নাম, উপাধি এবং একজন গোল্ডেন মনির

নাম, উপাধি এবং একজন গোল্ডেন মনির
প্রতীকী ছবি

একসময় আমাদের দেশে খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নামের সঙ্গে উপাধি যোগ হতো। গুণ ও কাজের সঙ্গে সংগতি রেখে তাদের এসব উপাধি প্রদান করা হতো। সাধারণ মানুষের দেওয়া এসব উপাধি তাদের নামের সঙ্গে মিশে গিয়ে তার গুণকে ফুটিয়ে তুলত। উপাধি ছাড়া নামগুলো বললে তাদের চেনা যেত না। যেমন দাতা ছিলেন বলে হাজি মোহাম্মদ মুহসীনকে বলা হতো দানবীর মুহসীন। দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবন উত্সর্গ করেছেন বলে অবিভক্ত ভারতবর্ষের অবিসংবাদিত নেতা চিত্তরঞ্জন দাসকে বলা হতো দেশবন্ধু। এভাবে বাপুজি মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, সীমান্তগান্ধী আবদুল গাফ্ফার খান, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখার্জি, মাস্টারদা সূর্যসেন, শেরেবাংলা ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ উপাধি, নাম ও কর্মের গুণে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

এখন যুগ পালটেছে। মহাপুরুষদের জীবনী আমরা আর তেমনভাবে পাঠ করি না। আর বর্তমানে মহাপুরুষদের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। এখন সন্ত্রাসী, মস্তান, দখলদার, চাঁদাবাজ, অবৈধভাবে অসৎ পথে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিরাই ‘মনীষী’র খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এখনকার বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামের সঙ্গেও উপাধি যোগ হয়। তবে সেই উপাধিগুলো একটু অন্যরকম। এখনকার বিখ্যাত নাম হচ্ছে মুরগি মিলন, কালা জাহাঙ্গীর, লেদার লিটন, টোকাই সাগর, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হান্নান প্রমুখ। এ ছাড়া গত তিন দশকে দেশে বেশ কিছু আলোচিত নাম সংবাদপত্রের কল্যাণে দেশবাসী জানতে পেরেছে। তাদের মধ্যে নামজাদারা হচ্ছেন ডগ শিশির, চুই বাবু, জাপানি কিংবা প্যালেস্টাইন বাবু, ছ্যাঁচড়া কামাল, ভেতো শাহীন, কিলার আব্বাস, নাটকা বাবু, গিট্টু নাসির, শ্যুটার লিটন, টুণ্ডা জলিল, বোস্কামারা কবির, জংলী শামীম, ডিব্বা হারুন, আন্ডা দেলু, চোট্টা হাইবা, চিকা হারুন, চিটার হারুন, বাস্টার্ড সেলিম, ল্যাংটা করিম, সেঞ্চুরি মানিক, খচ্চর হাবিব, পকেট রফিক, ডাইনিং বাবু, ঠ্যাক খাইরু, ক্ষুর হাদিছ, টুণ্ডা হারুন, টুটু বাবু, কুইড়া কবীর, নুলা লিয়াকত, ফেনসি পাপন, চীনা রফিক, ডাইল খোকন।

এর মধ্যে সম্পত্তির ওয়ারিশ নিয়ে দ্বন্দ্বের ঘটনায় মৃত্যুর দুই দশক পরে আবার আলোচনায় এসেছিল হুমায়ূন কবির ওরফে মুরগি মিলন। সম্পদশালী এসব ব্যক্তি একসময় ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়াতেন। চলতেন দলেবলে গাড়ি হাঁকিয়ে, আগেপিছে অস্ত্রসমেত পাহারা নিয়ে। বছরে দু-তিনবার গ্রেফতার হয়ে সংবাদপত্রের শিরোনামও হতেন। তার রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, শুধু ছিল না সামাজিক স্বীকৃতি। বাবা মুরগির ব্যবসা করতেন বলে মা-বাবার দেওয়া হুমায়ূন কবির নামটি হারিয়ে যায় ‘মুরগি মিলন’ নামের আড়ালে। আর নিজের অর্জিত সন্ত্রাসী উপাধি যোগ হয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পরিচিতি পান সন্ত্রাসী ‘মুরগি মিলন’ নামে।

সোনা চোরাচালান আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিলেন মুরগি মিলন। এলিফ্যান্ট রোডে দোকান, গার্মেন্টস কারখানা, পল্টনে ফ্ল্যাট, হাতিরপুলে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন আরো কত কী। কিন্তু কিছুই ভোগ করে যেতে পারেননি। রেখে যেতে পারেননি উত্তরাধিকার। এখন সেই সম্পদ চলে গেছে অন্যের হাতে।

আশির দশকের শেষ ভাগে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নামজাদা ক্যাডার ছিলেন। তিনি খ্যাতিমান ছিলেন ‘ডগ শিশির’ হিসেবে। শিশির কাঁটাবনে পশু-পাখির মার্কেটে গিয়েছিলেন চাঁদা আনতে। এখানকার ব্যবসায়ীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডারদের নিয়মিত চাঁদা দিতেন। একদিন শিশির চাঁদা পাননি বা প্রত্যাশা অনুযায়ী পাননি। তাই রাগ করে দোকান থেকে একটি বিদেশি কুকুর নিয়ে চলে এসেছিলেন। তারপর সেই কুকুর তার সঙ্গী হয়ে ওঠে। মোটরসাইকেলের পেছনে সেই কুকুর নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াতেন। রসিক শিক্ষার্থীরা তাকে ‘ডগ শিশির’ নামে ডাকতে শুরু করেন। এভাবে একদা গ্রাম থেকে আসা শিশির আসল নামের সঙ্গে ‘ডগ’ উপাধি অর্জন করে ‘ডগ শিশির’ নামেই অমর হয়ে রইলেন।

সম্প্রতি আরো একজন এমন উপাধিপ্রাপ্ত গুণধর ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। তার আসল নাম মনিরুল ইসলাম। পেশা স্বর্ণ ও গাড়ি ব্যবসায়ী। সেলসম্যান থেকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া মনির এখন খ্যাতি অর্জন করেছেন ‘গোল্ডেন মনির’ হিসেবে। একেবারেই সোনার ছেলে। তিনি দুবাইয়ে পাড়ি দেওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা পাকা করেছিলেন। কিন্তু বেরসিক র্যাব তার বাসায় অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি তাকে গ্রেফতার করে।

কী সুন্দর সিনেমার নায়কের মতো তার জীবনকাহিনি! নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন মনির। এরপর রাজধানীর মৌচাকের একটি ক্রোকারিজ দোকানে তিনি কাজ নেন। সে সময় এক লাগেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হলে মনির লাগেজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত—এই রুটে তিনি প্রথমে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিক, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার সামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করতেন। এই কাজগুলো করতে করতে তিনি লাগেজে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাকারবারি কাজে সাহায্য করে। সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।

শুধু তাই নয়, ২০০১ সালে তত্কালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার রাজউকের ডিআইটি প্রজেক্টে প্রতারণার মাধ্যমে অনেক প্লট নিজস্ব করে নেন। এভাবে রাজউক থেকে প্লট-সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে রাজউক পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে বিপুলসংখ্যক প্লট করেন।

অভিযোগ আছে, তিনি বর্তমানে নামে-বেনামে দুই শতাধিক প্লটের অধিকারী হয়েছেন। গোল্ডেন মনির আসলেই গোল্ডেনম্যান। এভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে সামান্য থেকে অসামান্য হওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়। আমরা যে দিন-রাত পরিশ্রম করি, সারাক্ষণ আচ্ছন্নের মতো ছুটে বেড়াই, সে তো জীবনে অর্থ-বিত্ত-প্রতিষ্ঠার জন্যই। কিন্তু কজন তা পারি? মনির সেটা করতে পেরেছেন। তিনি ‘ডগ’ কিংবা ‘মুরগি’ নন, উপাধিটাও পেয়েছেন বেশ লাগসই। ‘গোল্ডেন মনির’।

গোল্ডেন মনিরকে পাকড়াও করা মোটেও উচিত হয়নি। তিনি সমাজে সাফল্যের একটা দৃষ্টান্তে পরিণত হচ্ছিলেন। প্লট-সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে রাজউক, পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে বিপুলসংখ্যক প্লট বাগিয়ে নেওয়াটা মোটেও সহজ কাজ নয়। এমন দৃষ্টান্ত অতীতে কেউ দেখাতে পেরেছেন বলেও শোনা যায়নি। তাকে আরো বেশি সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। আর শুধু সোনা নয়, তাকে হীরার ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। হীরা নিয়ে কায়কারবার করলে তার উপাধিটা ‘ডায়মন্ড মনির’ হতে পারত। একটা মানুষের সম্ভাবনাকে এভাবে অঙ্কুরে ধ্বংস করে দেওয়ার কোনো মানে থাকতে পারে না!

হতাশাবাদীরা যতই হা-হুতাশ করুক, আমাদের দেশ কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বিস্ময়করভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। মুরগি মিলন, ডগ শিশির, লেদার লিটন, কালা জাহাঙ্গীর কিংবা গোল্ডেন মনিরদের সৃষ্টি ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি ঈর্ষণীয়। এমন জিরো থেকে হিরো হওয়া ব্যক্তিদের জন্ম-বিকাশের উদার লীলাভূমি পৃথিবীতে খুঁজে দ্বিতীয়টি আর মিলবে বলে মনে হয় না। এ দেশের সর্বত্র এখন গোল্ডেন মনিরদের চাষ হচ্ছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে তাদের বীরত্ব, তাদের অসাধারণত্ব, সামান্য থেকে অসামান্য হওয়ার দুর্দান্ত সব গল্প। রূপকথার নায়ক বলুন, অলৌকিক মানুষ বলুন আর মহাপুরুষই বলুন, একালে গোল্ডেন মনিররাই সবকিছু। রাজধানীতে, বন্দরনগরীতে, জেলা শহরে, গ্রামগঞ্জে—সবখানে তাদের বাড়বাড়ন্ত। তাদের কেউ কেউ গণতন্ত্রের সৈনিক সেজে বুলি কপচাচ্ছে, মাননীয় নেতানেত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলছে, সেই ছবি পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। তারপর এই তারাই নিরীহ লোকজনের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, জমি দখল করছে, ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে, অপহরণ করছে, ধর্ষণ করছে, নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে, প্রতিপক্ষের এক-দুই জন রাজনৈতিক কর্মীকে অবলীলায় নিজের হাতে খুন করছে, দলের মধ্যে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলে তাকে নির্দ্বিধায় হত্যা করছে।

প্রোডাকশন বেশি হয়ে গেলে নাকি সাপ্লাই বাড়িয়ে দিতে হয়। এজন্য মাঝেমধ্যে গুদাম খালি করতে হয়। এই গুদাম খালির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে র্যাবকে। মাঝে মাঝে দু-চারজনকে ধরে গারদে পোড়া হচ্ছে। দু-চারজনকে বিদেশে কিংবা যমালয়েও পাঠানো হচ্ছে। সেই ঘাটতি সঙ্গে সঙ্গেই পূরণ হয়ে যাচ্ছে। কারণ দেশে এমন ‘গোল্ডেন মনির’ তৈরির মেশিন সারাক্ষণই পূর্ণ শক্তিতে কাজ করে যাচ্ছে!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
close