গণমাধ্যম এবং সামন্তযুগের গোঁফওয়ালা প্রহরীগণ

গণমাধ্যম এবং সামন্তযুগের গোঁফওয়ালা প্রহরীগণ
প্রতীকী ছবি

পৃথিবীজুড়ে গণমাধ্যমের একটি শ্রেণি চরিত্র রয়েছে। অঞ্চলভেদে কখনো কখনো তা রূপ বদলায়, তবু মোটা দাগে এর কর্মকৌশল গত কয়েক দশকে খুব একটা বদলায়নি। কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে গণমাধ্যম কতটুকু ক্রিয়াশীল, তা অনেকাংশে নির্ভর করে রাষ্ট্রের শাসন পদ্ধতি এবং সেখানকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতখানি অগ্রসরমান তার ওপর। Mass media বা গণমাধ্যমের সক্রিয়তা কিংবা বিকাশের জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও সামজিক বিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামো। যে কাঠামো গণমানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রাম থেকে অনুসৃত হবে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্ব কিংবা সেই তত্ত্বের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমি দীর্ঘ সময় ধরে গণমাধ্যমের বিকাশকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, বঙ্গীয় সমাজে গণমাধ্যম তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়াতে না পারার পেছনে যতটা না রাষ্ট্র দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায় গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট কুশীলবদের। পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণমাধ্যমবিষয়ক গবেষকগণ অবশ্য শাসকগোষ্ঠীর সামন্তবাদী আচরণ কিংবা আমলাতন্ত্রকে দোষারোপের মধ্য দিয়ে প্রায়শই একধরনের উপসংহারে পৌঁছার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, রাষ্ট্র বরাবরই নিয়ন্ত্রণবাদী। যদিও রাষ্ট্রের অধিপতিগণ তা স্বীকার করতে চান না। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ অর্থনীতির ‘ফ্যালাসি’ তৈরি করে শাসকগোষ্ঠী নাগরিকদের এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। প্রাচীন গ্রিসে ক্ষমতাসীনদের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বা নীতিসমূহকে বিশেষায়িত বাগ্মিতার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে হিতকর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একধরনের উদ্যোগ ছিল। সেই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যারা বাস্তবায়ন করতেন, তাদের বলা হতো ‘সফিস্ট’। আজকের বাস্তবতায় একটি মর্মান্তিক সত্য হলো, আধুনিক গণমাধ্যম এখন সফিস্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা কোনো বিবেচনাতেই গণমানুষের ‘মাধ্যম’ হয়ে উঠতে পারেনি।

আমাদের রাষ্ট্র গত কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেছে অষ্টাদশ শতকে ফিরে যেতে; রাষ্ট্রের পাইকপেয়াদারা মিলে নিরন্তর চেষ্টায় নির্মাণ করেছে একটি সামন্তমনা ব্যবস্থা, যেখানে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট কুশীলবেরা প্রধানত দাস মানসিকতার হবে এবং কে কার থেকে উচ্চ স্তরের ‘সফিস্ট’ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে পারবে, সেটি নিয়ে একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হবে।

কেবল এ কারণে, আগেই বলেছি, আমাদের অঞ্চলে গণমাধ্যম তার নিজস্বতা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা যারা আশির দশকে বেড়ে উঠেছি, তাদের অনেকেরই মনে আছে, সেই সময়ে জনবুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলসমূহ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে উচ্চকিত ছিলেন। আজ এত বছর পরে এসে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশন কিংবা বেতারের সেই ‘ঘুণে ধরা’ সম্পাদকীয় নীতি না বদলালেও স্বায়ত্তশাসনের ঐ দাবি এখন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। সম্প্রচার সাংবাদিকতায় বিটিভির বিকল্প হিসেবে গোটা তিরিশেক বেসরকারি টিভি স্টেশন থাকলেও, দেখতে পাই, সেখানেও ‘সফিস্ট’রা তাদের মায়াজাল বিছিয়ে বসে আছে। যারা নীতিহীন-অযোগ্য-খ্যাতির কাঙালদের দেবতাজ্ঞানে প্রসাদ বিতরণ করে থাকেন। আমার ধারণা, একটি নিয়ন্ত্রণবাদী ব্যবস্থার ভেতরে থেকেও গণমাধ্যমগুলো তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে গণমানুষের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। এমনকি রাজনৈতিক সংকট কিংবা আগ্রাসনের বিপরীতে সোভিয়েত রাশিয়া এবং পৃথিবীর বহু দেশে আমরা সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটতে দেখেছি; খানিকটা নিভৃতেই। অথচ আমাদের অঞ্চলে গণমাধ্যমকর্মীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবলয়ের ভেতরে থাকার কারণে একধরনের পৌনঃপুনিকতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ফলে আধেয় বিবেচনায় ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এখন সম্প্রচারকর্মীদের নিয়তির সমান্তরাল বাস্তবতা, পরিবর্তনের আশা সেখানে দুরাশার সমার্থক।

পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং চ্যানেল হিসেবে বিবিসির পরিচালনা পদ্ধতি বা রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের জন্য একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত হতে পারত। কেননা, জনগণের লাইসেন্স ফি কিংবা ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত গণমাধ্যম যদি সরকারের একপেশে প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তানিশ্চিতভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোর বিষয়ে আসি। প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ আর তুলনামূলক বিচারে খানিকটা স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ কিংবা চর্চার সুযোগ থাকলেও আমাদের সম্প্রচার সাংবাদিকতা কোথায় যেন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে। নতুন ধারার ডিজিটাল মিডিয়ার এই জোয়ারের কালে পৃথিবী জুড়ে যখন সৃজনশীলতার জয়জয়কার, তখন আমাদের প্রথাগত সম্প্রচারমাধ্যমগুলো গণমাধ্যমকর্মীদের প্রাপ্য পারিশ্রমিকটুকু দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এই মিডিয়ায় গত দুই দশকে কতশত মেধাবী তরুণ-তরুণী হিমালয় সমান আশা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছে, সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে পালটে দিতে চেয়েছে মিডিয়ার সেকেলে সব প্রকরণকে। আমাদের দুর্ভাগ্য, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে মিডিয়ায় সেই অর্থে কোনো রোল মডেল তৈরি হয়নি; ভিন্নভাবে দেখলে আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র সত্যিকারের রোল মডেল তৈরিই হতে দেয়নি। তারুণ্যের কিংবা সম্ভাবনার কী বিপুল অপচয়!

আমার ঠিক জানা নেই, আমাদের দেশে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় একজন মানুষ সংবাদকর্মী বা গণমাধ্যমকর্মী হয়ে ওঠে। অন্য কথায়, আমি আসলেই বুঝতে চাই, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে একজন সাংবাদিক তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সময়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ একটি একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তখনো পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয় এতটা অগ্রসর চিন্তা নিয়ে উচ্চশিক্ষায় সাংবাদিকতাকে অন্তর্ভুক্ত করার সাহস দেখায়নি। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও সগর্বে ‘সাংবাদিকতা বিভাগ’ চালু করা হয়েছে; যার অর্থ প্রতিবছর একাডেমিক সেটিংয়ে শয়ে শয়ে গণমাধ্যম বিষয়ে জ্ঞানার্জনকারী গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। অথচ পরিতাপের বিষয়, কর্মক্ষেত্রে আমরা খুব কমই সেই অর্জিত জ্ঞান বা দক্ষতার প্রতিফলন দেখতে পাই। কেন এমনটা হয়? এর কারণ হলো, শুধু সাংবাদিকতার পাঠ্যসূচিতে মাথা গুঁজে বসে থাকলেই সাংবাদিক হিসেবে সার্থকতা মেলে না। আমি মনে করি, গণমাধ্যমের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সামন্তযুগের ‘গোঁফওয়ালা প্রহরীগণ’ নিজেদের সেকেলে জীবনাদর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজবীক্ষণের মায়াজাল থেকে যত দিন না তরুণদের চিন্তাজগেক ভারমুক্ত করবেন, তত দিন পর্যন্ত গণমাধ্যমের এই সামন্তমনা ‘শ্রেণিচরিত্র’ বদলানোর সুযোগ নেই।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সম্প্রচার সাংবাদিক, উপদেষ্টা সম্পাদক, ই-সাউথএশিয়া

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত