আরব বিশ্বে নতুন সমীকরণ

আরব বিশ্বে নতুন সমীকরণ
প্রতীকী ছবি

পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যখন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে তখনই তা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীর্ঘকাল ধরে যা চলে আসছে তার যদি কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় তখনই আমরা হতচকিত হই। ১৯৪৮ সালে আরব ভূমিতে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা ঘটে। আরবরা এই নতুন প্রতিষ্ঠিত ইহুদি রাষ্ট্রকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন থেকে সমগ্র আরব বিশ্ব বনাম ইসরাইল—একটি নির্দিষ্ট সমীকরণে আবর্তিত বিবর্তিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্য শক্তি ইসরাইলের পক্ষে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। অপর দিকে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আরব বিশ্বের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পালটে যায় রাজনৈতিক সমীকরণ। একক পরাশক্তির সাম্প্রতিক সময়ে আরব বিশ্বে দৃশ্যমান ঐক্যে অদৃশ্য ফাটল দেখা দেয়। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইসরাইল ও ইরানের পরস্পরবিরোধী অভ্যুদয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনীতির বিকাশ ঘটায়। এই রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকতায় সম্পাদিত হয় আমিরাত-ইসরাইল শান্তিচুক্তি। যেহেতু কোনো আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের চুক্তিবদ্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক নয়, তাই গোটা পৃথিবী বিশেষত আরব বিশ্বে বিষয়টি তোলপাড় সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির কারণ হিসেবে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ চিহ্নিত করেন :

১. ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সে শূন্যতায় একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ পৃথিবীর রাজনৈতিক সমীকরণ পালটে দেয়। এখন ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় শাসিত হচ্ছে পৃথিবী। পরিবর্তিত অবস্থায় ইসরাইল অর্জন করে বেপরোয়া শক্তি।

২. ১৯৭৯ সালে ইরানি ইসলামি বিপ্লব সফল হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হেস্তনেস্ত করে। ক্রমে সে পরিণত হয় মার্কিন প্রধান শত্রুতে।

৩. আফগানিস্তানে মার্কিনি দখল ও ইরাকে সাদ্দাম হুসেনের পতন পৃথিবীর এই অংশে মার্কিন প্রভাবকে ভীতিকর করে তোলে। প্রতিক্রিয়াশীল ও দক্ষিণপন্থি আরব নেতৃত্ব মার্কিন পক্ষপুটকে নিরাপদ মনে করে। ইসরাইল যেহেতু মার্কিনিদের বিশ্বস্ত মিত্র এবং ইতিমধ্যে অপ্রতিরোধ্য আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে তাই আরব সামন্ত শাসকরা ইসরাইলের সমর্থন ও মিত্রতাকে তাদের ক্ষমতার গ্যারান্টি বলে মনে করেন।

৪. আরব বসন্তের ফলে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয় তা সামন্ত শাসকদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। তারা আরো বেশি করে মার্কিন মিত্রতা অর্জনে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

৫. ইরানে ইসলামি বিপ্লব ও আরব বসন্তের মাধ্যমে যে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর সম্প্রসারণ ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্য তাকে সভ্যতার প্রতি চ্যালেঞ্জ মনে করে। মৌলবাদের এই উত্থান গণতন্ত্রকে বিপন্ন করবে বলে তারা সিদ্ধান্ত নেয়।

৬. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইসলামি সন্ত্রাস নির্মূলের সিদ্ধান্তের অনুকূলে সামন্ত শাসকরা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ছয়টি মুসলিম রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত করেন। বিস্ময়ের ব্যাপার তিনি বিদেশ ভ্রমণে প্রথমে যে রাষ্ট্রটিকে বেছে নেন তা-ও আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্র—সৌদি আরব।

৭. তুরস্কে এ কে পার্টি তথা এরদোগানের নেতৃত্বে উসমানীয় সালতানাতের গৌরব পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার আভাস পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় সমর্থনের জন্য ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে।

৮. আরব বিশ্বে এই সময়ে তিনটি নেতৃত্বের আবির্ভাব ট্রাম্প তথা ইসরাইলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হয়। এরা হলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং মিশরের সামরিক শাসক আবুল ফাত্তাহ আল সিসি। এই ত্রয়ীর সঙ্গে যুক্ত হন ট্রাম্প জামাতা কুশনার।

এই চুক্তি আরব জনমনে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলের আরব রাজনৈতিক দল ‘বালাদ’ মন্তব্য করেছে চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমিরাত শত্রুপক্ষে নাম লিখিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এই চুক্তিকে আরব জনগণের জন্য বড় ধরনের অপমান বলে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনিরা চুক্তিকে তাদের পিঠে ছুরিকাঘাত হিসেবেই গ্রহণ করেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইসরাইলের পক্ষে এটি একধরনের ‘কূটনৈতিক অভ্যুত্থান’। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে যুগ যুগ ধরে লালিত আরব ঐক্যের অস্বীকার মাত্র। যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনি মিশনের প্রধান লুসাম জমলতের মতে, এই চুক্তি ফিলিস্তিনে স্থায়ী প্রতিষ্ঠার পথে খুবই ক্ষতিকর। কেননা এটি ইসরাইলকে তার দখলদারির অবসান ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপনার অবসান ঘটাবে। এ চুক্তি আরব লিগের ২০০২ সালের গৃহীত প্রস্তাবের বিরোধী। আমিরাত-ইসরাইল চুক্তি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য সর্বনাশের কারণ হলেও ট্রাম্পের নির্বাচনি বিজয় এবং নেতানিয়াহুবিরোধী আন্দোলন প্রশমনে কাজে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

দীর্ঘকাল ধরে আরব বিশ্বে ফিলিস্তিনই ছিল আলোচনা ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ইসরাইল যৌথ প্রযোজনায় ইরান এখন আলোচনা ও আক্রমণের নিশানায় পরিণত হয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত-বিবর্তিত হচ্ছে আরব কূটনীতি। মূল সমস্যা ফিলিস্তিনি জনগণ না হয়ে ‘ক্ষমতা’ রক্ষার কৌশল প্রাধান্য পাচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন সেনাবাহিনী পাহারা না দিলে সৌদিরা ক্ষমতা হারাবে। আর বাহরাইনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিয়ারা ক্ষমতা দখল করবে। তাই মার্কিন পাহারাই সব আরব দেশের স্থিতিবস্থার গ্যারান্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুঃস্বপ্ন আক্রান্ত দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে এককাট্টা হচ্ছে। এক্ষেত্রে এত দিনের সাধারণ শত্রু ইসরাইল অনুঘটকের কাজ করছে। সৌদি আরবের ভবিষ্যত্ সিংহাসনের দাবিদার যুবরাজ ইসরাইলকে মসনদের পাহারাদার বানিয়ে ফেলেছে। তার সঙ্গে ইসরাইলের গোপন সম্পর্ক এখন আর গোপন নেই।

সামন্তবাদী চরিত্রের প্রতিক্রিয়াশীল আরব সরকারগুলো একই ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ায় আরব বিশ্বে নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলের গোয়েন্দা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘ডেবকাকাইন’ স্বীকার করেছে যে, ‘এই অঞ্চলে গভীর ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে।’ সাধারণভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকরা গণবিরোধী। এসব দেশে যদি গণতন্ত্র বহাল থাকত তাহলে গণরোষে সবাই ক্ষমতা হারাত। আলজেরিয়া ও সুদান এর প্রমাণ। এই গণবিরোধী সম্ভাব্য সমীকরণের বিপরীতে গণ-আন্দোলনও স্পষ্ট। ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় গণযুদ্ধ চলছে। বিশ্বব্যাংকের আরব বিশ্ববিষয়ক মুখ্য অর্থনীতিবিদ রাবাহ আরেফি মনে করেন, এ অঞ্চলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নতুন প্রজন্ম পরিবর্তন চায়। এই গণমুখী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করছে অনারব রাষ্ট্রগুলো—তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তান। সেক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বব্যাপী আরেকটি বিপরীত সমীকরণও দৃশ্যমান। এই সমীকরণের চূড়ান্ত ফলাফল দেখতে আমাদের আরো দু-এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত