ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬
৩৭ °সে

উপন্যাস

বাবর আজমের উপন্যাস

বাবর আজমের উপন্যাস

দ্বিতীয় পর্ব

বছর দুই আগে আমি একটি উপন্যাস লিখি। নাম—বাবর আজমের উপন্যাস।

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বাবর আজম লেখক। তরুণ লেখক। সে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকার ঈদসংখ্যায় উপন্যাস লেখার সুযোগ পেয়েছে। এই নিয়ে সে খুব উত্তেজিত। এমন একটা সুযোগ! সে ভাবছে, ঈদসংখ্যার সম্পাদকও তাকে বলেছেন, এমন একটা উপন্যাস লিখতে হবে, যেন সবাই বুঝতে পারে সে যথার্থই শক্তিশালী লেখক। বাবর আজমের মাথার ভেতর তাই উপন্যাসের চিন্তা ঘুরছে। সে নানারকম ভাবছে, কিন্তু কোনো কাহিনিতেই সে সন্তুষ্ট হতে পারছে না।

বিকালের দিকে সে বাড়ির কাছের পার্কে এসে বসে। ঠিক করে, এখানে বসে ঠাণ্ডা মাথায় উপন্যাসের কাহিনি সাজিয়ে নেবে।

উপন্যাসের অন্য দুই চরিত্র শরাফত ও আসিফ। তারা দুজনই ব্যবসায়ী। তারা একে অন্যকে দেখতে পারে না। তাদের দুজনের নজর পড়েছে এই প্রায় পরিত্যক্ত পার্কের ওপর। তারা এটি দখলের চেষ্টায় আছে। তার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা তারা নিয়েছে। আরো একটি কাজ বাকি, আপাতত, সেটি হলো—একটি লাশ। দেখাতে হবে—পার্ক মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, মাস্তানদের আড্ডাখানা হয়ে উঠেছে। তারা সেখানে মেয়ে ও মাদকের ফূর্তি করে, গোলাগুলি করে, এইসব।

শরাফত ভাড়া করা বাহিনী পাঠায় গোলাগুলি করে লাশ ফেলার জন্য। কাকতালীয়ভাবে আসিফের বাহিনিও একই সময়ে এসে হাজির হয়। একই উদ্দেশ্য দু দলের। তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে আরম্ভ করে। গুলিতে মারা যায় বাবর আজম। মারা যায় আরো একজন। তার নাম বাবুল, তালা বাবুল। এক দলের হয়ে গুলি চালাতে এসেছিল সে। সে মারা যায় তারই মহল্লার বন্ধু, আরেক দলের হয়ে আসা মন্নাফের গুলিতে।

হাসপাতালে বাবর আজম ও তালা বাবুলের পরিচয় হয়। বাবর আজমের মাথায় তখনো উপন্যাসের চিন্তা। সে ভাবে, কে তাকে, তাদের গুলি করল, কেন করল—এই নিয়ে সে উপন্যাস লিখবে। উপন্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই বাবুলের। সে গরিব ঘরের ছেলে। টুকটাক মাস্তানি করে ভাড়া খেটে তার দিন চলে। তবে উপন্যাস নিয়ে মাথাব্যথা না থাকলেও তাকে প্রভাবিত করতে পারে বাবর আজম। রাতে বাবর আজম আর সে বেরিয়ে পড়ে হাসপাতাল থেকে। তাদের সামনে একের পর এক দরজা খুলতে থাকে।

উপন্যাসটি পড়ে অনেকেই বলেছিলেন, এর দ্বিতীয় পর্ব লেখা উচিত। আমারও সেরকমই মনে হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্ব শুধু নয়, এর তৃতীয়, চতুর্থ পর্বও লেখা যেতে পারে।

দ্বিতীয় পর্ব লেখা শুরু করেছি। শুরুর অংশ এখানে প্রকাশিত হলো। এর কলেবর অবশ্যই আরো অনেক বাড়বে।

পাঠকদের সুবিধার জন্য, বিশেষ করে যারা ‘বাবর আজমের উপন্যাস’ পড়েননি, ঐ উপন্যাসের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা এখানে ব্র্যাকেটের ভেতর সংযোজিত হলো।

[শরাফত স্পষ্ট গলায় বলল—এইখানে আমাদের দোষটা তোমরা কোথায় দেখলা!

তারা বসেছে মুখোমুখি। একপাশে বাবর ও বাবুল, অন্যপাশে শরাফত, মেজবা ও রাহাত। তারা সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেলে, তাদের, বিশেষ করে শরাফতকে পার্ক দখল করার জন্য গুলি চালানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হলে, সে উত্তরে ঐ কথা বলল।

বাবর, শরাফতের এরকম অস্বীকারে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও সেটা সে তখনই কাটিয়ে নিতে পারল—আপনি বলছেন, আপনার কোনো দোষ নেই?

নাহ। আমার কীসের দোষ!

কেন আপনার দোষ নেই?

আগে কও, কেন আমার দোষ আছে?

আপনি, আপনারা দুজন পার্ক দখল করতে চেয়েছেন।

হুঁ, চাইছি।

আপনাদের প্ল্যানের অংশ হিসেবে ওখানে দু জনকে গুলি করেছেন...।

দুইটা না, একটা। এই যে, বাবুল না কী নাম বললা, এ তো মরছে বেহুদা।

বাবুল হাসল—এইটা তো আমি প্রথম থেইকাই জানি। মন্নাফে যদি...।

ঠিক আছে, একজন। আমি কেন গুলি খেলাম?

আহারে ভাই, তুমি কেন ঐসময় ঐখানে ছিলা, এইটা একবারও বিচার করবা না?

মানে! আমি কোথাও থাকতে পারব না!

তুমি না থেকে অন্যজন থাকলে সে গুলি খাইত। তোমার সমস্যা হইত না।

আচ্ছা, আমি না খেতাম, অন্য কেউ খেত, এটা তো ঠিক?

আমি একবারও বলব না এইটা মিথ্যা।

অর্থাত্ কেউ না কেউ গুলি খেত?

শরাফত মেজবা ও রাহাতের দিকে তাকিয়ে নিয়ে মাথা দোলাল—কেউ না কেউ তো খাইতই।

সেটা কি আপনাদের দোষ হতো না?

ওমা, কেন!

কেন দোষ হতো না!

আরে, গোলাগুলি যে হবে, একটা যে পড়বে—এইটা তো প্ল্যানের অংশ। তুমি প্ল্যানের মধ্যে পড়ছ। এইখানে আমার বা আসিফের দোষ কেন দেখতেছ!

কারণ আপনারা গুলি করেছেন।

শরাফত হতাশ চোখে একবার মেজবা একবার রাহাতের দিকে তাকাল—এ দেখি কিছুই বুঝতেছে না!

আপনারা অন্যের জমি দখল করার জন্য গুলি করেছেন, এটা মিথ্যা!

আরে বাবা, আমি কি একবারও বলছি—মিথ্যা।

গুলি করা অন্যায় বা অপরাধ না?

শরাফত সজোরে দু পাশে মাথা নাড়ছে।

আপনাদের কী মত? অন্যায়, না অন্যায় না? বাবর রাহাত আর মেজবার দিকে তাকাল।

মেজবা মাথা নাড়ল—এইটারে অপরাধ বলা ঠিক হবে না।

রাহাত মাথা নাড়ল—এইটাকেও যদি অপরাধ বলি...!

আশ্চর্য!

এর মধ্যে আশ্চর্যের কী দেখতেছ! আচ্ছা বলো, তুমিই বলো, তুমি যদি আমাদের জায়গায় থাকতা, তুমি কী করতা?

আমি আর যা-ই হোক, এলোপাতাড়ি গুলি চালাতাম না, কাউকে ফেলতে আমি চাইতাম না। লাশের ব্যবসায় আমি নাই।

তাইলে জমিও তুমি পাইতা না।

জমি... জমি আমার দরকার নাই।

সেইটা ভিন্ন বিষয়।

বাবর রাগ রাগ চোখে বাবুলের দিকে ফিরল—শুনেছ, তুমি এদের কথা শুনেছ!

জি দন, শুনতেছি তো।

কী সব বলে দেখ...।

আমার তো ন্যায্যই মনে হইতেছে। লাশ দিয়া শুরু না করলে তারা আউগাইতে পারতেন না।

বাবুল, বড়ই আশ্চর্য হচ্ছি, তুমি এদের পক্ষে বলা শুরু করে দিয়েছ।

এদের পক্ষে তো কিছু বলতেছি না!

তাহলে তুমি কী বলছ এসব!

আমি শুধু যেইরকম, সেইরকম বলতেছি।

ওসবই তাদের পক্ষে বলা।

না। শরাফত হাত তুলল। তুমি আমার কথা শুনো। জমি যখন আছে, তখন ঐটা দখল হবে। দখল করতে হলে দখল করার নিয়ম মানতে হবে। তুমি... মেজবা। শরাফত মেজবার দিকে তাকাল।... না, তুমি পারবা না।... রাহাত, কী যেন বলে—এলিয়েন?... ঠিক আছে, না?... বাবর, তুমি এলিয়েনের মতো কথা বললে তো হবে না। আমার আর আসিফের, যদিও সে আমার শত্রু, যেমন কুনো দোষ নাই, দোষ এই মেজবা আর রাহাতেরও নাই। তারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে মাত্র।

গুলি করার জন্য লোক নিয়োগ, থানা ম্যানেজ, পত্রিকা ম্যানেজ—এইসব পেশাগত দায়িত্ব!

জি। পেশা নানারকম হয়। কই, থানা-পুলিশ কেন ম্যানেজ হয়, এই নিয়া তো দেখি চিন্তিত হও না।

আপনি কি ভেবেছেন আমার লেখায় ঐ প্রশ্ন আমি তুলব না?

তুইলো। এখন শুনো, এই যে ঘটনা কে ঘটাইছে, এইটা খুঁজতে বাইর হইছ, এইটা হইতেছে তোমার হিংসা।

হিংসা!

আমাদের তো একটা পড়লেই চলত। পড়ছ তুমি। কিন্তু তুমি না পইড়া যদি অন্য কেউ পড়ত, ঘটনা কে ঘটাইছে, তা তুমি খুঁজতে বাইর হইতা?

হয়তো হতাম না, হয়তো হতাম। নিজের ঘটনা বলে বেশি উত্সাহী হওয়া খারাপ না।

আচ্ছা, খারাপ না। তখন আড্ডায় বইসা চুকচুক চা খাইতা আর বলতা—দ্যাশটার যে কী হইল!... তা, এখনো সেইরকম ভাবো। আর, জানা থাকুক যে—এইখানে নিয়মের বাইরে কিছুই হয় নাই।

যত কুযুক্তি, সব আছে আপনাদের কাছে।

বলো। বইলা যাও।

বাবর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল—আমি আর কী বলব! এত কিছু করলেন, কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে পারলেন না।

শরাফত চমকাল। চমকাল মেজবা ও রাহাতও। শরাফত মেজবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—এই খবর বাইরে যাওনের কথা না। মেজবা, এই খবর বাইরে গেল ক্যামনে। ... রাহাত, এইটা কি আসিফের মুখ থেইকা বাইর হইছে?

রাহাত সজোরে মাথা নাড়ল—ভাই, আপনে তো আসিফ ভাইয়ের খবর জানেন...।

আসলে কী খবর তার? নিজে পলাইছে, না সত্যি সত্যি?

ভাই, তার কি পালানোর দরকার ছিল?

তা বটে।... এই যে, তোমরা, এই খবর পাইছ কই?

যেখানেই পাই, খবর মিথ্যা না। কী লাভ হলো আপনাদের? একদিকে বেশকিছু টাকাপয়সা নষ্ট হলো, অন্যদিকে দুইজনরে...।

মাইরা ফেললেন।... দন, আপনে যে মারা গেছেন, এখন কি এইটা বিশ্বাস যান?

সাঙ্কো, তুমি কী বলো এসব...!

আচ্ছা, ঠিক আছে, আপনি এখনো মরেন নাই। আমি একাই মরছি।

উপন্যাস শেষ হোক সাঙ্কো, তারপর আমি এটা নিয়ে ভাবব। বলতে পার—তখন সেকেন্ড থট দেবো।

উপন্যাস তো শেষ। মানে, এখন শুধু লেখা বাকি...।

নাহ্। আমি ঐ লোকগুলোর কাছে যেতে চাই।

আর কার কাছে যাবেন!

যারা এদের কাছ থেকে কেড়ে নিল।

কী আশ্চর্য, তাদের সঙ্গে আমাদের কী লেনদেন!

আমি শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই।

আরে না, তারচেয়ে আসেন, এদের বিচার করি। কী বিচার করবেন? আমরা এদের কান ধরে উঠবোস করাবো?

দেখ। শরাফত গম্ভীর গলায় বলল। এখানে বিচারের কিছু নাই। এখানে সবই নিয়মমাফিক হইছে। আমি বা আসিফ কেউই নিয়মের বাইরে যাই নাই।

আপনারা বিচারের মধ্যে ছিলেন কি ছিলেন না, তার জন্য বিচার করতে হবে কি না—আমি এসব ভাবতে চাই না। আমার জানার ছিল কোথায় এর সূচনা, জানা হয়েছে।

বাবুলকে উত্ফুল্ল দেখাল—জি, আমিও এইরকম বলি। আপনি লিখতে বসেন, আমিও গিয়া মন্নাফের সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করি।

আর একটাই কাজ বাকি, বাবুল। এই তো দেখছ এদের, কী একটা ঘটনা ঘটিয়েছে, জমি দখলে লাশ দরকার বলে গোলাগুলি করেছে, কে মরল কী হলো, এসবে মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা আছে—জমিটা কিভাবে দখল করবে, তা নিয়ে। তার জন্য থানা-পুলিশ, তার জন্য পত্রিকা আর টিভি অফিস, তার জন্য রাজনৈতিক নেতার বাড়ি...।

এইটাই নিয়ম। শরাফত বলল। এইভাবেই হয়।

বাবর শরাফতকে গুরুত্ব না দিয়ে বাবুলকে বলল—কিন্তু এতসবের পরও তারা কাজটা রাখতে পারল না। তোমার জানতে ইচ্ছা হয় না, তারা কারা, যারা খুনির কাছ থেকে কাজ ছিনিয়ে নেয়...?

এই যে, এই যে ভাই, খুনি বলবা না...।

এবারও বাবর শরাফতের দিকে ফিরল না—চলো বাবুল, তাদের দেখে আসি...।

বাবুলকে নিমরাজি দেখাল—বুঝতেছি না, আপনার দেখি শুধু দেখলেই চলে, আপনার ভেতরে কুনো প্রতিশোধের ইচ্ছা দেখতেছি না। ধরেন, তিনজন একে অন্যের কান ধরল, তারপর ১৩০ বার উঠবোস...।

উপন্যাসটা নাটকীয় হয়ে যাবে, বাবুল। সবাই বলবে, লেখক নির্মোহ থাকতে পারেনি, ড্রামা করে ফেলেছে।

বাইরে বেরিয়ে বাবুল বলল—দন, ড্রামা অনেক হইছে, আমার আর ইচ্ছা করতেছে না। আমি এখন বাড়ি যাব।

আর মাত্র একটা কাজ, সাঙ্কো।

কিন্তু তালা বাবুল রাজি না—ঘুম পাইতেছে।

আর মাত্র একটা কাজ।

তাদের সাথে আমাদের কুনো সম্পর্ক নাই।

ছিল না। কিন্তু হয়ে গেছে।

দন, আমি বাড়ি যাব। যাদের দেখার ছিল, দেখছি।

আর অল্প পথ, সাঙ্কো।

আপনার তো এইটুকুই দরকার ছিল।

যখন শুরু করেছিলাম, তখন এটুকুই ছিল। এখন শেষের দিকটা বেড়ে গেছে। ওটুকু যদি না জানি, উপন্যাস খাপছাড়া হবে।

বাবুল মৃদু বিরক্তি নিয়ে বলল—আপনি না...।

এই অল্প একটু...।

যেইটুকুই হোক, এইবারই শেষ।

হ্যাঁ, এবারই শেষ।

বাড়িটা খোলামেলা। যেন সবার জন্য সবসময় উন্মুক্ত, এমন একটা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কখনো মনে হচ্ছে, ঠিক দাঁড়িয়ে নেই, বাড়িটা ভেসে আছে। বাবর আর বাবুল এসে বাড়িটার সামনে দাঁড়াল। বোঝা যাচ্ছে না, ভেতরে ঢুকতে হলে কোন পথে এগোতে হবে। মনে হচ্ছে যে কোনো পথেই ঢোকা যাবে, আবার কখনো মনে হচ্ছে কোনো পথেই এ বাড়িতে ঢোকা যাবে না।

তালা বাবুল বলল—এগো তো চালিয়াত মনে হইতেছে। কেমন একখান ব্যবস্থা নিছে দেখছেন! সবই আছে, আবার কিছুই নাই। কিছুই নাই, আবার সবই আছে।

বুদ্ধিমান। আবার কাউকে যে কেয়ার করে না, এটাও বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তালা বাবুল, আমাদের ঢুকতে হবে।

ভূতের জন্য এইটা কোনো সমস্যা না, দন। চলেন।

তারা দুজন ভেতরে ঢুকে পড়ল।

প্রথমেই যে ঘর, সেটা বিশাল, দূরে ছোট একটা টেবিলের পেছনে একজন বসে আছে। সারা ঘরে আর কিছু নেই। টেবিলের পেছনে যে লোকটা বসে আছে, সে তাদের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। আড়মোড়া ভাঙল, হাই তুলল, তারপর নীরস মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল।

ভাব নিতেছে। বাবুল বলল। ভূতের সঙ্গে ভাব নিতেছে!

নিতে দাও। আমাদের কাজ হওয়া দিয়ে কথা। চলো।

তারা টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালে লোকটা প্রশ্নহীন চোখ তুলে তাকাল।

দেখা করব। বাবর বলল।

ব্যস্ত আছেন।

তো! ব্যস্ত তো আমরাও, দেখতেছেন না!

আপনারা কিছুই করছেন না। তিনি করছেন।

একজন আছেন! বাকিরা?... আমাদের অবশ্য একজন হলেই হয়।

আপাতত একজন আছেন। তিনি ব্যস্ত।

আজিব। ব্যস্ত তো আমরাও। তিনি লেখবেন আমি ঘুমাব।

দেখুন, মিনিট পাঁচেক বের করা যায় না। খুব কি ব্যস্ত?

তিনি এখন মানি-বাথ নিচ্ছেন।

কী বাথ?

মানি-বাথ।... এখন বিরক্ত হতে পারেন।

একটু ভাবল বাবর—আবার খুশিও হতে পারেন।

লোকটাও একটু ভেবে নিল, মাথা দোলাল—কথা ভুল না। তবে...।

খুশি হবেন তিনি। এমন দৃশ্য লোকজন দেখুক, এটা কি তিনি চান না?

তার অবশ্য দেখানোর কিছু নেই।... আচ্ছা, যান আপনারা। ঐ যে, ঐদিকে।

লোকটার দেখিয়ে দেওয়া পথে এগোতে নিলে বাবরের হাত চেপে ধরল বাবুল—কী করতেছে বলল?

মজা।

মেয়ে আনছে?

আসো তুমি।

তারা ভেতরে ঢুকলে দেখল সে ঘরে একটা তিমি মাছ দাঁড়িয়ে আছে। বাবর আর বাবুল অবাক চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল। তার পরপরই অবশ্য তাদের ভুল ভাঙল। তিমি মাছ নয়, মানুষ। শরীরে পোশাক নেই কোনো, সাদাটে চামড়া, স্থূলকায়, চেহারা অনেকটাই মাছের মতো, সেজন্য প্রথমে তারা তিমি মাছ ভেবেছিল। ভুল ভাঙার পর তাদের অস্বস্তি অনেকটাই দূর হয়ে গেল। তারা তখন মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখতে শুরু করল। অবশ্য দেখার অনেক কিছু নেই। তিমি মাছের মতো লোকটা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার ওপরে যেন একটা ঝরনা। সেখান থেকে অবিরত টাকা এসে পড়ছে লোকটার শরীরে। লোকটা কখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, কখনো টাকা ধরে পাছা ও পুরুষাঙ্গসহ পুরো শরীরে সে-টাকা ঘষে, ফেলে দিচ্ছে।

লোকটা এসব করতে করতেই তাদের দেখল ও বিরক্ত হলো—কারা তোমরা? কী চাও? আমার মানি-বাথের সময় কেউ এলে আমি খুব বিরক্ত হই।

বাবুল বলল—আমরা ভূত।

নতুন কিছু না। লোকটার বিরক্তি কাটল না। ভূত সবাই।

ভূত সবাই মানে! বাবর অবাক হলো।

সবাই মানে আমরা যারা আছি, তারা সবাই... কী যেন বলে না—জনগণ। কিন্তু তোমরা কারা?... ওহ, বললেই একবার, ভূত। তা, কী চাও এখানে?

আমার নাম বাবর, ওর নাম বাবুল।

তোমাদের নাম দিয়ে আমি কী করব?

শরাফত আর আসিফের ব্যাপারে কথা ছিল।

তারা কারা?

বাবর ও বাবুল দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে নিল। বাবর বলল—আপনার চেনার কথা। এই দিন দুয়েকের কথা হয়তো।

মনে পড়ছে না।

বেশ, আমি তাহলে বিস্তারিত বলছি।

বাবর বিস্তারিত বলে তারপর জিজ্ঞেস করল—এবার মনে পড়ছে?

লোকটা অলস অলস গলায় বলল—কিছুটা।... আসলে, এত ঘটনা ঘটছে...।

বাবুল বলল—আমরা কিন্তু ভূত।

আহা, সে তো বললেই একবার।

ঘটনা শুনে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, আমরা জীবিত, ভূত না, মৃত ভূত।

তোমরা জীবিত ভূত না, মৃত ভূত?

হুম।

তো?

মানে!

তো?... তোমরা কী ভূত সেটা কে জানতে চেয়েছে?

ভূতের সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন না।

লোকটা প্রচণ্ড এক ধমক দিল। সে ধমকে বাবর ও বাবুল থরথর করে কাঁপতে লাগল। লোকটা বলল—আমাদের কাছে কতরকম কতজন ওঝা আছে, জানো তোমরা? জানো? অ্যানি আইডিয়া?

লোকটা আবার প্রচণ্ড ধমক দিল। সে ধমকে তারা ছিটকে এসে পড়ল রাস্তায়। সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে বাবর বলল—বাপরে! আর বাবুল জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে বলল—এই লোক কি দৈত্য?... ভূত কেমনে পারবে দৈত্যর সঙ্গে!

এই লোক আমার মনে হচ্ছে, দৈত্যর চেয়ে বেশি।

সেইটাই দেখলাম।... দন?

কিছু বলবে?

এইবার কি আমরা বিদায় নিব?

সে রকমই কথা ছিল, কিন্তু দেখ, পরিস্থিতি হঠাত্ কেমন বদলে গেল!

কোথায় বদলাইল।

বারে, লোকটা কীরকম ধমক দেয়, এটা দেখলে না?

সে দেখলাম। বিশাল ধমক।

লোকটা এসব বিশাল ধমক দেওয়ার ক্ষমতা কোথায় পেল, এটা না জানলে চলবে?

আপনার চলবে না?

কিভাবে চলবে! আমি একটু একটু সামনে এগোচ্ছি।

কিন্তু আমার চলবে।

কেন!

জাইনা কী হবে, দন?

একই কথা, দেখ, সামান্য একটা সূত্র, মন্নাফ, সেই মন্নাফকে ধরে আমরা কতদূর এসেছি!

আমরা মন্নাফরে কিন্তু ধরি নাই।

কেন, মন্নাফই তো।

না, দন, আমরা আমাদের মৃত্যুরে ধইরা এগোইছি।

সে তুমি যা-ই বলো, এগিয়েছি তো।

কারা গুলি করছে আমাদের জানা হইছে। এখন আমার আর জানার কিছু নাই। আমার কিন্তু কারা আমাদের গুলি করছে—এইটাও জানার দরকার ছিল না। শুধু আপনে লেখবেন বলে।

লেখাটা বড় হবে, বাবুল। এখানেই থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই যে আমরা ধমক খেয়ে রাস্তায় ছিটকে এসে পড়লাম, এটাই কাহিনিকে বড় করে দিল।

তাইলে কী করবেন?

আমি এদের উত্থান খুঁজব, এরা কেউ কাল্পনিক নয়, এরা আছে, না? তো, এরা আছে যখন, এদের উত্থানপর্বও আছে। আমি সেটা খুঁজব। তুমি আর আমি।

বাবুল দু পাশে মাথা নাড়ল—আমি নাই দন, আমি নাই।

বাবুল সত্যিই থাকল না। বাবর আজম বহু চেষ্টা করেও তাকে রাখতে পারল না। বাবুল জানাল, যথেষ্ট হয়েছে তার। সে এখন ক্লান্ত বোধ করছে। তাছাড়া এতসব জানার, খুঁজে বের করার কোনো অর্থও নেই তার কাছে। সে তাই ফিরে যাবে তার মহল্লায়। ওখানেই ঘোরাফেরা করবে। তার পরিচিত মুখগুলো দেখবে। কখনো হয়তো ঐ পার্কের কোনো দেয়ালে বসে পা দোলাবে।

বেশ। বাবর বলল। মূল কাহিনিতেও আমরা দেখি সাঙ্কো পাঞ্জা শেষ পর্যন্ত থাকেনি দন কিহোতের সঙ্গে।

এই কথায় বাবুলের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। সে একটু হাসল শুধু, বলল—আপনার উপন্যাস বাইরাইলে পড়তে দিয়েন। জীবনে কুনোদিন উপন্যাস পড়ি নাই। উপন্যাস পড়তে কেমন, এইটাও জানি না। কিন্তু আপনারটা পড়ব।... কতদিন লাগবে, দন?

বাবুল হাত মিলিয়ে চলে যাওয়ার পরও বাবর এই প্রশ্নে বহুক্ষণ বিভ্রান্ত থাকল—কতদিন লাগবে?

সে ভেবে দেখল, কতদিন লাগবে, এটা বলা মুশকিল। কারণ এটি কাল্পনিক মনে হলেও কাল্পনিক নয়, শত্রুদের শনাক্ত করতে তার কতদিন লাগবে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। ঈদসংখ্যায় ধরানো যাবে বলেও তার মনে হলো না। একবার তার মনে হলো, ইকবাল ভাইয়ের কাছে সে আরো কিছুদিন সময় চেয়ে দেখবে কি না। কিন্তু আরো কিছুদিন মানে আরো কতদিন? সুতরাং এবার সময় বাড়ানোর কথা তার না বলাই ভালো। সে বরং বলতে পারে সামনের বছরের কথা—ইকবাল ভাই, মনে হচ্ছে লেখাটা সময় নিয়ে সামনের বছর লিখলে ভালো হবে।... হ্যাঁ, সামনের বছর? প্লিজ।

বাবর আজম একা বোধ করল। সঙ্গ প্রয়োজন পড়ে। বাবুল থাকলে ভালো হতো। কিন্তু বাবুল যদি প্রয়োজন বোধ না করে, সে জোর করতে পারে না। আবার হাল ছেড়ে দিতেও সে পারে না। এমন একটা ভালো উপন্যাস লেখার সুযোগ যখন তৈরি হয়েছে, সেটা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা, সে জানে, খুব বোকার মতো একটা কাজ হয়ে যাবে।

বাবর কাহিনির পরের অংশ ভাবতে শুরু করল।]

বাবর আজমের বাড়িঅলার নাম আনম কামাল হোসেন। এই আনম কামাল হোসেন বাড়ির সদর দরজা খুলে বাবর আজমকে দেখল, তারপর কিছুক্ষণ প্রবল বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে মুখ ফ্যাকাশে করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

তখন রাত হয়েছে। বাড়ি ফিরবে কি ফিরবে না, বাবর আজম এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তালা বাবুল চলে যাওয়ার পর সে হতাশ ও অসহায় বোধ করছিল। এই এতটা, খুব বেশি হয়তো নয়। কিন্তু এই এতটা সময় একেবারে কমও নয়, একজন সঙ্গী ছিল তার, তারপর হুট করে একা হয়ে যাওয়ায় সে বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। সে কিছুক্ষণ পথে পথে ঘুরেছে। দেখতে হা-করা মাছের মতো লোকটা তাদের কী যে ধমক দিয়েছিল—এ নিয়েও কতক্ষণ ভেবেছে, বয়স একদম কম হয়নি লোকটার, এই বয়সেও অমন কলিজা-কাঁপানো আওয়াজ কী করে তার গলা দিয়ে বের হয়—এ নিয়েও ভেবেছে—টাকার জোরে হয়তো, হ্যাঁ, এটাই হবে, তবে মন খারাপ বলে এসব নিয়ে তার বেশিক্ষণ ভাবার ইচ্ছা হয়নি, তবে সে ঠিক করে রেখেছে—ভাববে, কারণ না ভাবলে তার উপন্যাস লেখা হবে না। অর্থাত্, উপন্যাসের কথা সে ভোলেনি, যদিও এরকম তার এখন বেশি বেশি মনে হচ্ছে যে, উপন্যাস শুরুর আগে সার্ভেন্তেসের সঙ্গে বসতে পারলে ভালো হতো। সে বুঝতে পারছিল, সার্ভেন্তেস এ সময় তাকে ভালো বুদ্ধি দিতে পারতেন, এই যে তালা বাবুল তাকে ছেড়ে চলে গেল, যেমন গিয়েছিল সাঙ্কোপাঙ্কো কিহাতোকে ছেড়ে, তাদের ছাড়াছাড়ির ব্যাপারটা সার্ভেন্তেস আগেই ঠিক করে রেখেছিল, নাকি লিখতে লিখতে হঠাত্ তার মনে হয়েছিল—সাঙ্কোরা এভাবেই যায়, তাই সাঙ্কো ওভাবে গিয়েছিল—এই ব্যাপারটা জানতে পারলে সে তালা বাবুলের যাওয়া নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারত। তবে, আপাতত সার্ভেন্তেসের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ সে পাচ্ছে না, পাচ্ছে না মানে সে আসলে সুযোগ দেখছে না, আবার, এখন ওসব নিয়ে, মানে দেখা করা দরকার জেনেও, দেখা করা যাবে কি যাবে না, দেখা করলে কিভাবে কী—এতসব ভাবতে তার ইচ্ছা করছে না। কী তার ভালো লাগবে, সে বুঝতে পারল না, সে তাই বিক্ষিপ্ত পায়চারি করল। হেঁটে সে ওদিকে গেল, হেঁটে সে সেদিকে গেল। তা, এই অর্থহীন হাঁটাহাঁটির ব্যাপারটাও বিরক্তিকর। সে তাই একসময় তার বাড়ির কাছের পার্কে গিয়ে বসল। এই পার্কেই সে বসেছিল সেদিন, বসে সে ঈদসংখ্যার উপন্যাসের কথা ভাবছিল, তখন কথা নেই, সংকেত নেই, বৃষ্টির মতো গোলাগুলি শুরু হয়েছিল, বসে থাকা সে গলায় গুলি খেয়েছিল, দু পক্ষের গোলাগুলি, কিন্তু গুলি কিনা খেয়েছিল সে, যে দু পক্ষের কেউ না, অবশ্য গুলি আরো একজন খেয়েছিল, দু পক্ষের একপক্ষের একজন, তার নাম তালা বাবুল। এই তালা বাবুলের সঙ্গে তার, পরে, হাসপাতালে পরিচয়। সেখানে গুলি খাওয়া উপলক্ষে তাদের দুজনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারপর বেশ কিছুটা সময় তারা একসঙ্গেই। তালা বাবুলকে বলেছিল সে, ঈদসংখ্যায় তার উপন্যাস লেখার কথা, বলেছিল সার্ভেন্তেসের ডন কিহাতোর কথা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা যেটা সে বলেছিল, সেটা হলো—কারা, কারা তাদের গুলি করেছে, তাকে গলায় আর তালা বাবুলকে বুকে—এটা তাদের খুঁজে বের করতে হবে। বেরও করেছিল তারা, তারপর আরো শিকড়ে, আরো, কিন্তু হা-করা মাছের মতো লোকটা এমন ধমকই দিল, তালা বাবুল আর থাকতে চাইল না। তালা বাবুল চলে গেল, সে হয়ে পড়ল একা।

একাই সে ঘুরল এদিকে-ওদিকে। পার্কে বসে থাকল কিছুক্ষণ। গেল তালা বাবুলের বাড়ির সামনে, ঘুরঘুর করল। কিন্তু তালা বাবুল, বা, তালা বাবুল তার যে বন্ধুর গুলিতে মারা গিয়েছিল, মন্নাফ—কাউকেই তার চোখে পড়ল না। সে তখন গেল ইকবাল ভাইয়ের অফিসের সামনে। ইকবাল ভাই তখন অফিসে থাকতে পারেন না-ও পারেন, নিশ্চিত করে বলা কঠিন। সে অবশ্য একবার ভেতরে ঢুকে দেখে আসতে পারত। থাকলে এক-দু কাপ চা, সঙ্গে সিঙ্গারা, পুরি বা সমুচা খাওয়ার পাশাপাশি কিছু সময় কাটিয়ে আসা যেত। কিন্তু তার যেতে ইচ্ছা করল না। তার আসলে কিছুই ইচ্ছা করছিল না। ইকবাল ভাইয়ের মুখোমুখি হয়ে যাওয়াটা হয় তো তার বিরক্তি বাড়াত। ইকবাল ভাই নির্ঘাত উপন্যাসের কথা জিজ্ঞেস করতেন—তারপর বাবর, কদ্দূর এগোল তোমার উপন্যাস?

হচ্ছে, ভাই।

হচ্ছে বললে কিন্তু কিছু বোঝা যায় না।

জি, হবে।

এই এবারও কিছু বোঝা গেল না।

হবে।... একটা সত্যি কথা অবশ্য বলা দরকার।

নার্ভাস হয়ে গেছ?

না, সেরকম কিছু না।

তাহলে?

ধরা খুব কঠিন।

কী ধরা কঠিন?

এই যে, যে উপন্যাস আমি শুরু করেছি, সেটাকে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া কঠিন।

বুঝতে পারছি না, ভেঙে বলো।

কিভাবে, কোথায় শেষ হবে এই উপন্যাস, আমি বুঝতে পারছি না।

অর্থাত্ তুমি শেষের কাছাকাছি চলে এসেছ? গুড।

না না, সেরকম কিছু না। আমি শেষটা ধরতে পারছি না।

তুমি কি আরম্ভই করোনি।

করেছি। আমরা হা-করা মাছ পর্যন্ত পৌঁছেছি।

ইকবাল ভাই হয়তো তখন ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর, সে-ও ইকবাল ভাইকে বোঝাতে পারবে না। তাই সে ইকবাল ভাইয়ের অফিসের ভেতর ঢুকল না। সে তখন, আজ আর এত ঘোরাঘুরি করে কী হবে, আজ ধকল গেছে অনেক, আজ বরং বাড়ি যাই—এই ভেবে বাড়ি ফিরল। কী কাণ্ড, সে বাড়ি ফিরল, আর দরজা খুলে তাকে দেখে বাড়িঅলা জ্ঞান হারাল।

আনম মোস্তফা কামাল জ্ঞান হারালে বাবর আজম খুবই বিব্রত বোধ করল, তাকে দেখে জ্ঞান হারাবার কিছু নেই, দিব্যি প্রতিদিন দেখছে, কোনো-কোনোদিন দু বেলা, তাছাড়া মৃগী রোগী বা এরকম কিছু, এমনও সে কখনো শোনেনি। তাহলে কেন অমন ফ্যাকাশে হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া! বাবর আজম বিব্রতমুখে এদিক-ওদিক তাকাল। না, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দৃশ্য কেউ দেখেনি। সে টেনেহিঁচড়ে আনমকে নিজের রুমে নিয়ে এল। ভারী শরীর, বাবর আজম তাকে কোনোমতে শুইয়ে দিল বিছানায়। সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে এল। তার নিজের ঘরের দরজাও সে বন্ধ করল। গ্লাসে পানি ভরে নিয়ে সেখান থেকে হাতে ঢেলে ছিটাতে আরম্ভ করল আনম-র চোখেমুখে। আনমকে দেখে যখন মনে হলো তার জ্ঞান এই ফিরবে এই ফিরবে—বাবর পানির এক বড় ঝাপটা দিয়ে গ্লাস টেবিলের ওপর রেখে আনম-র সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

আনম কামাল হোসেনের জ্ঞান কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরল, চোখ খুলে সামনে বাবর আজমকে দেখেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এমন একটা চেষ্টা চালাল, যেন তাকে দেখে মনে হয় সে আবার জ্ঞান হারিয়েছে। বাবর আজম বিরক্ত হলেও নরম গলায় ডাকল—কামাল ভাই... কামাল ভাই।

আনম কামাল হোসেনকে দেখে মনে হলো সে আরো বেশি অজ্ঞান হয়ে গেছে।

বাবর আজম বলল—আপনি তো শুনেছেন আমি আপনাকে ডাকছি। তারপরও এমন করছেন কেন!

কে কে কইল আমি আপনারে শুনছি!

না শুনলে এই এখন বললেন কিভাবে!

আনম উত্তর না দিয়ে চুপ করে পড়ে থাকল।

কামাল ভাই...।

আগে কন আপনি কে?

মানে! আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি বাবর।

সিউর আপনে বাবর?

আশ্চর্য কথা! আপনি আমাকে চেনেন না!

আনম বলল—আঁউ।

আঁউ কী? হ্যাঁ, আঁউ কী!

আনম চোখ অর্ধেকটা খুলল—ভাই, একটা কথা জিগাব?

মহা মুশকিল। জিজ্ঞেস করুন।

ঐ যে, প্রথমদিকে আপনি ভাড়া দিতে পারতেন না, কখনো আপনেরে কিছু কইছি? উইঠা যান—এইসব কইছি? শাসাইছি?

না, কখনো না। আপনি বাড়িঅলা হিসাবে খুবই ভালো।

এই যে রুমে মদের বোতল রাখেন, খান, চিল্লাপাল্লা যদিও করেন না, কিন্তু মদ যে রাখেন আর চুমুক দিয়া খান, আপত্তি করছি কখনো?

আরে না। বরং মাঝেমাঝে তো আপনার সঙ্গেই খেতে বলেছেন।

তাইলে বাবর ভাই, আমার কী দোষে কী অপরাধে আপনি আসছেন?

বাবর আজম কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল আনম-র দিকে—আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

কোনটা?

সারাদিন কী যে ধকল গেল আমার! নিজের রুমে আমি ফিরব না?

আনম অসহায় চোখে বলল—ফিরবেন!

আমি কি ভাড়াটিয়া হিসাবে খারাপ?

না না। এইটা কে বলে!

বাড়ি ভাড়া বাকি আছে আপনার?

না না, নাই। এই মাসও শেষ হয় নাই। আপনি এক মাসের অ্যাডভান্স পাওনা আছেন।

তো?

আনব? নিতে আসছেন?

কামাল ভাই, একবার বলেছি অনেক ধকল গেছে। এখন ঘুমাব।

ঘুমাইবেন?

হ্যাঁ, ঘুমাব।

ক্যামনে ঘুমাইবেন! পুলিশ আসছিল তো!

কখন?

এই তো বৈকালেই। খোঁজখবর নিল।

কার?

আনম কামাল হোসেনের মুখ হা হয়ে গেল—এইটা কী বলেন! আপনার কথা জিগাইল।

ওহ! আর সেজন্য আপনি আমাকে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন!

এবার কামাল হোসেন উঠে বসল—শুধু এইটা না, ভাই, শুধু এইটা না।

আর কী!

বুঝতেছেন না!

বাবর আজম দু পাশে মাথা নাড়ল—না।

আনম কামাল হোসেন তাকিয়ে থাকল বাবর আজমের দিকে। মুখ ফিরিয়ে নিতে নিতে বিড়বিড় করে বলল—আবার অজ্ঞান হওন ছাড়া আর তো কুনো উপায় দেখতেছি না।

তালা বাবুল বাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। পৌঁছানোর কিছু আগে তাকে আচমকা ঘিরে ধরল সাদা ও নিজস্ব পোশাকের পুলিশের দল। বাবুলের মন ভালো ছিল। বাড়ি ফেরার মধ্যে অধিকাংশ সময় একটা আনন্দ আছে। সে বেশ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, কখনো সে পরিচিত কাউকে খুঁজছিল—তেমন পরিচিত কেউ হলে দু-চারটে কথা হবে। সে বেশি করে চাচ্ছিল, মন্নাফের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাক। মন্নাফকে তার অনেক কিছু বলার আছে, ধন্যবাদ দেওয়ার, মন্নাফের গুলিতে সে যদি মারা না যেত, তবে তার এতকিছু দেখা হতো না। এইসব গল্প করতে হবে মন্নাফকে, মন্নাফ নিশ্চয় অবাক হয়ে যাবে।

তার এই ফুরফুরে অবস্থার মধ্যে তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরল পুলিশ, কেউ কেউ মারার ভঙ্গিতে লাঠি তুলল, কেউ কেউ রাইফেল তাক করল, দুজন ধরল পিস্তল, দু-একজন কাঁধে ঝোলানো স্টেনগান না কী যেন নামাতে গিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করল, আর, সবাই তাকে এমনই চেপে ধরল, তালা বাবুল খুবই হকচকিয়ে গেল—আরে আরে, করতেছেন কী!

চোপ শালা। কথা কবি তো মুখ সিলি কর্যা দিমু।

কিন্তু এমন জাইতা ধরনের কারণ বুঝতেছি না।

অ পালকি আনন উচিত ছিল।

পালকির কথা কই নাই। আমারে ধরছেন ক্যান, এইটা বুঝতেছি না।

তোর ময়নাতদন্ত হইছে?

বাবুলের মনে পড়ল একবার বন্ধুরা মিলে তারা ফূর্তি করতে গিয়েছিল। বাবুল গিয়েছিল খুব উত্সাহ নিয়ে, তবে গিয়ে অনেকটাই সিঁটিয়ে গিয়েছিল। এক মেয়ে তার কাপড় খুলে তার অবস্থা দেখে বলেছিল—উম্মা, তুমার ময়না দেখি কতা কয় না।

বাবুলের সেই কথা মনে পড়ল ও সে বলল—ময়না এখন আছে কি নাই, কইতে পারি না। আর তদন্তের কথা আপনারা কইবেন।

ইয়ার্কি মারস?

জি না। সত্য কই।

সত্য কইরা ক, তোর ময়নাতদন্ত হইছে?

বাবুল মাথা নাড়ল—না, ময়নাতদন্ত যদ্দূর জানি হয় নাই।

তাইলে ময়নাতদন্তের আগে পলাইছস ক্যান!

পলাই নাই।

হাওয়া খাইতে গেছিলি?

হাওয়া খাওন কি বাবুলের দোষের!

তাইলে গেছিলি কই, এইটা ক।

আছে। বুঝবেন না।

আমরা পুলিশ, আমরা বুঝব না!

বুঝলে তো হইতই।

আবার কয় আমরা বুঝব না!

ভুল বলছি। আপনারা বুঝেন। আপনাগো দরকার মতন।

এহে, তোর দেখি মুখ খুলছে! তাইলে এখন ক, তোর লগে যে আরেকটা ছিল সেইটা কই?

কে? দন?

কী কইলি! ডন? আমাগো অনুমতি না নিয়া ডন হইছে!

আরে, এই ডন সেই ডন না। দন দন।

দন দন কী রে?

সে লিখক দন।

অ, লিখক!

এখন কি আবার বলবেন নাকি আপনাগো অনুমতি নিয়া লেখক হইতে হইব?

সেইটা পরের বিবেচনা। সেই দন কই?

এইটা এখন আর কইতে পারব না। ছাইড়া আসছি। এখন একটু একটু খারাপ লাগতেছে।

বুঝছি, ব্যবস্থা না নিলে তার কথা কবি না।... অ্যাই, তোরা ওরে হাসপাতালে নিবি। ডাক্তাররে কইবি এরে যেন ভালো কইরা কাটে।

কাটব? কাটব ক্যান! কাটনের কী দরকার? বান্ধা ডাক্তার নাই? আমার একখান ময়নাতদন্ত সে বানাইয়াই দিতে পারে। তারে শুধু কইয়া দিবেন রিপোর্ট কেমন হইব। আমার বডি নেওনের দরকার দেখি না।

বাবুল, কথা বেশি বলতাছস। কথা কম ক। এইসব তোরে কে বলছে?

কেউ কয় নাই।... শুনছি আর কি... দেখছিও। আমগো চিন-পরিচিতের মইধ্যে এমন ঘটছে তো। লাকু, বুইল্লা, হাজি—এগো কত ঘটনা।

চুপ। মুখ খুলবি না।

অন্য একটা কই। ঐ যে সামনের মহল্লার এক মাইয়ারে বড়লোকের এক পোলা গাড়িতে টাইনা তুইলা করল না? সেইবার করেন নাই এইরকম?

নাটকির পোলা, চুপ যা। এইসব আমরা করি না। ডাক্তাররা করে।

বাবুল খিকখিক করে হাসল।

হাসবি না। হাতুড়ি আর বাটাল দিয়া তোর খুলি এমন ফাটান ফাটাইব!

হাতুড়ি?

হ হ। ডরাইলি?

ডরানের কিছু নাই। হাতুড়ি করাত ছেনি এই আর কি।... আচ্ছা, হাতুড়ি নাকি বাজারে নতুন নামছে? নতুন বাহিনী? হয় ঠ্যাঙে মারে, নাইলে কোমরে?

কথা কম ক।

কথা তো আমি কমই কইতাম সবসময়। আগে কখনো দেখছেন বেশি কইতে?

ক্যামনে দেখব! তুই ছিলি খুচরা। খুচরার খবর কেন রাখব?

বারে বা, সেই খুচরারে ধরতে বাহিনী নিয়া আসছেন!

সেইটা তুই মইরা গেছস, তাই। তুই জীবিত থাকলে তোরে যদি ধরতে হইত, দুই জন যাইত।

অদ্ভুত! নিজেরাই বলতেছেন, আমি মরছি। মরার জন্য কুনো ছাড় নাই?

কী ভাবছস, মরারা কত খতরনাক, এইটা আমরা জানি।

আর, জীবিতরা সাধু!

বুঝবি না। চল। কাজ কি কম? তোর ময়নাতদন্ত, তোর জিজ্ঞাসাবাদ, তাপর চার্জশিট... চল।

তালা বাবুলকে তারা টেনে নিয়ে চলল। তাকে বিমর্ষ মনে হলো। এমনিতেও তার মন খারাপ। সে ভেবেছিল, দনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো এক মজার অভিজ্ঞতা হবে। তার জগত্ আর কত বড়! দু-চারটার বেশি জায়গায় তার যাওয়াই হয়নি। তাই লেখক দন যখন বললেন, তিনি সূত্র ধরে খুঁজতে বেরোবেন, তখন সে প্রথমে রাজি না থাকলেও, একপর্যায়ে তার কাছে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হতে লাগল। তার মনে হলো, এইবার অনেক কিছু দেখা হবে। আর, সত্যি কথা হলো, দেখা অনেক কিছু হলো বটে, কিন্তু ওসব অধিকাংশ তার পছন্দ হলো না। সে দেখল, কোনো দেখাই তাকে আনন্দ দিচ্ছে না, বরং, যত সে দেখছে, তত তার অস্বস্তি বাড়ছে। শেষে ঐ যে ধমক, বিশাল মাছের মতো লোকটার, ঐ লোকটার ধমক কী যে ভয়ঙ্কর ছিল! এই যে সে ধরা পড়েছে, এখন কেটে-ছিঁড়ে তার পোস্টমর্টেম হবে, তারচেয়ে অনেক ভয়ের ছিল ওটা।

তারপরই তার মনে হলো, অনেক হয়েছে, আর না, সে লেখক না, লেখকের সহকারীও না। সে তা-ই দনকে ছেড়ে এল। ছেড়ে আসতে তার খারাপ লেগেছিল বটে, তবে ঐ অল্প সময়েই সে বুঝেছিল, বিশেষ করে ধমক খাওয়ার পর, এই কাজ তার না। বরং লেখকের কাজ লেখক করুক, এমন তো না সহকারী ছাড়া লেখকের কাজ হয় না, হয়, সে বাড়ির পথ ধরুক। তবে বাড়ির পথ আর তেমনই-বা কী। এই একটু বাড়িতে ফেরা, বাপের সঙ্গে দেখা হলে বলা—একটা অনুরোধ ছিল। একটু দাফনের ব্যবস্থা নেন।

কী উত্তর আসত, সেটা নির্ভর করত বাপের মর্জির ওপর। হয়তো মেজাজ খারাপ, বলত—তরে কি আমি মারছি?

আপনে মারছেন, এইটা আমি একবারও বলছি!

তাইলে তুই নিজেই দাফন নে। নিজে কব্বরের জাগা ঠিক কর, গর্ত কর, গোছল কর, সাদা কাপড় পিন্দ, তারপর গর্তে শুইয়া পড়।

পাড়া-প্রতিবেশী কী কইব!

সেই চিন্তা তোমার না।

আমার চিন্তা তো করতেছি না, তোমার কথা ভাবতেছি।... মিলাদ দিবা তো?

আবার যদি এমন হয়, তেমন সম্ভাবনা কম যদিও, বাপের মেজাজ কোনো কারণে ভালো, বলতে পারে—আমার বংশের বাতি থাকল না, হায়, আমার বংশের বাতি থাকল না।

আহা, কাইন্দ না। এইটা নিয়তি।

এই নিয়তি আমার ক্যান! আমি কি এইরকম চাইছিলাম!

বাদ দাও। বাড়ি তো পাইছ। ব্যবস্থা নাও।

গোর কুনখানে দিমু, কইয়া যা।

যামু।... শুনো, ছোট কইরা হলেও মিলাদ দিও।

দিমু। তোর বন্ধুরা কে কে আইব, কইয়া যা। বেশি বড় কইরা তো করতে পারুম না।

তালা বাবুল দেখল, এইসব ভাবতেও তার ইচ্ছা করছে না। তার মনে হলো, সম্ভবত এরকমই নয়, একজন মৃত মানুষের কিছুই ভালো লাগে না। তবে তারপরও কখনো কখনো কিছু থেকে যায়। এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে। সে এগোতে এগোতে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল—আমারে কই নেন?

সে পুলিশ বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাল—তরে আমরা বলি নাই তরে কই নেই?

জি, বলছেন।

তাইলে আবার জিগাস ক্যান!

না, মানে, একদম চুপচাপ যাইতেছি তো। কুনো কথাবার্তা নাই।

কথা কবি না। হাঁট।

ময়নাতদন্ত কইরা ছাইড়া দিবেন?

ছাইড়া না দিয়া তোরে বাইন্ধা রাখুম!

রিমান্ডে নিবেন না?

তোরে না স্যার একটু আগেই কইল—জিজ্ঞাসাবাদ করব, চার্জশিট দিব!

একেকবার একেক কথা কন।

অপরাধ করছস, শাস্তি তো পাবিই।

কী অপরাধ করলাম!

গুলি খাইয়া মরলি না?

তা মরছি।

এইটাই অপরাধ। মরলি মরলি মরলি যখন স্পটে পইড়া থাকবি, তা তুই কি না আবার পলাইলিও।

শুনেন। আমারে রিমান্ডে নিয়া লাভ নাই।

সেইটা স্যারে বুঝবেন।

রিমান্ডে নিয়া লাভ নাই। আমি জানিও না কিছু, আমার বাবাও গরিব।

তালা বাবুলের এই কথা মুহূর্তের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলার ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। আইন-শৃঙ্খলা ভেবে দেখল—তালা বাবুল ঠিক কথা বলছে। সে যদি না-ই জানে কিছু তাকে রিমান্ডে নেওয়ার কী দরকার। বিশেষ করে তার বাবা যখন গরিব। একজন এদিক ওদিক ফোন করে তখনই খবর আনল, জানাল—এর বাবা সত্যই গরিব। দিন আনে দিন খায়। বিক্রি যে করব, জমিজমাও নাই।

তাইলে রিমান্ড বাদ। ময়নাতদন্তের পর টুকটাক জিজ্ঞাসাবাদ।

তারপর চার্জশিট।

তার আগে সংবাদ সম্মেলন করা যাইতে পারে।

সংবাদ সম্মেলন করার ব্যাপারে সবাই একমত হলো—দুইটা দেশি পিস্তল আর কিছু গুলি, এই শুনো, সেইবার কিন্তু পিস্তল আর গুলি মিলে নাই, সম্মেলনের পর চা খাইতে খাইতে এক তোতাপাখি হালকা বলছিল, এইবার খেয়াল রাখবা। তো, যা বলতেছিলাম, গুলি আর পিস্তল সামনে, আমরা পিছনে, ছবি তোলাতুলি, আর, তোতাপাখি গো যেইসব প্রশ্ন দিয়া রাখব, সেইসব তারা করব আর কি, এই তো?

স্যার, দুই-একটা তোতাপাখি কিন্তু ত্যান্দড়, উল্টাপাল্টা জিগায়।

না জিগাইলে জমে না। চিন্তা নিও না। তাইলে এই ব্যবস্থাই থাকল।

তালা বাবুল বলল—সংবাদ সম্মেলন করেন, অসুবিধা নাই। সাম্পাদিকরা আমারেও দুই-একটা কথা জিগাইল, উত্তর দিলাম। কিন্তু ময়নাতদন্ত কইরা কুনো লাভ নাই।

একজন চড় তুলল—তুই এত কথা কস ক্যান! আছে কি নাই, আমরা বুঝব।

কী লাভ! আপনারা জানেন আমি ক্যামনে মরছি।

এইটার মধ্যে রহস্য আছে।

এই যে, মরলাম—এইটার মধ্যে?

পলাইছিলি ক্যান?

সেইটা অন্য ব্যাপার।

সেইটাই রহস্য।

আরে না, দন আমারে বললেন...।

এই তো, ডনের লগে...।

আরে, বলছি না, ডন না, দন দন।

তুই যে ডনরে সাংকেতিক ভাষায় দন বলতেছিস, এইটা আমরা বুঝি না!

ওইসব কিছু না। আর, বারবার যে রহস্যের কথা বলতেছেন, রহস্যও কিছু নাই। অবশ্য আমিও প্রথমে ভাবছিলাম অনেক রহস্য। কিন্তু পরে দেখলাম সব ফকফকা। সব কিলিয়ার, কোথাও কুনো রহস্য নাই।

গেছিলি কই!

খোঁজে।

সেইটা কদ্দূর?

কাছে।

কত কাছে?

চারপাশে।... এইটা ভেতরে ভেতরে সবাই জানে।

মরা রে, তোর দেখি ভাব কমে না।

আমার ভাব নাই। আর, মরা বলছেন, ঠিক আছে—বলেন। শুধু নিজেদের জ্যাতা ভাইবেন না।

আনম কামাল হোসেন বাবর আজমের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন—আপনার কথা আমারে বিশ্বাস যাইতে কন?

বাবর আজম মাথা ঝাঁকাল—কেন করবেন না?

আপনি তাইলে সত্যই মরেন নাই?

আহা, বললাম না—বাবুল যদিও বারবার বলছে—আমিও নাকি মরেছি, ওর সঙ্গেই, তবে সত্যি কথা হলো, আমার সেই প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে ভিন্ন ধারণা।

ওহ, নিজেরে জ্যাতা ভাবতেছেন!

আপনি মাঝে মাঝে বড়ই অদ্ভুত কথা বলেন। জ্যাতা থাকলে জ্যাতা ভাবব না!

এইটা বড়ই সাহসের কাজ। এই যে আপনে নিজেরে জ্যাতা ভাবতেছেন, এইটা।

কেন, আপনি নিজেকে জ্যাতা ভাবেন না?

পাগল! কবে এই ভাবনা বাদ দিছি, সেইটাও মনে নাই।

তাহলে কী দাঁড়াল? আপনি মৃত?

সেইটা বলতে পারব না। তবে জ্যাতা যে না, এইটুকু জানি।

এটা আমার উপন্যাসে আনব—এই যে, একজন জ্যাতা ভাবছে না।

আমি একা না, আরো আছে। লেখনের আগে খোঁজ নিয়েন।

নেব। কিন্তু এখন বিশ্রাম দরকার। ভাই, বাথরুমে পানি আছে?

তা আছে। না থাকলে ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু পুলিশের কী করবেন?

পুলিশ! পুলিশের কী করব?

আহা, বললাম না—তারা আসছিল। আবার যখন তখন আইসা পড়তে পারে।

আসুক। এসে দেখবে আমি মরি নাই।

পুলিশের কাছে আপনার দাবি টিকব! তারা বলতেছে, হাসপাতাল থেইকা আপনারা দুই মরা পালাইছেন। মরা পালাইলে কোন ধারায় পড়ে, এইটা তারা বলতে পারে না, তবে এইটা যে অপরাধ, এইটা তারা বলছে। বলছে, এইটা আপনাদের ষড়যন্ত্র, আপনারা আলামত নষ্ট করতেছেন, আরো নাকি অনেককিছু করতেছেন, আরো কী কী—সেইসব অবশ্য বলতে পারে নাই।

কামাল ভাই, আমি এখন গোছল করব। খাব।

দুইজনেই পালাইছেন? আর কে ছিল সঙ্গে?

তালা বাবুল। আমরা দুজনই একসঙ্গেই গুলি খেলাম।

পত্রিকায় পড়ছি। কত কী যে লেখছে। গল্পের মতো।

ঠিকই করেছে। গল্প বলানো ছাড়া ওদের কোনো কাজ নেই। এমনকি আমি যদি ওদের সত্যটা বলি, তা-ও ওরা গল্পই খুঁজবে?

সত্যটা আপনি জানেন? বেশ অনেকক্ষণ পর আনম কামাল হোসেনের মুখ উজ্জ্বল দেখাল।

বাবর কিছুক্ষণ ভাবল—জানি। আবার জানি না। কামাল ভাই, আরো খোঁজখবরের দরকার। কিন্তু বাবুল চলে গেল...।

বাবুল কে?

আহা, ঐ যে গুলি খেয়ে মারা গেল...।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝছি। পড়ছি তো।

আমি ওর কাছে আবার যাব। আবার আমরা বের হবো। বলব, শেষ হয়নি, বাকি আছে।

আপনাদের ঘটনা একটু বলা যায় না, ভাইজান?

আপনাকে বলব। পুরোটাই বলব। একটু দম নিয়ে নিই।

একটু যদি বলতেন...।

আহা...। শোনেন, কাঁচকি পুঁটি খলসা মলা-ঢেলা এইসব মাছের কোনো দাম নেই...।

কী বলেন, মলা তো উপকারী, আর কাঁচকির ভর্তা...।

দাম নেই দাম নেই। এখন বড় বড় মাছের রাজত্ব। যেমন...।

রুই, বোয়াল...?

তিমি, হাঙর, সোর্ড... সোর্ড ফিশ চেনেন?

আনম মোস্তফা কামাল সোর্ড ফিশ চেনে কি চেনে না জানানোর আগেই সদর দরজা ধাক্কানোর শব্দ পাওয়া গেল। এত জোরে, আনম ও বাবর দুজনেই চমকে উঠল।

কে? আনম কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

তার গলা সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছাল না। দরজায় আবার শব্দ হলো। আনম বলল—এইটা তো মনে হয় লাথির শব্দ।

আপনার দরজায় লাথি মারবে কে?

সেইটা আমিও বুঝতেছি না। আমি পুরানা বাসিন্দা...।

অই, দরজা খোল। এবার শব্দের সঙ্গে গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।

তুই করে বলতেছে!

কারো সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া করেছেন?

না না, আমি নিরীহ মানুষ...।

দরজা খোল। বাবর আজম, তুই বাইর হয়া আয়। চালাকি করবি না।

এ মা, ঝগড়া দেখি আপনে করছেন।

আমি? আমি না। আমি কার সঙ্গে ঝগড়া করব!

দরজায় প্রবল শব্দ হতে লাগল। এবার যান্ত্রিক শব্দও পাওয়া গেল—সারাবাড়ি ঘিরে ফেলা হয়েছে। বাবর আজম, তোমার পালাবার কোনো সুযোগ নাই।

আনম অবাক গলায় বলল—বড় রকমের ঝামেলা করছেন মনে হয়।

বাবর বলল—পুলিশ। পুলিশ এসেছে। ঝামেলা বড় না ছোট তারা জানে।

যেমন নিঃশব্দে আসিফ আকবর উধাও হয়ে গিয়েছিল, তেমন নিঃশব্দেই সে আবার একদিন ফিরে এল।

একদিন আসিফের অন্তর্ধান নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় নানারকম খবর ছাপা হয়েছে। একজন বড় ব্যবসায়ী কেন এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাবেন? দেশে কি তবে এমনই অরাজকতা শুরু হয়েছে? এই প্রশ্ন পত্রিকা ও লোকমুখে ঘুরতে আরম্ভ করলে, জাঁদরেল ও পদস্থ একজন জানালেন, তারা গভীরভাবে সন্দেহ করছেন, নিজস্ব কোনো অভিসন্ধি পূরণের লক্ষে আসিফ আকবর নিজেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে খবর আছে ও তারা গন্ধ শুঁকে শুঁকে আসিফের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অচিরেই তাকে জনসম্মুখে হাজির করা হবে, জনগণ তখন জানতে পারবে কী ছিল তার এই অন্তর্ধানের রহস্য। আরেক পদস্থ জানালেন, আমাদের বিব্রত করার এই কূটকৌশল কাজে লাগবে না।

পত্রিকাগুলো ব্যস্ত থাকল রহস্যের জট খুলতে। কী কী কারণে আসিফ নিখোঁজ বা গুম হতে পারে, তার নানা ব্যাখ্যা তারা হাজির করল। সেসব ব্যাখ্যা চমকপ্রদ, লোকজনকে বেশ উত্সাহী দেখাল। তারা, বিশেষ করে চায়ের দোকানে, বাজারে ও ফেসবুকে তাদের মতামত জানাতে লাগল। মনে হলো, তাদের বলার ধরন দেখে, তাদের সবার কথাই সত্য। এরপর কিছুদিন পত্রিকাগুলো ব্যস্ত থাকল—আসিফ আকবর জীবিত আছে কি নেই—এই নিয়ে। কেউ কেউ আসিফের জীবিত থাকার পক্ষে অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ হাজির করল, কেউ কেউ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল—কবে, কোথায়, কীভাবে আসিফ মারা গেছে। এ সবই তাদের বিশ্বস্ত সূত্রের খবর। এর কিছুদিন পর পত্রিকাগুলো যা করল, তা হলো, তারা চুপ করে গেল। আসিফ নামের কেউ ছিল ও সে নিখোঁজ হয়েছিল, এ কথা তারা মনে রাখতে পারল না। এমন এক সময়ে আসিফ আকবর নিঃশব্দে ফিরে এল। তখন মিডিয়া আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মিডিয়ার কর্মীরা দলে দলে আসিফের বাসায় হানা দিতে লাগল। এক টিভিকর্মীকে দেখা গেল গভীর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলছেন—যেমনটি আমরা বলেছিলাম, আমাদের প্রিয় এক নেতাও জানিয়েছিলেন—তিনি সম্ভবত প্রেমে ব্যর্থ হয়ে দুঃখ এড়াতে উদাস হয়ে কোথাও চলে গিয়েছিলেন। তাঁকে গোয়ালন্দ ঘাটে দেখা গিয়েছিল, এমন তথ্য আমাদের কাছে আছে। এই তথ্য প্রয়োজনে আমরা ব্যবহার করব, গোয়েন্দা সংস্থা চাইলে তাদের কাছে হস্তান্তর করব। এটা আমাদের সাংবাদিকতার নীতিমালার মধ্যেই পড়ে যে, পরস্পরকে সহায়তা করার মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আচ্ছা, সে যা-ই হোক, এখন প্রশ্ন, কে সেই মেয়ে যার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আসিফ আকবর এই গুমের খেলা খেললেন। দর্শক, অপেক্ষা করুন, আমরা অচিরেই সে মেয়েকে আপনাদের সামনে হাজির করব।... অ্যাই, তুমি আমার ওপর থেকা সরাইয়া ক্যামেরা মাঝে-মধ্যে এদিকওদিক করতাছিলা কেন!

বাকি সাংবাদিকরা কেউ আসিফ আকবরের বাড়ির প্রাচীরে, কেউ বাড়ির সামনের গাছে উঠে, কেউ মই বেয়ে দেয়ালে উঠে, আবার ভেতরে মই ফেলে সাদা পতাকা হাতে আসিফ আকবরের বাড়ির লনে নেমে এল। সম্মেলন ডাকা ছাড়া আসিফ আকবরের উপায় থাকল না। তখন মিডিয়া-কর্মীরা নানা প্রশ্নে তাকে জর্জরিত করে তুলল।

এই যে আপনার বিত্ত-বৈভব, এর উত্স কী, জনগণ জানতে চায়।

এই ক দিন আপনি ঠিক কোথায় ছিলেন? একজায়গায় না নানা জায়গায়? নির্দিষ্ট করে একটি জায়গার নাম বলুন প্লিজ। নানা জায়গার নাম বলে বিভ্রান্ত করবেন না।

যে মেয়েটির প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ছেড়েছেন, সে মেয়েটি কি আপনার সঙ্গে ছিল?

আপনি কি টুথপেস্ট, ব্রাশ, চিরুনি, শ্যাম্পু এসব সঙ্গে নিয়েছিলেন?

এটা কি ঠিক, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, কানালি এসব ব্র্যান্ডের বাইরে শার্ট আপনি পরেন না?

যদিও বলছেন, আপনি বুঝতে পারেননি কোথায় ছিলেন, তবু জিজ্ঞেস করছি—সত্য করে বলুন আপনি কোথায় ছিলেন?

আপনি বলছেন আপনি সুস্থ নন। চিকিত্সা কোথায় নেবেন, দেশে না বিদেশে? বিদেশে হলে সেই দেশের নাম জানাবেন?

হ্যাঁ, আমরা শুনেছি, আপনি সর্দি জ্বরের চিকিত্সাও দেশের বাইরে করান। এতে কি বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয় না?

এই যে অনেকে বলছেন, আপনি গুম হয়েছিলেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে এরসঙ্গে কি কোনো ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব আছে? থাকলে কার সঙ্গে?

আচ্ছা, কারা আপনাকে নিয়ে গিয়েছিল আর কোথায় রেখেছিল?

দুপুরে কী খেতে দিত?

দুপুর আর রাতের খাবার কি একই ছিল?

টিভি ছিল ঘরে? কোন কোন চ্যানেল দেখতেন?

আপনি কিন্তু বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন, বলছেন না—কোথায় ছিলেন। বলুন।

আসিফ ইকবাল বললেন—আমি না হয় নাইই বললাম। আপনারা যান, খুঁজে বের করুন আমি কোথায় ছিলাম। বাল।

পরদিন অনেক পত্রিকা হেডলাইন করল—আসিফ ইকবাল বাল বলেন। টিভি চ্যানেলে এই শব্দ তারা সরাসরি উচ্চারণ করতে সঙ্কোচ বোধ করে। তারা বলেন, আসিফ ইকবাল সংবাদ-সম্মেলন জুড়ে এক বিশেষ অঙ্গের কথা বারবার উচ্চারণ করেন। যেন এই একটি শব্দই তিনি এখন জানেন।

মিডিয়া অবশ্য বাবর আজম ও তালা বাবুলকে নিয়েও ব্যস্ত। তারা আগে বিস্ময় প্রকাশ করেছে, এটা কীভাবে সম্ভব, কীভাবে দুটো ডেডবডি সবার চোখ এড়িয়ে বের হয়ে যায় ও তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষের পক্ষে অবশ্য একজন নিশ্চিত ভঙ্গিতে জানান, আমাদের বিপদে ফেলার জন্য এটা অমুক অমুক ও আরো অনেক অমুকের ষড়যন্ত্র। তবে এইসব ঘটনায় তারা বিপদে পড়া দূরের কথা, বিব্রতও হবে না। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যারা জড়িত, তারা অচিরেই ও দুজনকে, ডেড বা নট-ডেড, খুঁজে বের করবে। এই দেশে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

এক সাংবাদিক জানতে চাইলেন—যতদূর জানা গেছে, মানে হাসপাতাল সূত্র যা বলছে আর কি, ও দুজন মৃত। তাদের ঠিক কোন পদ্ধতিতে বিচার...।

মৃত হোক কিংবা জীবিত, আপনি বিচার চান কি চান না?

না না, অপরাধ করে থাকলে বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু কোন আইনে?

কেন, বিদ্যমান আইনে কি মৃতের বিচার সম্ভব না?

সেটা আপনি বলবেন।

আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ঐ দুই মৃতের মতো আমাদের সব ব্যবস্থাও মৃত। আপনার হয়তো জানা নেই, আমরা নতুন নতুন অনেক আইন করেছি। দেশে এখন শৃঙ্খলা আছে। যদি প্রয়োজন হয়, এ দুজনের জন্যও নতুন আইন করা হবে। কারণ এমন ঘটনা যে আরো ঘটবে না, তা আমরা বলতে পারি না।

বেশ ক টি টিভি চ্যানেল টক শো-র ব্যবস্থা করেছিল। এক বক্তা গম্ভীর মুখে জানালেন—আমার প্রথম যেটা মনে হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাদের জীবিত আটক করা যায়। উপস্থাপিকা মনে করিয়ে দিলেন যে তারা দুজনই মৃত, বক্তা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, সে আমি জানি সে আমি শুনেছি। কিন্তু তারপরও, তাদের জীবিত ধরার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে দোষ কী!

অনুসন্ধানী অন্যান্য সাংবাদিকরাও থেমে থাকলেন না। তাঁদের একজন চলে গেলেন রোজের বাসায়—আমি রোজের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

রোজ অবাক গলায় বলল—আমার সঙ্গে!

জি, আপনার সঙ্গেই। ভুল শোনেননি।

আপনি কে?

আমি একজন সাংবাদিক।

অ! এক, আমার সঙ্গে কী কথা?

আমি আপনার ইন্টারভিউ করতে চাই।

রোজ আরো অবাক হলো—আমার ইন্টারভিউ! আমার কিসের ইন্টারভিউ?

কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন।

কিন্তু আমি কেন!

সাংবাদিকের মুখে মুচকি হাসি খেলে গেল—প্রশ্নগুলো বাবর আজমকে নিয়ে।

বাবরকে নিয়ে আমাকে কেন প্রশ্ন!

কারণ বাবর আজমের সঙ্গে আপনার প্রেম ছিল।

রোজের মুখ হা হয়ে গেল—বাবরের সঙ্গে আমার প্রেম ছিল!

জি। সাংবাদিক চোখ বন্ধ করে হাসিমুখে মাথা ঝাঁকালেন।

এই উদ্ভট তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করে লাভ হবে না। ম্যাডাম, আমরা সাংবাদিক।

এখানে শাকও নেই, মাছও নেই। আপনি যান।

বাবর আজম তার একটি গল্প আপনাকে উত্সর্গ করেছিলেন...।

ধরেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হোমারকে একটা বই উত্সর্গ করেছেন, তা, রবীন্দ্রনাথ ও হোমারের কি প্রেম ছিল?

এই হোমার কে, সে কী ভূমিকা আপনাদের প্রেমে পালন করেছে?

আপনি বের হন।

সাংবাদিক আবার মিটমিট করে হাসতে আরম্ভ করলেন—আপনি উল্টাপাল্টা নাম বলে যতই আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করুন, লাভ হবে না।

আপনি বের হন।

আপনি বাবর আজমকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

আপনাকে আমি বের হতে বলেছি। এখনই।

হুমকি দিচ্ছেন! সাংবাদিকের ক্ষমতা জানেন না? রিপোর্ট কিন্তু করে দেবো।

রোজ সে সাংবাদিককে বের করে দিল। দু দিন পর থেকে রোজ ও বাবরের প্রণয় নিয়ে এক অনলাইনে তিন কিস্তির রিপোর্ট ছাপা শুরু হলো। রিপোর্ট পড়ে রোজ নিজেও অবাক হয়ে গেল। ঐ সাংবাদিক এত তথ্য হাজির করতে কত পরিশ্রম করেছে, আরে, কতটাই-না সে কল্পনাপ্রবণ। এতটা কল্পনাশক্তি নিয়ে সে কি না বানোয়াট রিপোর্টের পেছনে সময় পার করে দেবে! পুলিশ একদিন তাদের বাসায় এল ঐ রিপোর্টের পর, তারা অবশ্য বেশিক্ষণ থাকল না, দু-চারটে প্রশ্নের পর চা খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল—সাবধানে থাকবেন। আর বাবর আজমের খবর পেলে আমাদের জানাবেন।

রোজের ওপর মূল যে মানসিক চাপ তৈরি হলো, তা হলো অন্যভাবে। তার ফোনে অনবরত কল আসতে আরম্ভ করল—ভূতের লগে ঐসব করবেন ক্যান! আমরা আছি না?

সামনের ছুটিতে বালি দ্বীপে বেড়াতে যেতে চাই। আপনি কি আগ্রহী?

আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনি অভিনয় ভালো পারবেন। আমাদের বিশেষ নাম্বার দিচ্ছি। যোগাযোগ করুন। আমরা কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষা করি।

আমি জানি মিথ্যা রিপোর্ট হয়েছে। আমি আমার সমস্ত আন্তরিকতা ও সহানুভুতি নিয়ে আপনার পাশে আছি। আমার নাম সুমন, বয়স-২৭...।

ফোন বন্ধ রাখলে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ইনবক্স এসবে সয়লাব হয়ে যেতে লাগল। শেষে রোজ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাকটিভ করে তার মামার কাছে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল।

ঐ সাংবাদিক তার বসকে বলল—এমন রিপোর্ট করলাম, সে দেশেই থাকতে পারল না।

তা-ই নাকি! দেশ ছেড়েছে?

হ্যাঁ, বস।... বস, এই চান্সে তারে কি প্রেগন্যান্ট বানায়ে দিব? লিইখা দিলাম, বিশ্বস্ত সূত্র জানাচ্ছে সে লোকচক্ষুর আড়ালে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের...।

লোকচক্ষুর আড়ালে মানে কি সে জঙ্গলে গিয়া অ্যাবরশন করব?

বস, যা-ই লিখি, পাবলিক কিন্তু নিব।

দাঁড়াও। এইটা কয়েকদিন পরে। তুমি আপাতত, এইরকম একটা রিপোর্ট করো যে তোমার রিপোর্টের সত্যতা সহ্য করতে না পেরে দেশ ছেড়েছে। বলো যে, এটা একটা বড় সমস্যা—আমাদের মেয়েরা সত্যের মুখোমুখি হতে পারে না।

রোজের পাশাপাশি আরেকজনও বিদেশ গেল। তিনিও একজন সাংবাদিক এবং তিনিও ধারাবাহিক রিপোর্ট শুরু করেছিলেন। বিষয় ছিল, পার্কের জোড়া খুন ও নেপথ্যের কথা। রিপোর্টে নেপথ্যের কথার পাশাপাশি, সম্পর্ক আছে—এরকম আরো কিছু তথ্য আসতে আরম্ভ করেছিল। তো, হলো কী, তিন কিস্তি ছাপা হওয়ার পর সম্পাদক তাকে ডেকে পাঠাল—এইসব তুমি কী ছাপতেছ?

কোনসব, স্যার? আমার রিপোর্ট?

এইসব আজগুবি তথ্য কই পাইতেছ?

সব প্রমাণ আমার কাছে আছে।

প্রমাণ?

জি।... আমি সব রিপোর্টে দিই না। কিছু হাতে রাখি।

বেশি প্রমাণের সমস্যা কী, জানো?

আমার রিপোর্ট কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।

আরে বাবা, তাহলে তো হইতই।

সমস্যা, কী, স্যার?

সমস্যা হইল—তুমিও থাকবা না, আমার পত্রিকারও সমস্যা করবা। স্যার, রিপোর্ট কিন্তু পাবলিক নিয়েছে।

আমি জানি।

আপনি চিফ রিপোর্টারকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।

তোমার রিপোর্ট ভালো। আমি জানি। তোমার বসের সঙ্গেও আমার কথা হইছে। এখন ধরো, ঐ যে বললা না—রিপোর্ট পাবলিক নিছে, নিছে বইলাই সমস্যা হইছে।... এক কাজ করো তুমি, বিবাহ করছ?

জি, গত বছর। আপনি আসছিলেন।

হানিমুন কই করছিলা?

যেতে পারিনি। যাব, এই আশপাশে কোথাও।

মালয়েশিয়া যাও। মাসখানেক থাইকা আসো।

অনেক খরচ। ওটা স্যার পারব না, আর এখন ঐ রিপোর্টের ফলো আপ...।

তার আগেই হয়তো পইড়া যাবা। শুনো, টাকা আমি দিমু। এই যে তোমার রিপোর্ট বন্ধ করলাম, তার কমপেনসেশন। আমার ওপর রাগ করবা না। তোমার-আমার ভালোর জন্য। তবে মালয়েশিয়া বইসা আবার এই ঘটনা নিয়া লেখালেখি কইরো না।

স্যার, আমি মালয়েশিয়া যেতে চাই না।

অভিমান?

আমি রিপোর্টটা আর চালিয়ে যাব না, কিন্তু মালয়েশিয়াও যাব না।

তোমাকে যেতে হবে।

স্যার, আপনি আমাকে ধমক দিচ্ছেন?

আমার গলা ধমকের মতো শোনাল?

দরকার হলে এই চাকরি আমি ছেড়ে দেবো...।

তবু তোমাকে যেতে হবে। তুমি কি বুঝতে পারছ?

দুজন দুজনের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল। সাংবাদিক মাথা ঝাঁকাল—হ্যাঁ, সে বুঝতে পারছে। সে জিজ্ঞেস করল—কিভাবে কী করব?

জরুরি কথা হচ্ছে, পাসপোর্ট আছে দুজনের?

আছে।

আমি পরিচিত এক ট্রাভেল এজেন্টের নাম বলছি। সে ভিসা করে দেবে। তুমি অফিস থেকে হাজার বিশ তিরিশ অ্যাডভান্স তুলবে। বাকিটা আমি দেবো।... কথা বাড়িও না। আজই পাসপোর্ট নিয়ে এজেন্টের সঙ্গে দেখা করো, আরো কী কী লাগবে সে তোমাকে বলে দেবে। আমি তোমার চিফকে বলে দিচ্ছি, তোমার ছুটির দরখাস্তে সই করে দিবে।

এক মাস ছুটি!

এক মাস ছুটি বোধ হয় তোমার পাওয়া হয় নাই। বিনা বেতনে নেবে। ওটা নিয়ে ভেবো না। দেখব। যাও।

যাব?

যাও। যা যা বললাম করো।... আরেকটা কথা, স্যরি। তোমার রিপোর্টটা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। কিন্তু তোমার ভালোর জন্য, আমার ভালোর জন্যও। যাও।... এসব কথা আমাদের দুজনের মধ্যে থাকবে।

থানা হাজতে বাবর আজম আর তালা বাবুলের দেখা হয়ে গেল। তালা বাবুল সেখানে আগেই ছিল, বাবর আজমকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। বাবর বাবুলকে দেখে বিরক্ত হলো—তুমি কী করো এখানে?

বইসা আছি আর গরমে ঘামি।

তুমি না বললে বাসায় যাবে...

মানে, বলছিলাম—মহল্লায় ফিইরা যাব, ওইখানেই ঘুরাফিরা করব। সবই ওইখানে।

ধরা পড়লে কিভাবে? তুমি না পুরনো দাগী!

সেইটা দন ধরেন, খুব একটা ভুল না। ছোট দাগী, তবে পুরানা।

তো? তোমার কি নিজের মতো আর থাকা হলো?

ভাবছিলাম, মৃত মানুষ আমি, আমাকে নিয়া মাথাব্যথা থাকব না।

বাসায় গিয়ে ধরল?

না না, বাসা পর্যন্ত যাইতেই পারি নাই। রাস্তায় কট। কামান নিয়া দাঁড়ায়া ছিল।

কী বলো, বাবুল! কামান!

কামান একটু বেশি বললাম। তবে ওইরকমই।

বলেছিলাম, আমার সঙ্গে থেকে যাও। শুনলে না।

আপনার সঙ্গে থাকলে কি ধরা পড়তাম না? আপনেও পড়ছেন।

আমি ধরা পড়েছি বাসা থেকে।

হা হা হা, কী বুদ্ধি। বাসায় গেছেন! আরে, বাসায়ই তারা প্রথম খোঁজ নিব।

তুমি থাকলে আমি নিশ্চয় বাসায় যেতাম না। তুমি-আমি কেউ ধরাও পড়তাম না।

কিন্তু দন, আমরা কী করতেছি, এইটাই আমি বুঝি নাই।

দেখ, আমাদের মৃত্যুর পেছনে কী রহস্য...

রহস্য আর কী, দুইজনে দুইটা গুলি খাইলাম...।

কিন্তু কেন খেলাম! এমনি এমনি কি কেউ গুলি খায়!

আহা, খাইলে অসুবিধা কী! সমাজে কুনো অসুবিধা দেখেন?

কিন্তু তোমার কি জানতে ইচ্ছা করে না, আমাদের মৃত্যুর পেছনে কী কারণ?

সেইটা ধরেন, কিছু তো দেখলাম, আর কী?

ওই যে মাছের মতো হা-করা লোকটা, গোছল করার সময় যার উদোম শরীরে পানির বদলে শাওয়ার থেকে টাকা ঝরে ঝরে পড়ে, সে কী করে অত জোরে ধমক দেয়, আমি বুঝতে পারি না, এটা কেন তোমার জানতে ইচ্ছা করে না।

টাকার জোরে দেয়। এইখানে আলাদা কইরা বুঝনের কিছু নাই।

কিন্তু অত টাকা তার কী করে হলো! কী করে হয়!

দন, এই যে আপনে আবার কঠিন কথা বলতেছেন।

এসব কঠিন কথা না, এসব জানতে হবে মানুষকে।

উপন্যাস না লিখবেন বলছিলেন, আরম্ভ করার সুযোগ পাইছিলেন?

না বাবুল, সময় পাইনি। তাছাড়া আমি অসমাপ্ত কোনো উপন্যাস লিখতে চাই না।

সমাপ্ত, অসমাপ্ত—এইসব খামোখা বলেন। আমি বুঝি?

আমার সঙ্গে আরো কয়েকদিন থাকলেই বুঝতে।

সারাজীবন ধমকধামকের ওপর থাকছি, মারা গেলাম, ধমক থামল না।

এই এটাই, এটাই। কেন একজনকে ধমক খেতে হয়, কেন একজন ধমক দিয়েই যায়!

এই যে, এখন পুলিশ ধমকাইতেছে...।

আহা, ওই মাছের মতো মানুষটার ধমকের কথা ভুলে গেলে! আচ্ছা, বাদ দাও, পুলিশ কী বলেছে তোমাকে?

বলছে, কাটব।

কাটব মানে?

ময়নাতদন্ত করব। আপনেরে করব না? বলে নাই কিছু?

ওইসব কিছু বলে নাই। শুধু শার্টের কলার ধরে বলল—চুপচাপ যাবি।

আপনেরেও কাটব। হাতুড়ি বাটাল করাত...।

কী বলো এইসব!

আপনি জানেন না?

জানি। ধারণা আছে।

আমার বিরক্ত লাগতেছে। ময়নাতদন্তের কী দরকার?

দরকার আছে, বাবুল।

আমি দরকার দেখি না। আমাদের মাটি খুঁইড়া চাপা দিলেই হয়।

ময়নাতদন্ত আমরা করব, বাবুল।

আমরা!

বাবুল...।

কী যে এখন কইবেন!

আমাদের ময়নাতদন্ত শেষ হয়নি।

আমরা আবার কার ময়নাতদন্ত করি?

করিনি? শুরু করিনি?

ধেত্। ময়নাতদন্ত করা আমি শিখি নাই।

বাবুল...।

কন।

আমরা পালাব।

আবার পালাব!

হ্যাঁ, আবার পালাব।

ক্যান! ময়নাতদন্তের পর কবর দিয়া দিব, এইটাই ভালো। ঝামেলা শেষ।

বাবুল, তুমি কি বুঝতে পারছ, কবর না দিয়ে এরা আমাদের বিচারের ব্যস্থাও করতে পারে। অত জিজ্ঞাসাবাদ তোমার ভালো লাগবে?

বাবুল মাথা নাড়ল না, জিজ্ঞাসাবাদ আমার ভালো লাগে না।

তাহলে?... আসো, আমরা বরং পালানোর প্ল্যান করি।

মেজবাকে ডেকে পাঠাল শরাফত—আসবা একদিন? কথা ছিল।

মেজবা বলল—আপনি ডাকলে এখনই রওনা দিই।

না না, এখনই দরকার নাই।

আমিও কথার কথা বলছি। রাতে আসি?

শরাফত গত কয়েকদিন ঘর থেকে বের হয়নি। তার বের হওয়ার ইচ্ছা হয়নি। তার সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। তার মনে হয়েছে, এই দেশে সত্ পথে ব্যবসা করা অসম্ভব এক ব্যাপার। এই যে সে জমিটা খুঁজে বের করল, ঘুরে ঘুরে খোঁজ-খবর নিল, দখল করার পর কিভাবে কী করবে এই জমি, ঠিক করল, আর, দখল কিভাবে করবে—ঠাণ্ডা মাথায় তা তো ঠিক করবেই—অথচ এর মধ্যে আসিফ ঢুকে পড়ল। তার মেজাজ বিগড়াল বটে, তবে সে মজাও পেল—আসিপ্পা, তুইও এই জমি চাস? আয়, দেখি কে পারে, তোরে গলায় দড়ি বাইন্ধা শহর ঘুরায় আনব। এরকম কত ভাবনাই সে ভেবেছিল। তার ধারণা হয়েছিল, জমিটা তার হয়েই যাচ্ছে। দখলের গল্পটা সাজানোর জন্য একটা লাশের দরকার ছিল, সেটাও হলো। একটার বদলে দুইটা লাশ পড়ল, কিন্তু জমি হয়ে গেল দূরের। এই যে লাশ পড়ল দুইটা, লাশ পড়লে কিভাবে সামাল দেবে—এসব ঠিক করাই ছিল। বড় সাংবাদিক ছিল, বড় নেতা ছিল, ঠিক ছিল—হইচই যা হবে, সে তো হবেই, তা যেন বেশি না ছড়ায়। হইচই বেশি ছড়ালও না। বরং যে লাশ দুটো পড়ল, তারা হাসপাতাল থেকে পালালে হইচই হলো বেশি। এটা সে সময় একটা খুশির খবর ছিল। এই যে হাসপাতাল থেকে লাশ দুটো পালাল—এটাই মানুষজনের মনোযোগ কাড়ল বেশি, পেছনে জমি দখলের একটা ঘটনা আছে, সেটা চাপা পড়ল। তবে যারা জানার, তারা জানল, তারা বড়, তারা বলল—জমি আমরা নেব। শরাফত এটা মেনে নিতে পারেনি। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে জমি দখলের ছক সে কেটেছে, লাশ ফেলেছে সে, আসিফ ছিল তার প্রতিপক্ষ, এখন আসিফ যদি বলে—জমি তার—সেটা শুনতে অত খারাপ লাগে না, কিন্তু যাদের এই জমি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, যারা দু দিন আগেও এই জমি সম্পর্কে জানত না, তারা যখন বলল—এই জমি তাদের—আর, সে যখন বুঝতে পারল, তারা যখন বলেছে তাদের, মানে তাদেরই, তখন থম মেরে যাওয়া ছাড়া তার আর কিছু করার থাকল না। তবে ভুল সে করতে পারত, যেমন আসিফ করেছিল, করেনি—কারণ মেজবা ছিল তার পাশে। মেজবার মাথা ঠাণ্ডা। তার চেয়ে অনেক ঠাণ্ডা।

মেজবা সচরাচর রাত করে আসে। আজ এল সন্ধ্যার পরপর। শরাফত বলল—এইটা ভালো করছ, সময় নিয়া আসছ।

শরাফত ভাই, আমি এইখান থেকে আরেক জায়গায় যাব।

অ।... নতুন কাজ?

কাজ না করলে খাব কী?

সেইটা ধরো, আমারও কথা। কাজ না করলে খাব কী!

আপনার আছে। আমি মজুর। দিন আনি দিন খাই।

ফ্লাট কিনছ না?

একটা-দুইটা ফ্লাট কে না কেনে!

হুমম।... মেজবা...।

জি ভাই, বলেন।

এখনই উঠবা, না কিছু সময় আছে?

ভাই, আপনে ডাকছেন, সময় কিছু না নিয়া তো আসি নাই।

কী খাইবা?

পরে। ডাকছেন কেন, এইটা শুনি।

একটুক্ষণ চুপ করে থাকল শরাফত—মেজবা...।

ভাই, শুনতেছি।

জমিটা পাইলাম না...।

এখনো ঐ জমি নিয়া পইড়া আছেন...।

ধরো, টাকাপয়সা একদম কম খরচ হয় নাই।

ভাই, আপনিও জানেন, এইটা ব্যবসার নিয়ম। খরচ ঠিকই হইব, কিন্তু সব ব্যবসা হইব না।

কিন্তু পোষায়ে নেওয়া তো দরকার।

জি, সেইটাও ব্যবসার নিয়ম।

নতুন কোনো জমির খোঁজ পাইছ? এমন জমি, সত্ পথে যেইটা নিতে পারব, আরো বড় পার্টি আইসা ঝামেলা করব না।

সত্ পথে জমি ক্যামনে পাইবেন! থ্রেট, মামলা, উঠায়া নেওয়া, লাশ...।

মেজবা, তুমি এইসব কী কও! ঐগুলো কি সত্ পথের মধ্যে পড়ে না। একজন সময় নিয়া, টাকা খরচ কইরা কাজ আগায়া নিব, তখন অন্যজন গায়ের জোরে দখলে নিব—এইটা হইল অসত্ পথ।

জি।... শরাফত ভাই, একটা কথা বলি। জমির ধান্ধা আর কইরেন না।

কিন্তু তুমি এইটায় লাভ দেখবা না?

লাভ আছে। কিন্তু এখন জমির ব্যবসা একা একা করতে যাওয়ার মধ্যে লসও আছে।

একা একা করতেছে না?

করতেছে। কিন্তু তারা অনেকদিন ধইরা করতেছে। তারা এখন একেকজন মাফিয়া। তারা যদি বলে—এই জমি আমার—তো সেই জমি তাদের। নিস্তার নাই। আর, আপনি একা গেলে গুপুত্ কইরা আপনার জমি আরেকজন খায়া ফেলব।

এইটা অবশ্য ঠিকই বলছ।

তাছাড়া ঢাকা শহরের মধ্যে জমি আর কই! জমি নাই। এখনো যারা একতলা দোতলা বাড়ির মালিক, দালালরা তাদের কাছে গিয়া নিত্য ধর্না দেয়, মানুষ বুইঝা থ্রেট দেয়। আপনি সুবিধা করতে পারবেন না।

হুম, এইটাও জানি। কিন্তু কিছু একটা করাও দরকার।

না করলেও বা অসুবিধা কী। এক্সিস্টিং ব্যবসা যেগুলো আছে...।

মেজবা, ব্যবসা বাড়াইতে কে না চায় বলো।

সেইটাও ঠিক। কিন্তু কী করবেন?

তোমারে ডাকছি। বাজারে কী চলতেছে?

চলে ভাই, অনেক কিছুই। প্রতিদিনই নতুন কিছু বাইর হয়। কিন্তু সেইসবের অধিকাংশ হয় যোগসাজশে...।

সেইটা কী রকম?

আগে থেইকা ছক কাইটা প্ল্যান পাশ করায়া মাঠে নামে...। আচ্ছা, আপনি কি ঢাকার বাইরে জমির ব্যবসা করবেন?

ঢাকার বেশি বাইরে যাইতে চাই না...।

মেজবা একটু ভেবে নিল—থাউক। ঢাকার বাইরেও তেমন জমি নাই। দুই বিঘা জমি কিইনা পেছনে এক শ বিঘা পর্যন্ত সাইনবোর্ড টানায়। আর আমি পাবলিকরেও বুঝি না। মারা দেওয়ার জন্য এমন অস্থির হইয়া থাকে!... তবে শরাফত ভাই, জমি থেইকা মানুষে হাজার হাজার কোটি টাকা কামাইছে।... একটা গল্প বলব?

বলো। অনেকদিন গল্প শুনি না।

এইটা একটা সিন্ডিকেটের গল্প। ধরেন, তিরিশ মাইল লম্বা একটা রাস্তা হবে। রাস্তাটা এলাকা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেইখান দিয়া হবে, তার দুই পাশের জমি হুহু করে বাড়বে। সরকার ডিসিশন নিছে, রাস্তা কই থেইক্কা কই হবে। তো সিন্ডিকেট করল কী, প্রথম থেইক্কাই সঙ্গে থাকল। ডিসিশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ায় কয়েকটা রিপোর্ট করাইল—রাস্তা হবে অমুক এলাকায়, অর্থাত্ যে এলাকা দিয়া হবে, সেই এলাকার নাম তারা বলল না, বলল অন্য এলাকার কথা। মিডিয়া এই কথা বিশ্বাস করে কিংবা পয়সা খেয়ে কয়েকটা রিপোর্ট করল। সংশ্লিষ্ট কেউ প্রতিবাদ জানাল না, কারণ ব্যবস্থা করা আছে।

জমি?

জমি। যারা বুঝল না, তারা ভুয়া রাস্তার দু পাশের জমি কিনতে লাগল। যারা সন্দেহ করল, তারা খোঁজখবর নিতে শুরু করল, কিন্তু সিন্ডিকেট সবকিছু গুছায়া রাখছে, তারা কাউকেই ঢুকতে দিল না। যাদের ক্ষমতা বেশি, তাদের বলল—এই প্রজেক্ট আমাদের করতে দেন, পরেরটা পুরোটাই আপনাদের, আমরা সেখানে হাত দিব না।

সিন্ডিকেট জমি কিনতে শুরু করল?

আর কী করবে! রাস্তা যেই এলাকা দিয়া হবে, তার দু পাশের সব জমি তারা কিনতে আরম্ভ করল। দু-আড়াই, বা তিন বছর পর বেঁচবে। কিন্তু যে লাভ হবে, তিন বছর টাকা ফেলায়া রাখা তার কাছে কিছু না।

অন্নেক লাভ, মেজবা, অন্নেক লাভ। কিন্তু এই গল্প তুমি আমারে শুনাইলা ক্যান!

জমির ব্যবসা, শরাফত ভাই, জমির ব্যবসা হইতেছে এইরকম। আপনি এক-আধ, দুই, তিন, চার, পাঁচ বিঘা জমি দখল কইরা কয় পয়সা কামাইবেন।

এইটা ঠিকই বলছ। কিন্তু ধরো, ইচ্ছা করলাম আর সিন্ডিকেটে ঢুইকা পড়লাম—তুমি জানো, ব্যাপার এইরকমও না।

এইরকমও না। কিন্তু সিন্ডিকেট লাগে।

শরাফত একটু ভাবল—আমার আসলে একাই ভালো লাগে।

টাকাপয়সা কি খুব বেশি কইরা ফেলছেন?

এইটা মেজবা, উল্লেখ করার মতো কিছু না।

বিদেশে কেমন আছে?

সামান্য।

বাইরে বাড়ি কয়টা?

করা দরকার।

আর কবে?

শরাফত সামান্য হাসল।

বাংলাদেশে বইসাও যদি আপনার যথেষ্ট ধনী হওয়ার ইচ্ছা না হয়, কোন দেশে থাকলে হবে, বলেন?

আসিফ আকবর বিশ্রামে আছে। তাকে বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে, কথা নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া বলতে নিষেধ করা আছে, বাড়ি থেকে খুব বেশি বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে—এসব সে মানতে চেষ্টা করছে। এসব সে মানার চেষ্টা করছে। কারণ যতদিন নিখোঁজ ছিল সে, ততদিনের অভিজ্ঞতা ভালো না। মারধর করেনি তারা, হালকা মারধরও না, কিন্তু কী যেন একটা ব্যাপার ছিল, একটা ভয় ঢুকে গেছে তার ভেতরে। যেন মাঝরাতে অন্ধকার বিছানায় কয়েকটি সাপের উপস্থিতি টের পাওয়ার মতো ভয়, তাদের শীতলস্পর্শ সহ্য করে পড়ে থাকা, বিছানা থেকে নামতে নিলেই তারা ছোবল বসাবে।

সমস্যা হলো তার মেজাজও গরম। কী কী নির্দেশ সে পেয়েছে, তার সবকটিই তার মনে আছে। তবু, সেদিন সাংবাদিকদের সে একহাত নিতে চাইল। এখন তার মন উড়ুউড়ু। সে ভাবছেন, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। এভাবে বসে থাকলে শরাফত তো বটেই, কম পর্যায়ের অন্যসব ব্যবসায়ীরাও তাকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। সে যদি বেশ কিছুদিনের গ্যাপ দেয়, তাহলে পরে দেখবে ব্যবসার অনেক কিছুই সে বুঝতে পারছে না। সে ঠিক করল, কিছু একটা শুরু করতে হবে। সেই কিছু একটা অবশ্যই ব্যবসা। রাহাতকেই ডাকবে সে। যদিও সে নিজেই রাহাতকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল, তার এখন মনে হচ্ছে, কাজের জন্য রাহাতই ভালো। তা ছাড়া সে যদি তখন রাহাতের কথা শুনত, মাথা গরম না করে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করত, তবে অনেক ধকলই তার ওপর দিয়ে যেত না। বরং এতদিনে সে হয়তো কিছুটা এগিয়েই থাকত। তবে রাহাতকে ফোন করার আগে কিছুটা সময় নিল সে। ভাবল, তারপর সে আরো একটু ভাবল, তারপর আরো একটু। রাহাতকে ফোন করে সে বলল—রাহাত...।

আপনার ফোন করার অনুমতি আছে?

আছে।

তাহলে বলুন।

তুমি কি এখন ব্যস্ত? মানে, কারো সঙ্গে কাজ করছ?

কাজ করতেই হয়, আসিফ ভাই।

হুম।... এরমধ্যে সময় বের করতে পারবে?

কেন ভাই?

সম্ভব হবে একটু দেখা করতে।

রাহাত কিছুটা সময় চুপ করে থাকল—কী ব্যাপারে?

কিছু একটা আরম্ভ করতে হয়।

আমি কি কাউকে পাঠাব?

না। আমার তোমাকেই দরকার।

আসিফ ভাই, আমি কাজে আছি।

ঐ কাজ শেষ হবে তোমার। তাছাড়া মানুষ কি একসঙ্গে দুটো বা তিনটা কাজ করে না?... করে না তোমাদের কেউ?

মনোযোগ কমে যায়, তবে করে।

আমি এখনই কাজ শুরু করতে চাই না...

তাহলে পরেই আসি আমি?

তবে আমি কিছু কাজ করতে চাই। গোছানোর কাজ।

রাহাত আবারও কিছুটা সময় চুপ করে থাকল—আমি যাব। তবে...

তবে কী?

শর্ত আছে আমার। শর্তগুলো আমার জন্য না, আপনার ভালোর জন্য।

হুম।

মেজাজ ঠাণ্ডা করতে হবে আপনার।

করব।

মেজাজ শুধু সেখানেই দেখানো যায়, যেখানে দেখিয়ে পার পাওয়া যায়।

বুঝতে পারছি।

আমি বলেছিলাম আপনাকে, আপনি শোনেননি।

তার মাশুলও আমাকে দিতে হয়েছে।

এভাবে মাশুল দিলে পিছিয়ে পড়বেন।

হ্যাঁ।... আর কী শর্ত তোমার?

আছে। বলব। সামনাসামনি।

কবে আসবে তাহলে?

খুব তাড়াতাড়ি।

বাবর আজম আর তালা বাবুল পালাল।

বাবর আজম অনেকভাবেই বোঝাচ্ছিল, কিন্তু তালা বাবুলের পালানোর ইচ্ছা ছিল না। সে বারবার বলছিল—আপনার কথা বুঝলাম। কিন্তু ঘটনার পেছনের ঘটনা নতুন নতুন দরজা বন্ধ হইতেছে না খুলতেছে, কে জানে; আমি পালানোর দরকার দেখতেছি না।

তুমি একটা কথা ভাবো। সেই যে হাসপাতাল থেকে আমরা পালালাম...।

সেইবারও আপনে আমারে ফুসলায়ে নিছিলেন।

ঠিক আছে, নিয়েছিলাম। কিন্তু খারাপ লেগেছিল তোমার?

বাবুল একটু ভাবল—খারাপ লাগছিল, এইটা আমি বলব না।

এইবারও লাগবে না।

লাগব। আমি জানি।

কিভাবে জানো?

সব যে একইরকম, এইটা আমি বুঝতে পারছি।

কিভাবে পারলে?

দেখলাম না?... আপনার কাছে নতুন লাগে, আমার কাছে লাগে না।

কিন্তু বাবুল, একবার ভাবো তুমি—।

বাদ দেন না...।

মাছের মতো ঐ লোকটা, ঐ যে তিমি মাছ, হা করে আর সব গিলে ফেলে। এই মাছগুলো কিভাবে তৈরি হলো বাবুল!

আমি ক্যামনে জানব! আমারে বলছে তারা?

আহা, তা কেন বলবে!

তাইলে জিগান কেন!

আমরা সেটা বোঝার চেষ্টা করব—কিভাবে, কিভাবে তারা তৈরি হলো...।

ভাই, আমি এর মইদ্যে নাই।

এর ঘণ্টা দুয়েক পর তারা পালাল। থানা হাজতে গরাদের ওপাশে দাঁড়িয়ে একজন হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল—ময়নাতদন্ত একটু দেরি হইব। এখন হইব সংবাদসম্মেল, সাংবাদিকরা আসতেছে। ঐদিকে আবার অনেক মন্ত্রী-মিনিস্টারও তোমাদের দেখতে চায়। এইসব শেষ হইলে ময়নাতদন্ত।

ওসব একসময় শেষ হলো। তখন বাবর আজম ও তালা বাবুল পালাল। v

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৬ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন