কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর :এক মহাযাত্রা

কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর :এক মহাযাত্রা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ, বাঙালি, বঙ্গবন্ধু একটি সত্তার অমর মহাকাব্য। অতল সমুদ্রের স্পর্শহীন জীবন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বিচিত্র, বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী শেখ মুজিব নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের হূদ্মাঝারে। বাংলাদেশের গোটা মানচিত্র জুড়ে অদ্বিতীয় রাজনীতির কবি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে অতিক্রম করে পৌঁছে গিয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের মনমন্দিরেও। এ বছর চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর নানা আয়োজন।

সেই আয়োজনের উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা ‘কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর’। প্রকাশিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সম্পাদনায়। অসামান্য প্রকাশনার সম্পাদনা পরিষদে আছেন প্রধান সম্পাদনা উপদেষ্টা—শেখ হাসিনা, সম্পাদনা উপদেষ্টা—জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সম্পাদক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।

সম্পাদনা সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—সৈয়দ নাসির এরশাদ, প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান, ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ, নাসরীন জাহান লিপি, কাজী মাহবুবুল আল, মুহম্মদ মোহসিন রেজা, দিপন দেবনাথ, আসিফ কবীর, স্নিগ্ধা বাউল।

‘বাবা’ বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় কন্যা শেখ রেহানার কবিতা দিয়ে ‘কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর’ প্রকাশনার দরজা খোলা হয়েছে। কবিতায় প্রিয়তম পিতাকে অনুভব করেছেন কবি শব্দের কারুকাজে—‘জন্মদিনে প্রতিবার একটি ফুল দিয়ে, শুভেচ্ছা জানানো ছিল, আমার সবচেয়ে আনন্দ। আর কখনো পাবো না এই সুখ, আর কখনো বলতে পারবো না, শুভ জন্মদিন।’

পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাণী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাণী পার হয়ে পাই মুখবন্ধ। মুখবন্ধের পরেই জাতির পিতার জীবনের রূপকথা সাজিয়েছেন সম্পাদনা পরিষদ। বিষয়টি খুবই প্রামাণ্য। ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সচিত্র সংক্ষিপ্ত জীবনী’ প্রামাণ্যে জাতির পিতার জীবনের বিশাল পরিধিকে খুব সংক্ষেপে কিন্তু বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে, কথা ও ছবির মুগ্ধ অ্যালবামে। এত সুচারু, গবেষণালব্ধ আয়োজন, মুজিব সম্পর্কে আগ্রহী যে কোনো বাঙালিকে প্রদীপ্ত করবে।

স্মৃতিকথা—নিবন্ধ পর্বে শুরুতেই ‘ভাইয়েরা আমার’। জাতির পিতার বিশ্ববিখ্যাত ৭ মার্চের ভাষণের আত্মবর্ণনা লিখেছেন শেখ হাসিনা। তিনি লেখেন—‘‘আব্বাকে মা ঘরে যেতে বললেন। পাশের ঘরটা শোবার ঘর। আমি আর আব্বা ঘরে গেলে মা বললেন, ‘তুমি একটু বিশ্রাম নাও’। আব্বা বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে আব্বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। এটা আমার সব সময়ের অভ্যাস। মা একটা মোড়া টেনে বসলেন। হাতে পানের বাটা। পান বানিয়ে আব্বার হাতে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘দেখো তুমি সারাটা জীবন এ দেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছো, দেশের মানুষের জন্য কী করতে হবে তা সকলের চেয়ে তুমিই ভালো জানো। আজকে যে মানুষ এসেছে, তারা তোমার কথাই শুনতে এসেছে। তোমার কারো কথা শোনার প্রয়োজন নেই, তোমার মনে যে কথা আছে তুমি সেই কথা বলবে।’

“আব্বা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন।’’

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রবণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন অনবদ্য নিবন্ধ—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরলস এক রাষ্ট্রনায়ক। তিনি লেখেন—“বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

“তার সোনার বাংলার স্বপ্ন বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।”

আমার বাবা শেখ মুজিব পর্বে শেখ রেহানা লেখেন অনবদ্য স্মৃতিমাখা ইতিহাস অ্যালবাম, শব্দের নিঃশব্দ বুননে। এই লেখার মধ্য দিয়ে মুজিব পরিবারের অনেক অজানা ঘটনা আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো, যা বাঙালির ইতিহাসের স্মারক। মার্চ মাসের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। তিনি ‘বঙ্গবন্ধু ও একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ’ নামে লেখায় ইতিহাসের অজস্র দুয়ার খুলে দিয়েছেন, চেতনার পরম্পরায়। ব্রিটিশ এনজিও অক্সফামের কর্মকর্তা জুলিয়ান ফ্রান্সিস লিখেছেন ‘মননে স্মরণে বঙ্গবন্ধুু নামে অনন্য এলিজি’।

বঙ্গবন্ধুর মহত্তম জীবনের আলেখ্য রচনা করেছেন কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ‘বঙ্গবন্ধু : চিরন্তন আলোকশিখা’ শিরোনামে। এই লেখায় বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর বিরামহীন লড়াইয়ের একটি বাস্তবানুগ দলিল উপস্থাপন করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে খুব কমই আলোচনা বা ব্যাখ্যা হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ করেছেন সৈয়দ বদরুল আহসান—‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার রাজনৈতিক দর্শন’ নিবন্ধে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণীয় বাণী পর্বে নেতার অনেক অমৃত বাণী উদ্ধৃত করা হয়েছে, একই সঙ্গে বাংলায় ও ইংরেজিতে। একটি বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন—‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালিও বেঁচে থাকতে এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না।’ পরের পর্বে রয়েছে—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিশিষ্টজনের স্মরণীয় উক্তি।

পরের পর্বে ‘ছয় দফা : বাঙালির মুক্তির সনদ’। এই নিবন্ধে ছয় দফার ইতিহাসের ছবি আঁকা হয়েছে নিপুণভাবে। ১৫১ পৃষ্ঠা থেকে শুরু হয়েছে ‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ’। স্বাধীনতার ঘোষণার পটভূমিসহ রয়েছে ঘোষণাপত্রও। ফলে, গোটা প্রকাশনা হয়ে উঠেছে বাঙালি ও বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক সম্পর্ক, লড়াই ও বিজয়ের দুর্লভ যাদুঘর। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং শেষাশেং বঙ্গবন্ধুর লিখিত গ্রন্থসমূহের পরিচিতি ।

‘কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর’ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী কেন্দ্র করে প্রকাশিত সুচিন্তিত, সুগ্রন্থিত, সুসম্পাদিত একটি জীবন্ত জীবননামা। যারা এই ঐতিহাসিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, প্রত্যেককে অভিবাদন ইতিহাসের রুচিস্নিগ্ধ দুর্লভ এক প্রকাশনার সঙ্গে বাঙালির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।

লেখক : কথাশিল্পী

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত