ঢাকা সোমবার, ২৫ মে ২০২০, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
৩০ °সে

গল্প

রুম্পার পিএসসি ইন্টারভিউ

ভাইভা বোর্ডের লোকগুলো যেন দয়ালু দেবদূতের মতোই নানা বিপত্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে এরপর জাতিসঙ্ঘের গঠনতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। রুম্পা সেসবেরও মসৃণ জবাব দিতে থাকে। যেমন জবাব দিতে হয় একজন কূটনীতিক হবার অভিলাষী তরুণকে
রুম্পার পিএসসি ইন্টারভিউ

‘How features are abroad

I am skilless of, but, by my modesty,

The jewel in my dower, I would not wish

Any companion in the world but you,

Nor can imagination form a shape

Besides yourself to like of (III.ii.).’

দূর— ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এ মিরান্ডার সংলাপ মুখস্থ করা ছেড়ে রুম্পাকে কিনা এখন নবম শ্রেণির পাটিগণিত করতে হচ্ছে। ‘একটি তৈলাক্ত বাঁশ বাহিয়া বানরটি এগারো হাত উঠিয়া আবার দুই হাত নামিলো’ থেকে শুরু করে ভুলে যাওয়া যত ঐকিক, ল.সা.গু. বা গ.সা.গু.—এসব কি পোষায়? কী আর করা? সামনে বিসিএস। এছাড়া আছে ইথিওপীয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার নাম মুখস্থ করা, পৃথিবীর বৃহত্তম ব্রিজ বা ক্ষুদ্রতম পাখির নাম মুখস্থ করা। মাস্টার্সের পরই প্রথমবার বিসিএস দেবে কি না—এটা নিয়ে খুবই সংশয়ে ছিল রুম্পা। ঢাকা ভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী মানে বাজারে চাকরি কিছু মিলবেই। ইউএনডিপির একটি প্রজেক্টে হুট করে হয়েও গেল তার। তবে, সেখানে রুম্পার বস কিনা ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইতিহাসে পাস করা। রুম্পা মাস ছয়েক খুব মন দিয়ে অফিসের লেখালেখির যাবতীয় কাজ ইংরেজিতে করতে থাকে, মিটিংয়ে ডোনারদের সঙ্গে বািচত করে। তবে দ্রুতই রুম্পাকে খুবই অবাক করে দিয়ে তারই তৈরি করে দেওয়া প্রেজেন্টেশন বা রিসার্চ রিপোর্ট নিয়ে অফিসের এমনসব মানুষ আজ ব্যাংকক কি কাল সুইজারল্যান্ড ট্রেনিংয়ে যায়, তাদের এমনকি বাংলা লেখাও খুব সুবিধার নয়। বস উল্টো তবু রুম্পাকেই সবসময় খড়েগর ওপর রাখেন। ফোঁপাতে ফোঁপাতে রুম্পা তার জীবনের প্রথম চাকরিতেই সত্তর হাজার টাকার বেতনের কাজে একবিকেলে সহসা রেজিগনেশন লিখে এসে বাসায় ফিরে হিস্টিরিয়া রোগীর মতো আচরণ করতে থাকে। দ্বিতীয় চাকরিটা খুবই অদ্ভুত...সত্তর হাজারের কাছ ছেড়ে বাড়ির পাশে একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে পনেরো হাজার টাকায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিল রুম্পা। তিন মাস ভালোই গেল। তিন মাস পর ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তাকে বলল, যে যে ছাত্র-ছাত্রীকে সে ফেল করিয়েছে, তাদের যেন সে পাস করিয়ে দেয়।

‘পাস করাবো মানে? আমার তো ধারণা ছিল যে পাবলিক ভার্সিটিতে আমরা মিডল ক্লাস ঘরের ছেলেমেয়ে। আমাদের চেয়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে আপার ক্লাসের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি অন্তত ভুল হবে না। হায় আল্লাহ, এত ভুল লিখেছে সব একেক জন!’

‘ইসরাত, আপনি খামোকা আর্গ্যু করছেন কেন?’

এভাবেই দুই কথা দুই কথায় চার কথা হয়ে উইলো প্রাইভেট ভার্সিটির গভর্নিং বডির সঙ্গে ইসরাত ওরফে রুম্পার এমন লাগা লাগল যে সেই চাকরিও ছাড়তে হলো তাকে।

‘আমার মনে হয় এবার তুই বরং বিসিএস দে।’

‘না আব্বু, এই তুমি যেমন ঘুষ খেতে পারো না বলে সারাজীবন আম্মা শুধু ঘ্যানঘ্যান করে গেল। আম্মুকেও তো আসলে কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়েছে। বিসিএস দিয়ে কী হবে?’

‘শোন্, তিন মাস দুই লাখ টাকাই আয় করলি। তারপর ছেড়ে দিলি বা ছেড়ে দিতে হলো। এরচেয়ে সারাজীবন কুড়ি হাজার টাকার চাকরি করাই কি ভালো না? প্রাইভেট জব তোর জন্য না। তুই এজাতীয় জব ট্যাকল করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ স্মার্ট বা চালাক-চতুর না। শুধু মেধা বা পরিশ্রম দিয়ে প্রাইভেট জব চলে না।’

‘সেটা অবশ্য ঠিকই।’

‘তোর কষ্ট করতে হবে না। কাল আমিই তোর জন্য বিসিএস গাইড কিনে আনব অফিস থেকে ফেরার সময়।’

এই শুরু হলো শেক্সপিয়র থেকে জোসেফ কনরাডের বই সব একপাশে সরিয়ে রেখে পৃথিবীর নানা দেশের মুদ্রা, রাজধানী, রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম মুখস্থ করা। মাঝে মাঝে কান্না পায় রুম্পার। ভালো লাগে না এত বিরক্তিকর পড়াশোনা। তাও কিনা এই ছাব্বিশ বছর বয়সে। তবে, চোখের সামনে একটা নতুন স্বপ্নও দেখা দিয়েছে তার। ইংরেজি তো সে মোটামুটি অনর্গল বলতে পারে। বিসিএসে আর ফরেন সার্ভিসেই বরং চেষ্টা করবে সে।

দুই

বিসিএসে প্রিলিমিনারি আর লিখিত—এই দুটো পরীক্ষাতেই মোটামুটি ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে রুম্পা। এখন সামনে ভাইভার প্রস্তুতি। যেহেতু তার প্রথম পছন্দ সে দিয়েছে ফরেন সার্ভিস, সারাদিনই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বইপত্র পড়তে হয় তাকে। আর এই কয়েকমাসের ভেতরে দেশে বেশ বড়সড় কিছু বদলও হয়েছে।

‘একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, আব্বু। দুই দলের কেউই ক্ষমতায় নাই।’

‘কিন্তু সেটা তো মুশকিলও।’

‘কেমন?’

‘ধর, একদল ক্ষমতায় থাকলে ফারাক্কা, টিপাইমুখ, সীমান্তে হত্যা নিয়ে ইন্টারভিউয়ে প্রশ্ন বেশি আসবে আরেক দল ক্ষমতায় থাকলে জেনেভা কনভেনশনে গণহত্যার সংজ্ঞা কী—এমন প্রশ্ন আসবে। যেহেতু এ মুহূর্তে এই দুই দলের কেউই ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় আছে যারা, তারা ঠিক কোন দিকের—এটা যেহেতু আমরা কেউই বুঝতে পারছি না—এটা আরো সমস্যা।’

‘তাহলে কী হবে?’ রুম্পা নার্ভাস হয়।

‘আপাতত দু দিকের পড়াই পড়তে থাক। পাকিস্তান কেন বিহারিদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না পড়তে থাক, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্যও পড়। আবার ঐ ফারাক্কা, টিপাইমুখ বা সীমান্তে হত্যা নিয়েও পড়। খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভাইভা বোর্ডে সব উত্তর দিবি মা! খুব স্ট্র্যাটেজিক্যালি। প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের ধরন শুনেই বুঝতে পারবি কে কোন দিকের, কে কোন পক্ষের? সেটা বুঝে যত ট্যু দ্য পয়েন্ট, যত অবজেক্টিভলি উত্তর দেওয়া যায় দিবি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা!’

তিন

কালই ভাইভা। বিকেলে অরিত্রী আপু এসে ওনার ইন্টারন্যাশনাল ল-এর কিছু নোট দিয়ে গেছেন। ‘ল অব দ্য সি’ বা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন নিয়েও কিছু প্রশ্ন আসতে পারে ভাইভা বোর্ডে। অতীতে এই ভাইভা বোর্ড ফেস করা এক বড় ভাই জানিয়েছেন।

‘এত নার্ভাস কেন? তুমি তো ভালো ছাত্রী!’

‘কী জানি আপু! অন্যান্য সময় তো বোঝা যায় সরকার কোন পক্ষের? সেই অনুযায়ী প্রশ্ন হয়। এক পক্ষ ক্ষমতায় থাকলে ধরা যাক মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে কোন দুই দেশ—এমন প্রশ্ন আসবে। আরেক পক্ষ ক্ষমতায় থাকলে ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য অসাম্য কত—এ বিষয়ে প্রশ্ন আসবে। এখন কারা আসলে দেশ চালাচ্ছে সেটা তো বোঝা যাচ্ছে না।’

‘হুম, সত্যিই কিছু বুঝছি না। সে যাক। আমি আসি রুম্পা।’

‘আপনার কাজ কেমন চলছে?’

‘এই কিছুদিন লাখ টাকা কামাই আবার কিছুদিন বেকার থাকি। সরকারি চাকরির পরীক্ষা তো দিলাম না। তোমরা তো তা-ও মাত্র চার ভাইবোন। আমাদের অনেক ভাইবোনের সংসারে বাবা ঘুষ খেতে পারতেন না—বাবার পিওনের বাসায় দাওয়াতে গেলে দেখতাম আমাদের বাসায় তখনো ফ্রিজ নেই, পিওনের বাসায় ফ্রিজ। সো, যে ডিসিশন নেওয়া হয়ে গেছে তো গেছে। এখন এভাবেই চলছে আর কি!’

‘হুম, সাবধানে এসেন।’

‘বাসা থেকে আসার পথে দেখলাম রাস্তাঘাট এমনিতে পরিষ্কার। জ্যাম নেই। তাই বলে এই অস্পষ্ট শাসনব্যবস্থাকে তো আর সমর্থন করা যায় না।’

‘আর আব্বু তো বলে এই শাসকগোষ্ঠী ঠিক কোন পক্ষের তা বলা যাচ্ছে না। তাহলেই বোঝেন কী বিপদ!’

রাতে কেমন এলোমেলো ঘুম হলো রুম্পার। স্বপ্নে সে দেখল পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের নুড়ি পাথরে পা রেখে সে হাঁটছে আর নগ্ন দুই পায়ের পাতা তার বিক্ষত হয়ে উঠছে রক্তে। সামনে দুটো নৌকা আর একটা আধাভাঙা জাহাজ।

‘কন্টিনেন্টাল শেলফ- ইইজেড অর এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন- ডিমারকেইশন অব সি’-

‘কী বিড়বিড় করছিস?’ আম্মু এসে রুম্পাকে ঘুম থেকে ধাক্কা দিয়ে তোলে।

‘সাতটা বেজে গেছে। ওঠ, গোসল কর। শাড়ি পরে যাবি না সালোয়ার-কামিজ? শাড়ি পরলে তো তুই ভালো পরতে পারিস না। আমাকেই পরাতে হবে।’

আব্বু দরজার ওপাশ থেকে মাথা গলায়।

‘শাড়ি পরেই যা। ফরেন সার্ভিসের ভাইভা মানে বিদেশে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করা। তোর গত জন্মদিনে যে লালসবুজ জামদানিটা দিয়েছিলাম না ওটা—হ্যাঁগো—ওকে আয়রন করে দাও না!’

‘যাচ্ছি আয়রন করতে। তুই রেডি হ। মাছের ঝোল-ভাত হয়ে গেছে।’

চার

লালসবুজ জামদানি পরে, আয়নায় ভেজা চুল আঁচড়াতে গিয়ে রুম্পা নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। এমনিতে সে একেবারেই মেকআপ করে না। লিপস্টিক কেন, কাজলও মাখে না চোখে। পুরু চশমা পরে। তবু শুধু শাড়ি পরেই নিজেকে একদম অন্যরকম লাগছে।

নাকেমুখে মাছভাত খেয়ে, বাবার সঙ্গেই সিএনজি ভাড়া করে পিএসসিতে ভাইভা রুমের সামনে পৌঁছে গেল রুম্পা। সিরিয়ালে সে পাঁচ নম্বরে। সময় লাগবে কিছু। বাবা গতকাল খোঁজখবর নিয়েছেন। এবার দুই দলেরই দুজন দুজন চার জন ভাইভা বোর্ডে মূল প্রশ্নকর্তা হিসেবে আছেন। রুম্পা যেন প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে খুব সতর্ক থাকে, খু-ব।

কল এল প্রায় সোয়া বারোটার দিকে। ফরেন সার্ভিসের ভাইভা। প্রশ্নোত্তর সবই ইংরেজিতে।

‘ওয়েলকাম ইয়াং লেডি! কনগ্র্যাটস ফর পাসিং ইন দ্য রিটেন এক্সাম। ইন্ট্রোডিউস ইওরসেল্ফ।’

রুম্পা হাসিমুখে তার নাম, কোন ডিপার্টমেন্ট থেকে পাস করেছে সেসবই বলে।

‘সো ইসরাত...টেল আস সামথিং অ্যাবাউট ইওর পার্সেপশন অন দ্য বার্থ অব বাংলাদেশ অ্যাজ আ নেশন!’

খাইছে! রুম্পার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। ভাইভা বোর্ডে দু পক্ষের দুজন দুজন চার জন। কী বলবে সে? ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দান থেকে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন বলে অন্য দুজন নম্বর কমিয়ে দেবে? আর ২৬ শে মার্চ বেতারে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার বিবৃতি পাঠ করেছেন বলে অন্য দুজন রেগে যাবে? কড়া এসির ভেতরেও রুম্পার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে।

‘ডিয়ার স্যার...বাংলাদেশ হ্যাজ অ্যাচিভড হার ফ্রিডম থ্রু আ নাইন মান্থস লং ব্যাটল অব এক্সটিম স্যাক্রিফাইস অ্যান্ড ব্লাডশেড...দিস ল্যান্ড অব গ্রিনস, ল্যান্ড অব রিভারস, ল্যান্ড অব মাইটি বে অব বেঙ্গল হ্যাড টু পে ভেরি হার্ড প্রাইস ফর হার ফ্রিডম!’

দারুণ। রুম্পা নিজেই বুঝতে পারে সে তার পথ পেয়ে গেছে। বাংলাদেশ যে শাপলা-শালুকের দেশ...ল্যান্ড অব ওয়াটার লিলিস...গান ও কবিতার দেশ...ল্যান্ড অব সংস অ্যান্ড পোয়েমস...গড়গড় করে পাঁচ মিনিট দিব্যি চলে যায়।

‘গুড। ইওর ইংলিশ ইজ গুড। নাউ দ্য সেকেন্ড কোশ্চেন ইজ...’

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। কোনো ব্যাপার? পড়া তো আছেই। বহুদূরের একটি বিষয়ে প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধ না, বিহারিদের ফিরিয়ে নেওয়া না, গণহত্যার সংজ্ঞাও না।

ভাইভা বোর্ডের লোকগুলো যেন দয়ালু দেবদূতের মতোই নানা বিপত্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে এরপর জাতিসঙ্ঘের গঠনতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। রুম্পা সেসবেরও মসৃণ জবাব দিতে থাকে। যেমন জবাব দিতে হয় একজন কূটনীতিক হবার অভিলাষী তরুণকে। কূটনীতিক কি নন সেই মাছের মতো যিনি পিচ্ছিল কাদার ভেতরেও আটকে না গিয়ে সরে যেতে পারবেন?

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৫ মে, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন