দুই মিত্রের লড়াই অস্বস্তিতে মস্কো

দুই মিত্রের লড়াই অস্বস্তিতে মস্কো
দুই মিত্রের লড়াই অস্বস্তিতে মস্কো।

ককেশাস অঞ্চলে নিজের দুই মিত্রদেশ আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের সূচনায় কিছুটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে মস্কো। উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ককেশাস অঞ্চলের দুই প্রতিবেশী আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান উভয়ের সঙ্গেই রয়েছে রাশিয়ার সুসম্পর্ক। মস্কোর নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামে যুদ্ধরত দুই দেশের রয়েছে জোরালো অংশীদারিত্ব। মূলত রাশিয়াকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের রাজনৈতিক পরিক্রমা। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া উভয়েই। ফলে নিজ দুই মিত্রের চলমান লড়াই থামানো রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে রাশিয়ার জন্য। যদিও আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সার্বভৌম বিরোধ নতুন কিছু নয়। সোভিয়েত আমল কিংবা তত্পরবর্তী সময় থেকেই দুই দেশের ভৌগোলিক বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে নাগরনো ও কারাবাখ অঞ্চল। আর্মেনিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন নাগরনো-কারাবাখের সার্বভৌমত্বের অপর দাবিদার আজারবাইজান।

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সময় নাগরনো-কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান প্রথম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে সেখানে কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিতর্কিত নাগরনো-কারাবাখসহ নিজের সাতটি প্রসাশনিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারায় আজারবাইজান। এর পরও উভয় দেশের মধ্যে থেমে থেমে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, রক্তপাত হলেও একধরনের স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। এই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। ঐ দিন দুই দেশের সেনাবাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে গুলি, মর্টার হামলা শুরু করলে সর্বশেষ যুদ্ধের সূচনা হয়। এই পর্যায়ে আজারবাইজানের পক্ষে তুরস্কের দৃঢ় অবস্থান যুদ্ধের গতিপথ পালটে দেয়। এই সূূত্র ধরে যুদ্ধ আরেকটু বিস্তৃতি হলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউরোপ যুদ্ধরত উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু উভয় পক্ষই সংযত হওয়ার পরিবর্তে আরো মারমুখী হয়ে ওঠে। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের আর্টিলারি ডিভিশনের ধারাবাহিক পালটাপালটি আক্রমণের মুখে বাড়তে থাকে হতাহতের সংখ্যা। শিগিগর ঐ অঞ্চলের জনজীবনে নেমে আসে মানবিক বিপর্যয়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন যুগসূত্র থাকায় এই গোলযোগ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা তুরস্কের সহায়তায় এখানে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ করে আর্মেনিয়া। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাশিয়া, চীন, ইরানসহ অন্যান্য দেশ। এরকম অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। ঐ টেলিফোন সংলাপে পুতিন দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার অনুরোধ করেন। রুশ প্রেসিডেন্টের ডাকে তাত্ক্ষণিক সাড়া দিয়ে দুই দফায় উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা হাজির হন মস্কোতে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভের মধ্যস্থতায় প্রথম বৈঠকে একটানা ১০ ঘণ্টা আলোচনা শেষে রাত ৩টায় রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। কিন্তু উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রাখে। এরপর আরেক দফায় মস্কোতে উভয় দেশের নেতারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চলের বিক্ষিপ্ত সংঘাত একেবারে বন্ধ হয়নি। মস্কোয় স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি না ঘটায় আমেরিকার সঙ্গে উভয় দেশ আলোচনায় বসে। ওয়াশিংটন আলোচনা শেষে আরেকটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আমরা লক্ষ করেছি। কিন্তু এখনো পরিস্থিতির বড়সড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

কিন্তু এই যুদ্ধ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে নানান শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আজারবাইজানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তুরস্কের ভূমিকা ছিল মারাত্মক উসকানিপ্রবণ। সর্বশেষ মস্কোর মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যত্ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে আংকারা। এছাড়া আর্মেনীয়দের ব্যাপারে নানা ধরনের আপত্তিকর মন্তব্যের মাধ্যমে আংকারার মনোভাব স্পষ্টভাবে যুদ্ধকে প্রলম্বিত করার ইঙ্গিতপূর্ণ। এই বাস্তবতার আলোকেই নাগরনো-কারাবাখ সর্বশেষ যুদ্ধের জন্য তুরস্ককে নানাভাবে অভিযুক্ত করছে আর্মেনিয়া। এদিকে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার এই যুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত মিলিটারি বাফারে পরিণত হয়েছিল ইরান। গত ২৭ সেপ্টেম্বর আজারি ও আর্মেনীয় সেনাদের মধ্যে গুলিবিনিময় শুরু হওয়ার পর বেশ কয়েকটি মর্টার শেল এসে পড়ে ইরানের বিরান এলাকায়। সর্বশেষ এক দিনে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও মর্টার ইরানে আঘাত হেনেছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরান যুদ্ধরত দুই পক্ষকে কড়াভাবে সতর্ক করে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ইরানের সঙ্গে সীমানা সংযুক্ত আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান উভয় দেশের সঙ্গেই তেহরানের সম্পর্ক ভালো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধের ক্ষত আঞ্চলিক পর্যায়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে? এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ককেশাস অঞ্চলে মস্কোর একক আধিপত্যের কোনো ব্যত্যয় হবে কিনা।

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দ্রুতই আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছে মস্কো। কিন্তু পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় আলোচনার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার সুযোগ নিতে চাইবে অনেকেই। বিশেষত ন্যাটো ও তুরস্কের সুপ্ত ইচ্ছায় আজারবাইজানকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে পরিস্থিতি অন্যদিকে টেনে নেওয়া। সম্ভবত ন্যাটোর এই মনোভাব উপলব্ধি করে রাশিয়া সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব এনেছে। এতে করে নাগরনো-কারাবাখের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সামরিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সমস্ত সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব হবে। যে কোনো ধরনের উসকানিমূলক তত্পরতায় যুদ্ধের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে ব্যাপারে বাস্তবিক ভূমিকা গ্রহণ করা হবে সহজ। এসংক্রান্ত একটি উদাহরণ হতে পারে আর্মেনিয়া, তুরস্ক, ইরান সীমান্তের একটি বিশেষ এলাকা; যেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার রুশ সীমান্তরক্ষী ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন। মূলত সীমান্তে সব ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই রুশ সেনাদের মূল লক্ষ্য। তাই আন্তঃককেশাস রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বৃহত্তর স্বার্থ নির্বিঘ্ন রাখতে নাগরনো-কারাবাখ নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর রুশ সীমান্তরক্ষীবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবটি দুই পক্ষ মেনে নেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এমনটি হলে নাগরনো-কারাবাখসংক্রান্ত আজারবাইজান-আর্মেনিয়া বিরোধ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে এখানের সামরিক উসকানি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে করে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সংশ্লিষ্টতায় যুদ্ধ বিস্তৃতির শঙ্কাও রীতিমতো কমে আসবে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যত্ পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। এক্ষেত্রে মস্কোর পরবর্তী করণীয় কী হয়, সেদিকে লক্ষ রাখাই বাঞ্ছনীয় হবে।

ককেশাস অঞ্চলের এই অস্থিতিশীলতার কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ নিজের নিরপেক্ষ ভূমিকার মাধ্যমে কিছুটা লাঘব করেছে রাশিয়া। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের ইতি টানার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা। এই পর্যায়ে উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখার মতো কঠিন কাজটি আপাতত সম্ভব করেছে তারা। যদিও আজারবাইজানের অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। আজারবাইজান সরকার যেন পশ্চিমা কিংবা তুরস্কের ইন্ধনে আবার যুদ্ধের শঙ্কা না জাগায়, সে ব্যাপারে রাশিয়াও সতর্ক আছে। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আংকারার বিতর্কিত ভূমিকা। এদিকে এই বিবাদে আংকারার সঙ্গে মস্কোর মৌলিক মতপ্রার্থক্যের বিষয়টি প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে তুরস্ক কখনোই রাশিয়ার কৌশলগত মিত্র ছিল না—এ কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে হয়েছে মস্কোকে। সবশেষে বলা যায়, তুরস্কের ভূমিকাকে ছেঁটে ফেলা সম্ভব হলে ককেশাস অঞ্চলে আপাতত যুদ্ধের বিস্তার ঘটবে না। অন্যদিকে সতর্ক রাশিয়া তুরস্ককে নিজের ভূরাজনৈতিক আধিপত্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করার সুযোগ দেবে না, যে কারণে নাগরনো-কারাবাখ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার যে চ্যালেঞ্জ, তা রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক আধিপত্যকে এলোমেলো করে দিতে পারে। যে প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাদের প্রক্সিযুদ্ধের ময়দান হয়ে উঠতে পারে নাগরনো-কারাবাখ। আরেকটু সময় গেলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত