একজন অ্যামি ব্যারেট এবং মার্কিন নির্বাচনি রাজনীতি

একজন অ্যামি ব্যারেট এবং মার্কিন নির্বাচনি রাজনীতি
একজন অ্যামি ব্যারেট এবং মার্কিন নির্বাচনি রাজনীতি

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে যারা উদারপন্থি বলে পরিচিত, তাদের কাছে একটি মৃত্যুসংবাদ শুধু একটি দুঃসংবাদ হয়ে আসেনি। ঐ দিন মৃত্যুবরণ করেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী বিচারক রুথ বেডার গিন্সবার্গ, যিনি ছিলেন উদারপন্থিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং মার্কিন সর্বোচ্চ বিচারব্যবস্থায় উদারপন্থিদের আস্থার জায়গা। জাতীয় ‘নর্মস’ ও পেশাগত সীমারেখায় সাংঘর্ষিক হলেও বিচারক গিন্সবার্গ ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রেসিডেন্টের নির্বাচনে জেতাকে ‘অকল্পনীয়’ বলে শ্লাঘা প্রকাশ করেছিলেন। দুবার ক্যানসারের বিরুদ্ধে এবং হার্টে রিং বসিয়েও আইনি পেশা চালিয়ে যাওয়া একজন বিচারকের মৃত্যু খালি চোখে খুব গুরুত্ব না পেলেও বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থা, বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং আসন্ন নির্বাচনে এর প্রভাব বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ইতিমধ্যে দুজন বিচারককে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের রাজনৈতিক আদর্শে সমতা আনেন, পূর্বে যেখানে উদারপন্থিদের প্রাধান্য ছিল। আর বিচারক গিন্সবার্গের মৃত্যুর পর সৃষ্ট শূন্যস্থানে পূর্বেই (২০১৭ সালে) প্রেসিডেন্ট মনোনীত রক্ষণশীল ঘরানার বিচারক অ্যামি কোনি ব্যারেটকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে সুপ্রিম কোর্টে নির্ধারিত সংখ্যার (৯টি) বাইরে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ডেমোক্র্যাট শিবির প্রথম থেকেই এই বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, নির্বাচনের পরে এই নিয়োগ দেওয়া হোক, তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই দাবিকে গ্রাহ্য করেনি। অথচ ২০১৬ সালের নির্বাচনি বছরে রক্ষণশীল বিচারক অ্যান্টোনিনস্ক্যালিয়ার মৃত্যুতে শূন্য হওয়া পদে ওবামা প্রশাসন উদারপন্থি বিচারক মেরিক গারল্যান্ডকে রিপাবলিকানদের তীব্র বিরোধিতার মুখে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিল। ঘটনার গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারি, যখন এ বছরের প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের প্রথম প্রশ্নটাও ছিল এ বিষয় নিয়ে। এদিকে চলতি মাসের ১২ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত চার দিনব্যাপী সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির আইনপ্রণেতারা অ্যামি কোনি ব্যারেটকে শুনানি করেন, যেখানে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার রাজনৈতিক আদর্শ-সমর্থন মাপার চেষ্টা করেছেন। তবে ঝানু আইনজীবীর মতো ব্যারেট আইন ও রাজনীতি আলাদা বলে অভিমত দিয়েছেন এবং আইনের দরবারে কোনো ব্যক্তিগত মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটবে না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে অ্যামি ব্যারেট সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী বিচারক হিসেবে চূড়ান্ত নিয়োগ পাবেন। বিচারক ব্যারেট যদিও উদারপন্থি বিচারক গিন্সবার্গের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন, তবে তার মধ্যে ২০০০ সালের ‘ফ্লোরিডা কেস’-এর জন্য পরিচিত রক্ষণশীল বিচারক অ্যান্টোনিন স্ক্যালিয়ার ছায়া দেখতে পান অনেকেই। যাই হোক, এই বিচারক নিয়োগ নিয়ে মার্কিন মুলুকে এত আগ্রহ কেন? উক্ত লেখনীতে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে।

প্রথম কারণটা ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বিল আল গোর (তত্কালীন ক্লিনটন প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট) ও রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশের মধ্যে নিকট ইতিহাসের সব থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন দেখা যায়, যেখানে ভোটের দিন রাতে আল গোর ২৪৯টি এবং জর্জ ডব্লিউ বুশ ২৪৬টি ইলেকটোরাল কলেজ নিয়ে তিনটি অঙ্গরাজ্যের—উইসকনসিন (১১), অরেগন (৭) ও ফ্লোরিডা (২৫) ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছেন। মার্কিন নির্বাচন ‘উইনার টেকস অল’ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী বলে উল্লিখিত অবস্থায় বোঝা যাচ্ছে যে উইসকনসিন এবং অরেগন দুটিতে জিতলেও ‘ম্যাজিক ফিগার’ ২৭০ পাওয়া সম্ভব নয়, অর্থাত্ উভয় প্রার্থীর জন্যই শুধু ফ্লোরিডার ইলেকটোরাল কলেজ বিজয় নিশ্চিতে যথেষ্ট। কিন্তু ফ্লোরিডার ভোট গণনা নিয়ে দেখা গেল মহানাটকীয়তা, ভোট গণনার ঐ রাতে বুথফেরত ভোটারদের সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে সব জাতীয় প্রচারমাধ্যমে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন ঘটছিল—কে হতে যাচ্ছে বিজয়ী। বিজয়ের পাল্লা একবার আল গোরের দিকে ঝোঁকে তো পরক্ষণেই জর্জ ডব্লিউ বুশের দিকে। অনেক নাটকীয়তার পর ফ্লোরিডার স্টেট গভর্নর জেব বুশ (জর্জ ডব্লিউ বুশের ছোট ভাই) পাঁচ শতাধিক ভোটের ব্যবধানে জর্জ ডব্লিউ বুশকে জয়ী ঘোষণা করেন। প্রথমে আল গোর এই ফলাফল মেনে নিলেও পরবর্তী সময়ে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ভোট পুনরায় গণনার আবেদন জানান এবং নির্বাচনের তিন সপ্তাহ পরেও ফ্লোরিডা সুপ্রিম কোর্ট কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে মার্কিন কেন্দ্রীয় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। ঐ বছরের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিজয়ী ঘোষণা করে। আল গোর মার্কিন বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে পরাজয় স্বীকার করেন। তবে এই ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এখনো আছে। ডাকযোগে যে ভোট এসেছিল, তাতে স্বাক্ষর এবং নির্ধারিত তারিখের পূর্বে পৌঁছায়নি—এই অভিযোগে অনেক ভোট বাতিল করা হয়েছিল, যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোর। ভোটের এই ফলাফল বিতর্ক নিষ্পত্তি হয় সর্বোচ্চ আদালতে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫-৪ ভোট) ছিল রক্ষণশীল বিচারকবৃন্দ। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছেন এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের মতাদর্শের বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থায় দেখা রিপাবলিকানদের স্বস্তি দেবে।

দ্বিতীয়ত, কৌশলগত বিজয়। স্মরণকালে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ঘটেনি সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এবং মার্কিন সংবিধানে ধারা অব্যাহত রেখেই। এখন রিপাবলিকানদের জন্য প্রশাসন চালাতে বিচারিক কোনো বাধা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, ওবামা কেয়ার। ট্রাম্প প্রশাসন অনেক চেষ্টা করেও এটি বাতিল করতে পারেনি। কারণ সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে এটি বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। আর সদ্যপ্রয়াত বিচারক গিন্সবার্গের স্থলাভিষিক্ত অ্যামি কোনি ব্যারেট যে ওবামা কেয়ার বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়ে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রিপাবলিকানদের একটি কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করবেন তা বলাই বাহুল্য। তৃতীয়ত, ক্ষমতার কাঠামোগত প্রেক্ষিতেও এই নিয়োগ একটি তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। যদি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে হেরে যান, তাহলে বাইডেন প্রশাসন কতটুকু সাফল্যের সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে তা একটি আগ্রহের বিষয়। কারণ তখন সুপ্রিম কোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবেন রক্ষণশীলেরা।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজিত প্রার্থীর ভোটের ফলাফল মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় এবং একাডেমিক আলোচনায় এটাই উঠে আসে যে পরাজিত পক্ষের সম্মতির (লুজার’স কন্সেন্ট) ওপর নির্ভর করে ঐ দেশের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা, গণতন্ত্রের ভিত্তি, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত চিত্র। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিপরীতে গৌরবময় ধারাবাহিকতার কথা বলেছেন, প্রচলিত ডাকযোগে ভোটের বিরোধিতা করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের এই দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ নিঃসন্দেহে ‘নন-ওয়েস্টার্ন ডেমোক্রেটিক’ রাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা, যেখানে সব সময় এরকম অভিযোগ শাসনক্ষমতার বাইরে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো করে থাকে। এই অভিজ্ঞতা আমেরিকানদের কাছেও কি নতুন নয়? এর মাধ্যমে কি দেশের সংবিধানের প্রতি একধরনের অনাস্থা জ্ঞাপন? এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগামী ৩ নভেম্বর পাওয়া যাবে। তার আগে এবারের নির্বাচনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। অন্যান্য উন্নত ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের তুলনায় মার্কিনিদের ভোটার ‘টার্ন-আউট’ হার তুলনামূলক কম হওয়ার অনেক কারণ (নির্বাচন-পূর্ববর্তী নিবন্ধনকে বাড়তি ঝামেলা গণ্য করা, কর্মদিবসে নির্বাচন, বাধ্যতামূলক ভোটিং না থাকা ইত্যাদি) দেখানো হয়। তবে এবারের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন হবে বলে মনে করছে নির্বাচনি গবেষণা সংস্থাগুলো। কারণগুলোও বেশ অনুমেয়—কোভিড-১৯ একটি অন্যতম অনুঘটক, ডাকযোগে ভোট প্রদানের মাধ্যমে ভোটাররা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাদের মতামত জানিয়ে দিচ্ছেন এবং গত মাস থেকেই ডাকযোগে রেকর্ডসংখ্যক ভোট প্রদান হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। তবে ভোট প্রদানের ব্যাপারটি ব্যক্তি পর্যায়ে আলোচনার দাবি করে। পক্ষান্তরে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও নির্বাচনি রাজনীতির মধ্যে যে সংযোগ আছে, ওপরের আলোচনায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লেখক: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং

বর্তমানে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত