ঘুরে দাঁড়াবে পোশাকশিল্প?

ঘুরে দাঁড়াবে পোশাকশিল্প?
ঘুরে দাঁড়াবে পোশাকশিল্প?

কোনো দেশের জনগণের মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উত্পাদন, শিল্পায়নের স্তর, বিস্তৃত অবকাঠামোর বিন্যাস এবং সাধারণ জীবনযাত্রার মানই হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি। একটি দেশের শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বিকাশ লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট বোঝা যায় সে দেশ কতটা উন্নত। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী শিল্প হলো তৈরি পোশাকশিল্প।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত পোশাকশিল্প, যা সুবিন্যস্ত কারখানায় বৃহদায়তনে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্পাদন

বহির্বিশ্বের বাজার স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। অতি দ্রুতই খাতটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। বর্তমানে মোট শিল্প খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ৩৩ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত।

বছরের শুরুতেই রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় পোশাকশিল্প রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে চলে যায়। ভিয়েতনাম চলে আসে দ্বিতীয় স্থানে। এর আগে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম পোশাক রপ্তানির প্রতিযোগিতায় প্রায় কাছাকাছি ছিল, কিন্তু দুই দেশের কাজের ধরন ও পরিবেশ ছিল ভিন্ন।

বাংলাদেশ মূলত প্রতিযোগিতা করে কম মূল্যে পোশাক রপ্তানি করে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম উচ্চমূল্যে। এ ছাড়া বেশ দক্ষ শ্রমশক্তিও রয়েছে তাদের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে। শ্রমিক আন্দোলন ও মালিক-শ্রমিক বিপরীতমুখী ভূমিকা পালন করার কারণে মাঝেমধ্যেই কারখানা বন্ধের খবর পাওয়া যায়। এছাড়া নিম্ন মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে কাজের পরিবেশের জন্য শ্রমিক অসন্তোষ বিরাজ করে। তবে আশা করা যায়, অতিদ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান নিশ্চিত করলে আবার পূর্বের অবস্থা ফিরে পাবে বাংলাদেশ।

করোনা মহামারিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় রপ্তানি আদেশ হারিয়ে বন্ধ হওয়ার মুখে ছিল কয়েক হাজার ছোট-বড় পোশাক কারখানা। চুক্তির শর্ত দেখিয়ে চলতি বছর একের পর এক রপ্তানি আদেশ স্থগিত করে বৈদেশিক ক্রেতারা? বিজিএমইএর হিসাবে, তিন শতাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩১৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ স্থগিত হয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এছাড়া ৪৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কমে গেছে ২৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড হয়েছিল ৪০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ পোশাকশিল্প খাতের এই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২৫ মার্চ রপ্তানিকারকদের ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার? করোনার জন্য ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি চলার পর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় সরকার। ফলে অর্থনীতির চাকায় কিছুটা গতি সঞ্চার হয়। তারও অনেক আগেই পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়ায় সরকারঘোষিত প্রণোদনার স্বল্প সুদের ঋণের সুবিধা নিয়ে কাজ শুরু করতে পেরেছেন গার্মেন্টস মালিকেরা। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রপ্তানির পরিমাণ পূর্বের তুলনায় বেড়েছে।

করোনা মহামারির লোকসান কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের পোশাকশিল্প। বড় ব্র্যান্ডগুলো স্থগিত ও বাতিল করা ক্রয় আদেশের পণ্য আবার নিতে শুরু করেছে। সব স্থবিরতা কাটিয়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আগেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সচল হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন বাজার, নতুন করে বাড়ছে রপ্তানি আদেশও। এ ধারা বজায় থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই পোশাক খাত আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। করোনা মহামারির জন্য এ বছর রপ্তানি আয় কমে গেলেও যদি অতি দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও উত্পাদন এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়, তবে বস্ত্র খাতে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত