প্রতিভার অপরিহার্য স্বীকৃতি

প্রতিভার অপরিহার্য স্বীকৃতি
ছবি: সংগৃহীত

আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যসচিবের দায়িত্ব অর্পণ করে সুচিন্তিত ভাবনা আর সমাজের প্রত্যাশিত দাবিকে মান্যতা দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আলাপনের অন্তত পাঁচটি পরিচয়ে আমরা মোহিত। গর্বিত। এক. স্কুল জীবনে, স্নাতকোত্তর শ্রেণিতেও প্রগাঢ় মেধার ছাত্র। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সেরা তালিকার উজ্জ্বলতর মুখ। প্রেসিডেন্সি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রেকর্ড তৈরির অন্যতম কারিগর। দুই. বহু বিষয়ের গুণী পাঠক, বিশেষ করে সাহিত্য, বহুমাত্রিক সমাজতত্ত্ব আর ধারাবাহিক ইতিহাসের। তিন. সুবক্তা, সুলেখক। বাংলাভাষা, দেশভাগ আর জাতিগত প্রশ্ন নিয়ে একাধিক বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থের প্রণেতা। চার. উঠতি বয়সেই তুখোড় সাংবাদিক। পাঁচ. বিভিন্ন জেলার আপসহীন প্রশাসক, স্বরাষ্ট্র ও তথ্যসংস্কৃতিসহ ২৭টি দপ্তরের ভূতপূর্ব সচিব। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রমাণিত তার স্বচ্ছ দক্ষতা, দক্ষতার কর্তব্যমগ্ন পরিক্রমা। ছয়. সাহিত্যিক ঘরানাকে জড়িয়ে ক্রমাগত তার সমগোত্রীয় হয়ে ওঠার অভিপ্রায়।

ব্যক্তি-প্রতিভার বিকাশে পরিবার আর ঐতিহ্য চেতনা কতটা নির্ণায়ক হতে পারে; কীভাবে ব্যক্তির গড়নকে সৃষ্টিশীল, আত্মসচেতন করে তোলে; ব্যক্তিকতায় মুক্তচিন্তা আর বহুত্ববাদিতা কী রকম আলো ছড়িয়ে দেয়, কখনো কখনো বানিয়ে দেয় নীরব প্রতিস্পর্ধী-আলাপন অবশ্যই এসব রূপায়ণের আরেক ব্যতিক্রম।

ব্যক্তি পরিচিতি, (ইনডিভিজুয়াল আইডেনটি) বৃহত্ অর্থে একমুখী নয়। বহুদর্শিতা তার স্বভাবধর্ম। সে কখনো বাবা, কখনো স্বামী, কখনো নিষ্ঠাবান প্রশাসক। কখনো বহির্মুখী বক্তা। কখনো অন্তর্মুখী লেখক, কিংবা সরব নাগরিক। আমরা যাকে নাগরিকতা বলে সংজ্ঞায়িত করি, একটিমাত্র পরিচয়ে তার চিত্রায়ণ কি সম্ভব? বহুর মধ্যে সে একক হয়ে ওঠে, বহুকে ঘিরে নির্মিত হয় তার স্বাতন্ত্র্য, তার প্রতিভা। সে স্বনির্মিত, স্বয়ংশাসিত হলেও তার সামাজিক ও কর্মীসত্তা জড়িয়ে নেয় বহুজনের প্রার্থনাকে, এ প্রার্থনা নির্যাস আহরণ করে সে আপনকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে, সমস্ত কর্মে, মর্মেও উঠতে থাকে আমির ঊর্ধ্বে। আলাপনকে নিয়ে এসব কথা বলার কারণ, তার ব্যক্তিকতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। বহুলাংশে সামাজিক ইচ্ছার (সোসাল চয়েস) সঙ্গে জড়িত।

প্রশাসনের বহুস্তরিক পর্বে, সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন আর ইতিহাস চেতনার যোগ খুবই জরুরি। ব্রিটিশ-পরম্পরার এই ভারতীয় উত্তরাধিকার, যা নির্মোহ, ঐকান্তিকতা নিষ্ঠ-১৯৮৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আলাপন নানারকম কর্মে স্থাপিত করেছেন তা। এ কথা ভাবলে তার উত্তরণকে স্বাভাবিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলতে হয়। ভাবতে আরো ভালো লাগে যে, আলাপনের বুদ্ধিভিত্তিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতি ছিল অপরিহার্য। আমাদের বিশ্বাস, বাংলার স্বার্থে, বাংলার উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রয়োজনে, বহুমাত্রিক সাংস্কৃতির পাহারায় তার অভিজ্ঞতা সমবেত ইচ্ছার সঙ্গে যোগসূত্র সৃষ্টি করে নবতর অভিমুখ তৈরি করবে।

সমাজ যখন নানারকম সংকটের সম্মুখীন হয়, তখন বাইরের প্রয়োজন আর ভেতরের আয়োজনকে জড়ো করে সমদর্শিতার নিরপেক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ জরুরি হয়ে ওঠে। মুখ্যসচিবের পদে আলাপনের নিয়োগ এই সামাজিক তাগিদের সত্যকেই বড় করছে।

ব্যক্তিপ্রতিভা যেমন সবসময় একক, তেমনি প্রতিভার অঘোষিত সংকল্প-জাতিপ্রীতি, ভাষাপ্রীতি, ঐতিহ্যপ্রীতি ইত্যাদি ছুঁয়ে থাকে সমাজকেই। ব্যক্তি এখানে সমাজের প্রতিনিধি, তার নির্বাচন বা মনোনয়নে স্বীকৃতি পায় বৃহত্তের আকাঙ্ক্ষা। এটা রাজনীতির নির্বাচিত সত্য, প্রশাসনিক অঙ্গনেরও অপ্রতিরোধ্য বাস্তব। একে বাদ দিয়ে নিত্যদিনের দুনিয়া চলে না। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার কারণেই সম্ভবত আলাপন তার ক্যারিয়ারের শুরুতেই এ সত্যের স্বরূপকে, স্বরূপের সন্ধানকে ব্যক্তিস্বরূপের সঙ্গে জড়িয়ে নেন। এ এক অঘোষিত অঙ্গীকার। যেখানে নিয়মতান্ত্রিকের নির্দেশ মানতে মানতে কর্মযোগে সৃজনকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয়। এক্ষেত্রে আলাপনের বিচরণের পরিধি নেহাত সীমিত নয়।

আসামে বিদেশি খেদাও আন্দোলনের রক্তাক্ত মুহূর্তে পেশাদার সাংবাদিক। ব্রহ্মপুত্র নদের দুই তীরের ঝড়ো তাণ্ডব দেখতে দেখতে ছুটছেন। পূর্বাভাস দেখছেন-অগপ ক্ষমতায় আসছে, হারছে কংগ্রেস, গোলাম ওসমানির নেতৃত্বে উদিত হচ্ছে তৃতীয় শক্তি ইউ এম এফ। সংশয়হীন চিত্তে, নিরপেক্ষ কলমে এসব খবরের ভেতরের খবর লিখে গেছেন তরুণ্যে ভরা আপসহীন প্রতিবেদক। প্রতিদিনের ঘটনাই যে ইতিহাসের নির্ণীত উপাদান এবং সাংবাদিকতা এর রূপদর্শী কারিগর—সত্যদর্শনের এ রূপকে সংক্ষিপ্ত পেশাজীবনে কখনো আলাপনকে এড়িয়ে যেতে দেখিনি আমরা। ঐ নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় তার প্রশাসনিক অঙ্গনেও অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত চেহারায় নিরন্তর প্রতিভায়িত, উদ্ভাসিত হয়েছে।

আরেকটি কথা। বাংলার মুখ্যসচিবের দায়িত্ব কেবল কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক বা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী, সমভাষী বা একই জাতির বাংলাদেশ অথবা ভিন্নভাষী নেপালের সঙ্গে সৌহার্দ রক্ষার প্রশ্নেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত, দুইটি দৃষ্টান্ত পেশ করা দরকার। ষাটের দশকে, পূর্বপাকিস্তানে গণআন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটছে। সম্মিলিত জনতার দাবিকে গুঁড়িয়ে দিতে আইয়ুব খান খড়গহস্ত। সাম্প্রদায়িক উসকানি তৈরি করে সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছেন। বিপরীতে আন্দোলনের প্রশ্নহীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর নেপথ্যে তার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী মানিক মিয়া। ইত্তেফাকের তুখোড় সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধুর অঘোষিত রাজনৈতিক উপদেষ্টা। দুই জনেই ভাবলেন, ভারতের পরোক্ষ সমর্থন প্রয়োজন। চিঠির খসড়া তৈরি করলেন মানিক মিয়া। শেখ মুজিবের স্বাক্ষরিত চিঠি ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে পৌঁছে গেল কলকাতায় মুখ্যসচিবের দপ্তরে, এখান থেকে নেহরুর হাতে। সত্যভাষী নেহরু জানালেন, পাকিস্তানের ঘরোয়া মামলায় আমাদের হস্তক্ষেপ অনুচিত। নেহরুর মৃত্যুর পর একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবের হাত বেয়ে বঙ্গবন্ধুর আরেকটি চিঠি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর কাছে পৌঁছে যায়। শাস্ত্রীজি জানিয়ে দিলেন, ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ভারতের নৈতিক সমর্থন থাকবে।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসেও এপার বাংলার মুখ্যসচিবের পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ অবদান কে না জানে! বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের জন্মলগ্নে সামাজিক পছন্দে সায় দেওয়ার দায় নিতে হলো মুখ্যসচিবকেও।

নেপাল ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নির্মাণে, সামাজিকতার প্রশাসনিক গুরুত্ব এখন আরো বেড়েছে। ক্রমশ বাড়বে। এক্ষেত্রে আলাপনের সমগোত্রীয় ভাবনা, পড়াশোনার নির্মিত অভ্যাস, সমান্তরাল ভাবাবেগ আর কর্মজীবনের প্রায় ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতা, আশা করি কার্যশীল, গতিশীল হতে থাকবে।

ব্যক্তিস্তুতি নয়, সামনে বসে গুণকীর্তন নয়, দূরে দাঁড়িয়ে, নিরপেক্ষতার দূরত্বকে সম্মান জানিয়ে আলাপনকে নিয়ে যা বলছি, তা আমাদের সত্যচর্চার নির্ভার অঙ্গ। এ ব্যাপারে আমরা অকপট নিকটদ্রষ্টা। পাশাপাশি নজরদারির আপসহীন কর্মী আর প্রবক্তাও বটে।

আলাপনের দক্ষতার বিস্তৃতি কামনা করছি। আশা করব, সবরকমের সৃষ্টিহীন, ধারহীন ধাঁচকে বদলে দিয়ে তার দায়বদ্ধতা বাংলার সৃজনের শক্তিকে অধিকতর মনোহর করে তুলবে।

লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত