ধর্মীয় অনুশাসন আইনের এক সহায়ক শক্তি

ধর্মীয় অনুশাসন আইনের এক সহায়ক শক্তি
প্রতীকী ছবি

সব ধর্মের মূলেই রয়েছে মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণের কথা, সত্যের পথে চলা, অন্যায়-অত্যাচার হতে বিরত থাকা, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নানা বিধিনিষেধসহ পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নির্দেশনা। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে মানুষের মধ্যে যেন ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মচর্চার আগ্রহ আগের মাত্রায়নেই। বর্তমান সমাজে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষাকে তেমন গুরুত্ব দিতে চায় না। তারা শুধু আইন দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলেন। কিন্তু সমাজের অপরাধচিত্র, আর মানুষে মানুষে পারস্পরিক বিরোধ-বিদ্বেষ-বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্কই বলে দেয় ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তা।

সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য সমাজে প্রতিনিয়ত পাপাচার, ব্যভিচার, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতিসহ এহেন কোনো অপরাধ নেই যা সংঘটিত হচ্ছে না। মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মানবতা এবং মানবিকতার জায়গাগুলো দখল করে নিচ্ছে চরম স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতায়। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আইনের সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা অপরিহার্য।

২০১৯ সালের পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে সর্বমোট সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮৪টি। এর মধ্যে হত্যা ৩৫১, নারী ও শিশুনির্যাতন ১ হাজার ১৩৯, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ ৯ হাজার ৬৯, চুরি-ডাকাতি-লুণ্ঠন ৭৬৮ এবং অন্যান্য অপরাধ ৬ হাজার ১৫৭। ধর্মপ্রাণ মানুষের কতজন এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সমাজের চোখে এদের সংখ্যা নগণ্য। মাদকদ্রব্য সেবন, মদ-জুয়ার আড্ডা, চুরি-ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ ইত্যাদি অপরাধসমূহের সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মচর্চায় নিয়োজিতদের জড়িত হতে সাধারণত দেখা যায় না। তবে ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই রয়েছে। তাছাড়া, ধর্মগুরু, ইমাম-মুয়াজ্জিন, আলেম-ওলামাদের আচার-আচরণ, ভক্তি-শ্রদ্ধা, শিষ্টাচার, সহযোগিতা-সহমর্মিতা সত্যিই অনুকরণীয়। তার পরও ধর্মীয় শিক্ষা অথবা মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেউ কেউ ভিন্নদৃষ্টিতে দেখেন।

অথচ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত কারো কারো যেন দুর্নীতির কোনো পরিসীমা নেই। এই তো কয়েক বছর আগেও যে ব্যক্তিটি হেঁটে চলাচল করত আজ সে দামি গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, অসংখ্য ফ্ল্যাট, জমি, কোটি কোটি টাকার মালিক। অর্থশালী হওয়ায় তিনি এখন এলাকায় ও সমাজে এক জন সম্মানিত ব্যক্তি। আরো বড়মাপের লুটেরা, ঠকবাজ, চোরাকারবারি, পাচারকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। কেউ কেউ যে সম্পদ করেছে তা হাজার বছর বেঁচে থাকলেও যেন শেষ করতে পারবে না। অথচ ধর্মপ্রাণ শিক্ষিত, সত্ মানুষের নেই অর্থবিত্ত, অধিকাংশ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা যত্সামান্য, যা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণই কষ্টসাধ্য।

বিগত বছরগুলোতে দেশে জঙ্গিতৎপরতা বেড়েছিল অনেকাংশে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঘটনাও ঘটিয়েছে। ধর্মের অপব্যাখ্যায় অনুপ্রাণিত করে কিছু মানুষকে তাদের দলে ভিড়িয়ে ছিল। তবে সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে তা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত প্রেষণামূলক প্রচার-প্রচারণাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ ইসলাম সমর্থন করে না। যারা ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াবে, অপরাধ করবে তারা সন্ত্রাসী/অপরাধী হিসেবেই শাস্তিভোগ করবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, বঙ্গবন্ধু নিজেও বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। তবে পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।’

ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মচর্চার জন্য দেশে রয়েছে অসংখ্য মাদ্রাসা, মসজিদ, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উপাসনালয়। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী দেশে মোট আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২৩ হাজার ২২১টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যদি এই মাধ্যমে অথবা সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ না করে অশিক্ষিত থাকত তা হলে হয়তো এদের অনেকেই অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ত, সমাজে অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। কারণ তারা অধিকাংশই দরিদ্র কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পিতা-মাতার প্রেরণায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছে, দরিদ্রতার মধ্য থেকে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখছে। একদিকে তাদের অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম, অন্যদিকে শিক্ষা শেষে তাদের দ্বারা সমাজে মানুষ প্রেষণা পাচ্ছে, ধর্মীয় শিক্ষা পাচ্ছে এবং সমাজকে অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ দিনে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ধর্ম গুরুরা স্ব স্ব ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর প্রেষণা দিয়ে থাকেন, যা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সরকার কর্তৃক মসজিদসহ, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড তদারকির মাধ্যমে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান রুখে দিয়েছে। তবে সমাজে আরো বেশিসংখ্যক আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ধর্মশিক্ষায় ও ধর্মচর্চায় সম্পৃক্ত হলে ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোরামি দূরীকরণে সহায়ক হবে এবং স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে কাউকে আর বিভ্রান্ত করতে পারবে না, সমাজে আরো বেশি ধর্মের সুফল অনুভূত হবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজে অপরাধ কমিয়ে আনে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। রাষ্ট্রীয় আইন অপরাধীকে শাস্তি দেয় এবং এই শাস্তির ভয়ে যদিও সমাজে অপরাধ কম হয়, কিন্তু ধর্ম মানুষকে অপরাধ হতে বিরত থাকার প্রেষণা দেয়, যেখানে ইহকাল ও পরকালের শাস্তির ভয় ও পুরস্কার প্রাপ্তির বিশ্বাস জন্মায়। আইন হচ্ছে অপরাধীর চিকিত্সা, আর ধর্ম হচ্ছে অপরাধ হতে বিরত রাখার সহায়ক চিকিত্সা। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় অনুশাসন আইনের এক সহায়ক শক্তি।

লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত