গণ-আন্দোলন হাইজ্যাক করে লাভ হয় কার?

গণ-আন্দোলন হাইজ্যাক করে লাভ হয় কার?
গণ-আন্দোলন হাইজ্যাক করে লাভ হয় কার?

গত সপ্তাহে লন্ডনের একটি ব্রডশিট বাংলা সাপ্তাহিকের প্রথম পৃষ্ঠায় বিরাট হেডিংয়ে প্রকাশিত লিড নিউজ দেখে চমকে উঠেছিলাম। খবরের হেডিংগুলো হলো :ধর্ষণবিরোধী লংমার্চে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলা, সারা দেশে বিক্ষোভ, রাজপথ রেলপথ অবরোধের ঘোষণা, সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি।

খবরের এই হেডিংগুলো চোখে পড়ায় চমকে উঠেছিলাম এজন্য যে ঢাকায় এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে আর আমি তা জানি না! রোজ আমি টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে দেশের খবর দেখি। এক সাংবাদিক বন্ধু আছেন ঢাকায় এবং আরেক বন্ধু আছেন ভিয়েনায়, তারা রোজ আমাকে দেশের সব খবর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানান। আমি এসব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে দেশের এত বড় খবর জানতে পারিনি, তা কেমন করে হলো?

লন্ডনের কাগজের খবরের হেডিং পড়া শেষ করে ভেতরের খবরটা পড়তেই আমার চমক দূর হলো। দুটি ঘটনাই মাইজদী ও ফেনীর। ধর্ষণবিরোধী ছোট সমাবেশে অচেনা যুবকেরা হামলা করেছে। পুলিশ হাঙ্গামা থামাতে মৃদু লাঠি চালনা করেছে। এই খবর ঢাকার সংবাদ মিডিয়ায় কোনো গুরুত্ব পায়নি। মফস্সল সংবাদ হিসেবে ট্রিটেড হয়েছে। কারণ এই বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল ছোটখাটো ধরনের। তাতে হামলাও হয়েছে ছোটখাটো ধরনের। দেশের জাতীয় দৈনিকে যে খবর গুরুত্ব পায়নি, সেই খবর লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিক বিরাট হেডিংয়ে এমনভাবে ছেপেছে, যাতে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মনে হতে পারে দেশের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে এমনই বিক্ষুব্ধ যে দেশব্যাপী তাদের বিক্ষোভে সরকারের অবস্থা বুঝি যায় যায়।

দেশে দশ-পাঁচ জন নিয়ে একটি সমাবেশ করে বিদেশে বাংলাদেশিদের কাছে তাকে বিশাল সমাবেশ বলে চালানো বিএনপি-জামায়াতের একটি পুরোনো কৌশল। এবারও দেশে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলন বলে দেশ-বিদেশে প্রচার চালাতে তারা নানা অপচেষ্টা করেছে। লন্ডনের সাপ্তাহিকটির বিরাট হেডিংয়ের খবর তারই একটি উদাহরণ। পত্রিকাটির মালিকানায়ও সংযুক্ত রয়েছেন বিএনপির এক সাবেক প্রবাসী নেতা।

লন্ডনের সাপ্তাহিক কাগজটির ভেতরের অংশ পাঠ করলেই যে কোনো পাঠক বুঝতে পারবেন, মাইজদী ও ফেনীর তথাকথিত বিক্ষোভ সমাবেশ ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের আড়ালে বিএনপি-জামায়াতিদের সরকারবিরোধী সমাবেশ। সেজন্যই এই সমাবেশে সাধারণ মানুষ আসেনি এবং সহজেই তারা হামলার শিকার হয়েছে। বিশাল সমাবেশে হামলাকারীরা, তারা যে দলেরই হোক, হামলা চালাতে সাহস করে না।

লংমার্চে বক্তাদের কী ধরনের বক্তব্য ছিল তা দেখা যাক। লন্ডনের পত্রিকাতেই বলা হয়েছে, বক্তারা বলেছেন, ‘এই সরকার ধর্ষকদের লালন-পালন করছে। যারা ধর্ষকদের লালন করছে, তাদের বিচার চাই।’ এটা সাম্প্রতিক ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও জনসমাবেশের বক্তব্য ছিল না। সমাবেশের বক্তব্য ছিল, ‘দেশে ধর্ষণ বন্ধ করতে ব্যর্থতার নিন্দা এবং ধর্ষকদের জন্য বিচারে চরম শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করার দাবি। সরকার জনগণের এই দাবি সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছে। দেশের বড় বড় মানববন্ধন, সভা-সমাবেশগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে।

এসব সভা-সমাবেশও হাইজ্যাক করে বিএনপি-জামায়াত সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করেছিল। ‘সরকারের পদত্যাগ চাই’ বলে স্লোগান তোলার প্রয়াস চালিয়েছিল। তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। লন্ডনের পত্রিকায় মাইজদী ও ফেনীর হাতে গোনা মানুষের সমাবেশে যে বক্তব্য শোনা গেছে, তা বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি। সাধারণ মানুষের বক্তব্য বা দাবি নয়। সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে অসন্তোষ ও ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু তা সরকার পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়েছে তার কোনো প্রমাণ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, বাম ও ডান দুই পক্ষের দলগুলোই নিজেদের শক্তি ও জনপ্রিয়তার জোরে কোনো গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে নিজেদের দাবি আদায় করতে চায়নি অথবা পারেনি। তারা অন্য দল কর্তৃক অন্য ইস্যুতে গড়ে ওঠা আন্দোলন হাইজ্যাক করে নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছে এবং লজ্জাকরভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

বাম তরফের ভ্রান্তির দুটো উদাহরণ দেব। বিএনপি-জামায়াতের আমলে যখন ধরা পড়ল, খালেদা জিয়ার সরকার একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার বদলে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগ দিতে চান, তখন প্রধানত আওয়ামী লীগের নেপথ্য উদ্যোগে ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলন গড়ে ওঠে। শেখ হাসিনা এই আন্দোলন সর্বদলীয়, সর্বমতের মানুষের করার জন্য দলের নির্দলীয় সভানেত্রী হিসেবে বেগম সুফিয়া কামালের নাম প্রস্তাব করেন। বেগম সুফিয়া কামাল নিজের কাজের ব্যস্ততার জন্য এই দায়িত্ব গ্রহণে তার অক্ষমতা জানালে শেখ হাসিনা বেগম সুফিয়া কামালকেই এই সভানেত্রী মনোনয়নের দায়িত্ব দেন। বেগম সুফিয়া কামালের অনুরোধে শহিদজননী জাহানারা ইমাম এই সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবদুর রাজ্জাক এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা হন। দেশে একাত্তরের ঘতক-দালাল নির্মূল আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে। কয়েক লাখ লোকের সমাবেশে ঢাকায় গণ-আদালত বসে এবং গোলাম আজম গংকে প্রতীকী মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।

ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখে তখনকার চীনপন্থি কিছু যুবনেতার সম্ভবত মনে হলো এই তো সুযোগ! এই বিশাল গণ-আন্দোলন হাইজ্যাক করতে পারলে যুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের জনধিকৃত ভূমিকা তারা ঢাকতে পারবেন। আবার জনতার বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। চাই কি, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলে আওয়ামী লীগ দল ও আওয়ামী লীগ সরকারকে নিপাত করতে পারবেন। এই উদ্দেশ্যে ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনে তাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয় এবং খুবই গোপনে বেগম জাহানারা ইমামকে তার অজ্ঞাতে শেখ হাসিনার বিকল্প জাতীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

জাহানারা ইমাম ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির পরিচালনার ব্যাপারে শেখ হাসিনার উপদেশ নিতেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন একদল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপরায়ণ ব্যক্তি তাকে শেখ হাসিনার বিকল্প নেত্রী হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ এবং নির্মূল আন্দোলনে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন তিনি অত্যন্ত ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি আমাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি তো রাজনৈতিক নেত্রী নই। এরা আমাকে তাদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং আমাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দুর্বল করে ফেলছে। আমি অসুস্থ। বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করব ভেবে উঠতে পারছি না।’ জাহানারা ইমাম ক্যানসার রোগে ভুগছিলেন। তখন তার শেষ অবস্থা। জার্মানিতে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সমর্থকদের এক সম্মেলন হয়েছিল। আমেরিকায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও জার্মানিতে এই সম্মেলনে তিনি আসতে চেয়েছিলেন। তার সঙ্গে দেখা হবে ভেবে আমিও এই সম্মেলনে গিয়েছিলাম। কিন্তু অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি সম্মেলনে আসতে পারেননি। তারপর মারা যান।

ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনে তখনই ভাঙন ধরে। সেই গণসমুদ্র তৈরির ক্ষমতা আর এই আন্দোলনের ছিল না। শাহরিয়ার কবির ও তার বন্ধুদের মতো কিছু নিবেদিতপ্রাণ, আদর্শবান নেতা এই আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছেন এবং ঘাতক-দালালদের বিচার ও শাস্তি বিধানে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন।

পরবর্তীকালে একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও মানবতার শত্রুদের বিচারে মৃত্যুদণ্ডদান এবং তা কার্যকর করার দাবিতে বিশাল গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তৈরি হয় সব দলের, সব মতের তরুণদের নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ। শাহবাগে দিনের পর দিন লাখ লাখ লোকের সমাবেশ চলতে থাকে। এই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পূর্ণ সমর্থন দিতে থাকে। এবার এই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা চালায় সিপিবি। এককালের শক্তিমান যে দলটি ভাঙতে ভাঙতে এখন তলাফুটো নৌকা, তারা চাইল এই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করে খুব চাতুর্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ জানাতে।

গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে ইমরান নামের এক তরুণ নেতা আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই নির্দলীয় ইমরানের মধ্যে আমি ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার আভাস পেয়ে তাকে আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছিলাম। তাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন জাফর ইকবালের মতো দলনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ ও ড. বারাকাতের মতো গণ-অর্থনীতিবিদ। দেশের তরুণদের এক বিশাল অংশের সমর্থন ছিল ইমরানের পেছনে।

কিন্তু সিপিবির নেতারা নেপথ্যে বসে কলকাঠি নাড়ালেন। ইমরানের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন, তিনি এখনই ‘জনগণমন অধিনায়ক’ হয়ে গেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন, শাহবাগ সমাবেশে জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্লোগান দিয়েছে ‘জয় বাংলা’। সেটা বন্ধ করতে না পেরে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ একটি দলীয় স্লোগান—এই বিতর্ক সৃষ্টি করে স্লোগানটি দেওয়া এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সমাবেশে প্রদর্শন বন্ধ করার চেষ্টা হয়। এ সবই করা হয়েছিল আন্দোলনকে দলনিরপেক্ষ রাখার নামে। ধীরে ধীরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ আন্দোলন থেকে সরে যায়। মঞ্চে ভাঙন ধরে।

গণজাগরণ মঞ্চের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হেফাজতি সমাবেশ গড়ে ওঠে। তারা বিএনপি, জামায়াত ও এরশাদের জাতীয় পার্টির সমর্থন পেয়ে শাপলা চত্বরে মাদ্রাসাছাত্রদের বিশাল সমাবেশ ঘটায়। গণজাগরণ মঞ্চ তখন এমনই দুর্বল যে হেফাজতিদের হামলা থেকে মঞ্চ ও নেতাদের বাঁচানোর জন্য পুলিশকে মাঠে নামতে হয়। সিপিবিও এই হামলা থেকে রেহাই পায়নি। হেফাজতিরা সিপিবির কেন্দ্রীয় অফিসেও হামলা চালিয়েছিল এবং দলের নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের গাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছে। সিপিবি এই হামলা প্রতিরোধ করতে পারেনি। কমরেড সেলিম পরে অভিযোগ করেছেন, পুলিশ কেন তার গাড়িটি রক্ষা করেনি?

বর্তমানে করোনা ভাইরাসের বিস্তার এবং নারী ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার মতো জাতীয় সংকটের সময়েও দেখা গেল যে এজাতীয় সংকট রোধে সরকারকে সহযোগিতা দিয়ে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে দুটি সংকটকেই দলীয় ইস্যু করার চেষ্টা এবং ধর্ষণবিরোধী যে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন দেশে গড়ে উঠেছে, তাকে হাইজ্যাক করে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তর করার চেষ্টা চালানো। আর তা না পারলে এই আন্দোলনে সরকারবিরোধিতার মিথ্যা রং লাগিয়ে তা প্রচার করা। লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিকে তা-ই করা হয়েছে।

এভাবে গণ-আন্দোলন অসাধু উদ্দেশ্যে হাইজ্যাক করার পরিণতি, যে উদ্দেশ্যে আন্দোলনটি গড়ে ওঠে, তা ব্যর্থ হয় এবং যারা আন্দোলনকে হাইজ্যাক করেন তারাও ব্যর্থতার গ্লানি বহন করেন এবং জনসমক্ষে ধরা পড়েন। যে গণজাগরণ মঞ্চ ভবিষ্যতে দেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারত, সেই সম্ভাবনাও ধ্বংস হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত