অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ওপর মহলে এবং বাইরের মহলেও বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রশংসা-উক্তি শোনা যায়। এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমরা দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য কমিয়ে এনেছি, শিশুমৃত্যুর হার, প্রাথমিক শিক্ষার অভিগম্যতা, নারীদের অগ্রগতি, প্রত্যাশিত গড় আয়ু ও গড় মাথাপিছু আয় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, কৃষি ও খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, রপ্তানিমুখী শিল্পের অগ্রগতি হয়েছে, বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পেয়েছে, ইত্যাদি অর্জনগুলো নিয়ে আমরা অনেক প্রচার দেখি ও শুনতে পাই। কিন্তু আত্মসন্তুষ্ট না হয়ে আজ আমাদের ভাবতে হবে, আমরা বর্তমানে মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছি তা অর্জনের জন্য এখন আমাদের কী করা উচিত? বিশেষ করে, আমাদের উন্নয়নকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায় কীভাবে? করোনার ধাক্কা আমরা সামলাব কীভাবে?

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কী?

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘নানা মুনির নানা মত’। একটি মত হচ্ছে, যদি প্রবৃদ্ধির একটি অংশ নিচের গরিবদের কাছে চুঁইয়ে পড়ে এবং তাতে কিছু লোক দারিদ্র্য-আয়ের ওপরে উঠে আসতে সক্ষম হয়, তাহলে একে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বলা যেতে পারে। অবশ্য অনেক সামাজিক ন্যায়বিচারপন্থি অর্থনীতিবিদ (এ কে সেন ও তার অনুসারীরা) একে বড় জোর ‘Pro Poor Growth’ বলবেন কিন্তু ‘Inclusive Growth’ বলতে আদৌ রাজি হবেন না। তাদের মতে, দারিদ্র্য আসলে আপেক্ষিক বহুমাত্রিক একটি অবস্থা। দরিদ্র বা নিচের ৪০ শতাংশ মানুষ আসলে তুলনামূলকভাবে ওপরের ১০ শতাংশ মানুষের তুলনায় আয় করে কম, সম্পদ সঞ্চয় করে কম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ, অন্যান্য বহু সামাজিক সূচকের নিরিখে তাদের তুলনামূলক অবস্থান থাকে অনেক নিচে। আর এসব বঞ্চনা অনেক সময় নানা কাঠামোগত শোষণমূলক বঞ্চনা ও বৈষম্যের সম্পর্ক তৈরি করে। সেসব সম্পর্কের কারণে তাদের এবং তাদের প্রভুদের মধ্যে আপেক্ষিক ব্যবধান ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। তখন বাধ্যতামূলকভাবে গরিবের প্রবৃদ্ধি হয় শম্বুকগতিতে আর ধনীর প্রবৃদ্ধি হয় অশ্বের গতিতে। তাই বর্তমানে এ ধরনের প্রবৃদ্ধিকে আজকাল অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বলা হয় না। কারণ, এতে নিচের দিকের খুব কমসংখ্যক লোকই অংশগ্রহণ করেন বা করলেও তা করেন অপেক্ষাকৃত প্রতিকূল শর্তে!

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত ‘Sustainable Development Goal’ (SDG)-এর ১০ নম্বর লক্ষ্যে তাই বলা হয়েছে কোনো দেশের প্রবৃদ্ধি তখনই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই’ হবে যখন সে দেশের নিচের ৪০ শতাংশের আয় প্রবৃদ্ধির হার ওপরের ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি হবে। অর্থাত্ শুধু দারিদ্র্য নিরসক হলে হবে না প্রবৃদ্ধিকে হতে হবে বৈষম্য নিরসক।

বিশ্বব্যাংকের ভেতরে অবশ্য এই মত নিয়ে এখনো বাদানুবাদ চলছে। ২০১১ সালে OECD-WB যৌথভাবে যে উন্নয়ন সংলাপের আয়েজন করেছিলেন সেখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির’ ব্যাপারে তীব্র আলোচনা হয়েছিল। সেখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির’ কম পক্ষে ছয় রকম বিভিন্ন অর্থের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে—১. আয়বৈষম্য নিম্নতর হতে হবে, ২. চরম দারিদ্র্য কমতে হবে, ৩. প্রবৃদ্ধিও বহিঃস্থ প্রভাবসমূহ (Externalities) অন্তঃস্থ (Internalize) করতে হবে, ৪. ‘উত্তর-দক্ষিণ’ আয়বৈষম্য কমাতে হবে, ৫. সুযোগের বৈষম্য কমাতে হবে এবং ৬. শিক্ষার সুযোগ, অর্থায়ন বা ঋণের অধিকার, বিচারের অধিকার, উদীয়মান বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন বজায় মধ্য আয় বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জসমূহ সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০২১-২০৪১’ ছাপিয়ে প্রকাশ করেছেন। সেখানে শুধু দারিদ্র্য কমানোর টার্গেট নয়, বৈষম্য কমানোর টার্গেটও দেওয়া হয়েছে। যদিও খুবই মিনমিনেভাবে বলা হয়েছে এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে—‘আয়বৈষম্য বৃদ্ধির প্রবণতা বন্দি করে তা কমানোর চেষ্টা করা হবে (Arrest the trend of increasing income inequality and seek to reduce it’ (P=42)। তবু ভালো যে পরিকল্পনা দলিলে এবার দারিদ্র্যের পাশাপাশি বৈষম্য কমানোর সূচক’ পালমা অনুপাত (সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের আয়-শেয়ার ও সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশের আয়-শেয়ারের অনুপাত) সূচকটিও সুনির্দিষ্টভাবে কতটুকু কমানোর চেষ্টা তারা করবেন তা তালিকায় তুলে ধরেছেন—দেখুন নিচের তালিকাটি।

তালিকা থেকেই বোঝা যায়, পালমা-অনুপাত বা আয়বৈষম্য কমানোর বিষয়টা কত শ্লথ!

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এস আর ওসমানী অর্থনীতি বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য’ নিয়ে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। এই লেখায় সেগুলো আমি তুলে ধরলাম।

প্রথমত, জনাব ওসমানী তথ্যের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশে সবচেয়ে গরিব অদক্ষ দিনমজুরদের প্রকৃত মজুরি কমছে। কারণ, শহরে ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বেকার অদক্ষ শ্রমশক্তির যে ভিড় সম্প্রতি ক্রমবর্ধমান, তাতে শ্রমচাহিদার চেয়ে শ্রমসরবরাহ অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কাজের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তাদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে, যদিও হয়তো গড় প্রকৃত মজুরি এ সময় সামান্য বেড়েছে। এসব দরিদ্র লোকের শহরে এসে জড়ো হওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান। এরা শিক্ষা পায়নি। অকৃষি খাতে চাকরির সুযোগও তাদের নেই। এদের বিরাট অংশ দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্যের পকেটে অবস্থান করছেন। সেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া তুলনামূলকভাবে কম। সুতরাং আঞ্চলিক বৈষম্য, শিক্ষা বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের বৈষম্যই তাদের তুলনামূলকভাবে খারাপ অবস্থার কারণ।

দ্বিতীয়ত, সংগঠিত খাতে ১৯৮৫-২০১৬ এই সুদীর্ঘ কালপর্বে সাধারণভাবে গড়ে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও ঐ বৃদ্ধির হার তাদের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির হারের নিচে ছিল। অর্থাত্ এই সময়ে শ্রমিকরা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যত অবদান রেখেছেন, ততটা তারা নিজেদের পাতে তুলতে পারেননি।

তৃতীয়ত, ওসমানী দেখান দারিদ্র্য হ্রাসের বাত্সরিক গতিবেগ ২০০০-২০১০ সালে যা ছিল তা ২০১০-১৬ সালে আরো কমে গেছে। কিন্তু আমরা আবার এটাও জানি যে, দ্বিতীয় কালপর্বে প্রবৃদ্ধির হার ছিল বেশি। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যমূলক বণ্টনের কারণে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বর্ধিত প্রবৃদ্ধির অভিঘাত ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সমস্যাটা প্রবৃদ্ধির মাত্রা নিয়ে নয়, সমস্যাটা প্রবৃদ্ধির গুণগত চরিত্র নিয়ে। প্রবৃদ্ধি গ্রাম অভিমুখী, ক্ষুদ্র-মাঝারি-দরিদ্র অভিমুখী, শ্রমঘন এবং স্বদেশ অভিমুখিন হচ্ছে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে প্রবৃদ্ধি কতখানি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই’ হবে সেটা। বস্তুত খুব ধনীরা এ দেশে এবং বিদেশে দুই জায়গায় পা রেখে চলেন। তাদের অর্থও দুই জায়গায় ব্যয়িত হচ্ছে। সম্ভবত সেজন্য দীর্ঘদিন আমাদের ট্রাক্স-জিডিপি অনুপাত এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ হার স্থবির হয়ে আছে। বাড়ছে খেলাপি ঋণের হার।

করণীয় সুপারিশ

অর্থনীতি বিভাগের যে সেমিনারে এসব বিষয় আলোচিত হয়েছিল, সেখানে পরিকল্পনামন্ত্রী মান্নান সাহেব উপস্থিত ছিলেন এবং বৈষম্য যে কমানো উচিত তা তার সমাপনী ভাষণে তিনিও উল্লেখ করেছিলেন। সেই সেমিনারে বৈষম্য কমানোর জন্য কতক আশু নীতিমালার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেগুলো তুলে ধরে এই লেখা শেষ করব—

১. প্রগতিশীল আয় ও সম্পদ কর ব্যবস্থা কার্যকরী করতে হবে যাতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি পায়। ২. তবে পাশাপাশি অপ্রত্যক্ষ করের অনুপাত কমাতে হবে। ৩. আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। কাজের পরিমাণ ও গুণ অনুযায়ী প্রকৃত মজুরি অবশ্য নিশ্চিত করতে হবে। ৪. শিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান করতে হবে। ৫. শিক্ষার পরিমাণ শুধু নয়, এর গুণমান নিশ্চিত করতে হবে। ৬. সামাজিক নিরাপত্তার পরিসর বাড়াতে হবে এবং সেখানে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিহীনভাবে ফান্ড হস্তান্তর করতে হবে। ৭. উত্পাদনশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণসুবিধা বাড়াতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে, বৃহত্ শীর্ষ খেলাপিদের কনসেশন বন্ধ করে দিতে হবে। আর্থিক খাতে ন্যূনতম শৃঙ্খলা আশু পুনরুদ্ধার করতে হবে। ৮. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। ৯. রাজনীতিতে, বিচারব্যবস্থায় ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ১০. বিদ্যমান অসাধু রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী ও অসাধু আমলার ত্রিভুজ ক্ষমতা জোটকে চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলতে হবে।

কিন্তু এত কথার পরে এখনো যে প্রশ্নের উত্তর আমার সুনির্দিষ্টভাবে জানা নেই এবং জনগণকেই তা খুঁজে বার করতে হবে। সেটা হচ্ছে কে, কখন, কীভাবে এসব নীতি বাস্তবায়িত করবেন? আমি বলব, জনগণ যেহেতু ভুক্তভোগী সেহেতু তাদেরকেই এটা ঠিক করতে হবে—হয়তো নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেই সংগ্রামটা এখনই আমরা শুরু করতে পারি।

লেখক :অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক

অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত