মিয়ানমার সীমান্তে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানে হুমকির মুখে ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতি

মিয়ানমার সীমান্তে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানে হুমকির মুখে ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতি
প্রতীকী ছবি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভার্চুয়াল ভাষণে বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি ইস্যু ছিল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশীদের নিয়ে। গত সোমবার ভারতের সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানে এবং পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও মিয়ানমারের ভারতীয় রাষ্ট্রীয়দূত শ্রী সৌরভ কুমার মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে মোদির উত্থাপিত ইস্যুগুলোর মধ্যেই কয়েকটি মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বলে জানিয়েছে ইয়াঙ্গুনে অবস্থির ভারতীয় দূতাবাস। এই বৈঠকে সুচির হাতে তিন হাজার ভায়াল রেমডেসিভিরও তুলে দেয় ভারত। এছাড়া ভারতের প্রতিনিধি দল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং এবং ভাইস সিনিয়র জেনারেল সো উইনের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতিসংঘে বলেছেন, ভারতের 'প্রতিবেশী প্রথম নীতি' থেকে শুরু করে আমাদের অ্যাক্ট ইস্ট নীতি পাশাপাশি এই অঞ্চলের সকলের জন্য সুরক্ষা এবং প্রবৃদ্ধির ধারণা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ; এই সব কিছুই মানবজাতির স্বার্থে । এগুলো আমাদের নিজের স্বার্থের জন্য নয়। ভারতের অংশীদারিত্ব সবসময়ে এই নীতিগুলো মেনে চলে। এ সময় সন্ত্রাসবাদ ও অস্ত্র এবং মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে নয়দিল্লি সর্বাত্মক লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান মোদি।

বলা বাহুল্য যে ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং প্রতিবেশী মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্রোহ ও মাদক পাচারের সমস্যায় ভুগছে। ভারতের এই উত্তর-পূর্বাঞ্চল এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশ দ্বার। এখানকার শান্তি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির সফল করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এই নীতির মাধ্যমে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করতে চায়। এই অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের অনেকটুকুই নির্ভর করছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের মিয়ানমারের মাটি থেকে নির্মূল করার জন্য ভারত দেশটিকে রাজি করাতে পারে কিনা তার ওপর।

ভারত এবং মিয়ানমারের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটারের সীমান্ত এলাকা রয়েছে। যেখান দিয়ে সহজেই অবৈধ অস্ত্র, মাদক চোরাচালান, স্বর্ণ এবং মূল্যপান পাথর সহ নানা ধরণের জিনিস পাচার হয়। পাশাপাশি এই সীমানা জঙ্গিরাও ব্যবহার করে থাকে।

গত ২৮ তারিখ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ( বিএসএফ) মিজোরামের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মামিত জেলায় দুটি গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ করেছে। এদের মধ্যে ছিল ২৯টি একে-৪৭ রাইফেল, ৭হাজার ৮৯৪ রাউন্ড গুলি। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখন বের হয়নি।

ভারতের অন্যতম শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হলো মিজোরাম। আর এ কারনেই চোরাচালানকারীরা এটিকে নতুন পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। ১৯৮৬ সালের মিজোরামে ভারত সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহীদের শান্তি চুক্তি হয়। এরপর থেকেই ঐ অঞ্চলে সংঘাত কমে আসে। আর এটি এখন পর্যন্ত ভারত স্বাধীন হওয়ার পর একমাত্র সফল শান্তি চুক্তি।

এদিকে মিয়ানমারে অনেকগুলো বিদ্রোহী দল রয়েছে। এই বিদ্রোহী দলগুলোর চীন থেকে অস্ত্র পাচারের ঘটনায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি ৫০০ চাইনিজ রাইফেল, ৩০টি মেশিন গান, ৭০ হাজার রাউন্ড বুলেট এবং গ্রেনেড আরাকান আর্মির কাছে সরবরাহ করা হয় বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস। আরকারান আর্মি বিদ্রোহী দলটি আরাকানে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে যাচ্ছে। আরাকান আর্মি এবং আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইনে তাদের কার্যক্রম চালায়। এদেরকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা করেছে মিয়ানমার সরকার।

থাইল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবাদি জানায়, জুন মাসেও থাই কর্মকর্তারা তাক প্রদেশের মায়ে সোট জেলা থেকে বড়ো অস্ত্রের চালান জব্দ করে। এর মধ্যে ছিল এম-১৬, এম-৭৯, এম৫.৫৬ এবং একে-৪৭ রাইফেল।। এই ঘটনায় দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের জঙ্গিরা এবং ভারতের বিদ্রোহীরা মিয়ানমারের সাগিংয়ে ক্যাম্প করেছে। তারাই মূলত এই অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতা।

গুয়াহাটিভিত্তিক সাংবাদিক রাজিব ভট্টাচার্য । মিয়ানমারে একটি বিদ্রোহি ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে 'রঁদেভু উইথ রেবেল: জার্নি টু মিট ইন্ডিয়া'স মোস্ট ওয়ান্টেড ম্যান' নামে একটি বই লেখেছেন এই সাংবাদিক। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের নিয়ে প্রচুর লিখেছেন তিনি। এই সাংবাদিক বলেন, ভারত-মিয়ানমারের সীমান্ত ১৯৯০ সালের পর থেকে ছোট ছোট অস্ত্র চোরাচালানের হটস্পট হয়েছে। চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রে মার্কেট থেকে একে সিরিজ ও আমেরিকার ম-১৬ মডেলের অস্ত্র এবং গোলাবারুদ আসে।

ভট্টাচার্য বলেন, গত ছয় সাত বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্ত্রের চাহিদা কমে গেছে। বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের দাবি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের আশায় ভারত সরকারের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রবেশ করেছে।

ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের ৫০০ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমানা রয়েছে। এই সীমান্ত দিয়েই গত কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ মাদক চোরাচালান হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এবং অন্যান্য মাদক দ্রব্য ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিয়মিত চোরাচালান হয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাতেও এই মাদকদ্রব্যের চোরাচালান হয়ে থাকে।

এই বছরের শুরুতে মিজোরামের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলকে মিয়ানমার-ভারত সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাগুলো বলছে, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে প্রায় ১ কোটি অর্থমূল্যের চোরাচালান জব্দ করা হয়েছে এই সীমান্ত এলাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত শতাব্দির শেষের দিকে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস এর সীমান্ত এলাকার (গোল্ডেন ট্রায়াল) মাদক ব্যবসায়ীরা বেশি লাভজনক হওয়ায় হেরোইনের পরিবর্তে মেথামফেটামিন জাতীয় মাদকের উৎপাদন শুরু করে। এটি থাইল্যান্ডে ইয়াবা বা 'পাগল ড্রাগ' নামে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশে আবার এই মাদককে বাবা নামেও ডাকা হয়।

মিয়ানমারের শান প্রদেশে সবচেয়ে বেশি ইয়াবার উৎপাদন হয়। জানা গেছে, এই প্রদেশে অস্থায়ী কারখানাগুলোতে বছরে ১০০ কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট উৎপাদন করা হয়। যা এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চোরাচালান করা হয়। ভারতেও অ্যাম্ফিটামিন জাতীয় মাদক জব্দের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। জাতিসংঘের জাতিসংঘের মাদক এবং অপরাধবিষয়ক সংস্থা জানায়, ২০১৮ সালে ৪৩১ কিলোগ্রাম অ্যাম্ফিটামিন জাতীয় মাদক জব্দ করা হয়েছিল। তবে ২০১৯ সালে এটি বেড়ে ২.২ টনে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মাদক পাচারের যে নতুন পথের তৈরি হয়েছে সেটিরই আংশিক প্রভাব এটি।

২০১৪ সালে নয়া দিল্লি এবং নাইপাইটোর সঙ্গে সীমান্ত অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে গত ছয় বছরে এর কিছুই অর্জিত হয়নি। ভারতে দায়িত্ব হলো অবশ্যই পূর্বের প্রতিবেশীকে মাদক পাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের মহামারীটির বিরুদ্ধে কাজ করতে রাজি করানো। কারণে অ্যাক্ট ইস্ট নীতি বাস্তবায়নের জন্য এই দুটি বড়ো বাধা।

(জয়ন্ত কালিতা, প্রবীণ সাংবাদিক এবং লেখক)

ইত্তেফাক/এআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত