প্রশিক্ষণের সাতকাহন: সামাজিক অবস্থান

প্রশিক্ষণের সাতকাহন: সামাজিক অবস্থান
প্রতীকী ছবি

বিদেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাজেটের একটা বিরাট অংশ ফি বছর গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করে। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিরাট মুনাফা অর্জন করে এবং সারা বিশ্বে বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করে। সেখানে আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি সর্বত্র প্রশিক্ষণ বিষয়টি অবহেলিত ও গুরুত্বহীন। আমাদের দেশে কোনো সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, পশ্চাত্পদতা, দক্ষতাহীনতা ইত্যাদি রয়েছে কি না বা থাকলে তার প্রকৃতি কী, সেই ঘাটতি কার্য সম্পাদনে কীভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা উদ্ঘাটনের প্রয়োজনীয়তা বা প্রক্রিয়ার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

এ কথাটা আমরা বুঝতে চাই না যে, কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অনুপ্রেরণা, স্বীকৃতি এমনকি পুরস্কৃত করার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত/আশানুরূপ কর্মদক্ষতা পাওয়া যায় না, যদি না এ কর্মী বাহিনীকে সক্ষম ও নিবেদিতপ্রাণ করে তোলা হয়। আবার কেবল রুটিনবদ্ধ, গতানুগতিক কিংবা চাকরি স্থায়ীকরণ বা পদোন্নতির লক্ষ্যে প্রদত্ত প্রশিক্ষণ কর্মের উত্কর্ষের গ্যারান্টি দিতে পারে না, পারে না লক্ষ্য অর্জনের নিশ্চয়তা দিতে।

এদেশে যেসব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণার্থীর কর্ম সম্পাদনে ইতিবাচক প্রভাব আদৌ ফেলে কি? এক কথায় প্রশিক্ষণের প্রভাব বা কার্যকারিতা নিরূপণের বিধিবদ্ধ কোনো অনুশাসন নেই এবং নির্ধারিত কোনো পদ্ধতি চালু নেই। সামগ্রিক বিবেচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণার্থী কিংবা তার কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণকে কেবল রুটিনমাফিক কাজ বলে মনে করেন বা কেবল পালনীয় দায়িত্ব বলে মনে করেন।

প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা পদায়নের একটি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে : প্রথমত, উপযুক্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয় না; দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় বা সন্তুষ্ট চিত্তে সেখানে পদায়িত হতে চান না; তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়িত কর্মকর্তারা সর্বক্ষণ তদবিরে ব্যস্ত থাকেন, অন্যত্র বদলি হতে; চতুর্থত, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তারা শুধু ঢাকায় বদলি হওয়ার জন্য কিংবা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করার জন্য সাময়িকভাবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে আসেন, অতঃপর তদবির করে অন্যত্র বদলি হয়ে যান বা পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে যান।

কেন এ অবস্থা, একটু পর্যালোচনা করা যাক। এ কথা সবাই জানেন যে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে না, প্রধান স্রোতের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা কম থাকে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের কেউ গুরুত্ব প্রদান করেন না বরং অবহেলা করেন। এসব পদে অধিষ্ঠিতদের পক্ষে কাউকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করার সুযোগ খুবই কম। এসব পদে যাদের পদায়ন করা হয় তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ধরে নেওয়া হয় যে, তারা প্রশাসনিক বা উন্নয়নমূলক পদসমূহের জন্য যোগ্য কর্মকর্তা নন বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক নেই বা তাদের নৈতিক বা আর্থিক সুনাম নেই বা তাদের খুঁটির জোর নেই। সাধারণত এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে কাউকে ‘ডাম্পিং’ করা হয়েছে মর্মেও ধরে নেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের নিবিড় যোগাযোগ কার্যত খুবই সীমিত। এসব প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেন না। যদিও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বক্তা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পেতে অনেকেই উন্মুখ হয়ে থাকেন। অনেকের প্রত্যাশা এরূপ যে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের আরো বেশি স্মরণ করা, আরো সম্মানিত করা, তোয়াজ করা।

সরকারি পর্যায়ে আন্তঃবিভাগীয়/আন্তঃপেশাগত সভায়, সম্মেলন, অনুষ্ঠানে, নীতিনির্ধারণী সভায়, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে, উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে কিংবা আন্তর্জাতিক সভা-সিম্পোজিয়ামে বা সম্মেলনে, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দলে বা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে সাধারণত বিবেচনা করা হয় না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুষদ সদস্যদের দেশি-বিদেশি পর্যায়ে যোগাযোগ, এক্সপোজার হ্রাস পায়, তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রসার বা আধুনিকায়ন বা বহুমুখীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

সচিব বা সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের গানম্যান নিরাপত্তা ছাড়াও বহুবিধ প্রয়োজনে, বিশেষ করে ‘আইডেন্টিটি ম্যান’ হিসেবে ব্যবহূত হয়। অধিকাংশ বেসামরিক কর্মকর্তার পরিচয়ের আলাদা কোনো প্রতীক, চিহ্ন বা মাধ্যম নেই, যাতে সবাই তাদের পরিচয় পেতে পারেন। একটি সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের রেক্টর (তিনিও সচিব বা সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার) কোনো সভায় যোগদান করতে গেলে কর্তব্যরত অফিস সহায়ক বা সিকিউরিটি লোকজন রেক্টরকে না চেনার কারণে হয়তো প্রবেশে বাধা দেন বা পরে ঢুকতে অনুরোধ করেন বা একেবারে পেছনের সিটে বসতে বলেন। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও রেক্টর একসঙ্গে লিফটে ওঠার সময় লিফটম্যান বা সচিবের গানম্যান না চেনার কারণে রেক্টরকে হয়তো উঠতে নিষেধ করলেন বা পরে উঠতে বললেন। অনুষ্ঠান শেষে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার রেক্টরের গাড়ির ড্রাইভারকে আগে গাড়ি স্টার্ট নেবার/চালানোর কারণে প্রটোকল বিঘ্নিত হচ্ছে ভেবে মন্ত্রণালয়ের সচিবের গানম্যান বা ড্রাইভার হয়তো তিরস্কার করলেন। এ ধরনের বিব্রতকর ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে। এতে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ, হতাশা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, যা তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

এক কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালে গানম্যান পেতেন, এমনকি পরবর্তীকালে তিনি ওএসডি হলেও গানম্যান বহাল ছিল, কিন্তু তাকে যখন কোনো একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে রেক্টর পদে পদায়ন করা হলো তখন গানম্যান প্রত্যাহার করা হয়। জেলা শহরে সরকারি দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব সফর করলে যে প্রটোকল দেওয়া হয়, রেক্টর সফর করলে তার ছিটেফোঁটা ও দেওয়া হয় না। পুলিশ প্রটেকশন তো দূরের কথা, সার্কিট হাউজে কক্ষ বরাদ্দ, ডিউটির জন্য গাড়ি প্রদান বা পুলিশি সালামি ইত্যাদিতেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়।

একটি ঘটনার বর্ণনা এখানে দেওয়া যায়। একবার এক রেক্টর সরকারি সফরে সিলেট সার্কিট হাউজে গিয়ে জানতে পারলেন যে ট্যুর প্রোগ্রাম আগে পাঠানো হলেও কোনো এক মন্ত্রণালয়ের সচিব পরদিন সিলেট সফরে আসবেন, তাই তাকে ২ নম্বর কক্ষ দেওয়া যাচ্ছে না, তাকে ৩ নম্বর কক্ষে থাকতে হবে। মজার ব্যাপার ঘটল তার পরে। পরদিন সকালে দেখা গেল সার্কিট হাউজের সামনে মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পুলিশি সালাম দেওয়া হচ্ছে আর রেক্টর কক্ষের ভেতর থেকে অবলোকন করছেন সে দৃশ্য। উল্লেখ্য, এ দুজন কর্মকর্তা একই ব্যাচের, দুজন একই সঙ্গে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে একই ব্যাচের হলেও রেক্টর সচিবের চেয়ে সিনিয়র ছিলেন। জেলা প্রশাসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও অনায়সেই এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করে থাকেন।

একসময় ভারপ্রাপ্ত সচিবের পদমর্যাদায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমির রেক্টর এবং একটি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব একই ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং রেক্টর সিনিয়র ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত সচিবের তিন মাস আগে রেক্টর ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পদায়িত হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি, যদিও তত দিনে বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিবকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের বৈষম্যের উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যাবে।

যারা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাদের জ্ঞান অন্বেষণ, জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞান বিতরণ করতে হয় সব সময়। ফলে বিভিন্ন নীতি, আইন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, রূপকল্প থেকে শুরু করে স্থানীয় বা বৈশ্বিক সব বিষয়ে নিজেকে হালনাগাদ রাখতে হয় কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন শেষে চাকরি থেকে অবসরের পর সাধারণত কোথাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয় না। বিভিন্ন জাতীয় কমিশনে বা সাংবিধানিক পদসমূহে তারা স্বাভাবিকভাবে উপযুক্ত বিবেচিত হলেও তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত হতে দেখা যায় না। প্রাসঙ্গিকতা বা উপযুক্ততার বিবেচনায় তাদের নিয়োগ খুবই যুক্তিসংগত হলেও এমনকি সরকারি কর্মকমিশনে ও নিকট অতীতে এ ধরনের কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত হতে দেখা যায়নি। অবসরের পর অতিরিক্ত সচিব বা সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক পদায়নের মোট কতটি সুযোগ/পদ রয়েছে এবং স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরপ্রাপ্ত কতজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার তথ্য নিলেই এ বক্তব্যের যথার্থতা পাওয়া যাবে।

লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সচিব

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত