আঙুল ফুলে কলাগাছ

আঙুল ফুলে কলাগাছ
প্রতীকী ছবি

বাংলা ভাষায় একটা জনপ্রিয় বাগ্ধারা হচ্ছে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’। আঙুলটা যদি হঠাত্ কলাগাছে পরিণত হয়, কলাগাছের মতো ফুলে-ফেঁপে ওঠে, সেই অবস্থাকেই বোঝায়। এর মানে হচ্ছে :অত্যন্ত বাড় বাড়া, অহংকার হওয়া, অপ্রত্যাশিত ধনলাভ, অবিশ্বাস্য উন্নতি, হঠাৎ বড়লোক হওয়া ইত্যাদি। আঙুলের সঙ্গে কলাগাছের কি কোনো মিল আছে? তারপরও মানুষ কেন বলে যে আঙুল ফুলে কলাগাছ? এটা তাল, নারিকেল, আম, কাঁঠাল, শাল, সেগুনসহ যে কোনো গাছই হতে পারত। তবু কেন কলাগাছকেই ফোলা আঙুলের সমার্থক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে?

এর একটা কারণ হতে পারে, কলাগাছ খুব সুলভ। এটা খুব দ্রুত বড় হয় এবং একবার একটা কন্দ বা গোড়া লাগালে এর বিস্তার চলতেই থাকে। এই বিবেচনায় কলাগাছ নির্বাচন করা হতে পারে।

সাধারণত অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করে হঠাৎ ধনী হয়ে যাওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ কথাটা বেশি ব্যবহার করা হয়। যদিও ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ না বলে ‘আঙুল ফুলে বটগাছ’ বললে অধিক মানানসই হয়। কারণ যে আমলে এসব বাগ্ধারা তৈরি হয়েছে, তখন চুরির একটা মাত্রা ছিল। সেজন্য চিন্তাটা কলাগাছ পর্যন্ত গেছে। এখন হলে বটগাছ, রেইনট্রি, নইলে আরো মোটা যত গাছ আছে সেগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হতো। অর্থাত্, আঙুল ফুলে বটগাছ, রেইনট্রি, মান্দারগাছ, অশত্থ কিংবা আরো মোটা কোনো গাছ হয়েছে বলা হতো।

সমাজ-সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে চুরি ও লুটপাটের মাত্রা বেড়ে গেছে। আগে চুরিচামারির একটা সীমারেখা ছিল। আগের আমলে ছিঁচকে চুরিই ছিল বেশি। বড় ধরনের চুরি কেউ করত না বা করার সাহস পেত না। বড় ধরনের চুরি বা লুটপাটকে বলা হতো ‘পুকুর চুরি’। এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কিছু ক্ষেত্রে যে লুটপাট চলছে, তা শুধু পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি। অর্থাত্, এখন চুরি আর পুকুরে সীমাবদ্ধ নেই, সাগর চুরি শুরু হয়েছে। আগে কিছু নির্দিষ্ট মানুষই চুরি করত। এর মধ্যে রাজকর্মচারীরা ছিল অগ্রগণ্য। এখন রাজকর্মচারীরা তো বটেই, চান্স পেলে পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ, মালি, মুটে, ঝাড়ুদার, পাহারাদার, পিয়ন-চাপরাশি, গাড়িচালক—যে কেউই চুরি করে বা করতে পারে। এখন সমাজে পেশা দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে পুকুর বা সাগর চুরি করেছে কি না। কলাগাছ দেখেও বোঝার উপায় নেই, সেটা আঙুল ফুলে এমন রূপ ধারণ করেছে কি না। সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে এ এক বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা!

আমাদের দেশের মানুষ এখন বড় চাকরি, বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, বড় ধরনের ঠিকাদারি করে টাকা নয়ছয় করে ধনী তো হয়ই, ছোট চাকরি করেও শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। যেভাবে বিরাট ধনী হয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেক। তার শতকোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। উনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পাজেরো গাড়িতে চড়তেন। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরো দুটি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। একটি পিকআপ গাড়ি তিনি নিজের গরুর খামারের দুধ বিক্রি এবং মেয়ের জামাই পরিচালিত ক্যান্টিনের মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতেন। আরেকটি গাড়ি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত তার পরিবারের অন্য সদস্যরা ব্যবহার করতেন। রাজধানীতে দুটি সাততলা বিলাসবহুল ভবন আছে তার, যাতে মোট ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। আছে নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবন। ১০-১২ কাঠার প্লট রয়েছে। পাঁচ কাঠা জমিতে একটি ডেইরি ফার্মও আছে। সব মিলিয়ে মালেকের শত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

অনেকেই তাকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখার ও ভাবার অবকাশ আছে। আবদুল মালেক আসলে একজন প্রথাবিরোধী ব্যতিক্রমী মানুষ। দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি শুধু সমাজ কিংবা অফিসের উঁচুতলার মানুষের জন্য এই প্রচলিত ধারণা তিনি বদলে দিয়েছেন। নিজে ‘শোষিত-বঞ্চিত’ শ্রেণির প্রতিভূ হয়েও রাষ্ট্রীয় সম্পদ করায়ত্ত করেছেন। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা-প্রতিভা দিয়ে তিনি ধনীক গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছেন। নিজের ভাগ্য বদল করেছেন। কেবল গাড়িচালক নয়, সমাজে একজন সফল ধনী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের কতজন মানুষ তার মতো টাকা বানাতে পেরেছে?

বাড়ির সিংহ দরজার চেহারা দেখলেও মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। তার রুচির প্রশংসা করতে হয়। তার নিশ্চয়ই অনেক এলেম আছে। না হলে স্রেফ গাড়িচালক হয়ে এত সম্পদ অর্জন করলেন কী করে? সমাজে পরাজিত ব্যর্থ মানুষেরাই আজ তার বিরোধিতা করছে। কিন্তু তার এই বিপুল সম্পদ তো আর এমনি এমনি হয়নি। তাকে এগুলো কেউ স্বেচ্ছায়ও দেয়নি। একজন বড় কর্মকর্তার গাড়িচালক বলে খুশি হয়ে সবাই তাকে টাকাপয়সা উপহার দিয়েছে এমনও নয়। এর জন্য তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। এরটা মেরে, ওরটা কেড়ে সমাজে ধনী হওয়া সহজ কাজ নয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার জন্য তাকে নিশ্চয়ই অনেক আত্মত্যাগ ও স্বার্থত্যাগ করতে হয়েছে।

নিজে যা উপার্জন করছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সুবিধা অন্য কাউকে পাইয়ে দিয়েছেন। দুনিয়ার নিয়মই হচ্ছে :দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে! নিজে কিছু পেতে হলে অন্যকেও অনেক কিছু দিতে হয়। তিনি দিয়েছেন এবং পেয়েছেন। বর্তমান যুগে সফল হওয়া, কোটিপতি হওয়া, বড়লোক হওয়াই তো সব দেশের, সব মানুষেরই আদর্শ। টাকাওয়ালা হতে পারার নামই সাফল্য। সফল হওয়ার কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। উপায় এখন কেউ দেখে না। উদ্দেশ্য আর ফলটাই দেখে। যারা নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখে নিয়মিত সরাতে পারে, তারাই প্রকৃত জ্ঞানী। মালেক কে? বড়োবাবুর নানা মাপের ক্যাশিয়ার বা টোল কালেক্টরদের একজন। বেহিসেবী বস্তার ছিদ্র থেকে টুকটাক সরিয়ে যত্সামান্য কিছু করেছেন।

এ প্রসঙ্গে সাহেদের কথাও বলতে হয়। সাহেদও কিন্তু একেবারে নিচুতলা থেকে নিজের মেধা ও প্রতিভা ব্যবহার করে উঁচুতলায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। সাহেদ কিংবা মালেক বড় ডিগ্রিধারী কেউ নন। তারা কিছু কিছু ব্যক্তির ঝোল খাওয়ার হাতা হিসেবে ব্যবহূত হয়েছেন। কিন্তু যেসব শিক্ষিত-সচেতন মানুষ তাদের ‘হাতা’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তাদের ছিটেফোঁটা নিয়ে নিজেরা অনেক বেশি খেয়েছেন, তাদের কজনকে নিয়ে আমরা আলোচনা করি? তাদের কজনই বা ধরা পড়েছে বা ধরা পড়ে?

একদিক দিয়ে দেখলে সাহেদ-মালেকরাই ভালো করেছেন। তারা নিজেরা নিজেদের উন্নতি করেছেন। এখন তো আমরা উন্নতিই চাই। আর সেটা আত্মিক বা নৈতিক উন্নতি নয়, আর্থিক উন্নতি। আর্থিক উন্নতি যে পথে হয়, সে পথে চলাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের আখের গোছাতে সবাই চেষ্টা করে। কেউ পারে, কেউ পারে না। যারা পারে বা পারছে, তাদের কি আমরা মাথায় তুলে রাখছি না?

নীতি-আদর্শ তো এখন কেবলই মুখের বুলি। অপকর্ম করে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ ধরা না খায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তো সবাই সাধু পুরুষ। ধরা না খাওয়া পর্যন্ত, সুশীল রাজনৈতিক কর্মী, ত্যাগী যোদ্ধা, সমাজের মাথা, হাজার মানুষের আইডল, মোটিভেশনাল স্পিকার, টক শোর জ্ঞানতাপস, কমিউনিটির বাতিঘর! তারপর একদিন হয়তো সবকিছু ফাঁস হয়, সাধক পরিণত হন মহাপাতকে। তবে সবাই নন, কেউ কেউ।

আসলে সবাইকে টেক্কা দিয়ে অঢেল অর্থ-সম্পদ অর্জনের খেলায় এগিয়ে যাওয়াই তো স্পোর্টিং স্পিরিট! আর জীবনযুদ্ধ তো প্রতিযোগিতারই নামান্তর। তাহলে কেন বন্ধ হবে এই খেলা? শুধু দু-একজন ভুল শট খেলে অতিআগ্রাসী হয়ে অসময়ে আউট হয় আরকি! এটা সব খেলাতেই হয়!

এ যুগে ধনের আরাধনাই শ্রেষ্ঠ আরাধনা। সাহেদ, সম্রাট, পাপিয়া, মালেক, সাবরিনাসহ সবাই ধনসম্পদ অর্জনের জন্য সাধনা করেছেন। এই সাধনা আরো অনেকেই করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, দেশে করোনাকালেও কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। বাড়বে না কেন? কোটিপতি হওয়া যেমন মানুষের লক্ষ্য, রাষ্ট্রেরও লক্ষ্য সবাইকে কোটিপতি বানানো। তাই তো ঝোপ বুঝে কোপ মারার বিদ্যায় যারা সিদ্ধহস্ত, তারা সহজেই ফুলে-ফেঁপে উঠছেন। আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হচ্ছেন। এটা ব্যক্তিরও সাফল্য, রাষ্ট্রেরও সাফল্য। রাষ্ট্রের সাফল্যও তো মাপা হয় ব্যাংকে জমানো ধনীদের টাকার অঙ্কে।

বাংলাদেশ ধনী তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এই কারখানা থেকে নিয়মিত ধনী উত্পাদন হচ্ছে—এটা আমাদের জন্য অবশ্যই সুখবর। সাহেদ, মালেক, সম্রাট, সাবরিনা, পাপিয়া, পিকে হালদাররা হচ্ছেন এই কারখানার শ্রেষ্ঠ পণ্য। আগামী দিনে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে এই সব সফল মানুষদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। জীবনে কীভাবে নিচু থেকে ওপরে ওঠা যায়, সেটা আগামী দিনের নাগরিকদের অবশ্যই জানা দরকার!

লেখক: রম্য লেখক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত