বাইডেন মেয়াদ ও উপমহাদেশ

বাইডেন মেয়াদ ও উপমহাদেশ
প্রতীকী ছবি

সব ধরনের সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্রেটিক দলীয় জো বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা দেবী হ্যারিস ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। প্রেসিডেন্ট-ইলেকট জো বাইডেনকে দেওয়া জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ)-র প্রশাসক এমিলি মারফির পত্র থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই পত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তুত থাকার কথা জানানো হয়েছে। তিন সপ্তাহেরও বেশি আগে জো বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় স্বীকার করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া এটিই প্রথম পদক্ষেপ।

মারফি তার পত্রে বলেছেন, আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর বিলম্ব করার জন্য তিনি হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে কোনো চাপের সম্মুখীন হননি। এছাড়া ‘ভীতি বা পক্ষপাতিত্ব’ করে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেননি। মারফি তার পত্রে লিখেছেন, ‘অনুগ্রহ করে এটি জেনে রাখুন যে স্বাধীনভাবে আইন এবং প্রাপ্ত সত্য ঘটনাবলির ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হোয়াইট হাউজ বা জিএসএসহ নির্বাহী বিভাগের কোনো কর্মকর্তার চাপে আমার সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু বা সময় নির্ধারিত হয়নি। স্পষ্টত, আমি আমার সংকল্প বিলম্ব করার জন্য কোনো দিকনির্দেশনা পাইনি।’

প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণ দিয়েছেন বাইডেন। ডেলাওয়ারে নিজের শহর উইলমিংটনের মঞ্চে ছিলেন তার জয়ের অংশীদার তথা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত ভারতীয়-আমেরিকান কমলা হ্যারিসও। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দে সঙ্গীদের সঙ্গে নৃত্যের ছন্দে তাল মিলিয়েছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়ে প্রথম থেকেই আমেরিকার সব মানুষের স্বার্থরক্ষার কথা বাইডেন-কমলা জুটির মুখে শোনা গেছে। নির্বাচিত হওয়ার পর কমলা হ্যারিস তার ফেসবুকের টাইমলাইনে নভেম্বরের ৯ তারিখে আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘আমেরিকার জনগণের প্রতি-- আপনারা কাকে ভোট দিয়েছেন এটি কোনো ব্যাপার নয়। জো বাইডেন যেমনটি বারাক ওবামার প্রতি ছিলেন, আমিও তেমন অনুগত, সত্ এবং প্রস্তুত, প্রতিদিন আপনার ও আপনার পরিবার সম্পর্কে চিন্তা করে সজাগ থাকব।’

ট্রাম্প কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এমিলি মারফির ওপর ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ ছিল। তবে সাম্প্রতিককালে রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছিল। এক বিবৃতিতে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর রব পোর্টম্যান ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এ যাবত্ কোনো আঙ্গরাজ্যেই ব্যাপক বিস্তৃত জালিয়াতি বা অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়ে জো বাইডেনকে এই পত্র দেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প জিএসএ প্রশাসক এমিলি মারফিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না, তিনি নির্বাচিত হন জনগণের নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা। জনপ্রিয় ভোট বা কংগ্রেসের দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার বিকল্প হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতাগণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ইলেকটোরাল কলেজ সৃষ্টি করেছেন। সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ, সেকশন ১ অনুযায়ী ইলেকটোরাল কলেজ হচ্ছে আনুষ্ঠানিক একটি প্রতিষ্ঠান, যা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে থাকে। ইলেকটোরাল কলেজে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ততজন ‘নির্বাচকমণ্ডলী’ আছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সেই অঙ্গরাজ্যের যতজন প্রতিনিধি ও উচ্চকক্ষ সিনেটে যতজন সিনেটর আছেন এবং এই সঙ্গে ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার তিন জন নির্বাচক আছেন। ভোটাররা যখন একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে যান, তারা প্রকৃতপক্ষে নির্বাচকমণ্ডলী বা ইলেকটোরাল কলেজের সদস্যদের নির্বাচিত করার জন্য ভোট দিয়ে থাকেন। সব ইলেকটোরাল ভোট সেই প্রার্থীরই হয়, যারা সেই অঙ্গরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ। অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের পর অফিসিয়ালরা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জনপ্রিয় ভোট সম্পর্কে সার্টিফাই করেন, বিজয়ী নির্বাচকগণ অঙ্গরাজ্যের রাজধানীতে মিলিত হন এবং দুটি ব্যালটে ভোট প্রদান করে থাকেন—একটি প্রেসিডেন্টের জন্য, অপরটি ভাইস প্রেসিডেন্টের জন্য। প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যদি একজন নির্বাচকের নিজের অঙ্গরাজ্যের হয়ে থাকেন, তাহলে সেই প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচক ভোট দিতে পারেন না।

বাইডেন আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্টের এই সংখ্যা গণনা করা হয়েছে একই ব্যক্তি কর্তৃক নিরবচ্ছিন্নভাবে একাধিক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে এক মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হিসেবে। উদাহরণস্বরূপ, জর্জ ওয়াশিংটন পর পর দুবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তাকে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণনা করা হয়েছে; প্রথম ও দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করার পর জেরাল্ড ফোর্ড ৩৮তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি সোজাসুজিভাবে নিক্সনের দ্বিতীয় মেয়াদের অবশিষ্ট সময়টুকুর জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং কখনোই নিজে প্রেসিডেন্সিতে নির্বাচিত হননি। গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ২২তম ও ২৪তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং তার এই দুই মেয়াদ ধারাবাহিক বা উপর্যুপরি ছিল না। একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট, যিনি আমেরিকার সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী অস্থায়ীভাবে অ্যাকটিং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন, তাকে প্রেসিডেন্টের সংখ্যাক্রমে গণনা করা হয় না, কারণ এ ধরনের মেয়াদকালে প্রেসিডেন্ট স্বয়ং পদে বহাল করেন।

এই নির্বাচন বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আনতে পারে? তেমন কোনো তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবে না বলেই প্রায় সব বিশেষজ্ঞই মনে করছেন। অতীতে যখন বারাক ওবামা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যে ধরনের সম্পর্কের রসায়ন গড়ে উঠেছিল, সেই রসায়নের ধারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেও চলমান ছিল। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গেও ভারত তথা নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কের পূর্ববর্তী ধারা বজায় থাকবে। অপর কথায়, মোদি এটি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

বিগত দুই দশক যাবত্ বিশেষত প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, বাণিজ্য, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটনের কাছে ভারত হচ্ছে স্বল্প কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর মধ্যে একটি।

ফরেন পলিসি জার্নালের স্যালভাটোরে বাবোনেস লিখেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের প্রতি আমেরিকার কঠোর নীতির সম্ভাবনা দেখা দিলেও এ দুই বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশের সম্পর্কের যে বিস্তৃততর প্রেক্ষাপট, সে ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর করা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অর্থাত্, পূর্ববর্তী ধারা বজায় থাকবে। ২০১৫ সালে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর কোনো কোনো আচরণ সম্পর্কে সমালোচনা করেছিলেন। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে, চীনের বিরোধিতার দৃঢ় অবস্থানের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি সাধারণ কারণ খুঁজে পাবে।

ভারতের বাইরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতির কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। যেমনটি ফরেন পলিসি জার্নালের আলি লতিফি লিখেছেন, আফগানিস্তানের জনগণ এটি জানে যে তাদের জন্য মার্কিন নীতির ধরন যথারীতি প্রস্তুত। ট্রাম্পের আমলে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা বাইডেনের আমলেও অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশ। এ দুটি দেশ ট্রাম্প চলে গেলেও বাইডেনের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারবে। ইসলমাবাদ ২০০৮-এর কথা হয়তো মনে রাখবে, যখন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর জন্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তার ব্যাপারে তখন দেনদরবারে বাইডেন সাহায্য করেছিলেন, যার ফলে পাকিস্তান তাকে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান হিলাল-ই-পাকিস্তান উপাধিতে ভূষিত করেছিল। আগামী ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট কমলা দেবী হ্যারিস দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবেবলে ধারণা।

লেখক: ‘ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক এবং সাবেক চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত