বাজার নিয়ন্ত্রণের দায় কার?

বাজার নিয়ন্ত্রণের দায় কার?
প্রতীকী ছবি

অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ, বলা যায় লাইক লাইন রপ্তানি ঠিক আছে তো? গরিব ও মধ্যবিত্তের দুশ্চিন্তার বিষয় দ্রব্যমূল্য ঠিক আছে তো? সরকারের দুশ্চিন্তার বিষয় ‘অপচয়’ বন্ধ হচ্ছে তো, অন্তত কমছে তো? এসব প্রশ্ন মানুষের মনে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। অফিস-আদালত খুলেছে। কলকারখানাও কিছু খুলেছে, কিছু খোলেনি, স্কুল-কলেজ বন্ধ। প্রবীণরা এখনো গৃহবন্দি। করোনার তাণ্ডব যথারীতি চলছে। মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে একটা টিকার জন্য। ভয়-আতঙ্ক যেমন আছে, তেমনি ভালো খবরে মানুষ বুক বাঁধছে। আবার নেতিবাচক খবরে আশাহত হচ্ছে।

ইতিবাচক খবরে মানুষের দুশ্চিন্তা কমছে। যেমন—‘রেমিট্যান্স’। ভাবা হয়েছিল ‘রেমিট্যান্সে’ ধস নামবে। না, তা মোটেও সত্য হয়নি। বরং বেড়েছে। রপ্তানির চিত্রটি ছিল হতাশাজনক প্রথমে। করোনা শুরুকালে মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুন মাসে ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল রপ্তানি, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি। এই চার মাসে ক্রমাগতভাবে রপ্তানি হ্রাস পায়। ভীষণ উদ্বেগের খবরে ছিল তা। কারণ এর ওপর নির্ভরশীল ৩০-৪০ লাখ শ্রমিকের জীবন। এর ওপর নির্ভরশীল বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ। রপ্তানি না হলে, না বাড়লে আমদানিও কমে যাবে। এর ফল গিয়ে ঠেকবে সরকারের রাজস্বে। রাজস্বের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। এমতাবস্থায় রপ্তানি না বাড়লে বেশ বড় বিপদ। না, দেখা যাচ্ছে রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তা নেতিবাচক ‘পারফরম্যান্স’ দেখিয়ে জুলাই থেকে তা বাড়া শুরু করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টের তুলনায় বর্তমান অর্থবছর ২০২০-২১ এ রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ। দুই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। গেল বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬৭৩ কোটি ২১ লাখ ডলার। মন্দ কী? রপ্তানি তো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে যা খুবই আনন্দের সংবাদ। এদিকে ‘রেমিট্যান্স’-এও কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। বলাবাহুল্য দুটো খবরই আশাপ্রদ খবর। দেশের জন্য ভালো খবর।

মুশকিল বেধেছে অন্যত্র। দেশের জন্য মঙ্গলকর খবর সত্ত্বেও সাধারণের জন্য কোনো ভালো খবর নেই। দৈনিক ইত্তেফাকের খবর ‘আমদানি নির্ভরতায় পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৩৫ টাকা। ১০ বছরে উৎপাদনের চেয়ে আমদানি হয়েছে অনেক গুণ’। খবরটি পেঁয়াজের ওপর হলেও শেষের দিকে বলা হয়েছে অন্যান্য সবজির দামের কথা। তাতে প্রতিবেদক উল্লেখ করেছেন করলা, বেগুন, বরবটি, পটোল, কাঁকরোল, শিম, আলু, টম্যাটো, গাজর ও কাঁচামরিচের দাম চড়া। দোকানদাররা বলছেন বন্যার কথা। বন্যায় সবজি খেতের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। আশঙ্কা শীতের মৌসুমের সবজি না উঠা পর্যন্ত দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মানে শুধু পেঁয়াজ নয়, শাক-সবজি, তরিতরকারির দামও বেড়েছে। অনেক ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। চাল, চিনি, সয়াবিন তেলসহ অনেক ভোগ্যপণ্যের দামই বেড়েছে। কারণ? কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা একেক পণ্যের জন্য একেক কারণের কথা বলেন। এটা তারা বরাবরই বলেন। আমদানি ঘাটতির কথা, চাহিদা বাড়ার কথা, ফসল নষ্টের কথা, পরিবহন সমস্যার কথা—বস্তুত ওজর-আপত্তির কোনো শেষ নেই। কারণ যাই হোক, মোট কথা সাধারণ মানুষের বারোটা।

এমনিতেই করোনার কারণে অনেক মানুষ চাকরিচ্যুত। অনেকেই বেকার। অনেকের রোজগার অর্ধেক। বিস্তর লোক সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে জিনিসপত্রের দাম বাড়া মানে মানুষের মাথায় হাত। সরকার মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বিবেচনা করে একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয় চট্টগ্রামের প্রধান বাজারে। অস্বাভাবিক দামে পেঁয়াজ বিক্রি ও পণ্যের ক্রয় রসিদ না থাকার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত দায়ী ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেন। এর প্রতিবাদে অচল হয়ে গেছে খাতুনগঞ্জ। এটা ৮ সেপ্টেম্বরের কথা। দেশের প্রধান পাইকারি ও আমদানিকৃত পণ্যের বাজার—খাতুনগঞ্জে ২৫০-এর মতো পাইকারি ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ব্যবসায়ী আছে। তারা বলছেন প্রশাসন তাদের হয়রানি করছে। এই অজুহাতে বাজার বন্ধ। এর অর্থ কী? অর্থ, পেঁয়াজের দামের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়া—তাই নয় কী? তার অর্থ জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হবে, নানা অজুহাতে। সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। বরাবরের মতো পরে প্রশাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়। এটা চলছে দীর্ঘদিন যাবত্। বাজেটের সময়, পবিত্র দুই ঈদের সময়, পূজার সময় এবং অস্বাভাবিক সরবরাহের সময়। কারো কিছু করার নেই যেন। বস্তুত করাও কঠিন। প্রতিটি পণ্যের জন্য রয়েছে ‘সিন্ডিকেট’ চাল, ডাল, নুন, তেল, সয়াবিন, চিনি, খেজুর, পেঁয়াজ থেকে প্রতিটি পণ্যে রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। একেকটি পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কয়েক জন ব্যবসায়ী-আমদানিকারক। দিনে দিনে তারা ‘ব্যবসায়ী-সাম্রাজ্য’ হয়েছে। দেশে-বিদেশে তাদের অফিস-কার্যালয়। জাহাজ-ভর্তি মাল এলে তারা বহির্বন্দরে নোঙ্গর করে থাকে। নিজের পয়সার ওপর আছে ব্যাংকের টাকা। বিপুল টাকার বলীয়ান হয়ে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই বাজার থেকে টাকা করে তারা ব্যাংক-বিমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মালিকও হচ্ছে। এদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এখন রাজনীতিতেও। এদের কথা বাদ দিন, সামান্য পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও প্রশাসন পারে না। পাইকারি বাজারের দাম এবং খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য বিরাট। কাওরান বাজারে একটি পণ্যের কেজিতে মূল্য ৩০ টাকা হলে শান্তিনগর বাজারে তা ৫০-৬০ টাকা। ‘বিপণন’ কত অদক্ষ হলে এমন অবস্থা হতে পারে এবং এর জন্য মূল্য দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাদেরকে। এসব থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ঢাকায় কয়েকটি পাইকারি বাজার করার কথা ছিল। কয়েক বছর আগে রাজধানীতে তিনটি পাইকারি বাজার করার জন্য ৩৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। দেখা যাচ্ছে, ছয় বছর পরও এসব বাজার চালু হয়নি। খবরে প্রকাশ, কাওরান বাজারকে তিন ভাগে ভাগ করে তিনটি ভবনে সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। তিনটি বাজারে একটিকে ‘ওয়ার্কশপে’ পরিণত করা হয়েছে, আরেকটি হাসপাতাল। অন্যটির ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু কাওরান বাজার নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি বাজার এবং কৃষকদের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কথা সরকারের, যাতে কতিপয় ব্যবসায়ী, পাইকার ব্যবসায়ী, আড়তদার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। দেখা যাচ্ছে সরকারের এসব পরিকল্পনা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না। তবে বলা সরকার, এসব বাজার সৃষ্টি করলেই কী মানুষ ন্যায্যমূল্যে জিনিসপত্র পাবে?

আমি মনে করি না তা পারে না। আসল কথা হচ্ছে সরবরাহ (সাপ্লাই)। সরবরাহ ঠিক না থাকলে, সরবরাহে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখা কঠিন। শাক-সবজি, তরিতরকারি বাজারের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষণীয়। প্রায় প্রতি বছরই এ সময়টাতে, শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে সবজির দাম বাড়ে। শীতকালীন সবজি উঠলে দাম কমে। কিন্তু এখানে কথা আছে। ৩০ টাকার জিনিসের দাম ৫০ টাকায় তুলে পরে ৪০ টাকায় স্থিতিশীল করা হয়। এভাবেই মূল্যস্তর এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উন্নীত হয়। এর থেকে পরিত্রাণ নেই? দৃশ্যত যা দেখছি তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশ। কারণ দেখা যাচ্ছে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী পণ্যের দাম তো বাড়াচ্ছেই, তার সঙ্গে আরো অনেক অসাধু পন্থা অবলম্বন করছে। ওজনে কম দেওয়া, মালের গুণগত মানে ঠকানো, মালে ভেজাল মিশ্রিত করা ইত্যাদি এখন ব্যবসায়ী স্বাভাবিক প্র্যাকটিসে পরিণত হয়েছে। সবাই এখন দ্রুত টাকা বানাতে চায়। সরকার যেখানে তাদের কাছে পরাস্ত, সেখানে সাধারণ গ্রাহকরা কী করবে? তবে একদম গোড়াতে ধরা যায়। পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে তা ভাঙার একটা ব্যবস্থা করা যায়। আইনগত ভিত্তি দরকার হবে। প্রতিযোগিতা আইন আছে। তার কঠোর ব্যবহার দরকার। বাস্তবে ‘প্রতিযোগিতা’ কমিশনের কাজ কী তাই আমরা জানি না। তাদেরকে সক্রিয় হতেও দেখা যায় না। অথচ এটা জোরদার করা দরকার।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত