আসুন ধর্ষণের বিপক্ষে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি

আসুন ধর্ষণের বিপক্ষে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি
আসুন ধর্ষণের বিপক্ষে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি।প্রতীকী ছবি

মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি বাঙালির জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর এই অর্জনের পেছনে জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে অসীম আত্মত্যাগ। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে ৩০ লক্ষ বাঙালি শহীদ হয়েছেন ও ২ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে বর্বরতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মদান আর অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে এখনো কাঁদায়।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার বাঙালি মা-বোনদের প্রতি যখন তাদের পরিবার-পরিজন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এমনকি মা-বাবা তাদের নির্যাতনের শিকার মেয়ের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তখন বাঙালি জাতির আদর্শিক পিতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মা-বাবা ও স্বামী পরিত্যক্তা এসব নির্যাতিত মা-বোনকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তিনি তাদের পিতৃ স্নেহে বেঁধে ছিলেন। তিনি এ সময় জীবনে সর্বস্ব হারানো এ সকল মা-বোনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-তাদের পিতার নাম লিখে দাও শেখ মুজিবুর রহমান আর ঠিকানা দাও ধানমন্ডি ৩২।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মলাভের সময়কার এই নির্মম ইতিহাস ও বাঙালি জাতির পিতার এমন মহানুভবতা দু’টোই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এদেশের প্রতিটি মা-বোনের প্রতি আমাদের মনে যথাযথ গভীর শ্রদ্ধাবোধ বয়ে আনে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমরা নারীর প্রতি নির্যাতনের অসংখ্য চিত্র পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই। সাধারণত নারীর প্রতি নির্যাতনের এ ভয়াবহ অর্থাৎ ধর্ষণ বেশিরভাগ সময় পুরুষদের সহযোগিতায় হয়ে থাকে। পুরুষ শাসিত আমাদের এ সমাজে পুরুষরা সাধারণত নারীদের শারীরিকভাবে দুর্বল মনে করে। কখনো তাদের দারিদ্রতা, পারিবারিক ও ব্যক্তি জীবনের অসহায়ত্বকে কাজে লাগায়। আমাদের দেশে ধর্ষণ কখনো ব্যক্তির বিকৃত মানসিকতা থেকে দেখা যায়, আবার কখনো এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংগঠিত হতে দেখা গেছে।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) জয়লাভ করে। এরপর দেখা যায়, এদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। বিএনপি আর জামায়াত ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এ সকল ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। এ সময় নির্বাচনের পর এক মাসের ভেতর প্রায় ১০ হাজার সংখ্যালঘু পরিবার পশ্চিম বঙ্গে চলে যায়।

২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রত্যেকটি ধর্ম আর গোত্রের মানুষের ভেতর পারস্পরিক শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। শেখ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে দেশে সাম্প্রদায়িকতা অনেকটাই দূর হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাম্প্রদায়িকতার সেই নির্মম দিনগুলো আজকের বাংলাদেশের কাছে একেবারেই ম্লান।

নিকট অতীতে আমরা দেখতে পাই, ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মৃত্যু হয় নুসরাত রাফি নামের এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর। মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষের বিপক্ষে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করে মামলা করেন। পরবর্তীতে নুসরাত নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধ্যক্ষের বিপক্ষে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলে। এর আগে ২৭ সে মার্চ ঐ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে তার শ্লীলতাহানি করে। পরবর্তীতে নুসরাত জাহান রাফি বিষয়টি তার পরিবারকে জানালে নুসরাতের মা মেয়ের নিরাপত্তা চেয়ে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা করেন। নুসরাতের মায়ের অভিযোগের পরবর্তী সময়ে পুলিশ মাদরাসা অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করলে, অধ্যক্ষের কিছু অনুসারী ও কিছু শিক্ষার্থী নুসরাতের পরিবারকে এই মামলা তুলে নিতে হুমকি দিতে থাকে। পরবর্তীতে নুসরাত পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে ঐ মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী নুসরাতকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একই ভবনের ছাদে নিয়ে যায়। ছাদে পৌঁছানোর পর তারা নুসরাতের হাত-পা বেঁধে তাকে হত্যার হুমকি দেয় এবং নুসরাতকে তারা মামলা নিষ্পত্তির একটি কাগজে দস্তখত করতে বলে। নুসরাত রাফি সেই কাগজে দস্তখতের অস্বীকৃতি জানালে দুষ্কৃতিকারীরা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে তাকে হত্যা করে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নুসরাত ঐ কাগজে দস্তখত করতে অস্বীকার করে। সেদিনের সেই কোমলমতী শিক্ষার্থী সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভেতর একটি প্রতিবাদের বহ্নিশিখা জাগিয়ে তুলেছিল। কারণ মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করে সে বিচার চেয়েছিল তার সম্ভ্রমহানিকারীর।

কিছুদিন পূর্বে সিলেটে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন ঘটনা সত্যি লজ্জাজনক। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আসামিদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে। তাদের সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিতের আশ্বাসও তিনি দিয়েছেন। কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাতেমা জান্নাত নামের এক শিক্ষার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরের এক সহযোগী হাসান আল মামুনের বিপক্ষে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি বিচার চাইতে ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরের কাছে গেলে, নূর নির্যাতনের শিকার মেয়েটিকে ধর্ষণের ঘটনাটি প্রকাশ না করতে হুমকি দেয়। বরং ঘটনা প্রকাশ করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে পতিতা হিসেবে প্রচারের হুমকি দেয়। অথচ ডাকসুর সাবেক ভিপি নিজ মুখে একবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসান আল মামুনের ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে এবং সে বলেছে মেয়েটি তার কাছে বিচার চাইতে নীলক্ষেত দেখা করেছিল আবার নূর অন্য একটি টিভি চ্যানেলে বলেছে ঐ মেয়েটি একবার তাকে ফোন করেছিল, তার সাথে আগে কোথাও দেখা হয়নি।

নূরের এমন একই ঘটনার দুই রকম বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তা ছাত্র সমাজের কাছে হাসির খোরাক হয়েছে। কেউ কেউ এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার গন্ধ খুঁজছেন ধর্ষকের সহায়তাকারী নূরের পক্ষ অবলম্বন করে।

কিছুদিন পূর্বে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সবুজ নামের এক সহ-সভাপতি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাকে তার সংগঠন থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

ধর্ষণের কিছু ঘটনার বর্ণনা করলাম এই জন্য যে, আমাদের সমাজ জীবনে বিভিন্ন সময় ঘটে যাচ্ছে এমন অসংখ্য ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ও বিভিন্ন সময় যৌন নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছে মেয়েরা। ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্কে গড়াচ্ছে। পরবর্তীতে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্পর্শকাতর ছবি অথবা কল রেকর্ডিং নিয়ে সাধারণত ছেলেরা মেয়েদেরকে যৌন নিপীড়ন করে থাকে।

শহুরে পরিবেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পডুয়া শিক্ষার্থীদের ভেতরও ধর্ষণের অহরহ ঘটনা ঘটছে। বন্ধুদের জন্মদিনের অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন নেশাদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমেও এমনটি ঘটছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পডুয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

গত বছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বলেছিলেন-ধর্ষণ সমাজে সাধারণত পুরুষদের মাধ্যমেই বেশি সংঘটিত হয়। পুরুষরা এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসলে সমস্যা অনেকাংশেই কমে যায়। অথচ পুরুষদের ভেতর এমন কোন উদ্যোগ দেখি না।

আমাদের পুরুষদের ভেতর সাধারণত আমরা সবসময় কি একথা মনে ধারণ করতে পারি কি? মেয়েরা মা ও বোনের জাতি। আমরা নিজেদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের মেয়েদের ব্যাপারে যেমন সহানুভূতি বা শ্রদ্ধা দেখাই সমাজের অন্য দশটা মেয়েদের ব্যাপারে কি তেমন সহানুভূতি পরায়ণ বা শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারি না? আমরা পুরুষেরা অনেকেই জনসমাজে অথবা জনসমাবেশে ধর্ষণ নিয়ে কথা বলতে ভয় পাই। এ ক্ষেত্রে আমার ছোট বেলার একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে যায়-সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পিছু লোকে কিছু বলে!

ধর্ষণ একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। আর এই ব্যাধিটির বিস্তার আমাদের দেশে যেমন, তার থেকে বেশি আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহৎ দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে।

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতা দুটোই বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে ভালো উদাহরণ হতে যাচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্ষণ নামক ব্যাধি থেকে অনেকাংশেই মুক্ত হয়েছে। তাই আমরা আশা করব,এ সমস্যা প্রতিরোধে আমাদের দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।

মেয়েদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা আমাদের সন্তানদের দান করতে হবে। মেয়েদেরকে বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষকদের বিপক্ষে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আমাদের দেশেও তেমনি ধর্ষণকারী যেই হোক না কেন তা যথাযথভাবে প্রমাণিত হলে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়া ধর্ষকের পক্ষে যদি কোন আইনজীবী কাজ করে সেটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বলা চলে।

এক্ষেত্রে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে ধর্ষণ বিরোধী সভা, সমাবেশ ,কনসার্ট,নাটক ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ধর্ষণের বিপক্ষে সমাজে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারি। সর্বোপরি পুরুষ সমাজকেই সমাজে ধর্ষণ প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। এ সমস্যা সমাধানে আমাদের পুরুষদের মনে রাখতে হবে-আমরা যদি না জাগি মা! কেমনে সকাল হবে?

লেখকঃ

কর্মী, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ;

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত