দলীয় সহাবস্থান বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা!

দলীয় সহাবস্থান বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা!
নবেন্দু সাহা জয়

বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবে এসে যায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের কথা। দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আপনি যখনি দুই দলের রাজনৈতিক সহাবস্থানের আলাপ করবেন, এক টেবিলে বসে মৈত্রী আলোচনার কথা বলবেন, তখনি প্রসঙ্গত সবার আগে আসবে ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনীতির সার্বিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এই দিনটি। ঐ হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এটিকে নিয়ে যায় একটি ভিন্ন মাত্রায়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে যে গভীর তিক্ততা, অবিশ্বাস, অনাস্থা - তার অন্যতম প্রধান কারণ ঐ গ্রেনেড হামলা। এটি এমন একটি দিন যে দিনের ভয়াল স্মৃতি মাথায় আসলেই ‘রাজনৈতিক সহাবস্থান’ শব্দটি লজ্জায় পলায়ন করে!

গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে ডেইলি স্টারে ‘আফটার থার্টি ইয়ার্স অব অটোক্রেসিস ডিমাইস, ডেমোক্রেসি স্টিল রিমেইনস এ ডিস্ট্যান্ট ড্রিম’ শিরোনামে মাহফুজ আনামের এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধে বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের এতোবছর অতিবাহিত হলেও গণতন্ত্র যে এখনো একটি সুদূর স্বপ্ন সেব্যাপারে আলোকপাত করা হয়। এবং সেই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণভাবে ওঠে আসে ২১ আগস্টের কথা। যেখানে মাহফুজ আনাম স্পষ্টভাবে এই হামলার জন্য বিএনপি’কে দায়ী করেন। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে ‘খালেদা জিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে যাদের সন্দেহ’ ছিল, ওই ঘটনার পর তখনকার বিএনপি সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখে তারাও নিজেদের ‘প্রতারিত বলে মনে করেছেন’ বলে তিনি উল্লেখ করেন। মাহফুজ আনাম আরো বলেন, ওই হামলার একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার কোনো চেষ্টাই তখনকার সরকার করেনি’, যা হামলার পেছনে ‘সরকারের সম্পৃক্ততার সন্দেহকে’ আরও জোরালো করেছে। মাহফুজ আনামের এই বক্তব্যের জের ধরে বিএনপি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে। বিএনপি একটি প্রেস কনফারেন্স করেছে যেখানে রুহুল কবির রিজভী মাহফুজ আনামের এই বক্তব্যকে সরকারের মদদপুষ্ট বলে অভিহিত করেছেন। যদিও মাহফুজ আনামের উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে কোন বক্তব্য আসেনি। অবশ্য মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে অন্য বিষয় টেনে বিষদ্গার ছাড়া রুহুল কবির রিজভী আর কীই বা করতে পারতেন!

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের কথা বাংলাদেশের মানুষ জানেনা সেই সংখ্যাটা বোধহয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল! তবে আমরা অনেকেই হয়তো ভুলে যেতে বসেছি এই হামলা ঠিক কিভাবে হয়েছিলো, কার নির্দেশে এবং হামলা পরবর্তী বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া কী ভাষ্য দিয়েছিলো। মাহফুজ আনামের এই লেখা বরং সেই অতীত ইতিহাসকে আরেকবার জাতির সামনে তুলে ধরেছে। ২১ আগস্ট নিয়ে মাহফুজ আনামের বক্তব্যের যথার্থ উত্তর কেন বিএনপির কাছে নেই তা একটু অতীত ইতিহাসকে টেনে আনলেই সবাই বুঝতে পারবেন। প্রথমত এই হামলার আসামীরা তাদের জবানবন্দীতে স্পষ্টভাবেই হাওয়া ভবনের নাম উল্লেখ করেছে, যেখানে দফায় দফায় মিটিংয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনা হত্যা পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। সেই হত্যা পরিকল্পনায় সরাসরি অংশ নিয়েছিলো তৎকালীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রীরা ও ক্ষুদে তারেক রহমান। এটা নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিন্তু উঠে এসেছে। এই বক্তব্যকে বিএনপি বা কোন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী যদি অস্বীকার করতে চায় তবে তা হবে সত্যের অপলাপ এমনকি রাষ্ট্রের জনগণের বোধবুদ্ধির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন! আর বিএনপি জেনে-বুঝেই সেই কাজটি করে যাচ্ছেন দীর্ঘ সময় পর্যন্ত।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর বিএনপি নেতৃত্ব কী ভূমিকা পালন করেছে বা কী বিবৃতি দিয়েছে তা কিন্তু জাতি ভুলেনি। প্রথমেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় শেখ হাসিনা নিজে ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন! শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে করা এই হামলায় যখন আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয় তখন কতোটা অমানবিক এবং হিংসাত্মক পরায়ণ হলে এই ধরণের বক্তব্য বিএনপি দিতে পারে তা কেবল অনুমেয়! এমনকি এই হামলায় যে সরাসরি বিএনপি জড়িত তা তাদের পরবর্তী কার্যক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় শুরু থেকেই হোতাদের আড়াল করতে তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। সাবেক ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি পুরো ঘটনা বেগম খালেদা জিয়াকে অবহিত করেন এবং ঘটনা তদন্তের অনুমতি চান। বেগম খালেদা জিয়া তদন্তের অনুমতি না দিয়ে মেজর জেনারেল রুমিকে তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত করেন।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে, কেনো তিনি সাদিক হাসান রুমির বক্তব্য আমলে না নিয়ে বা তদন্তের অনুমতি না দিয়ে উল্টো বরখাস্ত করলেন? উত্তরটা স্বাভাবিক, রুমির মাধ্যমে সত্যিকার তদন্ত যেনো ওঠে না আসে সেকারণেই এই ব্যবস্থা। আর তাইতো আমরা দেখি, হামলার পর তদন্তের নামে বিভিন্ন সময় নানা ‘আষাঢ়ে গল্প’ হাজির করে প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক, ডিজিএফআইয়ের হর্তা-কর্তা ও পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সরাসরি এই হত্যা ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত হয় যাদের নাম চার্জশিটে উল্লেখিত। এমনকি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা হত্যার জন্য শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেড সাপ্লাই দেয়। আর তাই মাহফুজ আনাম তার লেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ‘তখনকার বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার পার্লামেন্টে যেসব বক্তব্য এসেছে, তা ‘কেবল সত্যের অপলাপ নয়’, তাতে সাধারণ মানুষের বোধবুদ্ধির প্রতি ‘অবজ্ঞাও’ দেখানো হয়েছে।‘

মাহফুজ আনাম তাঁর বক্তব্যে ‘জজ মিয়া নাটক ও লোকদেখানো বিচারিক তদন্তের কথা উল্লেখ করেছেন যার একটি শব্দও মিথ্যে নয় আর নয় বলেই তাঁর সদুত্তর জনাব রুহুল কবির রিজভী দিতে পারেন নি। আমরা যদি ভুলে না যাই, এই শক্তিশালী হামলার ঠিক একদিন পরেই বিএনপি তার গতানুগতিক ভারত বিরোধী রাজনীতির প্রচারণা শুরু করেছিল। প্রথমেই শৈবাল পার্থ নামের এক যুবককে ২১ আগস্টের হামলাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় বিএনপি সরকার। পার্থ যেহেতু ভারতে লেখাপড়া করেছেন তাই তাকে ভারতের চর হিসেবে প্রমাণেরও চেষ্টা করেছিল বিএনপি জামাত জোট সরকার। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে পার্থ মুক্তিলাভ করলে সাথে সাথে নতুন গল্প ফাঁদে বিএনপি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারি নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলায় মামলার অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়। পরে জজ মিয়ার দরিদ্র পরিবারের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার লোভ দেখিয়ে এবং দুই ভায়রা রানা ও শফিকুল ইসলামকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়। এসব কিছুই বিএনপি করেছে কেবল নিজেদের অপকর্ম ঢাকার জন্য। আর মাহফুজ আনাম তাঁর লেখাতে এই বিষয়গুলোকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু নিবন্ধের ওই বক্তব্যকে ‘নির্জলা মিথ্যাচার, বিভ্রান্তিকর, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসংলগ্ন’ মতামত বলে আখ্যায়িত করেছেন রিজভী। কিন্তু এতোসব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে রুহুল কবির রিজভী এই বক্তব্যকে ‘নির্জলা মিথ্যা’ বলছেন? গোটা জাতির সামনে জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ করেও কী অবলীলায় জনাব রিজভী এই তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর ও অসংলগ্ন’ বলে যাচ্ছেন? এতোসব প্রমাণের পরেও বিএনপি কোন মুখে প্রেস কনফারেন্স করে বা জাতির সামনে মিথ্যাচার করার দুঃসাহস পায় তা এক বড় প্রশ্ন!

২০০১-২০০৬ সাল, বিএনপি-জামাত শাসনামলে সরকারী মদদে মৌলবাদের রাজনীতিকে পেট্রোনাইজ করা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষুদ সরকার প্রধানের পরিবার এই মদদে অংশ নিয়েছে। সারাদেশে বোমা হামলা ও বেছে বেছে শেখ হাসিনার সমাবেশে হামলা মূলত রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা ও জাতির পিতার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার এক ঘৃণ্য অপপ্রয়াস ছিলো। ২১ আগস্ট কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের উপর হামলার দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু বিবেচনা করলেই চলবে না, সর্বোপরি এটি ছিলো মানবতার উপর এক বিরাট আঘাত। ২১ আগস্টের পড়ন্ত বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এর নিথর লাশগুলো ছিলো ভুলুণ্ঠিত মানবতার স্মারক। বীভৎসতাই যেন ছিল ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সৌন্দর্য! আর সেই সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ তারা ঘটিয়েছে হত্যাকে উৎসব হিসেবে পালনের মধ্য দিয়ে। আর তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২১ আগস্ট এমন এক দিন যেদিনটিতে বিএনপি নিজ হাতে সহাবস্থানের রাজনীতিকে হত্যা করেছে। একুশে আগস্টের আগে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে নির্বাচনী লড়াই হত, সেখান থেকে দু’ দলের সম্পর্কটি রূপান্তরিত হয়েছে অস্তিত্ববাদী লড়াইতে! আর এর জন্মদাতা স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া। মনে রাখতে হবে, একুশে আগস্টের হামলা ইতিহাসের কোনো এক বিচ্যুতির স্বাক্ষর নয় বরং দেশকে উল্টো পথে নিয়ে যাওয়ার সেই পুরনো চক্রান্তের অংশ যা জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো!

লেখক: প্রধান সমন্বয়ক, মুক্তির গান ও তরুন রাজনীতিক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত