কোন পথে হাঁটছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ! 

কোন পথে হাঁটছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ! 
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকা [ফাইল ছবি]

নীরবতা নাকি সম্মতির লক্ষণ! যদি তাই হয়, তবে এক ভয়ংকর শংকা আজ জাতির সামনে অপেক্ষমান। এ শংকা অস্তিত্বের, এ শংকা অবক্ষয়ের, এ শংকা ত্রিশ লাখ শহীদ আর দু, লাখ মা বোনের সাথে আত্মপ্রবঞ্চনার। স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতির জনকের দল আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, এই সময়ে এমন শংকার কারণ কি? হেফাজত নেতা মাওলানা মোমিনুল হক অতি সম্প্রতি ভাস্কর্য নিয়ে এক ভয়াবহ হুংকার ছেড়েছেন, কোন রাখঢাক ইশারা ইংগিত নয়, খুবই স্পষ্ট করেই বলেছেন, জাতির জনকের ভাস্কর্য করতে দেয়া হবে না, প্রয়োজনে ভাসিয়ে দেবেন। এমন হুংকার ছেড়েও মোমিনুল হক দেশেই আছেন, বহাল তবিয়তেই দিন যাপন করছেন। যতদুর জানি জাতির জনককে নিয়ে কটুক্তি করা, ছবির অবমাননা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, আর এমন অপরাধে বহু মানুষ কারাবন্দী হয়েছেন, চাকুরী থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। এই তো গত সপ্তাহে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তার নিজস্ব ফেসবুক লাইভে এমনি কটুক্তির অপরাধে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন। ছবির অবমাননা, সামাজিক মাধ্যমে কটুক্তি যদি ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে শতাব্দীর মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার সদম্ভ ঘোষণা দিয়ে এখনো কেন মোমিনুল হক চার শিকলে আটকা পড়েননি? নাকি এর পিছনে জটিল রাজনীতির কোন হিসেব নিকেশই মূখ্য হয়ে উঠেছে?

ঐতিহ্যগত ভাবেই বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দেশ। যুগ যুগ ধরেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান মিলে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশেই (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) বসবাস করছে এ অঞ্চলের মানুষ। তাই তো পাইকগাছায় মন্দিরের পাশে সংখালঘু মানুষের স্বতস্ফুর্ত সহযোগিতায় তৈরি হয় মসজিদ, হবিগঞ্জে করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের জামাত পরিচালনায় স্বেচ্ছাসেবকের ভুমিকা পালন করে জেলা পূজা উৎযাপন পরিষদ। নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদকে ধর্মীয় খোলসে আবদ্ধ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার প্রচেষ্টা ও এ দেশে নতুন নয়। ১৯৭১ সালে তো ধর্মের নামে গঠিত অপশক্তি আমাদের মা বোনদের 'গনিমতের মাল' আখ্যায়িত করে ধর্ষনের মতো জঘন্যতম অপরাধ কে ও জায়েজ করে দিয়েছিলেন। তাই তো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করণ তথা ধর্ম কে রাজনীতির উর্ধে রেখে সকল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা কে অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার' এমন উদ্দীপনায় জাতি যখন এগিয়ে চলছে, এমন সময়ে সা¤প্রদায়িক শক্তির ঘন ঘন আস্ফালন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অসা¤প্রদায়িক সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা কে গুড়িয়ে দেয়ার কোন সুগভীর ষড়যন্ত্র নয়তো?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি আর ভাস্কর্য এদেশের কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা, আবেগ আর ভালোবাসার প্রতীক, লাখ লাখ আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীর হৃদয়ের স্পন্দন। যে ভাস্কর্য আর প্রতিকৃতি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে মহান নেতার জীবনী সম্পর্কে জানার অনুপ্রেরণা যুগাবে, জাতীয়তাবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার জীবনীশক্তি হবে, সেই নেতার ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা শুধুই কি একটি বক্তৃতা? মোটেই নয়, যদি তাই হতো তাহলে ২৭ নভেম্বর ২০২০ তারিখে হাটহাজারীর সম্মেলনে বাবুনগরী, যে কেউ ভাস্কর্য বসালে টেনে হিছড়ে ফেলে দেয়ার মতো দুঃসাহসিক ঘোষণা দিতেন না। যে দেশে জাতির জনককে হেয় করা আইনত নিষিদ্ধ, কটুক্তি করে অনেকেই শিকলবন্দী হয়েছেন, সেখানে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ভয়াবহ হুমকিতে ও সরকার তথা আওয়ামী লীগ নীরব কেন?

মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। নেতা, কর্মি সমন্বয়ে বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই দলটিকে জানে দেশের আপামর জনগোষ্ঠী। দেশ মাতৃকার সুরক্ষায় আর ত্যাগ তিতিক্ষায় পরীক্ষিত নেতাকর্মীর সংখ্যা ও কম নয়, তবু ও ভাস্কর্য কে উপড়ে ফেলার ঘোষণায় সরকার ও আওয়ামী লীগের নিরবতা কি দলটির ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার কোন লক্ষণ? উন্নয়নের জোয়ারে উপেক্ষিত নেতা কর্মী কি মনোবল হারিয়ে দিশেহারা? না কি সময়ের পরিবর্তনে দল টি তার আদর্শিক পিতা জাতির জনকের নীতি আদর্শের সংস্কারে নিয়োজিত? এর কোন একটির উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয় তবে জাতি হিসেব আমাদের অমানিশার অন্ধকার বোধ হয় বেশি দূরে নয়।

৭৫ এ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীল নকশায় সুপরিকল্পিত পট পরিবর্তনের পর ২১ বছরে দূঃসহ নির্যাতন সহ্য করেও যে দলের নেতা কর্মীরা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, লাল দীঘির মাঠে সামরিক জান্তার বুলেটে একের পর এক জীবন্ত দেহ নিথর হলেও যে আদর্শিক কর্মীরা পিছু হটেনি, ২১ আগষ্টের ছিন্নভিন্ন লাশের সামনে দাঁড়িয়ে মানববর্ম তৈরি করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও যে দলের নেতা কর্মীরা তার প্রাণপ্রিয় নেত্রীর জীবন বাঁচাতে পারে, সেই নেতাকর্মীরা কোন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হুংকারে ভীত হয়ে নীরবে জাতির পিতার আদর্শিক মৃত্যু কে মেনে নিতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে দলটিতে কিছু খোলস পরা সুবিধাবাদীর আবির্ভাব হলেও আদর্শিক আর ত্যাগী নেতা কর্মী ও আছে অগনিত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে জীবন কাটিয়ে সরকারে গিয়ে মহোদয় সেজে আজ যারা খবরদারি করছেন, সা¤প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে আদর্শিক লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা হবে অশ্বডিম্ব।

নেতৃত্ব আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়-প্রত্যয়ী শেখ হাসিনা সমসাময়িক রাজনীতিতে আজ অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত যার সমকক্ষ বা বিকল্প কোন রাজনীতিক বাংলাদেশে নেই। পিতার দেখানো পথে, পিতার স্বপ্ন কে বাস্তবায়ন ই এখন তার ধ্যান জ্ঞান, তাই তো সংসদে দাঁড়িয়ে জাতির পিতার আত্মজীবনী পাঠ করে সাংসদ আর জাতিকে উজ্জীবিত করতে ও ভুল করেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতিকে কলংকমুক্ত করলে ও অপশক্তির প্রেতাত্মারা এখনো সক্রিয়, শুধুমাত্র আর একটি সুযোগের ই অপেক্ষায়, এঁরাই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে সামনে রেখে গোলা পানিত মাছ শিকার করতে চায়, শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেকে ভূলুণ্ঠিত করে ভাস্কর্য আর প্রতিকৃতি মূক্ত বাংলা বানাতে চায়। ধর্ম নিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রশ্নে এদের সাথে যে কোন আপোষরফা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক মৃত্যু। আর একে প্রতিরোধ করতে হলে সারা জীবন ব্যবসা বাণিজ্যে মত্ত থাকা হঠাৎ রাজনীতিক আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসা মহোদয়দের দিয়ে নয়, রাজপথের পরীক্ষিত অভিমানে দূরে থাকা আদর্শিক, ত্যাগী নেতা কর্মীরা ই হতে পারে একমাত্র অবলম্বন।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশে­ষক

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত