অরক্ষিত মাঠ প্রশাসন: উল্টো পথের যাত্রা

অরক্ষিত মাঠ প্রশাসন: উল্টো পথের যাত্রা
অরক্ষিত মাঠ প্রশাসন: উল্টো পথের যাত্রা

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের সুযোগে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হবে, এটি অত্যন্ত বাস্তব এবং নিতান্তই অপ্রত্যাশিত কোন ব্যাপার নয়। আর মাঠ প্রশাসনের ডিসি, ইউএনও, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী হাকিমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সরকার আরোপিত নীতিমালা বাস্তবায়ন, প্রয়োগ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকি ও সমন্বয়ের মধ্যেই আর তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলা আর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে আমলাদের মতামত ইদানিংকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের তরুণ আমলাদের জন্য রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে গড়ে উঠা সুবিধাবাদী শ্রেণি ও চরম নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট নানাবিধ সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হয়ে দায়িত্বপালন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ও তার মুক্তিযোদ্ধা পিতার ওপর নিকৃষ্টতম কায়দায় বর্বর হামলা।

ওয়াহিদা খানমের ওপর নিষ্ঠুরতম হামলা আমাকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। কোমলমতি নিষ্পাপ শিশু সন্তানের সামনে মায়ের ওপর হাতুড়ি পেটা নির্মম জীবননাশী আক্রমণ, যে মেয়ে সন্তানকে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পিতা সারাজীবন গৌরব করে বেড়াতো, সেই আদুরে কন্যাকে বাঁচাতে গিয়ে তিনিও মৃত্যু শয্যায়।

কোমলমতি শিশুটির মনে এই জঘন্য ঘটনার সূদুরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে ভাবলে আতঙ্কে আমার শিহরণ জাগে। ওয়াহিদা খানমের স্বামী মাঠ প্রশাসনের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা এবং রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত। এই মানুষটির ব্যক্তি ও কর্মজীবনে এই নিষ্ঠুর ঘটনার প্রভাব নিয়ে আমার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রকরা ভেবেছেন কি? ঘটনা পরবর্তী সময়ে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতারে প্রশাসনিক তৎপরতা এসবই কি এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে কোন স্থায়ী সমাধান? গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পারি, আমলাদের রক্ষায় গানম্যান নিয়োগের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় সশস্ত্র আনসার নিয়োগের কথা বলেছেন-এর কোনটিই কি এসব সমস্যার কোন টেকসই সমাধান? যে দেশে খুনের মামলার আসামি নেতার পাশে বসে থাকলে প্রটোকল দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা তাকে পলাতক হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, সে দেশে আনসার আর গানম্যান এর বন্ধুক মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জীবন রক্ষায় সচল হওয়ার উপায় আছে কি?

অনেকেই হয়তো বলে থাকবেন, এমন ঘটনা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও ঘটে। এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনভাবেই রাষ্ট্রচিন্তার কারণ হতে পারে না। বিনয়ের সাথে বলবো অদ্যাবধি ওয়াহিদা খানমের ঘটনায় প্রাপ্ত তথ্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে এর সাথে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, অর্থনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন এবং ভয়াবহ মাদকের সংশ্লিষ্টতা ও সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। বিপরীতে উন্নত দেশের এমন ঘটনাগুলো ব্যক্তি কেন্দ্রিক স্খলনের সাথে জড়িত থাকলেও সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও প্রশাসনিক সহমর্মিতা থাকে শূন্যের কোটায়।

যেনতেনভাবে বিত্ত অর্জনের তীব্র বাসনা যেন সমাজ ব্যবস্থার নিত্য অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কুপ্রভাব সামাজিক জীবনকে অস্তির করে তুলেছে। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিয়োগাত্মক পরিণতিতে নিদারুণ নির্মমতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনায় একজন মাদকাসক্ত মানুষ যেমন তার পিতা-মাতার গায়ে হাত তুলতে বুকে চাপ অনুভব করে না, তেমনি লাগামহীন অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তরা চারপাশে থাকা মানুষগুলোকেও নিজ শ্রেণির ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তাদেরকে করে তোলে আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য। দখল, বেদখলের সংস্কৃতি, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে না পারলে আনসারের বন্দুক আর সশস্ত্র গানম্যান কোনভাবেই মাঠ প্রশাসনের আমলাদের জীবন রক্ষার প্রতিষেধক হতে পারে না।

দুর্যোগে, দূর্বিপাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা জনগণের পাশে থাকাটাই যখন প্রত্যাশিত ছিলো, কোভিড প্যানডেমিকে কিছু ব্যতিক্রম বাদে এর বিপরীত চিত্রটি ই আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে। শাসক আর বিরোধী দলের জীবন ভয়ে আতঙ্কিত নেতারা ঘরবন্দী হয়েছে, বাকপটু সমাজপতিরা ঘরমুখো বিলাসী জীবনে মুখ লুকিয়েছে। এমন কঠিন সময়েও সিভিল আর পুলিশ প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের আমলারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে, পরিবার-পরিজনকে জীবন-মরণের হুমকিতে ফেলে জনগণের পাশে থেকেছে,।দেশপ্রেমের সঞ্জীবনী শক্তি ছাড়া এমন কাজকে করতে পারে বলুন! এমনতর পরিস্থিতিতে মাঠ প্রশাসনের একজন গর্বিত সদস্য হাতুড়ি পিটার শিকার হলে আমার বিক্ষুব্ধ হওয়া খুব অন্যায় হবে কি?

আরও পড়ুন: করোনায় শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে মহিলা পরিষদের সমীক্ষা প্রকাশ

এগিয়েছে প্রিয় বাংলাদেশ। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে দুনিয়া কাঁপানো পরাশক্তিও আজ সম্মানের চোখে দেখে। জিডিপি আর রিজার্ভ এর জোরে দিশেহারা জাতির বৈষম্য আজ লাগামহীন, সুষম বণ্টন-এতো কল্পনাবিলাসীই বটে। দুর্নীতি আর মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন রোধ এখন সময়ের দাবি। এ দু'টি ক্ষেত্রের উন্নয়ন একদিকে যেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তেমনি বৈষম্য দূরীকরণেও হতে পারে একটি সুন্দর গ্রহণযোগ্য উদ্ভাবন। অনেকেই হয়তো বলবেন- নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি না করে দুর্নীতির লাগামটানা স্বপ্ন বিলাসী নয় কি? একমত হলেও বলতে চাই, মজ্জাগত দুর্নীতিকেও একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সাফল্য সর্বজনবিদিত। একটি ক্রাসপ্রোগ্রামের আওতায় প্রত্যেক ব্যক্তির অনুকূলে তার সমস্ত সম্পদকে একটি পরিচিতি নাম্বারের অধীনে এনে শ্রেণিভিত্তিক বাধ্যতামূলক নিয়মিত কর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারলে একদিকে যেমন বৈষম্য দূরীকরণে তা ফলদায়ক হতে পারে, অন্যদিকে যেনতেন উপায়ে বিত্তের বাসনায় মত্ত লোভাতুর শ্রেণির অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর কর ব্যবস্থাপনাকে মডেল হিসেবে অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে শাসক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুদৃঢ় সদিচ্ছা ব্যতীত এমন পরিকল্পনা কল্পনাবিলাসী হতে বাধ্য। বাংলাদেশের ভিত্তিমূলে ছিলো একটি সুখী, সুন্দর ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন। এ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৩০ লক্ষ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছিল। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন ও মাদকের মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার টেকসই সমাধান না করে শুধুমাত্র সিভিল আর পুলিশ প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে একটি পুলিশি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও দেশের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া জাতির গর্বিত সন্তানদের প্রতি যেমন অবজ্ঞার শামিল হবে। তেমনই জাতির জনকের আমৃত্যু লালিত বাসনা বৈষম্যহীন অর্থনীতির সুখী ও সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত