ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
৩১ °সে


গভীর রাতে নীরব সড়কে মরণখেলা ‘বাইক স্টান্ট’

ঘটছে দুর্ঘটনা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও এই কসরতে অংশ নিচ্ছে তরুণরা
গভীর রাতে নীরব সড়কে মরণখেলা ‘বাইক স্টান্ট’

ব্যস্ত ঢাকার সড়কগুলো যখন মধ্যরাতে নীরব হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই একশ্রেণির তরুণ ফাঁকা সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাইক স্টান্টের মরণখেলায় মেতে ওঠে। ফাঁকা রাস্তায় ‘বাইক চালিয়ে তারা নানা কসরত দেখায়। কখনো বাইকের ওপরে দাঁড়িয়ে, কখনো শুয়ে, কখনো বাইক দিয়ে জাম্প দিয়ে স্টান্ট করা হয়। প্রতিটি স্টান্টের আবার আলাদা আলাদা নামও রয়েছে। এর বেশির ভাগই ইংরেজি নাম। হুইলি, স্টপই, বারনাউট, বার্ন আউট, সার্কেল, হিউম্যান কম্পাস ইত্যাদি। এসব কসরত দেখাতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে ছোটো-বড়ো দুর্ঘটনা। চোখের সামনে দুর্ঘটনা দেখেও এমন ঝুঁকিপূর্ণ কসরতে আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণরা।

শুধু ঢাকা নয়, জেলা শহরগুলোতেও উঠতি বয়সি বাইকার তরুণরা মোটরসাইকেল স্টান্ট ও কার প্রতিযোগিতায় নামছে। রাতে ঘুমন্ত নগরীতে ফাঁকা রাস্তায় নিম্নে ৭০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে বাইক ও গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা হয়। কে কত গতিতে বাইক কিংবা গাড়ি চালাতে পারে এটাই প্রতিযোগীদের মূল টার্গেট। ফাঁকা রাস্তায় সর্বনাশা এই গতিই এ খেলার মরণনেশা। এসব গাড়ি দেখতে একটু ভিন্ন রকম। বাইকগুলোর সামনের হেডলাইট-মিটার খোলা থাকে, পেছনে থাকে লোহা লাগানো, ছোট ফগ লাইট থাকে সামনে, একটু অন্য রকম বাম্পার, পুরো বাইকটি বিভিন্ন রকম রং, লাইট ও স্টিকার দিয়ে সজ্জিত থাকে। অন্যদিকে গাড়ির প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হয় স্পোর্টস কার। এর বিকট শব্দ হয়, যেগুলো দিনের বেলা সচরাচর দেখা যায় না। শুধু রাতে প্রতিযোগিতার জন্য ব্যবহার করা হয়। ফাঁকা রাস্তায় ভোঁ ভোঁ শব্দ করে ছুটে চলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আবার কখনো কখনো একই গতিতে ইউটার্ন নেয়। এতে ঘটে দুর্ঘটনা। তবু বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই প্রতিযোগিতা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অভিজাত এলাকার বিত্তশালী পরিবারের উঠতি বয়সি তরুণরা এমন খেলায় মেতে ওঠে।

জানা যায়, গুলশান, বনানী, উত্তরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, হাতিরঝিল, বাড্ডার ৩০০ ফুট রাস্তা, আফতাবনগর ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফাঁকা রাস্তায় প্রায়ই এমন রেস দেখা যায়। এমনকি ফাঁকা সড়কে দিনের বেলায়ও এমন প্রতিযোগিতা চলে। বিশেষ করে ৩০০ ফুট রাস্তায় দিনের বেলায়ও বাইক স্টান্ট করতে দেখা যায়।

ঢাকায় বাইক স্টান্টের তরুণদের কয়েকটি গ্রুপ আছে। গ্রুপের সদস্য উঠতি বয়সি বাইকাররা। যারা বিভিন্ন সময় একত্রিত হয়ে এমন প্রতিযোগিতায় নামে। সামাজিক মাধ্যমেও এসব গ্রুপের ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল আছে। যেখানে বাইক নিয়ে বিভিন্ন কসরতের ভিডিও আপলোড দেওয়া হয়। কে কত ভালো কসরত দেখাতে পারলো এ নিয়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা চলে তরুণদের মধ্যে।

রাজধানীতে বাইক রেসের এমন নেশা রয়েছে কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী আবিক হোসেনের। তার সঙ্গে কথা হলে জানালেন, তারা বন্ধুরা মিলে প্রায়ই হাতিরঝিল ৩০০ ফুটে বাইক স্টান্ট করেন। ইউটিউবে বাইক কসরতের নতুন নতুন কৌশল শিখে প্রতিযোগিতা করে তারা। রাত ২টার পরে সাধারণত তাদের বাইক কসরত শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ দেখতে আসে। স্টান্ট করার সময় ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়টি মনে থাকে না। তখন কত ভালো করে কসরত দেখানো যায় এটাই মাথায় থাকে। কারণ, অন্যান্য খেলার মতো এটাও একটা খেলা। প্রতিযোগিতায় জেতাই থাকে টার্গেট।

বাইক স্টান্ট এবং বাইক রেসের পার্থক্য তুলে ধরে আরেক তরুণ তাসিফ আফসান বলেন, অনেকেই রেস ও স্টান্টকে গুলিয়ে ফেলেন। দুটি কিন্তু এক ব্যাপার নয়। বাইক রেসের সময় এর গতি থাকে ৭০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। রেসের সময় গতিই নেশা। এটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ঢাকায় এ ধরনের প্রতিযোগিতার জায়গা নেই। অন্যদিকে স্টান্ট করার সময় ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার থাকলেই যথেষ্ট। এখানে গতি বিষয় না। কে কত রকম কসরত দেখাতে পারলো এটাই মূল বিষয়। পাশ্চাত্যে এ ধরনের খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও আমাদের দেশে এর উপযোগী জায়গা নেই। এজন্য দুর্ঘটনা ঘটে। আবার এর জন্য যে ধরনের সুরক্ষা নেওয়া দরকার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা সেটাও নেন না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মানব সম্পদ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, সামাজিকভাবে এ ধরনের প্রতিযোগিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেখা যায়, বখাটে তরুণরা গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতায় নামেন। যেসব রাস্তায় এ ধরনের প্রতিযোগিতা হয় সেসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো উচিত। অন্যদিকে যাদের সন্তান এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করছে তাদেরও সচেতন হওয়া দরকার।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন