বিপজ্জনক ও বিপর্যয়কর একটি বিতর্ককাহিনি

বিপজ্জনক ও বিপর্যয়কর একটি বিতর্ককাহিনি
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করা যে কেউ, যিনি বাস্তবতাকে স্বীকার করতে চাইবেন না, তাকে চোখ খুলে দেখতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্কটিকে অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও ভাষ্যকাররা বলছেন, এই বিতর্ক ছিল আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম, অ-প্রেসিডেন্টসুলভ প্রেসিডেন্টশিয়াল বিতর্ক।

গত মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। আমরা দেখতে পেলাম, সেই বিতর্কে দুই প্রার্থী তীব্র বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। বিনিময় হতে থাকে তিক্ত ও তপ্ত বাক্য। এমনকি তারা একে অপরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেও কথা বলেন।

জো বাইডেন ট্রাম্পকে একপর্যায়ে ‘চুপ করে থাকুন’ বলে ধমকও দেন। উভয় প্রার্থীই বেশির ভাগ তাদের কথা বলার ক্ষেত্রেই আটকে ছিলেন। তবে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউই আমেরিকাকে বর্তমান নরকতুল্য অবস্থা থেকে বের করে আনার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাচিত্র তুলে ধরতে পারেননি। এবং জরিপগুলো বলছে যে বাইডেন এই বিতর্কে জিতেছেন। তবে কে জিতলেন আর কে হারলেন, তার চেয়েও পরিষ্কার একটি বিষয়—তা হলো, এ ধরনের বিতর্কে আসলে হেরেছে আমেরিকার জনগণ।

ট্রাম্প ও বাইডেন একে অপরের সঙ্গে চেঁচিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে তর্ক করেছেন বটে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি কোভিডে কেন আমেরিকানরাই মারা গেলেন, একটি ক্রমবিকাশিত অর্থনীতির মধ্যেও বর্তমানে আমেরিকায় কেন ৪ কোটি মানুষ বেকার রয়েছেন—এসব প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ বিতর্কের মাধ্যমে কোনো সমাধান বা পরিকল্পনাচিত্র আমরা দেখতে পাইনি। শিশুদের যত্ন বা স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে বাবা-মায়ের যে উদ্বেগ কিংবা আমেরিকার বয়স্ক নাগরিকদের নিরাপদে ভোট দিতে পারা নিয়ে যে সংশয়, এমনকি আমরা এখন যে দুটি মহামারির মুখোমুখি—পদ্ধতিগত বর্ণবাদ ও কোভিড—এসব গুরুতর বিষয় নিয়ে অর্থপূর্ণ কিংবা তাত্পর্যপূর্ণ কোনো আলোচনাই হয়নি এই বিতর্কে।

এই জঘন্য বিতর্কের মাধ্যমে আমেরিকান জনগণের খারাপ অবস্থাটাও বোঝা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি জটিল দায়িত্বশীল বিষয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই যথাযথ আচরণ করেননি এবং ভুল করে যদি বলাও হয় যে পুরো বিতর্কটি ছিল গণ্ডগোলে ভরা। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পই এই গোলমালের কারিগর।

বাংলাদেশের একজন বাদামি রঙের নারী হিসেবে আমার কাছে এই বিতর্কের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটি ছিল, যখন ট্রাম্পকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের জন্য নিন্দা জ্ঞাপনের কথা বলা হয়, তখন তিনি তা করেননি। বরং আমরা দেখতে পাই, বিতর্কের মডারেটর ফক্স নিউজের ক্রিস ওয়ালেস যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর নিন্দা করতে রাজি কি না, তখন ট্রাম্প বলেন :

‘অবশ্যই, আমি নিন্দা জ্ঞাপন করতে রাজি আছি, তবে আমি নিন্দা জ্ঞাপনের জন্য যা কিছু দেখি, সেটা বামপন্থিদের পাশ থেকেই; ডানপন্থিদের ভেতর থেকে নয়।’

‘আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?’ ওয়ালেস জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যে কোনো কিছু করতে রাজি আছি। আমি শান্তি দেখতে চাই।’ ট্রাম্প বলেন।

‘ঠিক আছে, তাহলে তা-ই করুন স্যার।’ ওয়ালেস চাপ দেন।

‘হ্যাঁ, এটা বলুন। এটা করে দেখান।’ ডেমোক্রেটিক দলের মনোনীত প্রার্থী জো বাইডেনও জোর দেন।

‘আপনি তাদের সঙ্গে কথা বলতে চান?’ ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাকে একটি নাম দিন। বলুন, আপনি আমাকে কার নিন্দা করবেন?’

ওয়ালেস পুনরায় ট্রাম্পকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও ডানপন্থি মিলিশিয়াদের নিন্দা জ্ঞাপন করতে বলেন। বাইডেন ট্রাম্পকে হিংস্র নব্য ফ্যাসিবাদী স্ট্রিট গ্যাং, তথাকথিত প্রাউড বয়েজের নিন্দা করতে বলেন। ট্রাম্প তখন বলেন, ‘প্রাউড বয়েজ? ওরা তো পেছনে এবং পাশেই দাঁড়ানো।’

যদিও ট্রাম্পকে এর আগেও বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের নিন্দা করতে বলা হয়েছিল এবং তখনো তিনি তা পাশ কাটিয়ে গেছেন। এবার তিনি কেবল তাদের নিন্দা করতেই অস্বীকার করেননি, বরং আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে একধরনের ‘মার্চিং অর্ডার’ দেওয়ার জন্য হাজির হয়েছেন।

এটি আমার কাছে এই বিতর্কের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ ছিল। কারণ বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে কেবল শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের সঙ্গেই ট্রাম্পের মিতালি নয়, বরং ট্রাম্প আরো চার বছর সময় পেলে আর কাউকে নয়, আমেরিকাকে তিনি শুধু সাদাদের দেশ বানাতে মরিয়া থাকবেন। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে হিটলারের সমান স্তরে উন্নীত করেছেন এবং আপনি যদি ভাবেন যে আমি একটি নাটকীয় সুরেই এই কথাগুলো বলছি, তাহলে আপনাকে আমি ট্রাম্পের কথাগুলো পুনরায় পড়তে অনুরোধ করছি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আর্থিক লেনদেন ও ট্যাক্সের বিষয়ে বিস্ফোরক কাহিনি প্রকাশের পর আরো সব ভীতিকর বিষয় প্রকাশ্যে আসছে। আর এতে করে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে হোয়াইট হাউজে বহাল থাকাটা ট্রাম্পের জন্য কেবল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়াটাই মূল বিষয় নয়, বরং এটি তার নিজেকে জেলের বাইরে রাখার এবং অপরাধমূলক কর ফাঁকির অভিযোগ থেকে দূরে রাখারও পরিকল্পনা বটে। এজন্য আসন্ন নির্বাচনটি আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বিভাজনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন নিজেকে কারাগারের বাইরে রাখার তথা অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রশ্নও বটে। আসলে আমেরিকা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো খেয়াল নেই। তিনি বরং দেখতে চান, ওভাল অফিস তাকে যে শক্তি দান করছে, সেই শক্তির মাধ্যমে তিনি নিজেকে যত্নের সঙ্গে সুরক্ষিত রাখতে পারেন কি না।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। ইংরেজি থেকে অনুবাদ :তাপস কুমার দত্ত।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত