প্রসঙ্গ: করোনাকাল, রূপকল্প ২০৪১ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব

প্রসঙ্গ: করোনাকাল, রূপকল্প ২০৪১ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব
প্রতীকী ছবি

করোনাকালে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এ অবস্থা শুধু আমাদের দেশে নয়, পুরো বিশ্বে একই সংকট। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস চিলড্রেন’স হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় জানা গেছে, শুধু গত জুলাইয়ের শেষ দুই সপ্তাহে অন্তত ৯৭ হাজার শিশু প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, এই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে অন্তত ৩ লাখ ৩৮ হাজার শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়। এতে অর্থ দাঁড়ায়, শুধু জুলাইয়ের দুই সপ্তাহে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

এই প্রতিবেদন এমন এক সময় প্রকাশ করে, যখন দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ থেকে স্কুলগুলো খুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলে। ৪৯ রাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে সাত জনের বেশি দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিম রাজ্যের। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ঘাবড়ে যায় মার্কিন প্রশাসন ও অভিভাবকগণ। একদিকে করোনার ভয়, অন্যদিকে পড়াশোনাহীন মাসের পর মাস। একই উদ্বিগ্নতা কিন্তু আমাদের দেশের অভিভাবকদের মধ্যেও।

ব্যক্তিগতভাবে আমার নাতি দুটিকে নিয়ে আমিও উদ্বিগ্ন। কত দিন সে স্কুলে যেতে পারে না! এর মধ্যে টেলিভিশনে দেখলাম সেপ্টেম্বরে স্কুল খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়ে। সিনিয়র এক সচিব বলেছেন, এখন পর্যন্ত স্কুল খোলার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। এর পক্ষে-বিপক্ষে গত সপ্তাহে আমাদের একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক অভিভাবকদের মতামত জরিপ করে। সেখানে প্রায় ৮৬ শতাংশ অভিভাবক একমত প্রকাশ করেন এবং ১৩ শতাংশ স্কুল খোলার পক্ষে মত দেন। ১ শতাংশ মতামত প্রদান থেকে বিরত ছিলেন। আমি কিন্তু হতাশ হওয়ার কিছু দেখি না। কারণ, আমার এই নাতি ভবিষ্যতে হতে পারে রাষ্ট্রপতি কিংবা অনেক বড় সায়েনটিস্ট, ডাক্তার, শিক্ষক। সম্ভাবনার বহু পথ তাদের এখনো বাকি। তাহলে মহাসংকটকালে কেন তাকে জোর করে স্কুলে পাঠিয়ে ঝুঁকির মধ্যে ফেলব? বিকল্প কী আছে, সেটাই চিন্তা করতে হবে এখন। একই সঙ্গে তার প্রতিটি দিন আনন্দময় ও শিক্ষণীয় করে তুলতে হবে। এটা গেল স্কুলগুলোর বাচ্চাদের বর্তমান অবস্থা। বড়দের প্রসঙ্গে আসি এবার।

ইদানীং বেশ জোরেসোরে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অনলাইন ক্লাসগুলোর জন্য জুম ভিডিও অ্যাপস, গুগল ক্লাসরুম, ফেসবুক লাইভ, মেসেঞ্জার চ্যাটরুম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উন্নত বিশ্বে অনেক আগে থেকে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম এখন আলোচনায় এসেছে। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সুফলের পাশাপাশি কিছু সংকট ও সমস্যাও আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অনেকে গ্রামে থাকে। তাদের নেটের সমস্যা, ল্যাপটপের সংকট, ডিভাইসের সমস্যা, সব এলাকায় নেটের একই স্পিড থাকে না, শিক্ষকদের প্রস্তুতি নিয়ে উপস্থিত হওয়া, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট ইত্যাদি ইত্যাদি।

গত সপ্তাহে আমার খুব স্নেহের এক স্টুডেন্টকে জিগ্যেস করলাম, অনলাইন ক্লাসের বিষয়টিকে তুমি কীভাবে দেখছ? সে বলল, এর তো অসংখ্য উপকার পাচ্ছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে না খেয়ে দৌড়ে ক্লাসরুমে যাওয়ার ঝামেলা নেই। ঘরে বসে ক্লাস করতে পারছি। শিক্ষক এখন বেশি প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসছেন। ক্লাসগুলো বেশ গোছানো, সাজানো। সে এরই মধ্যে অনলাইনে পরীক্ষাও দিয়েছে। এক ক্লাস বারবার নানাভাবে রিভিউ হতে পারে। বৈচিত্র্য, স্বাচ্ছন্দ্য আছে। নিজস্ব মতামতের জায়গা আছে। শুনে ভালোই লাগল। পৃথিবীর মহাসংকটে যখন সব স্থবির, তখন আমাদের শিক্ষার্থীরাও বসে নেই। নিজের চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে ভার্চুয়াল সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আরো এক ধাপ এগিয়ে। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কয়েক বছর পর ইন্টারনেট অনলাইনেই যেতে হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ কাজ একটু আগে আগেই করতে হলো। রূপকল্প ২০৪১ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের বৃহত্ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন আছে। সুতরাং অলনাইন শিক্ষাই তাদের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের মাইন্ডসেটে পরিবর্তন আনতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আমি একমত। কেননা, আমাদের ইন্টারনেট নেই, থাকলে স্পিড নেই, ডিভাইস নেই, এটা নেই ওটা নেই—এসব ভাবতে ভাবতে বছর শেষ হয়ে যাবে। চাইলে ক্লাসগুলো রেকর্ড করে এত দিন ইউটিউবে দেওয়া যেত। অথবা সেমিস্টার শুরুতে যদি শিক্ষার্থীদের পাঠ পরিকল্পনাগুলো দিয়ে দেওয়া যেত, তাতে তেমন কোনো ক্ষতি হতো না। চিরাচরিত সনাতন চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসাটাই সময়ের দাবি। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে কিছু বিভাগ আছে, যেখানে এখনো সেই মান্ধাতার আমলের পাঠ পদ্ধতি, সিলেবাস আর কর্মপরিকল্পনা চলে। এই শিক্ষকেরা নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টাও করেন না। এমন নাকাল অবস্থা আরো বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। এখন সময় হয়েছে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার। প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়াতে হবে। বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদেরও তাই করতে হবে। কারণ করোনা কত দিন স্থায়ী হবে, সে সম্পর্কে আমাদের কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। এমনকি রোগ বিশেষজ্ঞদেরও তা নেই।

সময় এসেছে শিক্ষার সিস্টেমটাকে ঢেলে সাজানোর। সময়োপযোগী ধারায় এগিয়ে নিতে হবে। প্রযুক্তি, অনলাইন, প্রেজেনটেশন, তথ্যভান্ডার ও কথোপকথনে আনতে হবে দক্ষতা, সঙ্গে থাকতে হবে বৈচিত্র্য। বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। ২০২০-২১ বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে জোর দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বরাদ্দ করা অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে গবেষণা ও যথোপযুক্ত খাতে ব্যবহার করলে আমরা সামগ্রিক জটিলতা থেকে বের হতে পারব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনের শুরুতে সমস্ত পাঠ পরিকল্পনা, লেকচারসহ যাবতীয় প্রদান করা থাকলে সময়মতো পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশ, সেশনজটমুক্ত ক্যাম্পাস—এগুলো বাস্তবায়ন করতে শারীরিক কোনো পরিশ্রমের দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার এবং সনাতন মানসিকতা পরিবর্তনের। বলতে অসুবিধা নেই, আরো এক যুগ আগে থেকে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারিগুলোর মধ্যে শাহজালাল এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ এগিয়ে। আজকের করোনার এই ধাক্কা আমাদের সব জড়তা আড়মোড়া ভেঙে স্বাভাবিকতা আনতে সহজ করেছে। যে কাজগুলোর জন্য এক দশক পরের প্রস্তুতি ছিল, সেগুলো এখন থেকে করতে হচ্ছে। ফলে রূপকল্প ২০৪১ :লক্ষ্যে পৌঁছানোটা আমাদের জন্য সহজ থেকে সহজতর হবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত