আরব বিভাজন ও পশ্চিম এশিয়া

আরব বিভাজন ও পশ্চিম এশিয়া
প্রতীকী ছবি

ইউনাইটেড আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি আঞ্চলিক মেরুকরণের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া কার্যত মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার সমীকরণে বিরাজমান উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ইসরায়েলের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে আমিরাতের পথ ধরে আরো কয়েকটি আরব কিংবা মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এমনটি বাস্তব হলে আরব অঞ্চলে অনেকটাই একঘরে ইসরাইল নিজের রাজনৈতিক অভিপ্রায় পূরণে আরো সক্ষমতা অর্জন করবে।

আরব-ইসরাইল সম্পর্কের স্বাভাবিকতা কার্যত ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রস্বপ্নকে চুরমার করে আঞ্চলিক পর্যায়ে তেল আবিবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য লড়াইয়ে আরব দেশগুলোর কৌশলগত সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে ইসরাইল। এই পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন আসন্ন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। যদিও ঘটনাটি এমন সময় ঘটছে, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিই মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষত, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে পশ্চিমাপন্থিদের পরাজয়, আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়া জুড়ে মার্কিন আধিপত্য পড়েছে ঝুঁকির মুখে। বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে একক মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল অক্ষটি রীতিমতো শক্তিশালী হয়েছে।

মূলত সিরিয়ায় রুশ সামরিক হস্তক্ষেপজনিত গৃহযুদ্ধের নিষ্পত্তি আঞ্চলিক শক্তিব্যবস্থায় আমেরিকা ইসরাইলবিরোধী অক্ষের জন্য কৌশলগত বিজয় হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রতিরোধ অক্ষের সক্ষমতা বেড়ে গেছে বহু গুণ। একই সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সিরিয়া-রাশিয়া-ইরানের সামরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে তেহরানের নেতৃত্বে নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে প্রতিরোধশক্তি। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার এই ভিন্নতাই আমেরিকা ইসরাইলের জন্য মাথাব্যথার কারণ। যে কারণে আরব-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘ প্রচেষ্টাই এই মুহূর্তে আমেরিকার জন্য তুরুপের তাস। যে প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক শক্তিব্যবস্থার হঠাত্ ভারসাম্যহীন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের মার্কিন প্রচেষ্টা হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। সংগত কারণেই আঞ্চলিক পরিস্থিতির যে পরিবর্তন অত্যাসন্ন বলে দৃশ্যমান হচ্ছে তার বাস্তবিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান সমীকরণে অনেকটাই চাপমুক্ত ইরান সিরিয়া লেবাননসহ তাদের অনুগত প্রতিরোধ ফ্রন্ট এই ভিন্ন পরিস্থিতিতে কী কৌশল গ্রহণ করবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে প্রায় ১৩টি দেশে আমেরিকার সরাসরি সামরিক ঘাঁটি আছে।

অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের হেডকোয়ার্টার্স হচ্ছে বাহরাইনে। বলা চলে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মার্কিন সেনারা। এই অঞ্চলে উপস্থিত মার্কিন সেনাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই হচ্ছে ইসরাইলের নিরাপত্তাভীতি দূর করা এবং অন্যান্য মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। আর এই প্রধান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে ইরানকে সব দিক থেকে কোণঠাসা করে রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিপরীতে এই মুহূর্তে মার্কিন সেনারাই কিছুটা চাপে আছে। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়—মাত্র কয়েক দিন আগে সিরিয়ার অভ্যন্তরে একটি মার্কিন সেনাবহরের টহল আটকে দিয়েছে সিরিয়ান সেনারা। উপরিউক্ত বাস্তবতাই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইতিহাসের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে সবাই ধারণা করছেন। ফলে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ইরানি দাবিই যেন প্রবল হয়ে উঠছে। ইরানের দাবি যে শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। এর একটি মাত্র উদাহরণ হতে পারে ইরান কর্তৃক মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।

উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে মার্কিন গুপ্ত হামলায় এলিট ফোর্স আইআরজিসির কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হলে মাত্র ছয় দিনের মাথায় ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় ইরানের সেনাবাহিনী। গত ১০০ বছরের মধ্যে সরাসরি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে প্রথম কোনো দেশ হিসেবে ইরানের ঐ ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ ছিল একটি বিরল ঘটনা। আমেরিকা কর্তৃক এর প্রতি আক্রমণ না হওয়াটাও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি স্পষ্টত সামরিক সমীকরণের প্রভাব। যে কারণে দীর্ঘ দিনের শত্রু ইরানের আক্রমণের মুখেও নিশ্চুপ থাকতে বাধ্য হয় আমেরিকা। এটি শুধু পশ্চিম এশিয়া বিষয়ে পেন্টাগনের কৌশলে পরিবর্তন নয়, একটি ভিন্ন বাস্তবতাকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করার বিচক্ষণতা। তাই এ কথা খুব পরিষ্কার যে দীর্ঘ সময় থেকে আঞ্চলিক পরিসরে একক মার্কিন আধিপত্য এখন বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে সমগ্র দুনিয়াই এখন বহুমেরুভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর যুগে বিশ্বব্যাপী বলদর্পী মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়ায় যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর সমাধান প্রয়োজন। এই বৈশ্বিক উপলব্ধির প্রাণকেন্দ্রে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। যেখানে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব একটি স্থায়ী সংকট। গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরব ইসরাইল সংকট এই আলোকেই ঘনীভূত হয়। কিন্তু ইতিহাসের দুর্ভাগ্য হলো এই যে আজ আরব জাতিয়তাবাদী দেশগুলোই ইসরাইলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পালটে দিচ্ছে চাকা। যে কারণে স্মরণকালের সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির মধ্যে পতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন। তাই ১৯৪৭ সালের বিভক্তি পরিকল্পনা মোতাবেক ইসরাইল নামক যে রাষ্ট্রটির জন্ম, তারাই আজ সমস্ত ফিলিস্তিনি ভূমির মালিক। আর বাস্তবতার মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইউনাটেড আরব আমিরাত কর্তৃক ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তটি আঞ্চলিক পরিসরে বিরাজমান স্থিতাবস্থার অবসান করবে। ফলে সিরীয় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট ইরান, সিরিয়া, লেবাননভিত্তিক প্রতিরোধ অক্ষের সম্মিলিত শক্তি সক্ষমতা নতুন করে চাপে পড়বে। বিশেষ করে ইরান। পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের দুই দেশ ইরান ও আরব আমিরাতের মধ্যকার সার্বভৌম বিরোধ আগে থেকেই লেগে ছিল। এর মধ্যে শত্রু দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ইরান-আমিরাত দ্বন্দ্ব শিগিগরই উত্তেজনার দিকে মোর নিতে যাচ্ছে। এর আভাস পাওয়া যায় আমিরাত-ইসরাইল চুক্তি সম্পাদনের খবরটি প্রকাশ্যে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজেদের জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করলে আমিরাতের একটি জাহাজ আটক করে ইরান। এর জবাবে কয়েকটি ইরানি মাছধরা নৌকা লক্ষ্য করে আমিরাতের কোস্টগার্ড গুলি ছুড়লে নিহত হন দুজন ইরানি জেলে। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও আপাতত পরিস্থিতি শান্ত। কিন্তু এই শান্তি অদূর ভবিষ্যতে বজায় থাকবে এমন নিশ্চয়তা কোনোভাবেই দেওয়া যাচ্ছে না।

আজ যে পরিস্থিতি হাতছানি দিচ্ছে তার সার সংক্ষেপ হলো আরব রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক ইসরাইলকে স্বীকার করে নেওয়া। কিন্তুযে প্রেক্ষাপটের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা এক দিনে হয়ে ওঠেনি। যুগ যুগ ধরে বহু ঘটনা, যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আজকের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে আরবদের প্রধান দুর্বলতাই ছিল বিভাজন। ঐ বিভাজনের পথ ধরেই আজকের মধ্যপ্রাচ্য যে ইতিহাসের জন্ম দিতে যাচ্ছে, সেখানে তাদের জন্য হয়তো আরো দুর্দশাই অপেক্ষা করছে। কেননা আমরা সবাই জাতিসংঘের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবের কথা জানি। ১৯৬৭ সালের ২২ নভেম্বর তারিখে নিরাপত্তা পরিষদ গৃহীত ঐ প্রস্তাবে রাশিয়াসহ অন্য সদস্য দেশগুলো ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের সমস্ত প্রক্রিয়াকে নিন্দনীয় কাজ বলে অভিহিত করেছিল। এতত্সত্ত্বেও ঐ প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ ছিল—ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত সমস্ত ফিলিস্তিনি ভূমি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে আরব-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। আরবরা অনেক ভেবেচিন্তে দ্বিধার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব মোতাবেক ইসরাইলের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে সম্মত হলেও ইসরাইল সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাই আজকে ইসরাইলি আধিপত্যের মুখে আরব-ইসরাইল সম্পর্ক শুধু একটি ঘটনাই। এর মধ্য দিয়ে আরবদের প্রাপ্তি শূন্যই থাকবে। ক্ষতি হবে ফিলিস্তিনের।

লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত