পোশাক নয়, প্রয়োজন চিন্তাধারার পরিবর্তন

পোশাক নয়, প্রয়োজন চিন্তাধারার পরিবর্তন
ধর্ষণের প্রতীকী ছবি।

প্রতিনিয়তই আমাদের দেশে ধর্ষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। রোজকার পাতায় স্থান পাচ্ছে নিত্যনতুন ধর্ষণের খবর। কিন্তু এর শেষ কোথায়?

সমাজের একদল মানুষ ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক ও চলাফেরাকে দোষারোপ করে ধর্ষকদের সাহসের মাত্রা যেন আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কোনো একটা ধর্ষণের খবর সামনে এলে আগেই নারীর পোশাকের ওপর আঙুল ওঠানো এখন যেন স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নারীর চলাফেরা, তার স্বাভাবিক মেলামেশা—এসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠিয়ে ধর্ষিতাকেই যেন তার ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হচ্ছে!

একটা মেয়ে যেমন পোশাকই পরিধান করুক, যে সময়েই ঘর থেকে বের হোক তাকে ধর্ষণ করার অধিকার কারো নেই। যদি কোনো পুরুষ যে কোনো সময়ে বাইরে বের হলে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে, তবে কোনো নারীর বাইরে বের হওয়াতে কেন সময় বেঁধে দেওয়া থাকবে?

যদি হয় পোশাকই নারীর ধর্ষণের প্রধান কারণ তবে কোলের শিশুর পোশাকেই-বা কী ত্রুটি ছিল! কোলের শিশু থেকে শুরু করে—বৃদ্ধ মহিলা, কিশোরী, রাস্তার ধারের মানসিক ভারসাম্য হারানো কিছু না বোঝা মেয়েটি কেউই রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের হাত থেকে। ঘরে-বাইরে সব জায়গায়ই যেন যৌনতার আশায় নারীকে ভোগ করার লালসায় থাকছে পুরুষরা। তারা যেন জঙ্গলের হিংস্র পশুর চেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে ঘুরছে আমাদের চারপাশে। আর তাদের ক্ষুধা রক্ত-মাংসে গড়া নারীর শরীরের প্রতি।

কখনো এই ধর্ষণের পেছনে থাকছে চেনামুখের অচেনা হিংস্রতা কখনো-বা অচেনা মুখের হিংস্রতা! তাদের লালসা মেটানোর সময় সামনে কাকে ভোগ করছে, সেটা ভাবার সময়ও তাদের নেই। আর ধর্ষণ শেষে দোষারোপ করা হচ্ছে নারীর পোশাককে, তার স্বাধীন মনোভাবকে, চলাফেরাকে। নারীর পোশাকের ওপর আঙুল তোলা শুধুই এক বাহানা।

ধর্ষণ রুখতে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার পরিবর্তন, পোশাকের নয়। যে সমাজে নিজ পিতা তার জন্ম দেওয়া সন্তানের মধ্যে যৌনতা খুঁজে পায়, কোলের শিশুর শরীরের প্রতিও লালসা জাগে, বৃদ্ধ চামড়ার মধ্যেও যৌনতা খুঁজে পায় সেই সমাজে ধর্ষণের পেছনে পোশাককে দায়ী করা শুধুই এক বাহানা।

আজ যারা ধর্ষণ হলেই নারীর পোশাককে দোষারোপ করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন, তারাই পরবর্তী ধর্ষণের জন্য ধর্ষকদের সাহস প্রদান করছেন!

একটা সময় ছিল, যখন অভিভাবকগণ নিরাপত্তার খাতিরে বাইরের মানুষজন, ছেলেবন্ধুদের কাছ থেকে মেয়েদের সাবধানে থাকতে বলতেন। কিন্তু, সময় এখন এমন এক রূপ ধারণ করেছে, যেখানে মেয়েরা না পিতা-মাতা বা স্বামীর সঙ্গে বাইরে গিয়ে নিরাপদ থাকছে, আর না চার দেওয়ালের ভেতরে পরিবারের মানুষের কাছে নিরাপদ থাকছে! তাহলে মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়? কার হাতে নারীর নিরাপত্তা!

যে পুরুষের হাতে নারীর সুরক্ষা থাকার কথা ছিল, সে পুরুষের ভয়েই আজ নারীরা পালিয়ে বেড়ায়। জন্মদাতা পিতা, সমাজের রক্ষক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কারো হাতেই নারীর নিরাপত্তা নেই। যৌনতার খোঁজে যেন হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে একদল পুরুষ। আর ধর্ষণ শেষে নারীর পোশাকের ওপর দোষ চাপাতে ব্যস্ত আরেক দল পুরুষ!

বিচারের আশায় আইনের আশ্রয় নিয়েও বিচার পাচ্ছে না অধিকাংশ ধর্ষিতা এবং তাদের পরিবার। বিচার লাভের আশায় গেলে ধর্ষক নয় বরং ধর্ষিতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় আজকের এই সমাজে! উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় এ সমাজে ধর্ষণের মিছিল বেড়েই চলেছে! এর শেষ কোথায় সেটাই আজ সব নারীর প্রশ্ন।

এই ধর্ষণের মিছিল রুখতে প্রয়োজন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নারীদের পুরুষের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নেই—এই ধ্যানধারণার পরিবর্তন করতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক, তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন বাড়াতে হবে। কোনো ধর্মই নারীর প্রতি অন্যায় সমর্থন করে না। ধর্মীয় শাসনের পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষার।

আমাদের সমাজে একটা মেয়ে একটু বুঝতে শিখলেই তাকে হাজারো নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু একটা ছেলেকে সাধারণত এত নিয়ম বেঁধে দেওয়া, এত বাধা প্রদান করা হয় না। যার ফলাফল, একটা ছেলে ছোটবেলা থেকেই এই ধারণা নিয়ে বড় হয় যে সে ছেলে। তার কোথাও কোনো বাধা নেই, সে স্বাধীন। আর এই মনোভাবের ফলে সে ছোটবেলা থেকেই নিজেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে দেয়।

সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মুছতে হলে ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়ে সবাই মানুষ, সবারই সমান অধিকার রয়েছে তা শিক্ষা দিতে হবে। শুধু মেয়েদের নয় ছেলেদেরও এসব শিক্ষা প্রদান করতে হবে। আর মেয়েদের চুপ না থেকে ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখাতে হবে। তবেই এই জঘন্য অপরাধের অবসান সম্ভব।

লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যাডিজ বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত