করোনা পরিস্থিতি ও সরকারের ঋণ

করোনা পরিস্থিতি ও সরকারের ঋণ
করোনা পরিস্থিতি ও সরকারের ঋণ। ফাইল ছবি

মন ভালো নয়। একে একে বন্ধু ও পরিচিতরা চলে যাচ্ছেন নিষ্ঠুর ‘করোনা-১৯’-এর মরণ আক্রমণে। প্রথমেই গেলেন আনিস স্যার, আমাদের সবার আনিসুজ্জামান স্যার। পরে গেলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ইঞ্জিনিয়ার তারেক আলী। গেলেন কালি ও কলমের সম্পাদক বন্ধু আবুল হাসনাত। দুই-তিন দিন আগে গেলেন দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুনীরুজ্জামান। সর্বশেষ সংবাদ আলী যাকেরের। ইত্তেফাকের শিরোনাম :‘নিভে গেল মঞ্চের আলো’। অধিকন্তু প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। শতে শতে, হাজারে হাজারে। এমতাবস্থায় কার মন ভালো থাকে! এটা অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি। দুই-তিনটা বন্যার পর সবে শাকসবজি উঠতে শুরু করেছে। আশায় ছিলাম এসবের দাম কমবে। কিন্তু শুরু হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা। করোনা-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথমটার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এসেছে দ্বিতীয় ঢেউ। রোগশোকের মধ্যেও অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাবেচা বন্ধ থাকে না। মানুষের জীবন চলমান। চেষ্টা হচ্ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। সরকার লক্ষাধিক টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ব্যাংকগুলো নানা সমস্যার মধ্যেও প্রণোদনার টাকা বিতরণ করছে। পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা ঠিক রাখা হচ্ছে। গরিবদের চাল দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি ঠিক রাখার চেষ্টা হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। এই দুর্দিনেও কাগজে দেখলাম মানুষ করের রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য কর কার্যালয়ে লাইন দিয়েছে। দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও মানুষ চলাচল করছে। অফিস-আদালতের কাজ শুরু হয়েছে। কারখানা চালু হয়েছে। প্রত্যাশা, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে। বহু লোক চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত। তবু আশায় বুক বেঁধে সবাই এগোনোর চেষ্টা করছিল। সামনে অগ্রহায়ণী ফসল। আনন্দের ঘটনা। এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় দফার ঢেউ সব কাজে যেন একটা বড় বাধা হয়ে উঠছে। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাজার কিছুটা শান্ত। দাম সেভাবে না কমলেও বাড়তির দিকে নয়। গোল আলু নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিও এখন নিয়ন্ত্রণে। চাল, ডাল, নুন, তেল, আটা, ময়দা ইত্যাদির বাজারও নিয়ন্ত্রণে। স্বভাবতই আশার আলো দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ এসে সবকিছু আবার এলোমেলো করে দিতে চাইছে। এরই মধ্যে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি রেমিট্যান্সের। এতে ভাটা পড়েনি, বরং প্রতি মাসে তা বাড়ছে। হুন্ডি বন্ধ থাকা এবং সরকারি নানা পদক্ষেপে রেমিট্যান্সে কোনো বাধা পড়েনি। কিন্তু শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে তো অর্থনীতি চলবে না। রেমিট্যান্স যারা পায়, তাদের জন্য তা ভালো। কিন্তু দেশের সবাই রেমিট্যান্সের সুবিধাভোগী নয়, বরং রেমিট্যান্স ব্যবহার করে যদি আমদানি ব্যবসা ঠিক করা যেত, তাহলে শিল্পকারখানা ভালোভাবে চলত। রপ্তানি বাণিজ্যেও একটা গতি আসত। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবরটি বেশ চিন্তার। ২৮ তারিখের কাগজের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে :‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, ফের শঙ্কা অর্থনীতিতে’। কেমন শঙ্কা? খবরটিতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মূল রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। অথচ এখন বাড়ার কথা।

সামনে ডিসেম্বর মাস। সারা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইতাদি দেশে নববর্ষ, ইংরেজি নতুন বছর আসছে। হবে ক্রিস্টমাস। আনন্দের ঘটনা। তখন ঐ সব দেশের লোকেরা দুই হাতে খরচ করে। অথচ সেখানে করোনা আবার হানা দিয়েছে। মানুষ মারা যাচ্ছে বেশি বেশি। লোকের হাতে টাকা নেই। আমেরিকার অর্থনীতিবিদেরা মানুষকে ক্যাশ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। তারাই বলছেন, সাধারণ নাগরিকদের হাতে ক্যাশ না দিলে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। করোনার শুরুতে সরকার ক্যাশ দিয়েছে। এখন আবার দেওয়ার জন্য দাবি উঠেছে। এই পরিস্থিতির শিকার আমরা। যেখানে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ার কথা, সেখানে তা কমছে। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ কমেছে বলে ইত্তেফাকের খবর। নভেম্বর মাসের ১৫ দিনে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। এই সংবাদের সঙ্গে আমদানির খবরও ভালো নয়। প্রচুর টাকা, রেমিট্যান্সের টাকা অব্যবহূত। এগুলো দিয়ে আমদানি হয়। কিন্তু আমদানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যেই আবার তা প্রচণ্ড আঘাত পাচ্ছে। আমদানি ঋণপত্র খোলার পরিমাণ কমছে। আমদানির টাকা পরিশোধের পরিমাণও কমছে। আবার আমদানি কমছে মূলধনী যন্ত্রপাতির। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়া মানে শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটছে। কিন্তু তা আবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এই দুটো খবরে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজস্বের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা আছে। মানুষের আয় স্বভাবতই এ বছর (করবর্ষ ২০২০-২০২১) কম। তাই কোনো নাটকীয় কিছু না ঘটলে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি হবে না। এর অর্থ, সরকারকে ঋণের দিকে যেতে হবে। অবকাঠামোর কাজ চালিয়ে যেতে হলে টাকার দরকার হবে। সেই টাকা ঋণের মাধ্যমে জোগাড় করতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কাজ হবে অন্যত্র।

নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও গরিব শ্রেণির লোকের হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই। যা কিছু সঞ্চয় তাদের হাতে ছিল, তা এই ৯-১০ মাসের করোনাকালে খরচ হয়ে গেছে। তাদের আশা ছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু করোনার নতুন আক্রমণ মানুষকে আবার ঘরমুখী করে তুলেছে। অথচ বাজারের শক্তি তারাই। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিকে প্রণোদনার যে টাকা দেওয়া হয়, তা দিয়ে ভোগ সৃষ্টি হয় না, বাজার সৃষ্টি হয় না। বাজারের মার্কেট ইকোনমির মূল শক্তি নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ। তারাই বাজারে যায়। বাজার চাঙ্গা হয়। আমেরিকার মানুষের যে অবস্থা, বাংলাদেশের মানুষেরও সেই অবস্থা। প্রতিবেশী ভারতের মানুষেরও একই অবস্থা। তবে একটা তফাত আছে, আমেরিকা ও ভারতে দফায় দফায় সরকার যাদের টাকা দরকার তাদের টাকা দিচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বেতনের সঙ্গে অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য দিয়েছে। আমাদের এখানে সরকার কিছুই করছে না, একথা বলা যাবে না। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। সরকার অনেক বেশি ব্যস্ত ব্যাবসায়িক জগত্, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা ঠিক রাখতে। এটা সরকারকে করতেই হবে। অর্থনীতির দুই-তিন স্তম্ভ কৃষি, রেমিট্যান্স ও পোশাক রপ্তানি ঠিক রাখতেই হবে। তবে এখানেও সমস্যা আছে। কৃষিতে বরাদ্দের টাকার অর্ধেকও ব্যাংকগুলো বিতরণ করতে পারেনি। অথচ সামনে অগ্রহায়ণী ফসল উঠবে। সেই ফসলের একটা অংশ সংগ্রহ করে স্টক বাড়াতে হবে। টাকা লাগবে। ইতিমধ্যেই কথা উঠেছে ৪ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। বোঝা যায়, খাদ্য নিরাপত্তায় আরো বেশি জোর দিতে হবে। আরেকটি ক্ষেত্র এখনো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি পর্যাপ্তভাবে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ‘এসএমই খাতগুলোতে এখনো প্রণোদনার বরাদ্দের সব টাকা পৌঁছানো যায়নি। এর জন্য আলাদা কর্মকৌশল ঠিক করা দরকার।’ এই খবর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার। কারণ এসএমই খাতটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপিতে এর অবদান এখন কৃষির চেয়ে বেশি। এখানে কর্মরত লোক অনেক। এই খাতে টাকা পৌঁছানো না গেলে অর্থনীতি সচল করা যাবে না। অথচ যা দেখছি, টাকার অভাব ব্যাংকে নেই। অলস টাকা ব্যাংকগুলোতে পড়ে রয়েছে। লিকুইডিটির কোনো অভাব নেই। তাহলে বড় গ্রাহকদের টাকা বিতরিত হতে পারলে কৃষি ও এসএমইর টাকা বিতরিত হয়নি কেন? অথবা হচ্ছে না কেন? অথচ এটা হলে সাধারণ মানুষের হাতে কিছু টাকা যেত। টাকার দরকার ভীষণ। কী কারণে এই বরাদ্দের টাকা তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না, তা আমার বোধগম্য নয়। একটা কথা শুনেছি, যা বলা দরকার। সরকারের বরাদ্দকৃত টাকা ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে স্বল্প সুদে। অর্থাৎ, ভর্তুকিতে। অর্ধেক ভর্তুকির টাকা দেবে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখানে একটা ছোট্ট শর্ত আছে। শর্তটি হচ্ছে, ঋণের টাকা আদায় হলেই কেবল ভর্তুকির টাকা পাওয়া যাবে। শর্তটি ছোট্ট হলো, না বড় হলো? এই জায়গাতেই ব্যাংকগুলো সাবধান। তারা টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেলে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। বড়দের ক্ষেত্রে তা তারা পারেনি। কারণ সেখানে টাকা রাখার প্রশ্ন আছে। কিন্তু এখানে ছোটদের ক্ষেত্রে তা নেই। অতএব, ঋণের টাকা বিতরণে যত অনীহা। এ কথা সত্য হলে সরকারকে এই শর্তের কথা দ্বিতীয়বার বিবেচনা করতে হবে। এমনিতেই ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণে জর্জরিত। এরপর প্রণোদনার টাকা বিতরণের দায়িত্ব তাদের ওপর। ‘শাকের ওপর আঁটির বোঝা’। কঠিন কাজ। অর্থাত্ বলার কথা হচ্ছে, প্রণোদনার টাকা কৃষি ও এসএমই খাতের প্রণোদনার টাকা একটা সময়সীমা বেঁধে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বাজারে টাকা যাবে। সঙ্গে সঙ্গে নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, অবসরভোগী বেসরকারি চাকরিজীবী ইত্যাদি শ্রেণির লোকদের হাতে ক্যাশ টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সবকিছুতেই যখন আমেরিকাকে অনুসরণ, লক্ষ্যও যখন আমেরিকাবাসী হওয়ার, তাই তাদের মতো ‘ক্যাশ’ টাকা সাধারণের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে বাধা কোথায়? স্বাধীনতার পরপর মনে আছে, ব্যাংকগুলো বিনা সিকিউরিটিতে মানুষকে ঋণ দিয়েছে। আমিও ঋণ নিয়েছিলাম ৫ হাজার টাকা, যা মাসে মাসে শোধ করেছি। সরকার যদি অনুদান দিতে অপারগ হয়, তাহলে উপরোক্ত শ্রেণির লোকদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে বিনা জামানতের ঋণ। ব্যাংক কাস্টমার বুঝে ঋণ দেবে, পরিমাণ ঠিক করবে। প্রয়োজনে এই ঋণের টাকাতেও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, একদম গরিব, একদম ধনীরা সরকারের কাছ থেকে কিছু না কিছু পেয়েছে এবং পাচ্ছে। উপরোক্ত শ্রেণির লোকেরা এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কিছুই পায়নি। তাদেরও রক্ষা করা দরকার। কেবল ১০-১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই বাংলাদেশ নয়, রপ্তানিকারক এবং রেমিট্যান্স প্রাপকেরাই বাংলাদেশ নয়। এর বাইরে অনেক লোক আছে। তাদের বাঁচানো দরকার। দ্বিতীয় দফার করোনা ঢেউ থেকে এদের বাঁচানোর জন্য তাদের হাতে ক্যাশ দেওয়া দরকার।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত