ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩৫ °সে


অণুগল্প

পিতা ও পুত্ররা

পিতা ও পুত্ররা

সিদ্ধেশ্বরীতে একালের মতো সেই উনিশ শ একাত্তর সালেও সন্ধ্যা নামত আর গাঢ় হতে হতে রাত করে ফেলত চারপাশ। ঢাকা শহরের এই জায়গাটাতে পাকিস্তানি সেনাদের বুটের আওয়াজ ছিল সেই উনিশ শ একাত্তরে, যা আজকাল রূপকথা মনে হতে পারে। যাঁরা ভাবেন কোথাও কিছু ঘটেনি, তাঁরা রূপকথাই বলবেন সন্দেহ নেই।

এইটুকু বলেই হাঁফাতে থাকেন ভদ্রলোক, উনিশ শ একাত্তরে যিনি ছিলেন নিতান্তই এক কৈশোর পেরুনো সদ্য তরুণ। রাস্তায় তাড়া করেছিল বুটের আওয়াজ। তাই সিদ্ধেশ্বরীর অলিগলিতে ছুটতে ছুটতে একইভাবে হাঁফাতে হাঁফাতে দলামুচ হয়ে বসে পড়ছিলেন যখন দেয়াল আঁকড়ে ধরার নিষ্ফল চেষ্টায়, শেষবারের মতো মায়ের মুখটা মনে আনতে চাইলেও বাতাসের অভাবে মস্তিষ্কের কোষগুলো ভোঁতা ছুরির মতো ছিলতে থাকে হূিপণ্ড। আর তখন এক বাড়ির দরজা খুলে দেবদূতের মতো নেমে আসা প্রবীণ তাকে টেনে নিয়ে যায় ভেতরে। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি এনে হুকুম দিয়ে প্রবীণ বলেন, রান্নাঘরে ঢুকে যাও বাপু। তুমি আমার বাড়িতে ফুটফরমায়েশ খাটা কাজের লোক, মনে থাকবে?

উনিশ শ একাত্তর সালের সেই সন্ধ্যায় দরজা বন্ধ হয় বাইরের আর কাজের লোক হয়ে তিনি ঢুকে যান প্রবীণের রান্নাঘরে যখন বুটের আওয়াজ ঠিক দরজার ওপাশেই থামে। ‘দরওয়াজা খুলো’ হুংকারে বাধ্য হয়েই প্রবীণ দরজা খোলেন। বুটের আওয়াজ ঢুকে পড়ে বাড়িতে, রান্নাঘরেও। এক মুক্তি নাকি পালিয়েছে এদিক দিয়েই। সেই খোঁজে বুটের আওয়াজ উদ্যত অস্ত্রের মতো কাঁপায় অন্তরাত্মা। কেবল সেই প্রবীণ না-কাঁপা কণ্ঠে জানান, কেউ ঢোকেনি বাড়িতে।

বুটের আওয়াজ একে একে ভেতর থেকে টেনে আনে প্রবীণের তিন পুত্রকে। এরা? এরা কারা?

আমার পুত্ররা।

মুক্তি?

না। পুত্র আমার। কেউই পার হয়নি স্কুলের গণ্ডি। পিঠেপিঠি ভাই, গোঁফের রেখা স্পষ্ট নয় কারোরই। আর ঐ যে রান্নাঘরে, গরিব কাজের লোক, তিন কূলে কেউ নেই, এমনি এতিম।

মুক্তিকো দো!

মুক্তি তো নেই। বাইরের কেউ নেই ভেতরে।

প্রবীণ সত্যি বলছেন কি না, বুঝতে গুলি করা হলো এক পুত্রকে। এ বাড়িতে মুক্তি ঢুকেছে, তাকে বের করে দেওয়ার হুকুমে বুটের আওয়াজ ঘোরে আর ঘোরে, ওদিকে প্রবীণের গোয়ার্তুমিতে রান্নাঘরের ফুটফরমাশ খাটা ছেলে হয়ে দেখতে হয়, একে একে ঝরে পড়ে তিনটি রক্তজবা। কেন কে জানে, গরিব কাজের লোক হয়ে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ ঘটে তার। ওদিকে বুটের আওয়াজ দরজা পেরিয়ে ছুটে চলে রাস্তায়। সিদ্ধেশ্বরীতে তখন রাত নেমে গেছে পুরোদমে।

এরপর, পথে নেমে যাওয়ার আগে তিনি দেখছিলেন প্রবীণের চোখে সব হারানোর হাহাকার। যুদ্ধ শেষ করে ফিরে এসে তিনি পেয়েছিলেন দরজার চৌকাঠ। হাট করে খোলা, তবে কেউ নেই ভেতরে ঢোকার বা ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার। দরজাওয়ালা এত বড় কবরের চাপ সহ্য হয়নি বলে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন পেছনে, আরো পেছনে, আরো...আরো...

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন