২৬/১১ মুম্বাই হামলা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই আতঙ্কের

২৬/১১ মুম্বাই হামলা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই আতঙ্কের
২৬/১১ তে মুম্বাই হামলা। ছবি: সংগৃহীত

মুম্বাই বিস্ফোরণ হামলার মূল কারিগর মুহাম্মদ হাফিজ সৈয়দের কারাদণ্ড হলে শুধু ভারত নয় গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে বিষয়টি। কারণ লস্কর-ই-তৈয়বা বা জামাত-উত-দাওয়া-র মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হাফিজকে সমস্ত প্রমাণ থাকা স্বত্বেও মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড অবশ্যই আসল ঘটনাকে লুকনোর চেষ্টা মাত্র।

গত সপ্তাহেই পাকিস্তানের সন্ত্রাস বিরোধী আদালত ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাই হামলার মূল ষড়যন্ত্রকারীকে এই সাজা দেয়। গোটা দুনিয়ার কাছেই হাফিজের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সবরকম তথ্য প্রমাণ থাকলেও এই রায়ের মাধ্যমে হাফিজকে রক্ষায় নিজেদের অবস্থান খোলসা করে দিয়েছে পাকিস্তান।

অবশ্য মুম্বাইয়ে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ হত্যার পরও যে হাফিজের কড়া শাস্তি হবেনা সেটা আগেই বোঝা গিয়েছিল। বিষয়টি এ বছরের ৯ জুন আরো পরিষ্কার হয়। মুহাম্মদ হাফিজ সৈয়দের সঙ্গী হাফিজ আবদুল রহমান মাক্কি, মালিক জাফর ইকবাল, ওয়াইয়া আজিজ আর আবদুল সালামদের শাস্তি ঘোষণার সময়ই তা উঠে আসে সাধারণ জনগণের কাছে। মুম্বাই হামলায় জড়িত ইকবাল আর আজিজের মাত্র ৫ বছর কারাদণ্ড হয়। আর মাক্কি ও সালামকে এক বছরের জন্য জেলে পাঠায় পাক-আদালত। হাফিজ ও তার দলবলকে ঘরোয়া রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের অভিযোগে শাস্তি দিচ্ছে পাক-সরকার।

আসলে জঙ্গিদের অর্থায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স বা এফএটিএফ-এর সন্দেহের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান। সামনের বছর মার্চে এফএটিএফ-এর অধিবেশনে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে পাকিস্তানকে। তাই আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা স্বচ্ছ করার তাগিদে ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাক-সরকারের সখ্যতা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে বহুদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ। তাঁদের কালো তালিকাভুক্ত করার দাবিও উঠছে বহুদিন ধরে। তাই অর্থনৈতিক অবরোধের আশঙ্কায় এফএটিএফ-কে বোকা বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে পাক-সরকার।

নিজেদের দোষ ঢাকতে ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে ব্যস্ত পাকিস্তান। ইতিমধ্যেই পাক-গোয়েন্দারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারত বিরোধী 'দলিল-দস্তাবেজ' তৈরি করেছে। ভারতই নাকি দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসের আতুর ঘর! পাক-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মহম্মদ ক্যুরেশি আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে বারবার বোঝাবার চেষ্টা করছেন এ কথা।

বাংলায় একটা কথা আছে, 'চোরের মায়ের বড় গলা!' পাকিস্তান এখন সেই প্রবাদকেই সত্যি হিসাবে প্রমাণ করতে ব্যস্ত। নিজেদের দোষ ঢাকতে চেষ্টার কোনও ত্রুটি তাঁদের নেই। তাই পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এফআইএ-র ৮৮০ পাতার তালিকায় মুম্বাই বিস্ফোরণের ১৯ জন সন্ত্রাসের নাম না থাকাটা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। বিশ্ববাসীর সঙ্গে প্রতারণা করে ইসলামাবাদ এক যুগ আগের ভয়াবহ বিস্ফোরণের যাবতীয় তথ্য মুছে ফেলার কাজে ব্যস্ত।

দুনিয়ার নজর অন্যদিকে ঘোরাতে ব্যবহার করা হচ্ছে পাক-গোয়েন্দারা। তবে পাকিস্তানিদের এই কারসাজি ধরে ফেলেছে পুরো বিশ্ব। আমেরিকা, কানাডা, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মরিশাস ও ইসরাইলের মানুষ সেদিন হারিয়েছিলেন তাঁদের প্রিয়জনকে। মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার শোক অনেকেই ভুলতে পারেননি আজও। হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন নারী সহ ১৬৬ জন মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়েছে ৪৬ নারী ও ১৩ শিশু-সহ ১৭৯ জন।

এমন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা মানব সভ্যতার পক্ষেই বিপজ্জনক। আর পাকিস্তান সরাসরি মদত দিয়েছে এই হামলায়। হামলায় নিহত মার্কিন নাগরিক অ্যালান শেরার ও তার ১৩ বছরের কন্যা সন্তান নাওমির শোকে আজও চোখের জল ফেলছেন তাঁদের পরিবার। মুম্বাইয়ের ওবেরয় ট্রিডেন্ট হোটেলে নৈশভোজে এসে জঙ্গি হামলার কবলে পড়েন তাঁরা। এরকম ভাবেই দেশ-বিদেশের বহু মানুষ জঙ্গিদের দানবিক আক্রমণের শিকার হন সেদিন। মার্কিন প্রকাশনা প্রোপাবলিকা মুম্বাই বিস্ফোরণের শোকগ্রস্তদের জবানবন্দি প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের অভিমত।

প্রোপাবলিকায় মন্তব্য করা হয়, “হামলায় প্রমাণিত হয়েছে লস্কর জঙ্গিদের সঙ্গে পাক-সরকারের সখ্যতা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কারণেই জঙ্গিদের ব্যবহার করছে ইসলামাবাদ। আফগান তালিবান সন্ত্রাসীদেরও মদত দিতে দ্বিধাবোধ করেনি পাকিস্তান সরকার। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানেই লুকিয়ে ছিলেন।

মুম্বাই বিস্ফোরণের তদন্তে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই-এর সঙ্গে লস্করের যোগাযোগের নতুন নতুন প্রমাণ উঠে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই গ্রেপ্তার করে ভারতে জঙ্গি হামলার ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া ডেভিড কোলেম্যান হ্যাডলিকে। লস্কর আর আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগসূত্রের ভূমিকায় ছিল হ্যাডলি। সে নিজেই বলেছে, মার্কিন, জিউস ও ভারতীয় নাগরিকদের খতম করার জন্য আইএসআই ও লস্কর যৌথভাবে ষড়যন্ত্রে সামিল ছিল। অর্থায়ন থেকে শুরু করে সব বিষয়েই আইএসআই জড়িত ছিল মুম্বাই হামলায়।

আইএসআই অফিসার মেজর ইকবাল হ্যাডলিকে হামলার বিষয়ে যাবতীয় গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করতেন। আক্রমণের লক্ষ্য নির্বাচন থেকে কৌশল সবই হয়েছিল মেজর ইকবালের নির্দেশনায়। বর্ষীয়ান লস্কর জঙ্গি মাজিদ মীর ছিলেন ২৬/১১ হামলার সমন্বয়কারীর ভূমিকায়। করাচীর হাই-টেক সেনা কমান্ড অফিস থেকে মীরের ফোনালাপও ধরা পড়েছে। স্পষ্ট শোনা গিয়েছে, সেখানে মীর চবদ হাউজে এক বন্দী নারীর মাথায় গুলি করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

পাকিস্তান মুম্বাই হামলার ষড়যন্ত্রকারীদের রক্ষা করে চলেছে। এর পিছনে রয়েছে নিজেদের স্বার্থ। ভারত ও আফগানিস্তানে জঙ্গি কার্যকলাপ জারি রাখার পাশাপাশি মুম্বাই ষড়যন্ত্রে তাঁদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা যাতে ফাঁস না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রয়েছে ইসলামাবাদের।

পাকিস্তানি সরকারি কর্মীরাই বলছেন, লস্কর এখনও ভয়ঙ্কর হামলা চালাতে পারে। তাঁরা পাকিস্তানি সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ। হাসপাতাল বা দাতব্য ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে পাক-জনগণের মধ্যেও তাঁদের প্রভাব রয়েছে। মুম্বাই বিস্ফোরণের পর বড় ধরনের কোনও হামলা না চালালেও লস্করকে নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে বড় ধরনের হামলার চালানোর মতো বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে তাঁদের। আইএসআইয়ের প্রশ্রয়ে বেড়েই চলছে অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার।

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক হ্যাডলিকে মার্কিন বিচার বিভাগ ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। ৩৫ বছর কারাদণ্ডও হয়েছে তাঁর। সেইসঙ্গে ভারতীয় আদালতকেও হ্যাডলির বিরুদ্ধে বহু প্রমাণ তুলে দেয় আমেরিকা। কিন্তু হাফিজ মহম্মদ সঈদ বা জাকিউর রহমান লাখভিকে কঠোর শাস্তি দিতে চায়না পাকিস্তান। আর এটাই প্রমাণ করে, ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানই আশ্রয় দিয়েছিল। কারণ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়াটা তাঁদের কাছে নতুন কিছু নয়।

পাক-সরকার চিরকালই সন্ত্রীদের মদত দেওয়ার পাশাপাশি তাংদের সুরক্ষিত রাখারও চেষ্টা করে এসেছে। ইতিমধ্যেই জঙ্গিদের পাকিস্তানি অর্থায়নের বিষয়টি নজরে এসেছে এফএটিএফের। এখনই সন্ত্রাস দমনে পাক-ভূমিকার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা স্টিমসন সেন্টার-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে, '২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর প্রমাণ হলো পাকিস্তানের সামরিক, রাজনৈতিক বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা চাননি বা পারেননি, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে’। এখন 'মুম্বাই ধাঁচের হামলা' দুনিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রায় একই ধরনের হামলার শিকার বাংলাদেশও।

২০১৬ সালের ১৫ জুলাই হোলি আর্টিজেনের হামলার সঙ্গে অনেকেই ২৬/১১-র মিল পান। আবার ২১ এপ্রিল, ২০১৯-এ শ্রীলঙ্কার গির্জায় হামলারও মিল রয়েছে মুম্বাই হামলার সঙ্গে। এই হামলাগুলি থেকেই বোঝা যায় দক্ষিণ এশিয় আঞ্চলিক সহযোগিতা বা সার্কের আসল উদ্দেশ্যই বিঘ্নিত হচ্ছে সন্ত্রাসের কারণে। সার্কভুক্ত দেশগুলির উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জঙ্গি শিবিরই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। দক্ষিণ এশিয় দেশগুলির কূটনীতিকরা সন্ত্রাস নিয়ে মুখ খুলতে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু সন্ত্রাস দমনে কার্যকরী ভূমিকার প্রয়োজন অনুভব করেন সকলেই।

আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্ট অনুসারে, ‘পুরো দুনিয়ার কাছেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দক্ষিণ-এশিয়া’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'সন্ত্রাসবাদীদের কারণে ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও আজ নানা দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন হতে পারে পাকিস্তানে পক্ষে। শুধু পাকিস্তানই নয়, আঞ্চলিক অস্থিরতাও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।' তাদের মতে, জঙ্গিদের মদত দিতে গিয়ে পাকিস্তান আজ নিজেই ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়াতেও রয়েছে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা। আর এসবের পিছনে রয়েছে জঙ্গিদের সঙ্গে পাক-সরকারের সখ্যতা। তবু ২৬/১১-র অপরাধীদের আগলে রেখে সন্ত্রাসীদের আজও মদত দিয়ে চলেছে পাকিস্তান।

ইত্তেফাক/এএইচপি/আরএ

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত