বিত্তের কাছে সবাই নতজানু

বিত্তের কাছে সবাই নতজানু
প্রতীকী ছবি

সারা বিশ্বের মানুষ এই করোনাকালে এক অদ্ভুত সময় পার করছে। যে মানুষ স্বাধীন হওয়ার জন্য দেশে দেশে সংগ্রাম করেছে, সেই মানুষ এখন অনেকটা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। সকালে কোনো এক নিকটজনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ঘুম থেকে উঠি, রাতে ঘুমাতে যাই অন্য কারো মৃত্যুসংবাদ শুনে। চিন্তা করি কখন আবার নিজেই না একটা সংবাদের শিরোনাম হয়ে যাই। এই দুঃসময়ের শুরুতে আমার পিঠাপিঠি বোনটা চলে গেল। ছোটবেলায় মাছের মাথা কে খাবে তা নিয়ে কত ঝগড়াঝাঁটি। মা মাথাটাকে দুই ফালি করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করে দিতেন। সেই বোনটাকে দেখতে যেতে পারিনি। বিশ্বের অতীব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে করোনা শুরু হওয়ার মাথায় বলা হলো নিজের সুরক্ষার জন্য সবাইকে মাস্ক পরতে বলতে হবে। জবাবে তিনি বললেন, ওটা তো সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করে। এখন তিনি নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেও মাস্ক পরছেন। ইউরোপের অনেক দেশে মুসলমান নারীদের মুখ ঢাকা নিয়ে কত কথা। অনেক দেশে আইন করে তা নিষিদ্ধ করা হলো। এখন প্রেসিডেন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী, জেনারেল থেকে করপোরেটের প্রধান—সবাই মাস্কের পেছনে নিজের চেহারা লুকিয়েছেন। এই করোনাকালে আমাদের মধ্য থেকে চলে গেছেন অনেক সম্মানিত স্বজন। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের একজন বড় মাপের ব্যবসায়ীর মৃত্যু হলো। মৃত্যুর পর জানা গেল, তিনি নাকি একজন খ্যাতিমান দানবীর ছিলেন। দেখি, একটি মহল তার মৃত্যুতে বেশ শোকাভিভূত। কেউ তার অতীত জেনে শোকে মুহ্যমান, কেউ না জেনে। আর তার অতীত ইতিহাস যারা জানেন, তার মৃত্যুতে কিছু মানুষের মুহ্যমান হওয়া দেখে স্তম্ভিত ও ব্যথিত। আসল ঘটনা জানতে হলে পাঠকদের একটু পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সময়টা ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাস। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের তোড়ে ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলেন। পরদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ চাকসু ছাত্র-শিক্ষকদের সমন্বয়ে এক বিশাল বিজয় মিছিল বের করে, যার অগ্রভাগে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আলমগীর মোহাম্মাদ সিরাজুদ্দিন। মিছিল শেষে এক সমাবেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি কারো নাম না করে তার বক্তব্যে বলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি নব্বইয়ে বিপ্লবী সেজেছে। তাদের থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’ এই বক্তব্যের ঘণ্টাখানেক পর ক্যাম্পাস দখলকারী মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনটি উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদে মিছিল বের করে এবং তার পদত্যাগ দাবি করে। পরের এক বছরের ঘটনা এই দেশের তখনকার সচেতন মানুষের কমবেশি জানা। শুরুটা হলো উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ক্যাম্পাসের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাস লকডাউন ঘোষণার মাধ্যমে। শিক্ষক-ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে ঠিক করলেন, তারা এই বাধা উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে ক্লাস নিতে যাবেন। ২২ ডিসেম্বর সামনে শ-খানেক শিক্ষক, পেছনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। তারা ক্লাস করতে রওনা হলেন। ক্যাম্পাসের মূল ফটকের কাছে আসতেই ক্যাম্পাস দখলকারী সেই মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনটির সশস্ত্র নেতাকর্মীরা এসে ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। পুলিশ ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে। আহত হলেন অর্ধশতাধিক শিক্ষক। গরিব রেল কর্মচারীর সন্তান ফারুকুজ্জামান ফারুককে একদল তস্কর ছাত্রদের মিছিল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। ফারুক এক দিন পর মারা যায়। সে এক ভয়াবহ দুঃসময়।

ফারুক হত্যা ঘটনার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ সম্পূর্ণ ঘটনা তদন্ত করার জন্য এক সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। সেই বিচারপতি চট্টগ্রামে এসে উঠলেন জামায়াতপন্থি এক আইনজীবীর বাসায়। দীর্ঘ শুনানি হলো। রিপোর্ট জমা দিলেন। রিপোর্টে লেখা হলো, ছাত্রদের বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষকদের ক্লাস নিতে যাওয়া ঠিক হয়নি। ফারুকুজ্জামানকে কারা মারল, সে সম্পর্কে নিশ্চুপ। পরবর্তীকালে বেগম জিয়ার আমলে সেই বিচারপতির বেশ উন্নতি হয়েছিল। তিনি হলেন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান বিচারপতি জয়নাল আবেদিনের যোগ্য পূর্বসূরি।

এর মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। বেগম জিয়া ক্ষমতায় এলেন। ক্যাম্পাস দখলকারীরা তখন আরো মরিয়া, কারণ তাদের মাতৃসংগঠনের সহায়তায় বেগম জিয়ার অপ্রত্যাশিত বিজয়। এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগ নয়, অপসারণ চাই। ক্যাম্পাস সম্পূর্ণ অচল। রাতদিন অস্ত্রের মহড়া। ক্যাম্পাসে বসবাসকারী শিক্ষক-কর্মকর্তারা সবাই অসহায়। উপাচার্য তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্ত্রী ও কলেজে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে পাহাড়ের ওপর বাংলোতে থাকেন। দখলদারেরা তার বাড়ির সামনে একটি পরিবহন বাস নিয়ে গেল। বাঁধা হলো মাইক। উপাচার্যের বাসভবনকে ঘোষণা করা হলো ‘সাবজেল’। মাইকে রাতদিন চলল উপাচার্যের উদ্দেশে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল। তার বাসভবনের গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির লাইন কেটে দেওয়া হলো। সে এক নরক গুলজার অবস্থা। ওপরের নির্দেশে এই দুর্বৃত্তদের পাহারায় জনগণের পুলিশ। বেগম জিয়ার ক্যাবিনেটে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি এলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সঙ্গে চট্টগ্রামের তত্কালীন মেয়র, যিনি একসময় উপাচার্যের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীকে তস্কররা পাহাড়ি ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। ডা. চৌধুরী মেয়রসমেত ভেতরে গিয়ে উপাচার্যকে অনুরোধ করেন তিনি যেন বাইরে স্ল্লোগানরত দুর্বৃত্তদের দাবি অনুযায়ী পদত্যাগ করেন। উপাচার্য তো ভেসে আসেননি। তিনি ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী গঠিত সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত ও মনোনীত ১০০ সিনেটরের মধ্যে ৭২ জনের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এই অরাজকতার প্রতিবাদে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে এক দিন ওয়াকআউট করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা চট্টগ্রাম শহরের এমইএস কলেজে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করেন। এমন প্রতিবাদ এই দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। একদিন এক যুবক এলেন আমার বাসায়। তখন সম্ভবত আমি শিক্ষক সমিতির সভাপতি। তার সঙ্গে বেশ কয়েক জন সঙ্গীসাথি। ক্যাম্পাস দখলকারী দুর্বৃত্তদের নেপথ্যে থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ আর উপদেশ দিয়ে সহায়তা করছিলেন ইনি, তাদের অন্যতম যদিও সেই সময় সেই যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন। সেই যুবক ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখিত মৌলবাদ ছাত্রসংগঠন থেকে একটি ছাত্রাবাস সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল। পরে অন্য ছাত্রাবাসে গিয়ে ঐ সংগঠনের সভাপতি। সেবার ছাত্রলীগের বিভক্তির সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সেই মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনের দখলে চলে যায় আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় রগকাটার রাজনীতি। সেদিন সেই যুবক আমার কাছে আবদার করে, উপাচার্য পদত্যাগ করলে তিনি ক্যাম্পাস আবার স্বাভাবিক করে দেবেন। তাকে আমি গেটের বাইরে থেকে বিদায় করে দিই।

কয়েক দিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উপাচার্য বরাবর চিঠি এলো তাকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে। তিনি আমাকে খবর পাঠালেন, তিনি এর উত্তর দিতে চান আইনজীবীর মাধ্যমে। উপাচার্য নিজে একজন লন্ডনের লিংকন্স ইনের ব্যারিস্টার। তাকে বলি, একবার ক্যাম্পাস থেকে বের হলে তিনি আর ক্যাম্পাসে ফিরতে পারবেন না। তিনি বললেন, তিনি তা জানেন। আমাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় গেলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াকের কাছে। সব শুনে ব্যারিস্টার ইশতিয়াক বললেন, ‘সরকার আপনাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আদালত আপনাকে সেই পদে বসাবে না। তার পরও আইনের শাসনের কারণে আমরা আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করব।’ সব শুনে আদালত সরকারের ওপর রুল জারি করেছিল। উপাচার্য চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে আর ক্যাম্পাসে ফিরতে পারেননি। সেই মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনের নেতারা তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়ার ঘোষণা করেছে আগে, আর তাদের সব কর্মকাণ্ডের সক্রিয় সহয়াতা ও অর্থের জোগান দেন সেই যুবক। ততদিনে তিনি একজন বড় রকমের ব্যবসায়ী। কয়েক দিন পরেই উপাচার্য ড. আলমগীর মোহাম্মাদ সিরাজুদ্দিনকে সরকার ১৮৯৭ সালের ব্রিটিশ আমলের জেনারেল ক্লসেজ অ্যাক্ট দ্বারা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। ক্যাম্পাসে সেদিন যে কয়েক জনের নেতৃত্বে বিজয় মিছিল বের হয়েছিল, তারা সবাই ছিল এই দানবীরের অনুসারী আর বিজয়ের উল্লাসের সব অর্থও জোগান দিয়েছিল সদ্য প্রয়াত এই ‘মহান’ ব্যক্তি, যার মৃত্যুতে চট্টগ্রামে বেশি শোকাহত হয়েছেন সরকারি দলের কিছু নেতাকর্মী। পত্রিকা মারফত জানা গেল, সেই ‘দানবীর’কে কবর দেওয়া হয়েছে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিই-বা আর করা! এক দিন পর জানা গেল, মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে একটি অবুদ্ধিজীবী কবরস্থান আছে। অবিশ্বাস করি কীভাবে ব্যাখ্যাটা যখন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হতে আসে? শহিদজননী জাহানারা ইমামকে ১৯৯৪ সালে এই কবরস্থানে কবর দিয়ে এসেছিলাম। ক্ষমা চাই একাত্তরের শহিদেরা। ক্ষমা চাই শহিদজননী। দেশের বেশির ভাগ মানুষ যে বিত্তের কাছে নতজানু হয়ে গেছে। বিত্তের জয়জয়কার চারদিকে।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত