কোভিডকালীন উচ্চশিক্ষা ও বাংলাদেশ

কোভিডকালীন উচ্চশিক্ষা ও বাংলাদেশ
কোভিডকালীন উচ্চশিক্ষা ও বাংলাদেশ। প্রতীকী ছবি

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশেও আঘাত হেনেছে। সেই অভিঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধসীমা বাড়ানো হয়েছে। বস্তুত, মধ্য মার্চ থেকেই বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে রয়েছে। থমকে গেছে সারা দুনিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু মানুষ দমবার পাত্র নয়। অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত নিউ নরমালে অভ্যস্ত হওয়ার সতর্কতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দিবারাত্র। ক্লাসরুম শিক্ষায় ছেদ পড়ায় অনলাইন শিক্ষা আঁকড়ে ধরেছে। জীবন তো আর থেমে থাকার জিনিস নয়। থেমে গেলে তা মৃত্যু।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একটি নিত্য চলমান প্রক্রিয়া বিধায় ক্লাসরুম শিক্ষার জুতসই বিকল্প হিসেবে অনলাইন শিক্ষা পোক্ত হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে তা খুব সহজেও হয় না। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় সরকারকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন লড়াকু মানুষ। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। কোভিড যুদ্ধেও তাকে আমরা দেখি দক্ষ হাতে হাল ধরতে। তার নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ডস কমিশন কোভিড কালে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার জন্য দফায় দফায় তাগিদ দিতে থাকে। তা বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ রচনায় কাজও করে চলেছে।

কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাড়া মেলেনি। নানান অজুহাতে অনলাইন শিক্ষাকে নিরুত্সাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মানছি, মুখোমুখি শিক্ষার বিকল্প অনলাইন হতে পারে না। কিন্তু মুখোমুখি শিক্ষার প্রতিবেশ যদি আরো ছয় মাস কিংবা এক বছর কিংবা অনির্দিষ্টকাল ধরে অবর্তমান থাকে, তাহলে কী হবে? কোভিড নাইনটিনের ভাবগতিক দেখে তো মনে হচ্ছে না যে শিগিগরই তার যবনিকাপাত ঘটবে। আর তাই অস্তিত্ববাদী বুদ্ধিমান মানুষ সত্যিকার স্বাভাবিকতা না ফিরে আসা পর্যন্ত ছদ্ধ স্বাভাবিকতায় অভ্যস্ত হতে চাইছে। কোভিডের বিরুদ্ধে ঢাল-তলোয়ার নিয়েই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইছে। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অতিকায় ডাইনোসরও বিলুপ্ত হয়েছে। আবার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারার কারণে ক্ষুদ্র তেলাপোকা আজও টিকে আছে। বিবর্তনের দৌড়ে সবচাইতে অগ্রগামী মনে হয় এই তেলাপোকাই।

যাই হোক, কোভিড সংক্রমণের অভিঘাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের উচ্চশিক্ষা টিকিয়ে রাখতে হলে লক্ষ-কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চলমান রেখে যথাসাময়িক সমাপ্তি টানতে হলে এই মহামারির কালে বিকল্প আশ্রয় গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ কথা সত্য, যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করতে পারব, আমাদের কল্যাণ ততই দ্রুততর হবে। ডিজিটাল ডিভাইডের বিষয়টি অবশ্যই বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে এবং সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং কার্যকর ব্যবস্থাও নিয়েছে বলেই জানি। তবে তা হয়তো পর্যাপ্ত নয়। তাই এ ব্যাপারে সরকারকে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কারণ উচ্চশিক্ষায় অনলাইন কার্যক্রমকে একটি স্থায়ী অবকাঠামোর আওতায় আনতে হবে। বস্তুত, দুর্যোগকালীন এবং স্বাভাবিককালীন সব সময়ের জন্য একটি মিশ্র (blended) শিক্ষা পদ্ধতির দিকে আমাদের ধাবিত হতে হবে। প্রকৃত ক্লাসরুমের পাশাপাশি ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের বন্দোবস্ত না থাকলে আপাতকালে আবারও অপ্রস্তুত হতে হবে। তাই উচ্চশিক্ষায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করতে হলে একটি টেকসই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং সেজন্য দরকার ইন্টারনেট সেবার আওতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইস শ্রেণির বিলোপ সাধন করা। শ্রেণিবিশেষকে বঞ্চিত করে উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব নয়। তাই এসডিজি গোল ৪-এ অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য মান শিক্ষার এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা সুযোগের উন্নয়নের নিশ্চয়তা বিধানের কথা বলা হয়েছে।

এসডিজির এই অতিগুরুত্বপূর্ণ গোলটি কোভিড অভিঘাতের ফলে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যায়, করোনা সংক্রমণের আগেই বিশ্বে অন্তর্ভুক্তমূলক এবং ন্যায্য মান শিক্ষার গতি অতি ধীর ছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ মিলিয়নেরও বেশি ছেলেমেয়ে স্কুলের বাইরে থাকবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। করোনার সংক্রমণকালে বর্তমানে সারা বিশ্বে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে রয়েছে। কোভিড নাইনটিন অভিঘাতে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তাতে দেখা যায় নিম্ন আয়ের দেশসমূহে স্কুল শিক্ষা সমাপ্তির হার ধনীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ এবং দরিদ্রদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম এখনো বিশ্বের ৫০০ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর কাছে অধরাই রয়ে যাচ্ছে। স্কুল শিক্ষা নিয়ে এই সমীক্ষা পরিচালিত হলেও কোভিড পরিস্থিতির এই প্রতিক্রিয়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেকটাই প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

এখন করণীয় কী? বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার দিকে দ্রুত অগ্রসরমান। আমাদের অবস্থা নিম্ন আয়ওয়ালাদের চাইতে বেশ ভালো। তবে আমাদের রিমোট লার্নিংয়ের সেবার আওতা বাড়াতে হবে। গ্রহণযোগ্য বিকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে। মান বজায় রাখতে হবে এবং শিক্ষা সমাপ্তির হার বাড়াতে হবে। সব ভালো, যার শেষ ভালো।

বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষায় অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো মানুষের মাইন্ডসেট। সময়ের একটি অনিবার্যতাকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে সহজ অতিক্রমযোগ্য সংকটগুলোকেও আমরা অনেক সময় বড় করে দেখি। কোভিড পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষার যে বিকল্প নেই, সেটা বুঝতে আমাদের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক সময় নিয়েছে। এখন অবশ্য অনলাইন শিক্ষার আপত্কালীন অনিবার্যতা নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন নেই। তার পরও সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমানভাবে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। তাই কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ওয়েভের কথা ভেবে অন্তত অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে পুরোদস্তুর গ্রহণ করা উচিত। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে জরুরি ভিত্তিতে অনলাইন পরীক্ষা গ্রহণের কথাও ভাবতে হবে।

একটি সেমিস্টারের পাঠদান শেষ করে পরীক্ষা না নিয়ে পরবর্তী সেমিস্টারের পাঠগ্রহণ শুরু হলে কিংবা তার পরেরটা শুরু হলে প্রশাসনিক জটিলতা তো বটেই, শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। এমনিতেই দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর জনমনে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর এই চাপ দ্বিগুণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাই বাস্তবতা, পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয়তা, সামর্থ্য, সহানুভূতি—সব এক করে ভাবতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউজিসি মূল পরীক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল, ভারতের মজুরি কমিশনও একটি অবস্থানে ছিল। সেই সিদ্ধান্ত ঠিকই ছিল। কারণ শিক্ষাজীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়টি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে নির্ধারিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমাগত অপরিবর্তিত থাকায় এবং বিশেষ করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা অনিশ্চিততর হওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে পুনর্ভাবনা অতি আবশ্যক হয়ে পড়েছে। ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই অনলাইন পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে একটি কেন্দ্রীয় সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকা দরকার। না হলে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত তারতম্য তো থাকছেই, এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহেও ‘যে যেমন সে তেমন’ নীতি অনুসৃত হলে শিক্ষা সমাপ্তিতে গিয়ে ঘোরতর বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।

সব মিলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোভিড পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য যেমন অনলাইন শিক্ষাকে মনে না নিলেও মেনে তিতে হয়েছে, তেমনি অনলাইন পরীক্ষাকেও একসময় মেনে নিতে হবে। তাই যথাসম্ভব ত্রুটিহীন শিক্ষার্থীবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর ও সুসমন্বিত অনলাইন পরীক্ষার কথা ভাবতে হবে। তাছাড়া করোনার আঘাতে পৃথিবীর সবকিছুই যেখানে ওলটপালট হয়ে গেছে, সেখানে পূর্ণ স্বাভাবিকত্ব প্রত্যাবর্তনের আশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার চাইতে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বিকল্পের কাঁধে চড়ে সংকটের বৈতরণি পাড়ি দেওয়া নিশ্চয়ই অধিক কাজের কথা। করোনা মানুষের সীমাহীন ক্ষতি করেছে আবার শিক্ষাও কম দিচ্ছে না—একটি বড় শিক্ষা হলো আমাদের মানসকাঠামোর পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তনের স্রোতে গা ভাসানোর দরকারও নেই, আবার উলটো সাতার দিয়ে ডুবে মরারও দরকার নেই। দরকার হলো তীরে ওঠা। অনলাইন পরীক্ষার বিষয়টি ইতিমধ্যে বিশ্ববাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দু-চারটি চ্যালেঞ্জ যে নেই তা নয়। ডিজিটাল ডিভাইডের বিষয়টি তো রয়েছেই। সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নকল করার সুযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথাও অনেকে ভাবছেন। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে ওপেন পরীক্ষার ব্যবস্থা তো রয়েছেই। সেখানে কি শিক্ষার্থীদের মান নির্ণয় হয় না?

মূল কাথা হলো, মান্ধাতা আমলের শিক্ষা কিংবা পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশ্নের ধরন-ধারণ পালটালে এবং সঠিক উত্তর শতভাগ বোধগম্যতানির্ভর ও সৃজনশীল হলে এবং পরীক্ষার সময় নির্দিষ্ট নির্ধারিত হলে তথ্য বিস্ফোরণের এই যুগেও পরীক্ষার্থীদের পক্ষে অসত্ পথে যথাসময়ে যথা উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীদের অনলাইন ভিজিলেন্সের জন্যও ডিজিটাল ডিভাইস রয়েছে। উত্তরপত্র স্বহস্তে লেখা কিংবা কম্পিউটার কম্পোজ করার ব্যবস্থা রয়েছে। মোট কথা হলো, এটাই পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি অলাইন পরীক্ষা গ্রহণ অন্যথায় সেশন জ্যামের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে প্রবল প্রতিযোগিতামুখর এই বিশ্বে ছিটকে পড়তে হবে। অনলাইন পরীক্ষা অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা অ্যাসেসমেন্টের অনুকূলে কোর্স কারিকুলামে থিওরির পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল এবং ল্যাব ইত্যাদিকে সমধিক গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো জ্ঞান বিতরণ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিলুপ্ত না হয়ে কৌশল পালটানোর বিষয়টি কোনো মতেই অসংগত নয়।

লেখক: অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
x