করোনার দ্বিতীয় ঢেউ :কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ :কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে
প্রতীকী ছবি

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বছরপূর্তি হতে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী মানুষ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পার করেছে দুঃস্বপ্নের একটি বছর। কিন্তু করোনা ভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং আতঙ্কের শেষ হতে-না-হতেই আলোচনার বিষয়বস্তু এসে দাঁড়িয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভ। কেবল পশ্চিমা দেশেই নয়, বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। তাছাড়া শীতের আগমনিবার্তাও পাওয়া যাচ্ছে। আসন্ন শীতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধারণা করা হতো, শীতকালে করোনার সংক্রমণ বাড়ে আর গ্রীষ্মকালে কমে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তবে চায়নাতে সংক্রমণের শুরুটা শীতেই ছিল, এমনকি কিছু কিছু শীতপ্রধান দেশে করোনার সংক্রমণ এবং ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ভয়ংকর! তবে আবহাওয়ার সঙ্গে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ দেখা গেছে, একপর্যায়ে এসে করোনা শীত-গ্রীষ্ম মানেনি, বরং শীত, গরম এমনকি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে নির্মমভাবে তার থাবা বসিয়েছে।

আসলেই কি দ্বিতীয় ঢেউ আসবে? দ্বিতীয় ঢেউ বলতে প্রকৃত অর্থে কী বোঝায়? তার প্রস্তুতিই-বা কেমন হওয়া উচিত? বিভ্রান্ত না হয়ে এসব বিষয়ে আমাদের সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকা উচিত। বৃদ্ধি পাওয়া প্রথম সংক্রমণের সার্বিক হার কমে গিয়ে বা স্তিমিত হয়ে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হলে তাকে দ্বিতীয় ঢেউ বলা হয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্লুর মোট তিনটি ঢেউ বা ওয়েভ দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউটা ছিল প্রথমটির তুলনায় মারাত্মক। তাই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সবার মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত বসে থাকার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই গবেষণার পর্যায়ে রয়ে গেছে। এটি কি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে, নাকি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে, টিকা কবে নাগাদ আসবে বা এলেও তা কতটা কার্যকর হবে, ভাইরাসের হার্ড ইমিউনিটি আসলেই সম্ভব কি না ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর এখনো ধোঁয়াশায়। সর্বোপরি করোনা আদৌ পৃথিবী থেকে নির্মূল হবে কি না, নাকি আমাদেরকে জীবন-জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ভাইরাসের সঙ্গে নিত্য বসবাস করতে হবে, তা নিয়ে এখনো রয়ে গেছে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব!

ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমণের হার বাড়ছে এবং দ্বিতীয় ঢেউয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে পুরোপুরি বা শহরভিত্তিক কঠোর লকডাউন এবং কারফিউ শুরু করেছে। অনেকে মনে করছেন আমাদের দেশের প্রথম ঢেউ তো শেষ হয়নি, সেখানে দ্বিতীয় ঢেউ আদৌ হবে কি না, কিংবা তাহলে কতটা গুরুতর হবে, এসব নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে এমনকি উচ্চ মহল থেকে সতর্কবাণী করা হচ্ছে। যেহেতু জনসাধারণের ঘরের বাইরে যাওয়া বেড়েছে, বাড়ছে জনসমাগম, এমনকি অফিস-আদালত, দোকানপাটসহ অনেক কিছুই আগের মতোই চলছে, সে কারণে সংক্রমণের হার বাড়তেই পারে। যারা আগে ঘর থেকে বের হননি, তারাও এখন বের হচ্ছেন। শিশু-কিশোররাও বের হচ্ছে, অনেক দেশে তো স্কুল-কলেজও খুলে গেছে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণ জনগোষ্ঠী, শিশু-কিশোররা উপসর্গহীন ক্যারিয়ারে পরিণত হচ্ছে, তারা আবার অন্যদের মধ্যে নিজের অজান্তেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও একই অবস্থা। শহর ও গ্রামে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করছে, অনেকেই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্কুল না খুললেও শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়েরা বাইরে যাচ্ছেন। শিশুরা সতর্ক থাকতে পারে না বলে ক্যারিয়ারে পরিণত হয়। নিজেদের উপসর্গ না হলেও পরিবারে বয়স্কদের সংক্রমিত করছে তারা। যেহেতু জনসমাগম বেড়ে চলেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বালাই নেই, জনসাধারণের মধ্যে একটা উদাসীনতা বা শৈথিল্য ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, এমনকি ন্যূনতম মাস্ক পরারও তোয়াক্কা নেই এবং অনেকেই শারীরিক দূরত্ব মেনে চলছেন না, তাই অদূর ভবিষ্যতে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তো আছেই।

আসছে শীতে সংক্রমণ কি বাড়বে?

কোভিড-১৯ কিন্তু শুরু হয়েছিল গত শীতেই, যা চীনে পুরো শীতকালটায় তাণ্ডব চালিয়েছিল। এমনকি শীতপ্রধান দেশগুলোতে সংক্রমণের হার জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে বলে লক্ষ করা গেছে। এ ছাড়া গবেষকরা বলেন, যে কোনো ভাইরাস শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া পছন্দ করে। আর শীতে বাতাসের আর্দ্রতাও কমে, আবহাওয়ার পরিবর্তন এসে শুষ্ক হয়ে যায়। তাছাড়া শীতে মানুষের দরজা-জানালা বদ্ধ ঘরে থাকার প্রবণতা বাড়ে, ফলে অ্যারোসল ছড়ায় বেশি। আর তাই বদ্ধ ঘরে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি।

এমনিতেই শীতকালে মানুষের নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি যেমন—ফ্লু, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (হাঁপানি বা ব্রংকাইটিস) বাড়ে এবং প্রতি বছর এ ধরনের রোগীতে শীতকালে আমাদের হাসপাতাল পূর্ণ হয়ে যায়। তাছাড়া শীতকালে দুনিয়া জুড়ে বয়স্ক ও শিশুদের ফুসফুস সংক্রমণজনিত মৃত্যুহারও সবচেয়ে বেশি হয়। উপরন্তু এ বছর অনেক নবজাতক শিশু লক-ডাউন ও মহামারির কারণে যথাসময়ে সব টিকা পায়নি। সারা পৃথিবীতেই এ অবস্থা। ফলে এবার শীতে অনেক বেশিসংখ্যক শিশু নিউমোনিয়া, হুপিং কফ, হাম, মাম্পস ইত্যাদিতে আক্রান্ত হবে বলে এখনই ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি কোভিডসহ অন্যান্য ফুসফুসের সংক্রমণ বাড়বে, তা ধারণা করাই যায়। কারণ এখনো করোনা সংক্রমণ না নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, না এর টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া শীতকালে সংক্রমণের হার আরো বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো এ সময়ে আমাদের ঘোরাঘুরি, নানা উত্সব, অনুষ্ঠান যেমন বিয়ে-শাদি, পিকনিক, ওয়াজ-মাহফিল, মেলা, সেমিনার সিম্পোজিয়াম, সাংস্কৃতিক কাজকর্মসহ গণজমায়েত বেড়ে যায়। কাজেই এসব অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়বে।

কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটে। স্প্যানিশ ফ্লুর বেলায় দ্বিতীয় সংক্রমণ ঢেউয়ে মিউটেটেড বা পরিবর্তিত ভাইরাসের শক্তি ছিল বেশি। আবার কোনো কোনো সময় ভাইরাস পরিবর্তন হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। করোনার ক্ষেত্রে কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। যেহেতু যথাযথ টিকা এখনো পাওয়া যায়নি, তাই প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলাই হবে যথোপযুক্ত কাজ।

এ কথা সত্য, সংক্রমণের হার বাড়লেও মৃত্যুহার কিছুটা কমতির দিকে। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে আগের মতো চলছে, তার মানে এই নয় যে, করোনা সংক্রমণ শেষ হয়ে গেছে। সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে এবং জীবন-জীবিকার তাড়নায় সব খুলে দেওয়া হয়েছে, মহামারি শেষ হয়ে গেছে বলে নয়, এ কথা মনে রাখা দরকার। তাই সবকিছু স্বাভাবিক মানে কিন্তু ঢালাওভাবে স্বাভাবিক নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বের হতে হচ্ছে বইকি, তাই বলে বেড়ানো, উত্সব, সামাজিকতা, জনসমাগম করার মতো সার্বিক অবস্থা তো আর এখনো আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি। তাই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

রোগটি যেহেতু নতুন তাই প্রথম দিকে ডাক্তার-নার্স এবং প্রশাসনসহ সর্বস্তরের প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি ছিল। তবে এগুলো থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। এমনি শুরুতে ডাক্তার নার্সসহ সর্বস্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে যে ভীতি বা ইতস্তত ভাব ছিল, তাও কেটে গেছে। বর্তমানে ডাক্তার-নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা দক্ষতার সঙ্গে রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ওষুধপত্র, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং চিকিত্সা-সামগ্রীর যে অপ্রতুলতা ছিল সে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তাছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা-বেড, আইসিইউ-ভেন্টিলেটরসহ মোটামুটি রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিতে প্রস্তুত। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোও সক্ষমতা বাড়িয়ে দক্ষতার সঙ্গে ভালোভাবে করোনার চিকিত্সা দিয়ে যাচ্ছে।

জনগণের সচেতনতার মধ্যেই রয়েছে সফলতা। করোনা প্রতিরোধের ভ্যাকসিন এখনো হাতের নাগালে আসেনি, কবে নাগাদ আসবে তাও অনিশ্চিত। টিকা হাতের নাগালে এলেও সর্বস্তরের জনগণ তো একই সঙ্গে টিকা পাবে না, পেলেও সেই টিকা কতদিন প্রটেকশন বা সুরক্ষা দেবে তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মূলকথা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের প্রথম ঢেউ কিংবা দ্বিতীয় ঢেউ যেটিই হোক না কেন, প্রতিরোধের লাগাম কিন্তু আপনার-আমার হাতেই। আপনার সুরক্ষা বা নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। কারণ আপনি আক্রান্ত হলে তখন প্রশাসন, কোনো গোষ্ঠী, দল বা অন্যকে দোষারোপ করে কোনো লাভ হবে না। তাই অন্য কিছু মানুন আর না মানুন, মাত্র তিনটি সাধারণ কাজ করলে করোনা ভাইরাসের মতো ভয়ংকর দানবকে আমরা রুখে দিতে পারব। এক. নিয়মিত মাস্ক পরতে হবে, দুই. নিয়মিত অন্ততপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করে হাতকে জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে এবং তিন. ঘরের বাইরে অন্য মানুষের সাথে শারীরিক দূরত্ব (অন্ততপক্ষে তিন ফুট) বজায় রাখতে হবে। করোনা ভাইরাসের কার্যকর টিকা গ্রহণের আগে পর্যন্ত এই তিনটি কাজ টিকার একমাত্র বিকল্প, এমনকি তা টিকার চেয়ে বেশি কার্যকর। আপাতত এই তিনটি কাজই আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষকে করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যথেষ্ট। তাই আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সচেতনতা থাকলে আমরা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম হব।

লেখক :মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত