করোনা-উত্তর পুনরুদ্ধার কর্মসূচি জাতীয় ও শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি

করোনা-উত্তর পুনরুদ্ধার কর্মসূচি জাতীয় ও শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতীকী ছবি

মহামারি :একটি জাতীয় বিষয়

কোভিড-১৯ একটি মহামারি। এই মহামারিতে শ্রেণিনির্বিশেষে ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। সেই হিসাবে বলা যায় যে এটি একটি সার্বজনীন বৈশ্বিক মানবিক সংকট। এ জন্য এটাও বলা হয়ে থাকে যে কোভিড-১৯-এর আগের পৃথিবী ও কোভিড-১৯-এর পরের পৃথিবী এরকম হবে না। আগের বাংলাদেশ ও পরের বাংলাদেশ এরকম হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, বড় পরিবর্তনটা কোথায় হবে?

কিন্তু ‘সার্বজনীনতা’ যেমন যে কোনো মহামারির আক্রমণে রয়েছে, ঠিক তেমনি তার প্রতিরোধের ব্যবস্থাটিও কি সার্বজনীন চরিত্রবিশিষ্ট ছিল বা আছে? রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ক্ষেত্রেই যদি বৈষম্য থাকে, তাহলে তা ইমার্জেন্সি পদক্ষেপ নিয়ে যথাসময়ে পুষিয়ে দিতে না পারলে ফলাফলেও অনিবার্য বৈষম্য তৈরি হবে। যারা আগে থেকেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন, যাদের বয়স বেশি, যাদের ফুসফুসের বা শ্বাস-প্রশ্বাসের দুর্বলতা আছে, যাদের হূদয় দুর্বল, যারা কোভিডে আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে বেশি থেকেছেন, তারা এই রোগের দ্বারা বেশি আক্রান্ত হবেন বা আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি হবে এটাই তো সত্য। সুতরাং ‘কোভিড জীবাণুর’-ও কিছু স্বাভাবিক (Natural) পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। আবার যে সমাজে মানুষ মানুষের জন্য বা যেখানে রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত সুসংগঠিত ও সক্ষম, সেখানে বিপদের মাত্রাও কম হবে, বিপদ হলে তা দ্রুত দূর হয়েও যাবে!

মহামারির শ্রেণি পক্ষপাতিত্ব আছে কি?

এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে ‘হ্যাঁ’। কিন্তু এই পক্ষপাতিত্বগুলো অর্থনৈতিক শ্রেণিভিত্তিক না-ও হতে পারে। যেমন বাংলাদেশে আমরা সাধারণভাবে এরকম দেখি বা শুনি যে এখানে মহিলারা কম আক্রান্ত হচ্ছেন, মৃত্যুর হারও তাদের কম। বস্তিবাসী নাকি কম আক্রান্ত হচ্ছে, গ্রামবাসীও নাকি কম আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের নাকি বিশেষ ‘Hard Immunity’ বেশি। তবে গবেষণালব্ধ তথ্য হাতে না থাকলেও সাধারণভাবে বলা যায় যে ধনী-গবির-মধ্যবিত্ত সব ধরনের লোকই এবার আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত অনেকেই তো নারী, শহরে ভালো বাসায় থাকেন, মোটামুটি ভালো আয় করেন, তবু তারাও কিছু না কিছু আক্রান্ত হয়েছেন। তাহলে ‘রোগের’ ব্যাপারটা শ্রেণিভিত্তিক—এ কথা পুরোপুরি বলা যাবে না। কিন্তু আবার যে কথাটা বারেবারে ফিরে আসে, তা হচ্ছে রোগ থেকে দূরে থাকা, ঝুঁকিমুক্ত থাকা বা রোগ হলে দ্রুত উচ্চ গুণগত মানের প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বা রোগ বিস্তারের সময়টা সুস্থভাবে নিজেকে আলাদা রেখে মোটামুটি বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার বিষয়টা কিন্তু অবশ্যই অর্থনৈতিক শ্রেণি বা সামাজিক বা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। যেমন ধরুন বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক, যিনি ইতালি বা চীন বা সৌদি আরবে আছেন, তিনি যদি কোভিডে আক্রান্ত হন, তাহলে তার দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। তবে রাষ্ট্র যদি সমাজতান্ত্রিক বা কল্যাণমূলক চরিত্রের হয় (সামাজিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র!), তাহলে তাদের অতটা সংকট না-ও হতে পারে। আমাদের দেশে আমরা দেখেছি, পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিকের সংকটের মাত্রা এরকম হয়নি। প্রবাসেও একজন সাধারণ শ্রমিক ও একজন শিক্ষিত সাদা কলারের চাকরিজীবী শ্রমজীবীর সংকটও একরকম হবে না। খাতভেদেও সংকটের তারতম্য হবে। যেমন ট্যুরিজম বা হোটেল যতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ওষুধশিল্প বা ‘মাস্কের’ ব্যবসা ততখানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সর্বোপরি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা, যারা মূলধারার আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে ছোটখাটো আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। তারাই কোভিডের সময়ে বেকারে পরিণত হবেন, দরিদ্রে পরিণত হবেন, এমনকি পরিবারের কেউ কেউ ক্ষুধার্ত বা পুষ্টিহীন হয়ে যাবেন। সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো মহামারির আক্রমণের চরিত্র কিছুটা ‘র্যান্ডম’ হলেও তুলনামূলকভাবে যে কোনো প্রাকৃতিক সংকটের মতো এর অভিঘাতটা বা বোঝাটা বেশি গিয়ে পড়বে দরিদ্র বা তলের লোকদের ওপর। এই সাধারণ সূত্রটি বাংলাদেশের কোভিডকালীন সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকেও সমর্থিত হয়।

সমন্বিত পুনরুদ্ধার নীতিমালা কেমন হবে?

এতক্ষণ আমরা যে বিশ্লেষণ করলাম, তাতে এ কথা স্পষ্ট যে আমাদের কোভিড থেকে বের হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি যুগোপত্ জাতীয় ও শ্রেণিভিত্তিক সংবেদনশীল পলিসি প্যাকেজ বা নীতিমালা লাগবে।

কতকগুলো সাধারণ সার্বজনীন নীতির লক্ষ্য হবে সামুষ্টিক জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি। এর প্রধান বিষয়টি হবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও মহামারি প্রতিরোধক ব্যবস্থা তৈরি করা। প্রতিটি উপজেলায় সরকারি খাতে আক্রান্তদের সুচিকিত্সার জন্য এখন থেকেই আমাদের হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডিসপেনসারি ও বিশেষ কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে আমাদের উপজেলাভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক আছে এবং উপজেলা ও জেলা সদরে সরকারি হাসপাতাল আছে। কিন্তু কোভিড দেখিয়ে দিল যে সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিত্সক নেই, নার্স নেই, ঔষধপত্র নেই। আর ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্টের জন্য আইসিইউ নেই, নেই টেস্টের ব্যবস্থা। এমনকি টাকা দিলেও তা পাওয়া যায় না। এগুলো কেন নেই, খোঁজ করতে গিয়ে আমরা বুঝলাম যে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সরকারি খাতে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যয় সর্বনিম্ন। আর অসুখ হলে দরিদ্রতম রোগীটিকেও নিজের পকেট থেকেই সিংহভাগ ব্যয় (প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ) নির্বাহ করতে হয়, যে সক্ষমতা আবার তার নেই। আর নিচের দিকে ক্লিনিকে প্রায়ই ডাক্তার থাকে তো নার্স নেই অথবা নার্স আছে তো ডাক্তার নেই—এই অবস্থা রিবাজ করছে। টেস্ট এখন পর্যন্ত পর্যাপ্তভাবে করাই যাচ্ছে না, মাস্ক ও টেস্টের উত্সভেদে খরচে বিষম তারতম্য—এখানেও মুক্তবাজার তার মুনাফা ও দুর্নীতির খেলা শুরু করেছে। সুতরাং সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পাবলিক সেক্টরের অধীনে একধরনের সার্বজনীন অধিগম্যতা নিশ্চিত করে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, সেখানে সুশাসন কায়েম করতে হবে এবং পর্যাপ্ত উপকরণ ওষুধ ও চিকিত্সকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা অকুণ্ঠিতভাবে সেবা দেয়। এটা অনেকটা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ হবে এবং তা আজই শুরু করতে হবে। এটাই জাতীয় কর্তব্য।

কিন্তু অর্থনীতিতে এজাতীয় কর্তব্যের পাশাপাশি আমাদের দুই ধরনের শ্রেণিভিত্তিক বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কাজ আরো দীর্ঘদিন ধরে চালাতে হবে। একধরনের কাজ হবে পুনর্বাসনমূলক। আরেক ধরনের কাজ হবে ‘ঘুরে দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করার’ কাজ। অর্থনীতির ভাষায়—Rehabilitation and Restart.

যারা নতুন করে দরিদ্র হয়ে গেলেন, যারা করোনায় চাকরি হারিয়েছেন, যারা পুঁজি ও বাজার হারিয়ে এখন সঞ্চয় ভেঙ্গে ভেঙ্গে খাচ্ছেন বা না খেয়ে আছেন, এদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার বা অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে রাষ্ট্রকে। এদের transfer payment বা অনুদানের মাধ্যমে আগে পুনর্বাসিত করতে হবে। যেটুকু তারা হারিয়েছে, তা যথাসম্ভব পুষিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে প্রথমে অনুদান দিতে হবে সবচেয়ে নিচে যারা নেমে গেছেন তাদের। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কারা—কোথায় বা কোন ‘পকেটগুলো’তে তারা বাস করে, সেই সবকিছু চিহ্নিত করা যাবে কীভাবে?

প্রান্তিক মানুষের যে তালিকা সরকারের কাছে আছে এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর জন্য যেমন আদিবাসী এলাকা, খরাপ্রবণ এলাকা, বন্যাপ্রবণ এলাকা, লবণাক্ত এলাকা, বস্তিবাসীর এলাকা, চরম দরিদ্র পরিবারের মহিলাপ্রধান খানাসমূহ, হাওর এলাকা, বৃদ্ধ দুস্থদের ও প্রতিবন্ধীদের তালিকা ইত্যাদি যা আছে, সেসব স্থানে বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। আগামী বাজেটগুলোতে এসব জায়গায় বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে—ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ, বিকেন্দ্রীভূত ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। তালিকা তৈরি করে স্থানীয় তৃণমূল সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে দাবি তুলতে পারে—এগিয়ে আসতে পারে, যাতে সেখানে কেউ বাদ না পড়ে এবং অযোগ্য কেউ না ঢুকে পরে তার ব্যবস্থা করাটা এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আজ আর কঠিন নয়। এখানে প্রগতিশীল গনসংগঠনগুলোকে স্বেচ্ছাসেবক ও ইনসাফের মনোভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয় কাজটি হচ্ছে উত্পাদনশীল উদ্যোগগুলোর জন্য নতুন করে বাজার খুলে দেওয়া, পুঁজির ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ঋণ স্বল্প সুদে, দুর্নীতিশূন্যভাবে দ্রুত টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অর্থনীতিকে নতুন করে সক্রিয় করা।

সাধারণভাবে যেটা আমরা এখন দেখছি, প্রথম কাজটিতে সুশাসনের অভাব ছিল আর দ্বিতীয় কাজটি এখন পর্যন্ত সর্বত্র শুরুই করা যায়নি। মাঠের খবর হচ্ছে Big industry-র লোনগুলো দেওয়া হয়ে যাচ্ছে দ্রুত, কিন্তু SME-এর লোনগুলো চালুই হচ্ছে না। যদিও এখন দাবি করা হয় পোশাকশিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে, রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন হয়েছে এবং কৃষিতে ক্ষতি হয়নি, প্রবৃদ্ধি অন্য দেশের তুলনায় বেশি ইত্যাদি, কিন্তু এসব কথা বলার সময় ভুলে যাওয়া হয় যে এই অগ্রগতিগুলো বিশেষ বিশেষ খাতে বিশেষ লোকদের জন্য সত্য। যেই বৃহত্ শিল্পপতিরা প্রচুর ঋণ পেয়েছেন, সরকার যেই খেলাপিদের টাকা আদায় না করেই এবার আবার তাদের ঋণ দিল, যে দরিদ্রদের ক্ষুদ্র একটি অংশের জন্য রিলিফ দেওয়া হলো, কিন্তু যা তাদের কাছে সব সময় পৌঁছাল না, যে পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা গ্রামে গিয়ে আর ফিরে এলো না, বেকার হয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতের যে লোকেরা ক্ষুধা নিয়ে এখন দিন কাটাচ্ছে, তাদের জন্য এই উন্নতির সূচকগুলো মোটেও সত্য নয়। তাদের সংখ্যা যে কম নয়, তা আগেই আমরা দেখেছি।

সবাইকে ভাবতে হবে

এক কথায় বলা যায় যে আমাদের পুনরুদ্ধার কর্মসূচিকে যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যহীন না করা যায়, তাহলে পুনরুদ্ধারের পর আমাদের সমাজে সৃষ্টি হবে দুটি মেরু। তখন কিন্তু আমরা কেউই শান্তিতে থাকতে পারব না। এ কথা আজ শুধু বামপন্থিদের কথা নয়, স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বারই বলছে যে এমনকি তাদের পুনরুদ্ধারে কর্মসূচিটিও খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি করতে যাচ্ছে বিশাল বৈষম্য এবং দুই মেরু। যারা সংকটে পড়েছিল, তারা নিচে নামছে তো নামছেই। আর যারা সাহায্য ও সুযোগ পেয়ে আগেভাগে দাঁড়িয়ে গেছে, তারা উঠছে তো উঠছেই। অনেকটা K curve-এর মতো বিকাশের এই রেখাচিত্র (দেখুন নিচের চিত্র-১)। আজ মনে হচ্ছে এই K (কে) curve-ই হয়তো আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যত্ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। যদি জনগণের সংগ্রাম, সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা সচেতনভাবে বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তৈরির আন্দোলন বা জনমত গঠন করতে সক্ষম না হন, তাহলে আমরা এই অনিবার্য পরিণতি এড়াতে পারব না।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত