ডেভিড পারডুর বর্ণবাদী আচরণ অস্বীকার করা যায় না

ডেভিড পারডুর বর্ণবাদী আচরণ অস্বীকার করা যায় না
জর্জিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর ডেভিড পারডু। ছবি: সংগৃহীত

জর্জিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর ডেভিড পারডু, যিনি একটি কঠিন পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, তিনি জর্জিয়ার ম্যাকন-এ গত শুক্রবারের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচয় দেওয়ার আগে সিনেটর কমলা হ্যারিসের নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করেন।

কী বিস্ময়কর! কমলা হ্যারিস, যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, সিনেটর ডেভিড পারডু তার সিনেট বাজেট কমিটির সহকর্মীও ছিলেন, বলা যায়, সিনেটর হ্যারিসের অধীনে পারডু বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছেন। আর তাকেই কিনা তিনি ব্যঙ্গ করে ডাকছেন—‘কা-মাল-এ, কা-মাল-এ বা কামলা, কা-মালা, -মালা, -মালা! ঠিক জানি না, তবে আমি ঐ সমাবেশের দর্শকের হাসির ছবি স্পষ্ট আঁকতে পারছি। (হ্যারিস নিজেই লিখেছেন যে এটি বিরামচিহ্নের মতো ‘কমা’-লা’ উচ্চারণ করা হয়েছে।)

ট্রাম্পের বিষাক্ত বর্ণবাদ মতাদর্শীদের মধ্যে যারা আছেন, তারা বাদে আর কেউ কি এই বর্ণবাদী আচরণের ভেতরে মজা খুঁজে পাবেন? এর উত্তর অবশ্যই ‘না’। হ্যারিসের প্রেস সেক্রেটারি সাব্রিনা সিং তত্ক্ষণাত্ প্রতিক্রিয়া জানান পারডুর এই আচরণের জন্য। তিনি টুইটারে বলেন, ‘তিনি (পারডু) একজন ভয়াবহ বর্ণবাদী।’ এজন্য সিং টুইটারে ভোটারদের পারডুর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী জন ওসোফের পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানান।

পারডুর ক্যাম্পেইনের মুখমাত্র ক্যাসি ব্ল্যাক সিএনএনে দেওয়া একটি বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এটা ঠিক যে সিনেটর পারডু সিনেটর কমলা হ্যারিসের নাম ভুলভাবে প্রকাশ করেছেন, তবে এর দ্বারা তিনি কোনো অর্থবোধক কিছু বোঝাতে চাননি।’ ক্যাসি আরো বলেন, ‘তিনি আসলে উগ্র সোশ্যালিস্ট এজেন্ডার বিরুদ্ধে একটি বস্তুনিষ্ঠ তর্কবির্তক করতে চেয়েছেন এবং এটা করতে কমলা হ্যারিস ও তার সমর্থিত প্রার্থী জন ওসোফ পারডুকে তাতিয়েছেন।

এটা বলাই যেতে পারে যে, ক্যাসি ব্ল্যাক তার বসের পক্ষে কথার মারপ্যাঁচ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন, কারণ আমেরিকা জুড়ে বিপুল অভিবাসী এবং বিচিত্র বর্ণের বিপুল মানুষ রয়েছে, যাদের ‘নাম’ নিয়ে ব্যঙ্গ করার ব্যক্তিগত এবং বেদনাদায়ক গল্প রয়েছে। পারডুর ক্লিপটি অনলাইনে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রঙের লোকেরা তাদের নাম সংক্রান্ত ‘অত্যাচারিত’ হওয়ার ট্রমাজনিত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া শুরু করেন।

ইরানি-আমেরিকান সংবাদপাঠিকা আসিহ নামদার টুইট করে বলেছেন, ‘আমাদের নামগুলো আমাদের পরিচয় এবং গর্বের। এটি আমাদের পরিচয়ের একটি মৌলিক অনুষঙ্গ। এই ‘নাম’ই বলে দেয় আমরা আসলে কে?’

পারডুর অমন বর্ণবাদী আচরণের পর অনেক বিশিষ্ট ভারতীয়-আমেরিকান #মাই-নেম-ইজ হ্যাশট্যাগটি ব্যবহার করে টুইট শুরু করেন। পারডুর করা হ্যারিসের নামের ইচ্ছাকৃত এবং অপমানজনক বিদ্রূপের প্রতিক্রিয়াগুলো পড়ে আমার অবস্থা ছিল যুগপত্ থেরাপিউটিক ও বেদনার্ত। আমার বাংলাদেশি মা তার চারটি মেয়ের ফারসি নাম রেখেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্য সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাবকে শ্রদ্ধা করে। তিনি কীভাবে আমার নামটির অর্থ ‘সৃষ্টিকর্তার উপহার’ হিসেবে রেখেছিলেন এবং ছোট অবস্থায় এটা জানতে পারার পর আমার স্পষ্ট মনে আছে—কীভাবে এটি আমার ছোট্ট বুকটিকে গর্বে ভরিয়ে দিয়েছিল।

কয়েক বছর ধরে আমি আমার নামের অর্থ বিভিন্নভাবে শুনেছি, বিশেষ করে আমার ইরানি স্বামীকে বিয়ে করার পর এটির ব্যাপ্তি ‘অমর’ থেকে ‘চিরন্তন’ পর্যন্ত হয়েছে। সার্বিকভাবে আমার নামের প্রতি আমার তীব্র ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমেরিকাতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকার সময় আমি আমার নামটির সঠিক উচ্চারণ নিয়ে অনেকের অনেক ব্যঙ্গের ও ব্যর্থ চেষ্টার মুখোমুখি হয়েছি। সেটা এখনো নিয়মিতভাবে ঘটে, এবং তা সত্ত্বেও আমি অন্য আমেরিকানদের কখনো সুযোগ দিইনি এই ‘কঠিন’ উচ্চারণের নামটিকে একটি ছোট্ট ভার্শনের মাধ্যমে ডাকতে। এজন্য আমি গর্বিত যে, এত বছরে আমার এই দৃঢ়তা এবং সাহস ছিল—লোকেদের আমাকে ‘আনু’ বা ‘অ্যানি’ না বলতে দেওয়া। আমার নাম ‘আনুশে’। কীভাবে এটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তা শিখতে বা জিজ্ঞাসা করাটাকে সম্মানের একটি মৌলিক লক্ষণ এবং সাধারণ শালীনতা বলে আমি মনে করি।

যদিও আমি নিজের নামটি রক্ষার ব্যাপারে অনেক সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, তবে যখন আমাদের বাচ্চাদের নাম রাখার সময় আসে তখন আমার স্বামী ও আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আমাদের দুই কন্যার এমন নাম বেছে নিতে হবে—যা আমরা যে ধরনের বর্ণবাদী নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছি—তা থেকে যেন নামগুলো আমাদের বাচ্চাদের রক্ষা করে।

আসল কথা হলো, আমাদের সবারই নিজস্ব একটি ‘পারডু গল্প’ আছে। বিচিত্র ও ‘নৃতাত্ত্বিক’ শব্দযুক্ত নামগুলো নিয়ে লোকেদের উপহাস ও ব্যঙ্গ করা হয়েছে। এই কারণে পারডু হ্যারিসকে আক্রমণের মাধ্যমে এক অর্থে আমাদের মতো বিপুলসংখ্যক মানুষকেই আক্রমণ করেছেন। কারণ আমাদের নামগুলো আমাদের পরিচয়ের একটি মৌলিক অংশ। এই নামগুলো কেবল এটাই বলে না যে, আমরা কে? বরং আমরা কোথা থেকে এসেছি সেই গল্পটিও বলে দেয়। এমনকি তারা আমেরিকার গল্পও বলে।

স্পষ্টতই এই বর্ণবাদী খেলায় একটি বিষয় লক্ষ করা যায়, বিদেশি, অশ্বেতাঙ্গ ও কম আমেরিকান নামগুলোর ব্যাপারে। তবে কোন নামগুলো আমেরিকান আর কোনগুলো আমেরিকান নয়—সেই সিদ্ধান্ত কে নিতে পারে?

ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান সমর্থকরা যতটা আমাদের অতীতের আমেরিকাতে ফিরিয়ে নিতে চায় বলে মনে হচ্ছে, ততই তাদের পুরোনো বর্ণবাদ চিত্র প্রকাশ করছে। এই চিত্র এটাই বলছে, যে কোনো মূল্যে জিওপি (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি—রিপাবলিকান পার্টির ডাকনাম) নির্বাচনে জয়ের জন্য মরিয়া।

প্রিয় শ্বেতাঙ্গ মানব :সিনেটর কমলা হ্যারিসের নামটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে শিখুন। তিনি কোথাও চলে যাচ্ছেন না এবং তিনি আমেরিকায় অভিবাসীও নন।

(সিএনএন থেকে অনূদিত)

অনুবাদ :তাপস কুমার দত্ত

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত