অ্যান্টিবডি-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন ও তথ্যবিভ্রাট প্রসঙ্গে

অ্যান্টিবডি-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন ও তথ্যবিভ্রাট প্রসঙ্গে
অ্যান্টিবডি-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন ও তথ্যবিভ্রাট প্রসঙ্গে

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে কয়েক দিন আগে আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআরবি,র সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে যে তথ্যবিভ্রাট হয়েছে, একজন গবেষক হিসেবে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তারা যে পরীক্ষাটি করেছেন তা হলো ঢাকা শহরে ‘বাসায় থাকা ও বস্তিতে থাকা’ মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শতকরা কতজনের করোনা ভাইরাসের বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।

তারা ঢাকা শহরের ৩ হাজার ২২৭টি বাসাবাড়ি থেকে ৫৫৩ জন কোভিড-১৯-এর লক্ষণযুক্ত এবং ৮১৭ জন লক্ষণহীন মানুষকে শনাক্ত করেছেন। এদের মধ্যে থেকে ৩৩৩ লক্ষণযুক্ত এবং ৩৫৯ জন লক্ষণহীন মানুষের রক্তে করোনা ভাইরাসের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করেছেন। একইভাবে তারা বস্তিতে গিয়ে সেখান থেকে ৯৬ জন লক্ষণযুক্ত এবং ৩২৪ জন লক্ষণহীন মানুষকে শনাক্ত করেন, তাদের মধ্যে থেকে যথাক্রমে ৩৬ এবং ৮৯ জন মানুষের রক্তে অ্যান্টিবডি দেখেছেন।

এই পরীক্ষা থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, বাসায় থাকা শহুরে মানুষের মধ্যে ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরেই করোনার অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা গেছে। আর বস্তিতে থাকা ৭৪ শতাংশ মানুষের শরীরে পাওয়া গেছে করোনার অ্যান্টিবডি। এখানে উল্লেখ্য যে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা, কাজেই এখানে করোনা রোগী টেস্টের মাধ্যমে আগেই শনাক্ত করা জরুরি ছিল না। সুতরাং তারা এসব মানুষের পিসিআর রিপোর্ট আছে কি নেই—তা তারা আমলে নেননি, আমলে নিয়েছেন তাদের জ্বর সর্দি কাশি ছিল কি না।

তারা গত ১২ অক্টোবর যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তার থেকে আমরা কী জানতে পারি? ১) প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বস্তিবাসী মানুষের মধ্যে করোনা অ্যান্টিবডি শনাক্তের হার বাসাবাড়িতে থাকা মানুষের থেকে বেশি। ২) বস্তিবাসীদের মধ্যে আইজিজির পরিমাণ বাসাবাড়িতে থাকা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু কেন বেশি তা জানতে আরো বিশ্লেষণ এবং গবেষণা প্রয়োজন। ৩) একটি বিশালসংখ্যক শহুরে ও বস্তিবাসী মানুষের রক্তে অ্যান্টিবডি নির্ণয় করা গেছে, কাজেই ধারণা করা যায়, শিগিগরই তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও তৈরি হওয়া এই অ্যান্টিবডি কতদিন তাদের করোনামুক্ত রাখবে, তা এই সমীক্ষার থেকে বলা যায় না। ৪) এই গবেষণায় অ্যান্টিবডি শনাক্তের যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রচলিত প্রদ্ধতির থেকে একটু আলাদা এবং তা তাদের ল্যাবেই তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে হওয়া এই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাস-সংক্রান্ত আরো মাঠপর্যায়ের গবেষণা, ভ্যাকসিনের কার্যকরী প্রয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। এই একই গবেষণা যদি আরো বিস্তৃত পরিসরে করা যায়, তাহলেই তা ঢাকা শহরের মানুষের করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্তের আসল চিত্র তুলে ধরতে পারবে। তারা আরো বলেছেন, তারা ৬৭ জন মানুষের ভাইরাস জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন। এই জিনোম সিকোয়েন্স থেকে তারা দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস অন্যান্য দেশের মূল কয়েকটি করোনা ভাইরাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

এই খবরটিও ভ্যাকসিন আসার আগেই জানা জরুরি ছিল, ‘বাংলাদেশের করোনা ভাইরাস দ্রুত মিউটেশন করেছে’ এরকম গুজবকে উড়িয়ে দিয়ে এই গবেষণাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা অন্যান্য দেশের মতোই হবে। আইইডিসিআর তাদের দৈনন্দিন রুটিন কাজের সঙ্গে সঙ্গে সীমিত সক্ষমতার মধ্যে আইসিডিডিআর,বি-এর সহযোগিতায় যে উঁচুদরের গবেষণা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের মানুষের উচিত তাকে সাধুবাদ জানানো। সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দক্ষ সাংবাদিক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

(ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড থেকে)

লেখক : এমবিবিএস, এমপিএইচ, পিএইচডি

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত