ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৭
১৫ °সে

আনন্দবার্তা বয়ে আনে ঈদ-উল-ফিতর

আনন্দবার্তা বয়ে আনে  ঈদ-উল-ফিতর

‘ঈদ’ মানেই আনন্দ ও খুশির উত্সব। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি, শব্দমূল ‘আউদ’, এর অর্থ এমন উত্সব যা ফিরে আসে, পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়। এর অন্য অর্থ খুশি-আনন্দ। উচ্ছল-উচ্ছ্বাসে হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ঈদ প্রতিবছর হিজরি সালের চান্দ্রমাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট রীতিতে মুসলিম সমাজে এক অনন্য আনন্দ-বৈভব বিলাতে ফিরে আসে। এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার পর নানা নিয়ম-কানুন পালনের মধ্যে দিয়ে আসে ঈদুল ফিতর; অন্য কথায় রোজার ঈদ। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া। সুদীর্ঘ একটি মাস কঠোর সিয়াম সাধনার পর মুসলিম উম্মাহ রোজা ভঙ্গ করে আল্লাহ্’র বিশেষ নিয়ামতের শুকরিয়াস্বরূপ সপরিবারে যে আনন্দ উত্সব পালন করেন সেটিই ‘ঈদুল ফিতর’। যারা রোজার যাবতীয় হক আদায় করেছেন, তাদের জন্য ঈদুল ফিতরের দিনটি মহাসম্মানের, আনন্দের, অভিনন্দনের, শান্তির, ক্ষমার এবং মহাপুরস্কারের দিন। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘লিকুল্লি কাওমিন ঈদ, হাযা ঈদুনা’ অর্থাত্ ‘প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব আনন্দ-উত্সব রয়েছে, আমাদের আনন্দ-উত্সব হচ্ছে এই ঈদ।’ (বুখারি ও মুসলিম)

ঈদ ধনী-গরিব সব মুসলমানদের জীবনে মহামিলনের আনন্দবার্তা বহন করে। ঈদ মুসলিম সমাজের ধনী-গরিব পারিবারিক ব্যবধান ভুলিয়ে দেওয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। এক কাতারে দাঁড়িয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে নামাজ পড়ার সুযোগ এনে দেয় ঈদ। ঈদের খুশির এক অন্যতম উপকরণ হচ্ছে এ

ঈদুল ফিতরের অর্থ যেমন রোজা ভাঙার আনন্দ-উত্সব তেমনি এর অর্থ ফিতরা প্রদানের আনন্দ-উত্সব। অভাবী, নিঃস্ব, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে শরিয়ত নির্ধারিত হারে ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে ঈদুল ফিতরের দিবসের সূচনা হয়। এজন্য মুসলমানদের ঈদকে বলা হয় ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য খুশির দিন। ইসলাম সব ধনাঢ্য ও সামর্থ্যবান মুসলিম পরিবারের ছোট-বড় সদস্যদের জন্য ঈদুল ফিতরের দিনে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বিধান অত্যাবশ্যকীয় করেছে। ঈদের দুই, একদিন আগে বা ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিতরা আদায় করতে হয়। ফিতরার টাকার হকদার হলেন পাড়া-প্রতিবেশী, গরিব-দুঃখী, অসহায় মিসকিনগণ। ফিতরার উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্যের কারণে যাতে কোনো পরিবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় এর নিশ্চয়তা বিধান। ঈদে শুধু সামর্থ্যবানরাই আনন্দ করবেন, গরিব অসহায় পরিবার নয়—এমন রীতি ইসলাম সমর্থন করে না। যাকাত আদায়ের জন্যও সাধারণত ঈদুল ফিতরের সময়টাকেই বেছে নেওয়া হয়। সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যই আল্লাহ্তায়ালা যাকাতের বিধান দিয়েছেন। তাই দরিদ্র মুসলিম পরিবার ও সমাজে রোজার ঈদ নিয়ে আগ্রহ-উচ্ছ্বাসের শেষ নেই।

ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ। বছরান্তে মুসলিম পরিবারের ছোট, বড় সর্বস্তরের লোকেরা ঈদের জামাতে সানন্দে উপস্থিত হন। ঈদের নামাজ আদায়ের পর ঈদগাহ ময়দানে একে অপরের হাতে হাত, বুকে বুক রাখলে মুসলমানরা সারা মাসের রোজার কারণে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ভুলে যান। এ যেন একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাত্ ও কুশল বিনিময়ের এক অপূর্ব সুযোগ। তখন পরিবারের ছোট-বড়, ধনী-গরিব, আমির-ফকির, শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে কোনোরকম ভেদাভেদ থাকে না। ঈদ উত্সবের সন্ধিক্ষণে কে কত দামি পোশাক পরলেন, কে কত উত্তম পানাহার করলেন সেটা কখনো বিচার্য নয়; বরং বিচার্য বিষয় হচ্ছে নিজ আত্মাকে কে কতটুকু নিষ্পাপ রাখতে পেরেছেন। একমাস সংযম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির যে নিরলস প্রচেষ্টা মুসলিম পরিবারের সদস্যরা চালান, ঈদুল ফিতর এরই পূর্ণতার সুসংবাদ। ঈদুল ফিতরের তাত্পর্য হলো সিয়ামের দাবি পূর্ণ করে নতুন অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়ার খুশি। ঈদের দিনে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় ও একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাম্যের জয়ধ্বনি করেন।

ঈদ সারা বিশ্বের মুসলমানের সর্বজনীন আনন্দ-উত্সব। সুদীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ প্রতিটি ছোট, বড় মুসলিম পরিবারে নিয়ে আসে আনন্দের সওগাত। এ এক অনাবিল উত্সব, সীমাহীন আনন্দ। বছরজুড়ে নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-কষ্ট, বেদনা সব ভুলে এ ঈদের দিনেই ছোট ছোট পরিবারগুলো তাদের পিতা-মাতা, ভাইবোন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়। পেছনের সব গ্লানি বিস্মৃত হয়। পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক কোলাকুলি, সাম্য-মৈত্রী, সৌহার্দ্য, সমপ্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে নতুন করে আবদ্ধ করে। সাধ্যমতো নতুন পোশাকে আনন্দের আবীর মেখে সপরিবারে ঘুরে বেড়াতে পথে নামে মানুষ। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় ঈদের দাওয়াত খাওয়া, চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া, কখনোবা বহুদিন না দেখা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়, গালগল্প চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা- এসব আনন্দের কোনো কিছুতেই যেন বাধা নেই। ঈদের দিন সকাল থেকে রাত অবধি অপার আনন্দে ডুবে থাকে সবাই। ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন, যেখানে মুসলিম পরিবারের সদস্যরা আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মেলবন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আনন্দ সমভাগাভাগি করে।

ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে সবাই মিলে আনন্দটাকে ভাগ করে নিতে এই ছুটে যাওয়া। ঈদ সকলের মাঝে আনন্দ বিতরণের ঐশী বাণীরূপে মুসলমানের জীবনে ফিরে আসে। ঈদ প্রতিটি মুসলিম পরিবারের মাঝে সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করে। ভেদাভেদহীন মুসলিম সমাজ তৈরির বিষয়টি ঈদ-উত্সবের মধ্যে নিহিত রয়েছে। ঈদের দিনে সবাই সবার হয়ে যায়। পাশের বাড়ির গরিব প্রতিবেশীটিও এদিন দারুণ আপনজন। একসঙ্গে ঈদের জামাতে নামাজ আদায়, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি চলে সমানে। ঈদের খুশি কেবল নিজে নিজে উপভোগ করার মধ্যে কোনো মজা নেই; বরং তা সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়েই পরম আনন্দ পাওয়া যায়। আর আনন্দ ও পুণ্যের অনুভূতিই জগতে এমন এক দুর্লভ জিনিস যা ভাগাভাগি করলে ক্রমশ তা বৃদ্ধি পায়। ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার উত্সব এমন এক পরিচ্ছন্ন আনন্দ অনুভূতি জাগ্রত করে, যা মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত করে এবং আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের পথপরিক্রমায় মুসলমানদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন পরিচালনায় চলতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই আসুন না, ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিই সবার প্রাণে-মনে। বুকে বুক মিলিয়ে আসুন সবাই সবার হয়ে যাই। সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ‘ঈদ মোবারক আস-সালাম।’

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন