নয়া মেরুকরণের পথে মধ্যপ্রাচ্য

নয়া মেরুকরণের পথে মধ্যপ্রাচ্য
প্রতীকী ছবি

ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্থাপনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন এক বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রীতিমতো পরিবর্তনশীল সেখানকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্কই ছিল না আরব বিশ্বের। উলটো ইসরাইলকে দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে।

ইতিহাসের প্রতিটা সময় আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ছিল সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিপূর্ণ। এই সূত্র ধরে ইসরাইলের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধে জড়ায় আরব দেশগুলো। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধেই সম্মিলিত আরব শক্তির শোচনীয় পরাজয় তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। যদিও ঐ তিন যুদ্ধেই পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন পেয়েছিল ইসরাইল। তেলআবিবের প্রতি পশ্চিমাদের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেই ইসরাইল কর্তৃক জাতিসংঘ বিভক্তি পরিকল্পনার একতরফা বরখেলাপ, ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের সর্বগ্রাসী প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। এতদসত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের নায্য অবস্থানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল এককাট্টাই ছিল আরব বিশ্ব। এই আলোকেই আঞ্চলিক পরিসরে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও দেশটির কূটনৈতিক পরিক্রমা ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু পশ্চিমা বৃহত্ শক্তিগুলো বিশেষত আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরাইলকে দ্রুতই বেপরোয়া করে তোলে। ফলে ক্রমাগত ফিলিস্থিনি ভূমি দখল ছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তত্পরতা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যায় দেশটি। বলা চলে, ইসরাইলি বলদর্পী নীতির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক আইন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্তই ইসরাইলের দখলদারিত্বকে দমাতে পারেনি। ইসরাইলের এ ধরনের তাণ্ডবের বিপরীতে নিজের একনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকার কৌশলী অবস্থান তেলআবিবকে ব্যাপক সুবিধা এনে দেয়। বিপরীতে আমেরিকার কূটনৈতিক চাপে থাকত আরব দেশগুলো। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আরবদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইসরাইলের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নীতি অবলম্বন করে পরিস্থিতি তেলআবিবের অনুকূলে রাখা। এক্ষেত্রে আরব বিভাজন উসকে দিয়ে সুকৌশলে ইসরাইলের নিরাপত্তা সুসংহত করার প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। এ কথা আজ স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন কূটনৈতিক কৌশলের কাছে পর্যায়ক্রমে ধরাশায়ী হয়েছে আরব দেশগুলো। রক্ষণশীল আরব বিশ্বের শাসকদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাবের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভোগবিলাসিতাকে পুঁজি করে পশ্চিমারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এই সূত্র ধরে আন্তঃআরব কলহ দিনে দিনে প্রকাশ্য হয়ে উঠলে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র স্বপ্নের দাবি।

১৯৯০ সালের পর আন্তঃআরব কলহের বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ইসরাইলি মনোবাসনা পূরণের পথকে মসৃণ করে দেয়। এই পর্যায়ে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে মার্কিন কর্তৃত্বের বিস্তার ঘটে। ঐ সময় থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিক মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট করে। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধের সূত্রপাত আরব জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে। একই সঙ্গে আরবদের অবশিষ্ট শক্তি একেবারে অকার্যকর হয়ে পড়ে। যদিও এই ধারার ব্যতিক্রম হিসেবে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখে ইরান, সিরিয়া ও লেবানন। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত ঐ সমস্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আরব দেশগুলোর মধ্যে একধরনের ভিতির সঞ্চার করে। এ সময় আরব দেশগুলোর বিভাজন এতই প্রকট হয়ে ওঠে যে ফিলিস্তিন বিষয়ে তাদের মনোযোগ একেবারে শূন্যে নেমে আসে।

এই পর্যায়ে সম্প্রতি কয়েকটি আরব দেশ কর্তৃক ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে একেবারে উলটে দিয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক মেরুকরণের এক ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের অবতারণা হওয়ায় পালটে যচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আরব দেশগুলো এমন একটি সময় বেছে নিয়েছে, যখন বিশ্বব্যবস্থার কর্তৃত্ব থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে আমেরিকা। এই বাস্তবতা খুব সহজভাবেই যে বিষয়গুলো দৃষ্টিগ্রাহ্য করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ ফ্রন্টের সক্ষমতা।

কয়েক যুগের মার্কিন ইসরাইলি চাপের মুখে কোণঠাসা হয়ে থাকা ইরান, লেবানন, সিরিয়াসহ তাদের প্রক্সি যোদ্ধারা এই মুহূর্তে অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি শক্তিশালী। এর ফলে ইসরাইলের ওপর মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামরিক চাপ। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে জাতিসংঘের বিভক্তি পরিকল্পনা মোতাবেক যে ইসরাইল রাষ্ট্রের উত্পত্তি, সেই রাষ্ট্রই এখন মোট ফিলিস্তিনি ভূমির ৯৬ শতাংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী পূর্ব জেরুজালেমকে দখলে নিয়ে নিজেদের রাজধানীর মর্যাদা দিতে চলেছে। ঠিক এরকম সময়ে কতিপয় আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার ফলে আঞ্চলিক মেরুকরণে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন আবহ। এই ভিন্ন মেরুকরণের ফল আরব বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একধরনের বিপর্যয়কর অবস্থার সূচনা করতে পারে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে সংঘাতকবলিত মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যত্ নিয়ে বহুমুখী শঙ্কা।

অন্যদিকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে সামরিক সমীকরণে। মূলত পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের শক্তি প্রবাহের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি, একই সঙ্গে ঐ অঞ্চল ঘিরে রাশিয়া ও ইরানের সম্মিলিত রণকৌশল আমেরিকা-ইসরাইলের সামরিক স্বার্থকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এর ফলে অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে ইরানের নিরাপত্তা মজবুত হয়েছে। এই ব্যাপারগুলো মাথায় রেখেই আমেরিকা-ইসরাইল নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে যেসব পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, সেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে আরব-ইসরাইল সম্পর্কের স্বাভাবিকতা। একসময়ের শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের এই নতুন মৈত্রী কার্যত ইরানকে নতুন করে চাপে ফেলার কৌশল। মূলত সৌদি-ইরান সম্পর্কের ক্রমাবনতি মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে নয়া মেরুকরণের ক্ষেত্র তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে ইরানকে দেখে নেওয়ার প্রবণতা থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষাকারী দেশগুলো শিগিগর ইসরাইলের পরিবর্তে ইরানকেই নিজেদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। কিন্তু এই বিবেচনা আরব দেশগুলোর দূরদর্শিতার মারাত্মক ঘাটতি। এতে করে তারা ইসরাইলের কৌশলী ফাঁদেই পা ফেলছে। এ ধরনের তত্পরতা কোনোভাবেই বৃহত্তর আরব স্বার্থের অনুকূলে ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে না। এতে করে শুধু আরব বিভাজনের ঐতিহাসিক দুর্বলতাকে পরিপূর্ণতা দেবে। বাড়িয়ে দেবে ভাতৃঘাতী সংঘাত।

অনুমান করা যাচ্ছে যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পশ্চিমা অস্ত্র বাজারের বৃহত্ ক্রেতায় পরিণত হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। মূলত যুদ্ধের আবহ জিইয়ে রেখে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিরোধ বিস্তৃত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইতিমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে আরব আমিরাত আমেরিকার কাছ থেকে উন্নতমানের অস্ত্র কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অথচ আরব আমিরাতের এমন কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই, যে কারণে তার এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রয়োজন। এসব অস্ত্র আমদানির প্রধান কারণ যে ইরানের ওপর চাপ তৈরি করা, সেটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তাই মধ্যপ্রাচ্যে যে নয়া মেরুকরণের সূত্রপাত, সেটি স্পষ্টত আরো বিস্তৃত যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে। একসময়ের শত্রু দেশ ইসরাইলের অনুকূলে আমিরাত ও বাহরাইনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে তাই নানা হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে। এসব হিসাবনিকাশে অগ্রাধিকার পাচ্ছে সামরিক কৌশল। যেখানে ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের পরবর্তী টার্গেট হিসেবে থাকছে ইরান, সিরিয়া ও লেবানন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ’৯০ সালের পর থেকেই আন্তঃআরব কলহের লাগামহীন বিস্তৃতি আঞ্চলিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের প্রসঙ্গটি দ্রুতই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। তবে গত তিন দশকে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কোনো পরিবর্তন না হলেও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ শক্তির সামরিক সক্ষমতা নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে। মূলত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে পশ্চিমাপন্থিদের পরাজয় আঞ্চলিক সামরিক ব্যবস্থাপনায় বড়সর পরিবর্তন এনে দেওয়ায় যে প্রেক্ষাপটের সূচনা হয়েছে তার সম্মিলিত চাপ সামলানো ইসরাইলের জন্য বেশ কঠিন। আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে ইসরাইল পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে চাইছে। সব শেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের নয়া মেরুকরণের পথটি প্রাথমিকভাবে ইসরাইলের জন্য সুখকর দৃশ্যমান হলেও শেষ পর্যন্ত এ স্তিতাবস্থা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে।

লেখক: বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
close