বিজয়ের অপ্রতিরোধ্য চিহ্ন

বিজয়ের অপ্রতিরোধ্য চিহ্ন
প্রতীকী ছবি

করোনার বিদায় আসন্ন। মানুষের প্রেম, প্রেমের যৌথশক্তি, যৌথতার একাগ্রতা এখন মুখ্য; এখন চাঙ্গা সর্বগামী লড়াই; এখন যুক্তি, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পচর্চার সব অঙ্গনই এক হয়ে, এক স্বরে, নিঃশব্দ চোরাগোপ্তা সংক্রমণের কবর খুঁড়তে ব্যস্ত। অতএব মরণব্যাধির উচ্ছেদ আর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। অনিবার্য। এটা নিছক আবেগ বা আশাবাদের কুসুমঝুরি নয়, অবিনশ্বর সত্যের যুদ্ধংদেহি, রণজয়ী লক্ষণ। এবং সর্বত্রজয়ী পরিসংখ্যানেরও চেহারা। আজকের, ২০২০-এর ৩০ নভেম্বরের বিশ্বতথ্যটি দেখুন। এ পর্যন্ত মৃত ১৪,৬২,৯৪৫। আক্রান্ত বা চিকিৎসাধীন ৬,২৮,৭২,২০২। সুস্থ ৪,৩৪,২৩,৩৩৭। তার মানে সুস্থতা বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিল থমকে যাচ্ছে। দিন কয়েকের মধ্যে নিরাময়ের হার সংক্রমণের ব্যপ্তিকে অবশ্যই হার মানাবে।

যে আমেরিকা সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত, যেখানে মৃত্যু সর্বোচ্চ, সেখানেও প্রতিরোধের শক্তির সামনে নতুন ব্যাধি বৃদ্ধির শঙ্কা মাথা নোয়াচ্ছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্তারে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়; ভয় ছিল, ঘনবসতি আর অপ্রতিহত জনসংখ্যার কারণে ভারতের বিপর্যয় সব দেশকে ছাপিয়ে যাবে। সৌভাগ্য, হয়নি তা। সতর্কতা, জনযুদ্ধ, গণচেতনা কোভিডকে মন্থর করে দিচ্ছে। ভারতে এই লেখা পর্যন্ত আক্রান্ত ৯৩,৯২,৯১৯। মৃত ১,৩৬,৬৯৬। সুস্থতার গতি ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, ৯০ পেরিয়ে শতাংশের দিকে এগোচ্ছে। আগামী দুমাসের মধ্যে সম্ভবত সংক্রমণ আরো কমবে। কমবেই। বঙ্গের চিত্র এর চেয়েও আশাব্যঞ্জক। মৃত্যু ৮৩৭৬। আক্রান্ত ৪,৮০,৮১৩। সুস্থতা ৯৭ শতাংশ। এসব তথ্য, অবশ্য অতি অবশ্য প্রমাণ করছে, মানুষের ঐক্য, সমবেত যুদ্ধ, মানবিক সংকল্প তার ঘোষিত লড়াইকে জয়ের ঊর্ধ্বে উঁচিয়ে সার্বিক জয়কে সুনিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশে বিজয়ের মাস, করোনাকালে বহু মহাপ্রাণ আর বিবেককে হারানোর জাগ্রত বেদনা সত্ত্বেও দুই দেশ তার জয়-বিজয়ের মুখ চওড়া করবে। যাদের হারিয়েছে, জাগিয়ে রাখবে তাদের নির্মাণ আর সৃজনের বিচরণকে। দুর্ভাগ্য, কো-মর্বিডিটির শিকার হয়ে একই দিনে চলে গেলেন দুই সমবয়স্ক প্রজ্ঞা দেবেশ রায় আর আনিসুজ্জামান...কিছুদিন পরেই যুক্তি আর বিবেকের উজ্জ্বল প্রতিনিধি প্রণব মুখোপাধ্যায় (ভারতের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি); থিয়েটার ও অভিনয়ের বহুমাত্রিক প্রতিভা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর আলী যাকেরকে হারাতে হলো, হারালাম আমরা কামাল লোহানী; অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, স্বপন মজুমদার, আবুল হাসানাতসহ বহু মনীষাকে...তাদের শূন্যতায় নিঃস্ব-রিক্ত বোধ করছি, এসব মৃত্যু যে ক্ষত, যে স্থায়ী চিহ্ন রেখা যাচ্ছে, তাতে সামাজিক কান্না বুকে বড্ড বাজছে, কান্নার ভেতরে বাইরেও আমাদের জাগৃতি, আমাদের অঙ্গীকার, আমাদের জেদ বিচ্ছেদের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠছে তবু।

একে একে আলো নিভে যাচ্ছে বটে, ব্যক্তিক ও সামগ্রিক ভাঙন আর বেদনা তার আগ্রাসন প্রকট করে তুলছে, কিন্তু প্রকটতা, ভাঙনের আওয়াজ আর নৃশংস আয়োজন পেরিয়ে আমরা ব্যক্ত-অব্যক্ত উষ্ণতাকে, বেঁচে থাকার, অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনকে কি নাকচ করে দিচ্ছি? না, এরকম হতে পারে না। হবে না, বীরের মৃত্যুতে মানুষ চিরদিন কাঁদে না। কিছুক্ষণ, কয়েক দিন, কয়েক মাস ভেতরের কান্নায় বসবাস করতে থাকে, তারপর শোক আর শূন্যতাবোধকে রুদ্ধ করে ভালোবাসার জগেক বিস্তৃত করে স্থায়ী আর সীমান্তহীনতায় পৌঁছে দেয়। গত শতকের দুই মহাযুদ্ধ, পরপর মহামারি, দেশে দেশে ভাঙন, মানবসম্পদের ক্ষয়কে কালজয়ী, স্থায়ী ক্ষতে রূপান্তরিত করে মানুষের সমবেত উচ্চারণ, শিল্পচর্চা সাহিত্যবাস ও দর্শন কি নব নব দিশা তৈরি করেনি? আলবত করেছে। এর সেরা কয়েকটি দৃষ্টান্ত...গ্রেট বেঙ্গল ফেমাইন নিয়ে কালোত্তীর্ণ চিত্র এঁকেছেন জয়নুল আবেদিন আর সোমনাথ হোর। মহাযুদ্ধের ভাঙন অতিক্রম করে প্রায় একই সময়ে চিত্রশিল্পে কিউবিউজম আর বিজ্ঞানে আপেক্ষিকতাবাদ আবিষ্কার করেছেন পাবলো পিকাসো ও আইনস্টাইন। বছর কয়েক পরে, মহামারির তিক্ত অভিজ্ঞতায় আলোড়িত হয়ে কল্যাণপ্রসূ অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট সজ্ঞার নতুন পরিচিতি জানিয়েছেন অমর্ত্য সেন। ব্যক্তিপ্রতিভার বিচ্ছুরিত আলো এসব। সামাজিক সত্তা ও কি ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে সৃজন আর নির্মাণের চেহারা দেয়নি? ঔপনিবেশিকতাকে হটিয়ে গড়ে তোলেনি নতুন নতুন দেশ!

বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ১৯৪০ থেকে ’৬০ পর্যন্ত আমরা কীসের সাক্ষী হয়ে রইলাম? অন্ধকারের বিস্তার না আলোকিত মহিমার? দৈত্যের না, দৈত্যনাশের অযূথ শক্তির? বিজ্ঞানের বিজয়, না মূঢ়তার, কুসংস্কারের, না-শিল্পের, অসেবা আর অধর্মের গ্লানিময় বিভ্রান্তির? অবশ্যই দাবি করব, পরপর দুই মহাযুদ্ধ, মহামারি এবং সভ্যতার সংকট মৃত্যুকে, ক্ষয় আর অবক্ষয়কে, প্রিয়জনবিরহকে যতটা ভারী করেছে, তার চেয়ে কুিসতকে, কুিসতের অনুশাসন আর আগ্রাসি অভিপ্রায়কে গুঁড়িয়ে দিয়ে মানবসভ্যতাকে, হূদয়ের সত্যতাকে অধিকতর শক্তপোক্ত ভূমিতে, দিকদিগন্তে, মহাকাশে, মহাসমুদ্রের অতলে স্থাপিত করেছে সর্বজয়ী মানুষ।

যেখানে সে ধ্বংসস্তূপ দেখেছে, বিশ্বাসের ভাঙন লক্ষ করেছে, দেখেনদারি প্রেমের আড়ালে প্রকট, অনুর্বর ছলনা তাকে গ্রাস করতে চেয়েছে, হুমকি দিয়েছে মৃত্যু, সেখানেই সে প্রাথমিক সংশয়, দিশাহীনতা, ভয়কে তুচ্ছ করে, ভেদ করে তার আত্মতায়, নির্বিশেষের সত্তায় যুক্তি, বুদ্ধি আর বিজ্ঞানকে জড়ো করে লড়াই উত্তীর্ণ ভাবও আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এটাই তার ভেতরের সুন্দরের অভিমুখ, বাইরের বিন্যাস ও কর্মকাণ্ডেও সে অভিন্ন অভিযানের যাত্রী। যেখানে পরাজয় নেই। জয়, বিজয়, উন্মোচন, উদ্ভাবন তার নিত্যসঙ্গী। সহযোগী দুঃসাহস আর আত্মবিশ্বাস। সভ্যতার জন্ম ও উষালগ্ন থেকেই মানুষের আত্মিক যুদ্ধের ইতিহাস খানাখন্দ, জ্বরা ও মৃত্যুকে হার মানানোর বৃত্তান্ত। সব সময় সে কিছু একটা হতে চায়, জিততে চায়, অথবা অঘরে ঘর বানায়। নোনাজলে, নোনাডাঙায় ফসল ফলায়। ছবি আঁকে, অন্যকেও আঁকার স্পৃহা জোগায়; নিজে লেখে, অন্যকেও লেখায়, যে হাঁটতে জানে না, রাস্তা চেনে না তাকেও জলাশয় দেখিয়ে বলে হাঁটো, হাঁটতে থাকো। সূর্যোদয় সামনে। বিপর্যয় নয়, ধ্বংস নয়, সম্মুখে তরুণ ইচ্ছার জয়। এটাই চড়াই-উতরাই সভ্যতার, মানববোধের ইতিহাস এবং মানুষের স্বনির্মিত, স্বনির্ণীত নিয়তি। তার ইঙ্গিত আর আত্মনিবেদনে যে এগিয়ে আসে, তাকে সে সমর্পিত বাক্যে, সজল উচ্চারণে আকুতি জানায়, চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না সরায়ে।

করোনাজয়ী, করোনাত্তীর্ণ বিশ্ব ব্যক্তিমানুষের, সমষ্টিরও এই মুখ, এই আরজ গোজারিশ স্তরে স্তরে দেখতে পাবে এবং মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে বলবে, নো করোনা, নো ডিফিট। আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাতই ভবিতব্য। ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান আর সাহিতের (সাহিত্য) সঙ্গে যার গার্হস্থ্য অঙ্গে অঙ্গে জড়িত, রঙ্গ বিরঙ্গে সে ক্ষতচিহ্নকে ধূসর করে ধ্বংসস্তূপে স্বজন হারানোর বেদনা আর অনির্বাণ প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে, যা শ্বাশত। অব্যয়। মানুষের শ্রম, অধ্যবসায় আর অর্জনের পূর্ব ও দীর্ঘতর কাহিনিতে তার আশু বিজয়ের ইশারা ছড়িয়ে আছে। তার ইঙ্গিতে সংকট নয়, সুস্থতারই এইসব সাংকেতিক উদ্বোধন বাড়িয়ে তুলছে প্রত্যাশা। করোনার বিনাশ মাড়িয়ে পৃথিবী নতুন এক পৃথিবীকে দেখবে। বদলাবে। গড়বে স্থিতি আর শান্তির ভিন্নতর ইমারত।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত