লোকশিল্প

শোলার দুনিয়া

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাসান মাহমুদ রিপন

 

শোলা, বাঙালির ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের একটি অংশ। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ এই বাংলাদেশ। আমাদের দেশে বর্ষাকালে জলাশয় ও নিচু জায়গায় শোলার বংশ বিস্তার ঘটে। অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও এই শোলাকে মালি শোলা এবং ভাট শোলাও বলে থাকে।

ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, লোকাচার, ধর্মাচার, সামাজিক বিবর্তন, জাতিতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপট সব মিলিয়ে লোক সংস্কৃতিতে, লোকশিল্পে অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছে শোলা। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেব-দেবীর প্রতিমা অলঙ্করণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানে, মন্দির বা কোনো স্মৃতিসৌধের মডেল তৈরির জন্য শোলার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। মসৃণ ও পাতলা শোলার ফালি আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি ক্যানভাসে জলরং দিয়ে নানা লোকজ গাথা ও ধর্মীয় কাহিনি চিত্রিত করা হয়ে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণে দেব-দেবীর প্রতিকৃতি শোলার ক্যানভাসে জলরঙে আঁকা হয়। এছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য তৈরির শোলার মুকুট বা টোপর ও মালা এখনো এই মাধ্যমে অপরূপ কারুকার্যময় বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে। বড়শির ফাতনা, মাছ ধরার জল ভাসানোর জন্য ও গৃহসজ্জার জিনিসপত্র তৈরিতে শোলার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। শোলার তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী গ্রামাঞ্চলের মেলায় যেমন চৈত্রসংক্রান্তির মেলা, পৌষমেলা, লক্ষ্মীপূজার মেলা, কালী পূজার মেলা, মহররমের মেলা এবং বৈশাখিমেলায় সমাদৃত। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে এসব দ্রব্য সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শোলার শিল্পকর্ম তৈরি হয়। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম ও বরিশালের দক্ষিণাঞ্চলে এক সময় শোলার কাজের জন্য খ্যাত ছিল। এই পেশায় নিয়োজিত কারুশিল্পীরা মালাকার বা শোলারি নামে পরিচিত।

শোলা মূলত ধানখেতে বেশি হয়। শোলা দিনে এনে শুকানোর পর খুব সামান্য পরিমাণ জলীয় পদার্থ ধারণ করে। ফলে ওজনে খুব হালকা হয়ে যায়। শুধু একটি ধারালো ছুরি ও কাঁচির সাহায্যে কারুশিল্পীরা বিস্ময়করভাবে তাদের দক্ষতা ও নৈপুণ্যের মাধ্যমে এই শোলা দিয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত ঝালর, চমত্কার ফুল, নানা ধরনের খেলনা, মুখোশ, সাজসজ্জা ও অলঙ্কারসহ বাংলার চিরায়ত সব নির্দশন তৈরি করেন।