মহামারি মোকাবিলায় আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা

মহামারি মোকাবিলায় আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা
প্রতীকী ছবি

উন্নয়নের চাকায় বিশ্বের উন্নত দেশের সঙ্গে আমরা যখন খাপ খাওয়াতে ব্যস্ত, প্রতিনিয়ত গ্রামকে প্রতিস্থাপিত করছি শহরে, শহরকে বাড়িয়ে চলেছি উত্তরোত্তর, ঠিক তখনই একবিংশ শতাব্দীর এই উন্নয়নের মহাস্রোতে জীবন অনেকটাই স্থবির। কোভিড ১৯-এর প্রাদুর্ভাবে আজ ধনী থেকে উন্নয়নশীল সব দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে যখন মানুষ হিসেবে পৃথিবীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের সর্বোচ্চ সীমায় আমরা পৌঁছেছি, পরিবেশের ওপর কোভিড ১৯ নামক এই অনভিপ্রেত অভিসংযোজন আমাদের করেছে দিশেহারা। একদিকে বাস্তুতনের একটি উপাদান মানুষ, তার অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অন্যদিকে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের প্রতি নির্লিপ্ত উদাসীনতার ফলে মানুষ হিসেবে আমরা আজ চিরাচরিত জীবনযাপনের গতিপথ হারিয়েছি। এমতাবস্থায় আমাদের ভাবতে হবে নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে।

প্রথমত আমরা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে যদি ভাবি, কেমন হচ্ছে আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, তাহলেই অনেকাংশে অনুমান করতে পারবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। এটা সহজেই অনুমেয়, কোনো মহামারি ছাড়াই অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন ঢাকার মানুষকে অনেক আগেই বসবাসের অনুপযুক্ত করে তুলেছে। ছোট্ট একটা শহরে প্রতি কিলোমিটারে থাকছে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ, যেখানে একটি টেকসই নগরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫ হাজারের মতো অধিবাসী থাকতে পারে, সেখানে ঢাকায় বসবাস করছে প্রায় ১০ গুণ মানুষ। অন্যদিকে জীবন ও জীবিকার চাহিদায় এবং প্রতুলতার কারণে প্রতিদিন আরো ২ হাজার মানুষ নতুন করে শহরে অভিগমন করছে।

ঢাকা বিশ্বের এমন একটি বর্ধিষ্ণু শহর, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সুব্যবস্থা নেই, এতে প্রায় প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সময় বিভিন্ন জৈবিক ও প্রাণিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতাও দিন দিন কমে যেতে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের যেখানে গড় বয়স মাত্র ৬২ বছর। শুধু তা-ই নয়, মানুষের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা এবং শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অপরিকল্পিত নগরায়ণ। অন্যদিকে নতুন নতুন শিল্পায়নের ফলে নতুন ধরনের বর্জ্য উত্পাদন হচ্ছে, অথচ আমরা জানি না সেগুলো কীভাবে বিনষ্ট হবে অথবা সেটি পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। এভাবে অজানার দিকে আমরা ঠেলে দিচ্ছি আমাদের চিরচেনা শহরকে। বিন্যস্ত করছি উত্পাদনশীল জমি আর জলাধারকে।

অন্যদিকে বয়স্ক, শারীরিকভাবে অক্ষমদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক মানুষ। শুধু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে কীভাবে নগরের আশপাশে অথবা গ্রামাঞ্চলে জীবিকা নির্বাহ সম্প্রসারণ করা যায়, সেটি আজ উপলব্ধি করা জরুরি। এই মহামারিকালীন অনেকে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন। যেটা মানুষ পারেনি, প্রকৃতি সেটা মানুষকে শিখিয়ে দিয়েছে। আমরা যা ভোগ করতে পারছি না, সেটা উচ্ছিষ্ট হিসেবে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছি অথচ ভাবছি না সেটা প্রকৃতির বাকি সদস্যদের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা শহরে প্রয়োজনীয় প্রশ্বাসের স্থান রাখছি না, রাখছি না শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট সবুজ পরিবেশ বা জলাধার। এর ফলে আশপাশের এলাকা থেকে নগরের তাপমাত্রা বেড়ে একটা ভয়াবহ জৈবিক চক্রের দিকে নিয়ে চলেছে। আর সেটা আমাদের কল্পনার বাইরে থাকছে। এতে করে বড় ধরনের দুর্যোগে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ছি। একদিকে যেখানে বনভূমি না থাকার কারণে বন্য প্রাণিজগত্ লোকালয়ের কাছে চলে আসছে, ফলে বিভিন্ন জুনোটিক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলেও প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। এমতাবস্থায় উপযুক্ত অভিযোজনক্ষমতা না থাকলে সেটি আমাদের জন্য বড় শারীরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে আসছে।

তাই সময় এসেছে আমাদের নগরগুলোতে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার। যেসব স্থাপনা আছে সেগুলো কীভাবে পরিবেশসম্মত করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করার। স্থাপনা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে শিল্পাঞ্চল, রাস্তা-সেতু, অফিস, বাসভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ইত্যাদি। নগরে যতটুকু অবকাঠামো আছে ঠিক সমপরিমাণ কার্বন শোষণ করার মতো উদ্যান স্থাপন করা অতি প্রয়োজন। উপরন্তু বিশেষভাবে নজর দিতে হবে চিত্তাকর্ষণকেন্দ্র, শিশু ও বয়স্কদের বিশ্রামের জন্য খোলা প্রান্তর, খেলার মাঠ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা শোষণ করার জন্য জলাধার প্রস্তুত করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়াও অতি জরুরি বিষয়। কারণ এই অপরিশোধিত বর্জ্য মানুষ ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব রাখা যেন সম্ভব হয়, এমনভাবে বিপণিবিতান বা বাজার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। নগরকৃষির বিস্তরণ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। এতে করে দৈনন্দিন চাহিদার পূরণেই শুধু সহায়তা হবে না বরং শিশু-কিশোরদের অংশমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটবে। দেখা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অল্প স্থানে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে অনেক মানুষ বসবাস করে। এতে করে শিক্ষানবিশ নতুন প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে, যেন তারা পরবর্তী সময়ে শহর তথা সমগ্র দেশকে তাদের উদ্ভাবনী চেতনার মাধ্যমে নতুনভাবে প্রস্তুত করার সামর্থ্য অর্জন করতে পারে। এলাকাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করাও আরেকটি দিক, যেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।

এছাড়া প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যেন মানুষ ঘরে বসে সুবিধা পেতে পারে, সেই বিষয়ে লক্ষ্য দেওয়া এখন অনেক পরিবর্তনের বড় নিয়ামক। কারণ এই করোনা মহামারি হয়তো আমাদের বাসভূমিকে নতুন এক পৃথিবীতে পরিণত করছে, যেখানে আমরা আগের মতো পরিবেশের কথা বিবেচনায় না রেখে আগের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারব না। কিন্তু জীবন ও জীবিকার তথা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আমাদের জনঘনত্বের চিরচেনা নগরের টেকসই ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতেই হবে। আর তা না হলে এই শহর, সভ্যতা বা ঐতিহ্য কিছুই টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা আমাদের সামাজিক ও প্রাকৃতিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবে। আর এতে করে নতুন পৃথিবীতেই নয় বরং আমরা আমাদের শহরকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিতে পারব, পারব শহরের অধিবাসীদের মনে আশার আলো সঞ্চার করতে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত