বেকারত্ব হ্রাসে চাই তরুণ উদ্যোক্তা

বেকারত্ব হ্রাসে চাই তরুণ উদ্যোক্তা
বেকারত্ব হ্রাসে চাই তরুণ উদ্যোক্তা

একটি দেশের উন্নয়নের যদি পাঁচটি নির্দিষ্ট খাত থাকে তাহলে ওই পাঁচটি খাতের মধ্যে সেই দেশের মানুষের কর্মসংস্থান একটি। কারণ, একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেই দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান থাকে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ। এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ছোট্ট অর্থনীতির দেশটি আজ পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমিথ’ হিসেবেও। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে গত দুই দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে অভূতপূর্ব। কিন্তু দেশ এগিয়ে গেলেও দীর্ঘদিনের ‘বেকার’ সমস্যাটির কোনোভাবেই সুরাহা হচ্ছে না।

দেশ যেভাবে হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঠিক তেমনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে। যার দরুন এই ক্ষতিপূরণ কবে নাগাদ কাটবে, তা নিয়ে সংশয়ে গবেষকরাও।

আমাদের সমাজে বেকার মানে বোঝানো হয় যাদের কোনো কর্ম নেই। মূলত বেকার বলতে এমন সব মানুষকে বোঝানো হয়, যাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম পেতে ব্যর্থ, তারাই বেকার। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে কিন্তু শিক্ষা অর্জনের পর সেই তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কিন্তু কেনই বা যুগ যুগ ধরে এই বেকার সমস্যার কোনো নিরসন হচ্ছে না?

দেশে বিগত কয়েক বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে না হলেও কর্মসংস্থান যে বাড়েনি, তা কিন্তু নয়। কর্মসংস্থান বাড়া সত্ত্বেও বেকারত্বের হার ১ শতাংশও কমছে না। ক্ষমতাবানদের দখলে কর্মসংস্থানেও চলছে লুটতরাজ। সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না উপযুক্তরা। বর্তমানে আমরা সবাই ধরেই নিয়েছি বা বাস্তবায়িত হতেও দেখছি যে, টাকা ছাড়া সরকারি চাকরি পাওয়া অসম্ভব এবং বেসরকারি খাতে নেপুটিজম ছাড়া চাকরি হওয়ার নয়। বেসরকারি খাতে এখনো মেধার যতটুকু যাচাই করা হয়, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সেটুকুও হয় না।

সরকারি চাকরি তাদেরই হয়, যাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার মতো সামর্থ্য থাকে। এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে ব্যতিক্রম কোনো কিছু তো আর উদাহরণ হতে পারে না। টাকার কাছে যখন মেধা হেরে যায় ঠিক তখনই বেকারত্বের হতাশার মধ্যে ডুব দেয় আমাদের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা। দুর্নীতির করাল গ্রাসে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত ব্যক্তিরা যদি হয় ঘুষ দ্বারা অনুপযুক্ত, তাহলে সেটা উপযুক্তদের যতটা না ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে বহু গুণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।

যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা যারা আগামী প্রজন্মের কান্ডারি তারা সেই অনুপযুক্ত শিক্ষকের থেকে কতটুকু শিক্ষা অর্জন করতে পারবে, প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এমন ঘটনা সবক্ষেত্রেই ঘটছে।

বাংলাদেশে ছোট-বড় সব ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। খারাপ শোনালেও বাস্তবতা এটাই যে, এই দেশকে একপ্রকার নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী লোকজন। সর্বক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি সুন্দর সাজানো ও উপযুক্ত লোকজন নিয়ে কোনো কাজ করার পরিকল্পনা করা হলেও সেই প্রকল্পের সমাপ্তি হয় ক্ষমতাবানদের মতামতে। মুষ্টিমেয় কিছু রাজনৈতিক নেতা সত্ হলেও বেশির ভাগ অসত্ভাবে সেই কাজগুলো সম্পন্ন করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেন বা বিদেশে পাচার করেন। বিগত বছরগুলোতে দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে যে লুটপাট আর বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

সরকারকে কঠোরতার সঙ্গে এসব বিষয়কে নজরে আনতে হবে। রাষ্ট্র থাকলে ক্ষমতাবানরা থাকবেন— এটাই স্বাভাবিক। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না হয় এবং সেটাতেও কর্তৃপক্ষের যাতে দৃষ্টিগোচর হয়, সেদিকেও মনোযোগী হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্যতা রক্ষা করতে হবে। এছাড়া চাকরি ছাড়াও নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনার মাধ্যমেও দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করা সম্ভব।

এতে গ্রামপর্যায়ের তরুণ-তরুণীরাও শহরের অপ্রতুল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগানে ও আরো বিভিন্ন মাধ্যমে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ঘুচিয়ে দেশকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে। নামে সাক্ষরতা না বাড়িয়ে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রেখে সার্টিফিকেট প্রদান করা উচিত, যাতে একজন ছাত্র বা ছাত্রী কর্মজীবনেও সেই দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারে। এজন্য শিক্ষাপদ্ধতি প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে, যাতে একজন শিক্ষিত যুবক বা যুবতী শুধু চাকরির সন্ধান নয়, নিজেরা কর্মসংস্থান তৈরি করে অন্যদের বেকারত্ব ঘোচাতে সক্ষমতা অর্জন করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত