নির্বাচনে আমেরিকা বদলায় না

নির্বাচনে আমেরিকা বদলায় না
প্রতীকী ছবি

‘অল মেন আর ক্রিয়েটেড ইকোয়াল’, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিমূলে থাকা এই বাক্যটির ওপরও সময়ের ধুলো জমেছে। মাঝেমধ্যে উপলক্ষ্য ঘটে এই ধুলো সরিয়ে বাক্যটিকে দৃশ্যমান করার। আড়াইশ বছরে এমন উপলক্ষ্য বহুবারই ঘটেছে; বিশেষ করে নির্বাচনের মৌসুমে এটিকে সাফ-সুতরো করা হয় বেশ ঘটা করে।

শত্রুও স্বীকার করবে, আড়াইশ বছরে আমেরিকা বহুদূর এগিয়েছে। বহুদিন হলো তারা মোটাদাগে বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা; সামরিক শক্তি, অর্থবল, প্রযুক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক কূটকৌশলে তাদের সমকক্ষ হতে হতেও কেউ ঠিক সেভাবে সুবিধা করতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মূলত দেশটির এই শৌর্যবীর্যের সুরক্ষা ও সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের প্রার্থীদের দেওয়া এই প্রতিশ্রুতির ধরনে কিছুটা যা তফাৎ; এর বেশি কিছু নয়। এই তফাতের সামান্য সরু জায়গাটায় কোনো রকমে টিকে আছে ‘অল মেন আর ক্রিয়েটেড ইকোয়াল’ বাক্যটি। জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের জেরে হালের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনই এ কথার পক্ষে সবচেয়ে সবল উদাহরণ। অর্থাত্ ‘ইমানশিপেশন প্রক্লেমেশন’ জারির দেড় শতক পেরিয়ে গেলেও বর্ণবাদের ভূত এখনো আমেরিকানদের ঘাড়ে দিব্যি বসে পা দোলাচ্ছে। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ এবং জো বাইডেনের ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ একই মুদ্রার দুই পিঠ মাত্র; দর্শনগত কোনো অমিল নেই এ দুইয়ে। হ্যাঁ, কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা, অভিবাসন নীতি, ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের জন্য নীতি, মুসলিমদের জন্য নীতি ইত্যাদি কয়েকটি দফা রয়েছে বাইডেনের ‘বোল্ড আইডিয়াজ’-এ। জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও সেক্সুয়াল ওরিয়েনটেশন নিয়ে বরাবরই জনসমক্ষে বিরূপ মন্তব্যকারী ট্রাম্পও কিন্তু হাজির ‘প্লাটিনাম প্ল্যান’ নিয়ে।

সুতরাং বিশ্বব্যাপী বেছে বেছে মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি রাখা, মুসলিমদের ওপর অতিমাত্রায় নজরদারি এবং তাদের অভিবাসন দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় কঠোর নীতি অনুসরণ থেকে বাইডেন সরে আসবেন, এমন আশায় যারা বুক বাঁধছেন, তারা বারাক ওবামাকে নিয়ে স্বপ্নের ফানুস চুপসে যাওয়ার বাস্তবতা এরই মধ্যে ভুলে বসে আছেন। সন্ত্রাসী সন্দেহে কোনো মার্কিন নাগরিককে অনির্দিষ্ট মেয়াদে আটকে রাখার বিধান কিন্তু ওবামারই অবদান। তার প্রশাসনই ‘ইউএস প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’ সম্প্রসারণ করেছিল। ‘কাউন্টারিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম’ নামে উগ্রপন্থিদের মোকাবিলার যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন ওবামা, সেটি আদতে মুসলিম দৈনন্দিন জীবনকে সার্বক্ষণিক ‘সফট’ নজরদারির আওতায় আনা। ‘বর্ণসাম্য’ আমেরিকার ২২০ বছরের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের নির্দেশেই কিন্তু তৈরি হয়েছিল ‘কিল লিস্ট’। সেই তালিকা ধরে বিভিন্ন মুসলিম নেতাকে কোতল করে মার্কিন বাহিনী। প্রতিশ্রুতি দিয়েও গোয়ান্তানামো বে কারাগার বন্ধ করেননি তিনি। ইরাক যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলায় নিহত বেসামরিক নারী-শিশুদের পর্যন্ত ‘শত্রু যোদ্ধা’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন ওবামা।

সুতরাং আসছে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ও তার রানিং মেট কমলা হ্যারিস জিতলে মার্কিন প্রশাসন একপেশে নীতি থেকে সরে আসবে, বর্ণসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেবে, এমন ভাবনায় আর যা-ই থাকুক, বাস্তব ভিত্তি নেই। সাদারাই শ্রেষ্ঠ বা হোয়াইট সুপ্রিমেসি ধারণার নেপথ্যের কারণ আসলে যতটা না ‘ব্যবহারিক’, তার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। এক হিসাবে, আমেরিকায় প্রতিবছর গড়ে আড়াই লাখ মানুষ হেট-ক্রাইমের শিকার হন। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হামলা হয়, তার দুই-তৃতীয়াংশের পেছনে রয়েছে উগ্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠী ও ব্যক্তিরা। আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হিসাবে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন মুল্লুকে সংঘটিত ১৩৬টি সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশের সঙ্গে যোগ ছিল মুসলিমদের।

আরেক গবেষণা বলছে, নাইনুইলেভেন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই কিছুদিন আগে পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন, সাদ্দাম হোসেনই ঐ হামলার নেপথ্যের কারিগর। রাষ্ট্রীয়ভাবে কতটা চর্চা জারি থাকলে জনমনে এমন ধারণা পোক্ত হতে পারে, বোঝা যায়। ঠিক এ কারণে মুসলিমদের হেনস্তা করা বা গণমাধ্যমে তাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা প্রবল। আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ গবেষণা আরো বলছে, কোনো অমুসলিম ঘটনার পেছনে থাকলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে, একই ঘটনার নেপথ্যে মুসলিম থাকলে সাড়ে ৩০০ গুণেরও বেশি জোরেশোরে ঢাকঢোল পেটানো হয়।

সুতরাং ইসলামোফোবিয়াকে ‘মুসলিমবিদ্বেষ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ভুল না হলেও তা খণ্ডিত; এটি আসলে ‘পরিকল্পিত বর্ণবাদ’, যা কোনো ব্যক্তির আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। মোদ্দা কথা, আমেরিকান রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি, দোর্দণ্ড প্রতাবশালী ইহুদি লবি শতভাগ ইসলামোফোবিক। এই সত্য অনুধাবন করতে পারলে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও যে ইসলামভীতি, বর্ণবাদ, সম্প্রসারণবাদ জিইয়ে রাখারই প্রতিশ্রুতি, রোদেলা দিনের মতো তা পরিষ্কার হয়। ট্রাম্পকে গালমন্দ করে মনের ঝাল কিছুটা মিটতে পারে, কিন্তু ভুলে যাবেন না আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী সামরিক সম্প্রসারণের কট্টর সমর্থক বাইডেন-কমলাও।

লেখক: সাংবাদিক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত