ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
৩৫ °সে

মনীষী

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট, পাকিস্তান গণপরিষদে, অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাভাষায় অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি উত্থাপন করে যে তীর ছুড়েছিলেন পাকিস্তানিদের বুকে, তার অসহ্য যন্ত্রণায় হায়েনারা হতবাক। বাংলার দাবি? ভাষার দাবি? কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শুরু হয় ধীরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কোনোভাবেই তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি পাকিস্তানিরা। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত এখান থেকেই। ২৯ মার্চ, ১৯৭১ সালের দিবাগত রাতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর পুত্র দিলীপকুমার দত্তসহ গ্রেফতার হন পাকিস্তানি ঘাতকদের হাতে। তাঁদেরকে ময়নামতী সেনানিবাসে নিয়ে অমানবিক অত্যাচারের পর হত্যা করা হয়। পাকিস্তানিরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর এতটাই অসন্তুষ্ট ছিল যে, পিতা-পুত্রকে নৃশংসভাবে হত্যার পর মৃতদেহগুলোকেও গায়েব করে ফেলেছে, তাঁদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একাধারে আইনজীবী, সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ। ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর (১২৯৩ বঙ্গাব্দের ১৬ কার্তিক) ব্রাহ্মণবাড়ীয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার। ধীরেন দত্ত ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, কলকাতা রিপন কলেজ থেকে ১৯০৮ সালে বিএ এবং ১৯১০ সালে বিএল পরীক্ষা পাস করেন।

পেশাগত জীবনের প্রথমদিকে তিনি প্রায় বছরখানেক কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধানশিক্ষক ছিলেন। ১৯১১ সালে কুমিল্লা জেলা বারে যোগদান করেন। ১৯০৭ সালে ত্রিপুরাহিত সাধনী সভার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ১৯১৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি মুক্তি সংঘ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেন। কুমিল্লার অভয় আশ্রমের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং ১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিনি তিন মাসের জন্য আইন ব্যবসা স্থগিত রাখেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন এবং বঙ্গীয় কৃষিঋণগ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশবিরোধিতার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে কখনো বিনাশ্রম আবার কখনো সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস দলের পক্ষে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ থেকে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খান-এর মন্ত্রিসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করা হয় এবং এর ফলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
৩০ মার্চ, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন