পশ্চিম বাংলায় করোনা পরিস্থিতি

পশ্চিম বাংলায় করোনা পরিস্থিতি
করোনা ভাইরাসের প্রতীকী ছবি। ছবি: ইত্তেফাক

পশ্চিমবঙ্গে কয়েক হাজার কোভিড শয্যা খালি, কিন্তু কলকাতায় রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি না করতে পারার অভিযোগ তুলছেন অনেক রোগীর পরিবার। পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমণ যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সেই সময়েই হাসপাতালে বেডের অভাবে অনেক করোনায় সংক্রমিত ভর্তি হতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠছে।

গত কয়েক দিনে এমন ঘটনাও হয়েছে, যেখানে করোনা রোগীকে নিয়ে তিন-চারটি হাসপাতাল ঘুরেও জায়গা না পাওয়ার ফলে মৃত্যু হয়েছে রোগীর। উত্তর চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা ১৭ বছরের এক কিশোরের কদিন আগে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় তার পরিবার দুটি সরকারি এবং একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়েও ভর্তি করাতে পারেননি। এরই মধ্যে পরীক্ষা করে জানা যায়, তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অবশেষে পুলিশের সহায়তায় যখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে নিয়ে আসা হয়, সেখানেও দীর্ঘক্ষণ তাকে ভর্তি করানো হয়নি বলে অভিযোগ করছে ঐ কিশোরের পরিবার। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।

কলকাতার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অফিসার সুদীপ দত্ত তার কয়েক জন করোনা আক্রান্ত সহকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়েও অনেকটা একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংক কর্মচারীদের মধ্যে নিয়মিতই কোভিড সংক্রমণ হচ্ছে, আর সেই সব সহকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য আমাদের দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। এরকম বোধহয় খুব কম ক্ষেত্রে হয়েছে, যেখানে এক সুযোগেই রোগীকে ভর্তি করা গেছে। নানা হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কোথাও বেড খালি পাওয়া যাচ্ছে না। এমনও হয়েছে, রোগীকে ভর্তি করাতে এক বা দুই দিন অপেক্ষাও করতে হচ্ছে, বলেছেন তিনি।

একদিকে হাসপাতালগুলো যখন বেড নেই—এই অজুহাত দেখিয়ে রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রকাশিত দৈনিক বুলেটিনে দেখা গেছে, সারা রাজ্যে হাজার হাজার করোনা রোগীর জন্য সংরক্ষিত শয্যা খালি পড়ে আছে। সম্প্রতি যে বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীদের জন্য সংরক্ষিত ১০ হাজার ৮৩২টি শয্যার মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশে রোগী ভর্তি আছেন।

সরকারি চিকিৎসক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক ডা. মানস গুমটার ব্যাখ্যাও তেমনই। তিনি বলছিলেন, এই যে হিসাবটা দেওয়া হচ্ছে, সেটা গোটা রাজ্যের। বিভিন্ন জেলায় কোভিড হাসপাতালগুলোতে দেখবেন সংরক্ষিত শয্যা খালি পড়ে রয়েছে, যেখানে অত রোগীই নেই। কিন্তু শয্যা প্রয়োজন কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়ার এ জেলাগুলোতে।

তিনি বলেছেন, খুব দ্রুত যদি শয্যা বাড়ানো না যায়, তাহলে এখানকার হাসপাতালে কদিন পর থেকে আর ভর্তিই করা যাবে না কাউকে। আবার মোট যে কোভিড সংরক্ষিত শয্যার হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তার একটা বড় অংশই প্রস্তাবিত। সব শয্যা কিন্তু এখনো তৈরিই হয়নি।

ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এর দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। প্রথমত, সরকারি হাসপাতালের তুলনায় মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা করাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। আর দ্বিতীয়ত, মোট যত বেডের হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা গোটা রাজ্যের। কিন্তু সংক্রমণ তো বেশি হচ্ছে কলকাতা আর তার আশপাশের তিন-চারটি জেলায়। এখন এ অঞ্চলের রোগীকে নিয়ে তো দূরের জেলায় ভর্তি করা হবে না, তাকে তো এখানকারই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

পূর্ব ভারতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সংগঠন এএইচইআইয়ের প্রেসিডেন্ট রূপক বড়ুয়া বলেছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার সমস্যা আছে। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলেই তো হবে না, সমাধানের পথ বের করতে হবে। যারা উপসর্গহীন কিন্তু করোনা পজিটিভ এবং যাদের সামান্য উপসর্গ আছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে বাড়িতে রেখেই চিকিত্সার ব্যবস্থা করছি। হাসপাতালেরই ডাক্তার, নার্স, ডায়টেশিয়ান ২৪ ঘণ্টা নজর রাখবেন তাদের ওপরে। তবে এক্ষেত্রে বাড়িতে তাদের কিছু ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেমন—ঘরের লাগোয়া টয়লেট ইত্যাদি।

দেশের চার রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি এম আর শাহ, বিচারপতি অশোক ভূষণ ও বিচারপতি সঞ্জয় কিষান কাউলের ডিভিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানা হচ্ছে না করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেহ সত্কারের গাইডলাইন। ঠিকমতো টেস্টিংও হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট উদ্বেগ প্রকাশের পরই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারসহ মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নোটিশ পাঠিয়েছে।

বিচারপতি অশোক ভূষণ তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হাসপাতালগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। ইতিমধ্যেই করোনায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যারা এখনো জীবিত আছেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন আদালত। হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। কোনো কোনো রাজ্যে দেহ আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। মৃতদেহগুলোকে পশুর লাশের মতো ট্রিট করা হচ্ছে। এমনকি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃতদেহের সত্কারের গাইডলাইনও ঠিকমতো মানা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। বিচারপতিরা মন্তব্য করেছিলেন, করোনায় মৃতদেহ কীভাবে সত্কার হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ১৫ মার্চ একটি গাইডলাইন দিয়েছিল। কিন্তু কেউ সেই নির্দেশিকা মানছে না। এমনকি আত্মীয়-পরিজন রোগীর মৃত্যুর খবর পর্যন্ত পাচ্ছেন না। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

করোনা টেস্টিং কম হওয়া নিয়েও একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। মুম্বাইতে যেখানে দিনে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টেস্ট হচ্ছে, সেখানে দিল্লিতে কেন ৭ হাজারেরও কম টেস্ট হচ্ছে? প্রশ্ন তোলেন তারা। দিল্লিতে টেস্টিংয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কমে গিয়েছে, অবিলম্বে টেস্টিং বাড়ানোর নির্দেশ দেয় আদালত। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ, কোনো অজুহাতে কেউ যেন টেস্টিং করতে বাধা না দেয় বা টেস্টিংয়ে বাধা না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। চলতি পর্যন্ত রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪৪৮ জন। রেকর্ড আক্রান্ত হচ্ছেন এক দিনেই। যদিও করোনা সারিয়ে সুস্থও হয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যখন উদ্বেগে গোটা দেশ, তখন পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক নয় বলেই দাবি করেছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর।

পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমণের ওপরে সরকারের যে আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বুধবার নবান্নে তা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মেনেই নিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অভয়বাণীও দিয়েছেন, আতঙ্কিত হবেন না।

মমতা এ দিন বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যাটা আগামী কয়েক দিনে বাড়বে। কারণ আমরা টেস্টিংয়ের সংখ্যা বাড়াব। আগামী দুই মাসে করোনা আক্রান্তের সংখ্যাটা শিখরে পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই টেস্টিং, ট্রেসিং আর ট্র্যাকিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছি আমরা।’

যদিও গত এপ্রিলে ঠিক উলটো তত্ত্ব খাড়া করেছিল সরকার। তখন পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, পরীক্ষার সংখ্যার সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যার তেমন সম্পর্ক নেই। পরে দেখা যায়, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেও সেই হারে বাড়েনি আক্রান্তের সংখ্যা। এখন আবার উলটো গাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার দাবি, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে বাড়বে আক্রান্তের সংখ্যা। করোনা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সাহায্য চান তিনি। বলেন, এ লড়াই সরকারের একার নয়। সবাইকে লড়াইয়ে শামিল হতে হবে।

সবচেয়ে বেশি চিন্তা বাড়াচ্ছে শহর কলকাতার পরিস্থিতি। যত দিন যাচ্ছে ততই সেখানে সংক্রমিতের সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই ৩০০ জন করে করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে এই বর্ধিত সংক্রমণ রুখতে আরো কড়া লকডাউনের পথে হেঁটেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে জারি হওয়ার মধ্যে রয়েছে মালদহের তিনটি পুরসভা এলাকা। এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এ লকডাউন। পরে আরো এক সপ্তাহ তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। মালদহের ইংরেজবাজার, মালদা টাউন এবং কালিয়াচকে লকডাউন জারি রয়েছে। এছাড়াও উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার বেশ কয়েকটি পুরসভা এলাকায়। লকডাউন জারি করা হয়েছে। এসব জায়গায় খোলা রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দোকান, তবে অন্য সব পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর এমেরিটাস বিজ্ঞানী ও এইমস-এর প্রাক্তন ডিন নরেন্দ্র কে মেহরা আবার জানাচ্ছেন, যতক্ষণ না কোভিডের প্রতিষেধক বা ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে বা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ সংক্রমণ রুখতে মাস্ক পরা, হাত ধোওয়া, দূরত্ববিধি মানাসহ যাবতীয় নিয়মকানুন নিয়মিত মেনে চলতে হবে। তার কথায়, ‘উপসর্গহীন ও অল্প উপসর্গ রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও সংক্রমণ বাড়তে থাকলে অনেকেরই হাসপাতালে ভর্তির পরিস্থিতি হতে পারে। সেক্ষেত্রে মৃত্যুহার বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।’

যদিও গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতার পক্ষে মাইক্রোবায়োলজিস্টস সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট এ এম দেশমুখ বলছেন, ‘শুধু সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা নিয়ে হইচই করলে হবে না। সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা ও অত্যন্ত কম মৃত্যুহারের বিষয়টিও দেখতে হবে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে হার্ড ইমিউনিটি এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার অন্যতম পথ।’ মাইক্রোবায়োলজিস্ট তথা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান রাজেশ কুমারেরও বক্তব্য, ‘গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে একটু সময় লাগলেও এ মুহূর্তে সেটিই হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সেরা বিকল্প পথ।’

গবেষকদের একাংশের অবশ্য বক্তব্য, গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির তত্ত্বটি আসলে জনমানসে ভয়-ভ্রান্তি কাটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দেশের মৃত্যুহার কতটা কম, সেটাই অনেকে তুলে ধরছেন। হু-র রিপোর্টে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেমন জানিয়েছে, যেখানে প্রতি লাখ জনসংখ্যায় ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি, আমেরিকা ও জার্মানির মৃত্যুহার যথাক্রমে ৬৩.১৩, ৬০.৬, ৫৭.১৯, ৩৬.৩ এবং ২৭.৩২, সেখানে ভারতে প্রতি লাখ জনসংখ্যায় মৃত্যুহার হলো ১। যার পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকদের সতর্কবার্তা, মৃত্যুহার কম বলে অবশ্য আত্মসন্তুষ্টির কোনো জায়গা নেই।

লেখক: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত