ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) 

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) 
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) 

পবিত্র এ রবিউল আউয়াল মাসে বিশ্বনবী ও শ্রেষ্ঠনবী খাতামান্নাবেঈন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশ্বময় শান্তি আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মহানবী (সা.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এক বিরল আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব, আমির-ফকির, মুসলিম-অমুসলিম, আত্মীয় ও অনাত্মীয় এক কথায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে তিনি ন্যায় বিচারের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পবিত্র কোরআনে ন্যায়বিচারের বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও আর কোন জাতির শত্রুতা যেন কখনোই তোমাদেরকে অবিচার করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা সদা ন্যায়বিচার করো। এ কাজটি তাকওয়ার সবচেয়ে নিকটে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। তোমরা যা কিছু কর, নিশ্চয় আল্লাহ-সে বিষয়ে পুরোপুরি অবগত আছেন’ (সুরা মায়েদা: ৮)। উক্ত আয়াতের নিরিখে হজরত ওমর ফারুক (রা.) কাযী শুরায়হ-এর নামে একটি আদেশ লিখে পাঠিয়েছিলেন। তিনি (রা.) লিখেন ‘বিচার সভায় দরকষাকষি করবে না, কারো সাথে বিবাদে লিপ্ত হবে না। কোন ধরনের ক্রয়-বিক্রয় করবে না এবং রাগান্বিত অবস্থায় তুমি দুই ব্যক্তির মধ্যে বিচারের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবে না’ (তানতাবী, ওমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ: ৩০৭)।

মহানবী (সা.) পবিত্র কোরআনের শিক্ষার ওপর পরিপূর্ণ আমল করে তা নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। একবার কুরাইশ বংশীয় মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরির অপরাধে ধরা পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার হাত কর্তনের নির্দেশ দেন। আভিজাত্য ও বংশমর্যাদার উল্লেখ করে সে মহিলার শাস্তি লাঘবের জন্য রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে তার একান্ত স্নেহভাজন উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) সুপারিশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, ‘তুমি কি আল্লাহর দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছ?’ অতঃপর লোকজনকে আহ্বান করে মহানবী (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জনগণ পথভ্রষ্ট হয়েছে, এ জন্য যে তাদের কোনো সম্মানিত লোক চুরি করলে তখন তারা তাকে রেহাই দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে, তবে অবশ্যই তার হস্ত কর্তন করে দিতাম’ (বোখারি ও মুসলিম)।

ইসলাম একটি শান্তিপ্রিয় ধর্ম এবং এর শিক্ষা অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের। ইসলামের শিক্ষাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সমাজ ও দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহপাকের পক্ষ পৃথিবীতে এ পর্যন্ত থেকে যত নবীর (আ.) আগমন ঘটেছে, তাদের প্রত্যেককে আল্লাহতায়ালা বিশেষ যেসব দায়িত্ব দিয়েছেন তার মধ্যে প্রধান দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী সকল নবীই (আ.) দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন এবং এক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন।

ইসলামে ন্যায়বিচারের শিক্ষা এমন এক অনিন্দসুন্দর শিক্ষা, যা ন্যায়পরায়ণ প্রত্যেক অমুসলিমও শুনে প্রশংসা না করে পারে না। পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করাই মহানবীর (সা.) আগমনের উদ্দেশ্য এবং তিনি নিজ আমল দ্বারা সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষমও হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে যেভাবে ইরশাদ করা হয়েছে ‘বল, আমার প্রভু আমাকে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন’ (সুরা আরাফ: ২৯)। মহানবী (সা.) তা অক্ষরে অক্ষরে আমল করেছেন।

আল্লাহতায়ালার অনুপম শিক্ষা এবং ইসলামের সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির বহিঃপ্রকাশ তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহপাকের প্রতিটি আদেশের ওপর আমল করবে। ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের ঘর, সমাজ, আপন-পর, এমনকি শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার সাথে ন্যায়সূলভ ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা মহানবীর (সা.) প্রকৃত অনুসারী বলে দাবি করতে পারি। এছাড়া কেবল মুখে শ্রেষ্ঠনবীর উম্মত হবার দাবির কোন মূল্য আল্লাহপাকের কাছে নেই। আমাদের নিজ জীবনে মহানবীর অনুপম আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে এবং নিজ কর্মের মাধ্যমে আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে আমরা যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো, তখনই আমরা আল্লাহর প্রেমিকও হতে পারব আর খায়রে উম্মত হিসেবে নিজদেরকে প্রকাশ করতে পারব এবং আল্লাহর দরবারে মুমিন হিসেবে বিবেচিত হব।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ রয়েছে ‘আর মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তাদের মাঝে তোমরা মীমাংসা করে দিও। এরপর তাদের মাঝে একদল অন্যদলের বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করলে যে দল সীমালঙ্ঘন করে, তারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। এরপর তারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে এলে তোমরা উভয়ের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে মীমাংসা করে দিও এবং সুবিচার করো। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন’ (সুরা আল হুজুরাত: ৯)। আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের এই নীতিমালা এক মহা রক্ষাকবচ। মুসলিম বিশ্ব যদি আজ পবিত্র কোরআনের এই নীতির ওপর আমল করে, তাহলে বিশ্বময় অরাজকতার কোন প্রশ্নই থাকার কথা না।

মহানবীর (সা.) নির্দেশ হলো ‘তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর, অন্যদের জন্যও তা পছন্দ কর’। আমরা যদি এই হাদিসের ওপর দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত হই, তাহলেই কেবল ন্যায়বিচার করা সম্ভব। সাধারণত আমরা কি দেখি, নিজের অধিকার পুরোপুরি আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা বদ্ধ পরিকর, অথচ অন্যের অধিকারের বিষয়ে সামান্যতম চিন্তাও করি না। সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আমাদেরকে যদি নিজ আত্মীয়স্বজন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের অসন্তুষ্টিরও সম্মুখীন হতে হয়, তারপরও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কোন ধরণের পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। আমরা নিজেরা যখন ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকব, তখনই আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারব। নিজের মধ্যেই যদি ন্যায়পরায়ণতা না থাকে, তাহলে অপরকে কিভাবে উপদেশ দিতে পারি? আজকে ন্যায়বিচারের বড়ই অভাব আর একারণেই সর্বত্র বিশৃঙ্খলা, সামাজিক অস্থিরতা আর অরাজকতা দেখা দিচ্ছে।

মহানবী সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন এক মূর্ত প্রতীক। মহানবী (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ একে অপরের ভাই। সব মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটি থেকে তৈরি।’ (মুসনাদে আহমাদ)

মহানবী (সা.) সব মানুষের প্রতি ছিলেন উদার। ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী বিচারে তিনি করো প্রতি জুলুম-অন্যায় করেননি। কারো প্রতি অবিচার করেননি। সমাজে বসবাসকারী সকল সদস্যদের সাথে ন্যায়বিচার এবং উত্তম আচরণ করার শিক্ষাই বিশ্বনবীর শিক্ষা। ন্যায়, শান্তি ও নিরাপত্তার আচরণ অবলম্বন করার বিষয়ে মহানবী (সা.) ইসলামী শিক্ষামালার সারাংশ এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে-ই, যার কথা এবং হাত থেকে কোন মানুষ কোনরূপ কষ্ট বা ক্ষতির সম্মুখীন হয় না’ (সুনানে নিসাই, কিতাবুল ঈমান)। এই ভাষ্যে মুসলমান, অমুসলমান, বর্ণ ও জাত বা পূর্বসূরির সম্পর্কের ভিত্তিতে কোন-রূপ তারতম্য করা হয় নি।

এই সুপ্রতিষ্ঠিত ভিত্তিতে গড়ে উঠা সমাজ উন্নতি করে জাতীয় শান্তি ও নিরাপত্তার জামিনদার হয়ে যায় এবং অবশেষে যদি বিশ্বের সকল রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থের উর্ধ্বে গিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসব মূলনীতিতে সংঘবদ্ধ হয়ে যায় এবং কোরআনি শিক্ষামালা ও মহানবীর আদর্শকে পথ-নির্দেশক বানিয়ে এসব মূলনীতি বাস্তবায়ন করে তাহলে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলা যায়, বিশ্বশান্তি পুরো বিশ্বের ভাগ্যে অবশ্যই জুটবে।

আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে মহানবীর (সা.) অনুপম আদর্শ ও শিক্ষা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

ই-মেইল: [email protected]

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত