বৈষম্য হ্রাস না পেলে ঈর্ষণীয় জিডিপি দিয়ে কি হবে?

বৈষম্য হ্রাস না পেলে ঈর্ষণীয় জিডিপি দিয়ে কি হবে?
মো. মাহমুদ হাসান

কোভিডকালে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি যখন টালমাটাল অবস্থায়, দক্ষিন এশিয়ার ইমারজিং টাইগার বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। চল্লিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশী বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ নিয়ে নিঃসন্দেহে শক্ত ভিত্তির উপর দাড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। বৈদেশিক রেমিট্যান্সে ২% প্রণোদনাসহ নানাবিধ সহযোগী ফ্যাক্টর- এর প্রসারে কাজ করেছে দারুণভাবে। অতি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর তথ্যমতে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১৮৭৭ ডলার, প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৮ শতাংশ, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে, ভারত, জার্মানী, জাপানের মতো দেশের ও প্রবৃদ্ধি হবে ঋণাত্বক। প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর শীর্ষ তিন দেশের একটি, হেনরী কিসিঞ্জার যাকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন, জানিনা এমন সংবাদে বয়োবৃদ্ধ সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব কেমন বোধ করছেন, তবে যে গতিতে অগ্রসরমান, তা দেখে পশ্চিমের নিক্সনরা ঈর্ষায় চটপট করলেও শান্তিপ্রিয় বাংলার মানুষের মনে তুষের আগুন কেন?

অর্থনীতির সূচকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্য নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও প্রবৃদ্ধির সুফল নিয়ে আছে ব্যাপক মতানৈক্য। সতেরো কোটি জনসংখ্যার ছোট একটি দেশ অভ্যন্তরীণ আয়ের সমষ্টি কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে জিডিপির যে বিস্ময়কর অর্জন জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এর সুফল আপামর জনসাধারণ কতটুকুই বা ভোগ করছে তা বিশ্লেষণের দাবী রাখে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির গ্রাম বাংলার আপামর কৃষককূল উৎপাদিত ফসলকে বাজারজাত করে যেখানে বিনিয়োগকৃত অর্থই তুলে আনতে পারে না, এক মন ধান বিক্রির টাকা দিয়ে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে হয়, চার কেজি পেয়াজ কিনতে এক মন ধান বিক্রি করতে হয়, বছর ঘুরে জমি বিক্রি বা বন্ধক না দিলে পরবর্তী ফসলের জন্য বিনিয়োগের টাকা যোগাড় হয় না, কৃষক কূল কে এমন দুঃসহ পরিস্থিতিতে রেখে জিডিপি আর প্রবৃদ্ধির উলম্পনে লাভ কি হবে?

সতেরো কোটি মানুষের দেশে মাত্র সতেরো লাখ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী, শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় বেতন ভাতা আর সুযোগ সুবিধায় তারা এখন আগের মতো হাহাকারী দৈন্যতায় নেই, তবু্ও কিছু সংখ্যক লোকের ব্যাংক হিসেবে শত শত কোটি টাকার পাহাড়, গাড়ি, বাড়ি অট্টালিকায় এলাহী কাজ কারবার। নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ প্রায় শুন্যের কোটায়, নামে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ আর ব্যাংকের হিসেবে বেহিসেবী তারল্য এমন ব্যাবসায়ীদের সংখ্যা ও সর্ব সাকুল্যে মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের বেশী হবে না, সব মিলিয়ে দশ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের নব্বই শতাংশ সম্পদ থাকলে সুষম উন্নয়ন সম্ভব হবে কি? দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, " আমি হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেই,আর উইপোকারা সম্পদের পাহাড় গড়ে" তাতে বুঝতে কি বাকী থাকে, জিডিপির খেলায় সাধারণ মানুষের কি ত্রাহি সংকুল অবস্থা। ঢাকা দক্ষিণে মেয়র তাপস উইপোকা দমনে যে শক্ত প্রতিশ্রুতিতে অগ্রসরমান এমন পদক্ষেপ সর্বজনিন নয় কেন?

একটি কল্যাণমূখী রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার এখনি তো শ্রেষ্ঠ সময়। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় দেশের অগ্রগতি অনেক, একে আরও দ্রুতগামী করে দেশের সব প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও আয়ের উৎসকে একটি সার্বজনীন কর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে সমস্যা কোথায়? কল্যাণমূখী মানবিক রাষ্ট্রের আদলে একটি শক্ত কর ব্যবস্থাপনাই একদিকে যেমন দূর্নীতি নিয়ন্ত্রণে মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে, পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির সুবিধা ভোগ করে দরিদ্র, ভূমিহীন, আর নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রিয় আনুকুল্যে উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে । এক্ষেত্রে ব্যক্তির অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদ কে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়ার আগাম ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি থাকলে এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্পে এগিয়ে গেলে সাফল্য তো অবধারিত।

বছর বছর ব্যাংকিং খাতের অবলোপনের অসৎ সুবিধাভোগী, উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয়ের সাথে বাস্তব ব্যয়ের আকাশ পাতাল তফাৎ সৃষ্টিকারী কতিপয় আমলা, আর জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই নগন্য সংখ্যক দূর্নীতিবাজ ছাড়া সবাই তো এমন পদক্ষেপে অভিনন্দন জানাবে,তবে আর দেরী কেন? পদক্ষেপটি লুঠেরা সিন্ডিকেটের প্রতিরোধের মুখে পড়লেও বঙ্গবন্ধু কন্যার দৃঢ়তায় সহজেই তা উতরে যাবে।

নারীর ক্ষমতায়ন, বয়স্ক ভাতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার রোধে ভারতকে ছাড়িয়ে গেলে ও আত্ম অহমিকায় না ভোগে এসব সেক্টরের কর্ম পরিধিকে আরও দ্রুততর করতে হবে। চমকপ্রদ জিডিপি আর অব্যাহত প্রবৃদ্ধির সাথে নৈতিক অবক্ষয় যেন প্রতিযোগীতায় নেমেছে। ক্ষয়িষ্ণু নৈতিক মূল্যবোধ আর দূর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে টেকসই সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে কি? বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে সর্বোচ্চ ১০% মানুষের অব্যাহত সমৃদ্ধি লুঠেরা মনে প্রশান্তি আনলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে হতাশায় নিমজ্জিত করবে, অনৈতিকতা আর লোভাতুর মানসিকতায় মানবতা হবে বিপর্যস্ত, জাতির জনকের আমৃত্যু লালিত বাসনা একটি সুখী, সুন্দর, বৈষম্যহীন অর্থনীতির সোনার বাংলা হবে সূদুর পরাহত।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত