ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৭ °সে


অণুগল্প

হারিয়ে যাওয়া গল্প

হারিয়ে যাওয়া গল্প

আচমকাই ছিটকে পড়ল রাহুল। স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে নেমে আসা জনস্রোতে সেও ছিল। কিন্তু সেখান থেকে ছিটকে পড়তেই খানিকটা অপ্রস্তুত হলো রাহুল। অবশ্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে ফেলল, কেউ তাকে ধাক্কাটাক্কা মারেনি। হনহনিয়ে এগিয়ে যাবার বদলে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করতেই জনস্রোতের ধাক্কা তাকে প্রবাহপথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

আসলে হঠাত্ ও লক্ষ করেছিল যে ভিড়ের মধ্য থেকেই কেউ একজন বারবার ওর দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা কোনো ছিনতাইকারী তস্করটস্কর নয় তো? ভাবতে ভাবতেই দু হাত জোড় করে মলিন পোশাক পরা একটা লোক ওর সামনে এসে দাঁড়াল। ভালো করে তাকাতেই দেখল, আরে এ লোকটাই তো ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল ওকে। এখন আবার কোন মতলবে যে এসেছে! তবে ওর ভাবনায় ছেদ ফেলে লোকটা বলল, স্যার আমায় চিনেছেন?

হতভম্ব রাহুলকে চমকে দিয়ে হেসে উঠে বলল লোকটা, আমি নিতাই। আপনার সঙ্গে পড়তাম ইশকুলে।

মুহূর্তেই তীক্ষ হলো রাহুলের দৃষ্টি। স্মৃতি হাতড়ে আবিষ্কারও করে ফেলল সে তাকে। ভাবল, আরে সত্যিই তো এ আমার সহপাঠী ছিল! কিন্তু এখন স্যার স্যার করছে কেন? বিস্ময় আর আনন্দ মিশিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে, আরে তুই ? তা আমাকে স্যার স্যার করছিস কেন? এখন কী করিস? থাকিস কোথায়?

ওর সংক্ষিপ্ত উত্তর, সেসব শুনে আর হবেটা কী? দিনমজুরের ছেলের কপালে তো আর স্বপ্নের বরাদ্দ থাকে না। অভাবটা রয়ে গেল, আর পালিয়ে গেল স্বপ্নেরা। আপনার বাবা বদলি হয়ে যাওয়ায় ক্লাস এইটে থাকতেই আপনি পরিবারের সঙ্গে কোথায় যেন চলে গেলেন। এরপর আর ছ মাস আমি টিকেছিলাম ইশকুলে। একদিন বাবা বড়ো সড়কে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। হাসপাতালে যাওয়াটাই ছিল তার শেষযাত্রা। আমাকে নিয়ে বাবার যে স্বপ্ন ছিল সেটা তার মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গেই বিদায় নিল। ঠেলাগাড়ি চালানো, রিকশা টানা কিছুই বাদ দিইনি। বস্তিরই একটা মেয়ে বদমাশদের খপ্পরে পড়ে সব খুইয়ে রেললাইনে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। ওকে আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়েছিলাম। হিরোগিরির ফলে আমার ঘরে তাকে ঠাঁই দিতে হলো।

রাহুলের ততক্ষণে মনে পড়ে গেছে, নিতাই স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় একটা গল্প লিখেছিল। বেফাঁস একটা প্রশ্ন তাই করে বসল ওকে, গল্প তুই খুব ভালো লিখতিস রে! এখনও কি লিখিস?

শ্লেষ মেশানো কণ্ঠে বলল নিতাই, আমার জীবনটাই তো গল্পের খসড়া। কিন্তু সেটা খসড়া থাকতে থাকতেই হারিয়ে গেল। সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পের খোঁজও তো কেউ নেয় না কোনোদিনও।

তারপর হা হা করে হাসতে হাসতে হারিয়ে গেল সে জনারণ্যে। তার যাত্রাপথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাহুল। ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।

এরপর আর কখনো রাহুলের সঙ্গে দেখা হয়নি নিতাইয়ের।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন