ঢাকা রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬
২৮ °সে

জন্মদিন

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

শিল্পের মধ্যে বিদ্রোহ করতে সবাই পারে না। ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক কবি-সাহিত্যিকরা অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। সেই গান বা কবিতা মানুষকে শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শক্তি জুগিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের নতুন উপনিবেশবাদ এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ‘বিদ্রোহী’। ছবিটিতে একটি গাভী প্রচণ্ড শক্তিতে একটি দড়ি ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। তাকে বেঁধে রাখা দড়িটি টান টান হয়ে রয়েছে, যে কোনো সময় ছিঁড়ে যেতে পারে। খুলে যেতে পারে গাভীটির সকল বন্ধন, নিয়ম-কানুন-শৃঙ্খল। মুক্তি প্রত্যাশী গাভীটি সকল অনিয়ম উপেক্ষা করে শোষকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার ক্রোধ আর নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার অদম্য চেষ্টার সংমিশ্রণে তৈরি ‘বিদ্রোহ’ অনবদ্য এক শিল্পকর্ম হয়ে থাকবে শত শত শতাব্দ। দড়ির টানে গাভীর ঘাড় বেঁকে গেছে, যেন পরাধীনতা তাকে জোর করে ঘাড় নুয়ে রেখেছে, তবু সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দিগন্ত রেখাহীন হলুদ-বাদামি পটজুড়ে শুধু একটিমাত্র গাভী, পরিলেখ রেখার স্পষ্টতা ছাড়া বাকি পট প্রায় একরঙা। নিচু করা মাথা, এগিয়ে যাওয়ার তীব্র প্রয়াস, গতি বনাম স্থিতির প্রবল টানাপড়েন, বিপরীত গতির প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, জয়-পরাজয়ের মোহ আবিষ্ট করে ফেলে দর্শককে। দেহভঙ্গি ও গতিবেগের অপ্রতিরোধ্যতার ছবিটি দ্রুত ভঙ্গিমায় কয়েক টানে আঁকা হলেও, মুক্তি প্রত্যাশী মনের আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি লক্ষ্যণীয়। মুক্তি প্রত্যাশী দেশের মানুষের এমনই আবেগ তুলে ধরেছেন পুলিশ কর্মকর্তা তমিজউদ্দিন আহমদ এবং জয়নাবুন্নেছার নয় সন্তানের প্রথম সন্তান জয়নুল আবেদিন। আজ ২৯ ডিসেম্বর। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে তত্কালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার কেন্দুয়ায় তাঁর জন্ম। বাংলার এই প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীকে, শিল্পাচার্যকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

বিদ্রোহী ছবিটি আঁকা হয়েছে ১৯৫১ সালে। ঐ বছরই জয়নুল আবেদিন এক বছরের বৃত্তিতে লন্ডনের স্লেড-স্কুল অব আর্টে যোগ দিয়ে বাহান্নোর মাঝামাঝি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকদের আচরণে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক মনোভাব প্রকাশ পায় এবং বাঙালিদের মনে এই অপশাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধতে শুরু করে, যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। ঐ সময় জয়নুল দেশে ছিলেন না। তবে কি তাঁর বিদেশ যাওয়ার আগেই দেখা দেওয়া মুক্তির স্বপ্ন প্রতীকের মাধ্যমে তিনি বলতে চেয়েছেন? এ ছবিটিকে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার সার্বিক মুক্তি আন্দোলনের একটি প্রতীকী সূচনাভাষ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।

নিপীড়িত বাঙালি, নির্যাতিত বাঙালি বারবার এসেছে জয়নুলের তুলিতে। ১৯৪৩ সালেও বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের করুণ চিত্র এঁকে বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। সে সময় তিনি মূলত দুটি চরিত্রকে উপজীব্য করে সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী চিত্রকর্ম ‘দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা’। বিষয়বস্তু ছিল মা ও শিশু। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার চিত্রকর্মের মধ্যে অন্যতম ১৯৫৭-এ নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাডোনা। তার দীর্ঘ দুটি স্ক্রল ১৯৬৯-এ অঙ্কিত ‘নবান্ন’ এবং ১৯৭৪-এ অঙ্কিত ‘মনপুরা-৭০’ জননন্দিত দুটি শিল্পকর্ম। এছাড়াও তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক ইত্যাদি। অনুমান করা হয় তাঁর চিত্রকর্ম তিন হাজারেরও বেশি।

চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি ‘শিল্পাচার্য’ অভিধা লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রদের তরফ থেকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি পান এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান দেয়। শিল্পাচার্যের উদ্যোগে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের একটি জীর্ণ কক্ষে গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউট স্থাপিত হয়। প্রথমে এর ছাত্র সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক। তাঁর আগ্রহ ও পরিকল্পনায় সরকার ১৯৭৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে।

স্কেচ : মতলুব আলী

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৫ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন