ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
৩২ °সে

অনুবাদ উপন্যাস

অব মাইস অ্যান্ড মেন

অব মাইস অ্যান্ড মেন

সোলেদাদের কয়েক মাইল দক্ষিণে, সালিনাস নদী। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে গভীর ও সবুজ হয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে। সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার আগে সূর্যালোকে তপ্ত বালুরাশির ওপর দিয়ে এই নদীটি প্রবাহিত হতে হতে সরু হয়ে গেছে, তাই জল খুব উষ্ণ। নদীর একপাশে সোনালি পাদদেশের ঢালগুলি শক্ত এবং পাথুরে গিলিলান পর্বতগুলিতে বক্ররেখা করে বয়ে গেছে, কিন্তু উপত্যকার পাশে জলরাশি বৃক্ষের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে। গাছগুলো প্রতি বসন্তে তাজা আর সতেজ হয়ে ওঠে। শীতল এবং সবুজ পাতাগুলি শীতকালে এর ধ্বংসাবশেষ বহন করে। বৃক্ষের নিচে বালির তলদেশে পাতাগুলি গভীরে চলে যায়। পাড়টি এত নরম যে একটা টিকটিকি এর ওপর দিয়ে গেলেও নিচে চলে যাবে। সন্ধ্যাবেলায় বালির ওপর বসার জন্য খরগোশগুলি বেরিয়ে আসে এবং স্যাঁতস্যাঁতে বালুস্তরে রেকুনের পায়ের ছাপ দেখা যায়, মাঝে মাঝে কুকুরের পায়ের ছাপও পড়ে থাকে এখানে। এমনকি রাতের বেলা হরিণ যে পানির খোঁজে এখানে এসেছিল, তার পায়ের ছাপও দেখা যায়!

উইলো এবং সিকামোর বৃক্ষগুলির মধ্য দিয়ে একটি পথ চলে গেছে, যে পথ হেঁটে ছেলেরা সাঁতার কাটার জন্য চলে আসে। জীবন এখানে নীরস ছিল। কিন্তু দুজন মানুষের সঙ্গে এই পথে দেখা হলো এবং তারা ঐ সবুজ নদীর কাছে এল। তারা সেই পথ ধরে হেঁটে চলে এল, এমনকি একজন আর-একজনের পিছনে হেঁটে চলল। দুজনই জিন্সের ট্রাউজার আর কোটপরা ছিল, কোটগুলোর বোতাম ছিল পিতলের। উভইয়েই কালো টুপি পরত এবং উভয়ে তাদের কাঁধে টাইট করে কম্বল ঝুলিয়ে রাখত। প্রথম লোকটি ছোটখাটো এবং চটপটে, চকচকে চোখ এবং তীক্ষ, শক্তিশালী গড়ন, মুখের রং কালো। সংক্ষেপে বলা যায় সে ছোটখাটো, শক্ত হাত, সরু বাহু, পাতলা এবং তীক্ষ নাক। তার পেছনের লোকটি তার বিপরীত, একটি বিশাল মানুষ এবং খুব ধীর গতি, ফ্যাকাশে চোখ, এবং চওড়া ঘাড়।

প্রথম লোকটি পথ ছেড়ে দাঁড়াল যেন কারণ পেছনের লোকটি তার ওপর পড়ে যাবে এমন অবস্থা। সে তার টুপি তুলে নিল, সোয়েটব্যান্ড দিয়ে ঘাম মুছে নিল। পেছনের লোকটি তার গায়ের কম্বল খুলে নিচে নেমে গেল এবং সবুজ নদীর পানি খেতে লাগল। গা ডুবিয়ে দিল ঘোড়ার মতো। ছোট চটপটে লোকটি ভয়ে ভয়ে তার পাশে গেল।

‘লেনি!’ সে তীব্রভাবে বলল। ‘লেনি, ঈশ্বরের দোহাই, নদীর পানি পান করা বন্ধ করো।’ লেনি নাক দিয়ে শব্দ করতে লাগল। ছোট লোকটি তার ঘাড়ের কাছে কাত হলো এবং তার কাঁধে ঝাঁকুনি দিল ‘লেনি তুমি গত রাতের মতো অসুস্থ হবে।’

লেনি তার মাথাটি পানির নিচে ডুবিয়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল এবং তার টুপি তার নীল কোটের ওপর দিয়ে পড়ে গেল। ‘ভালো,’ সে বলল, ‘তুমিও পান করো, জর্জ। আচ্ছামতো পান করো।’সে আনন্দে হাসল। জর্জ তার থলেটা নামাল এবং আস্তে করে নদীর ধারে রাখল। ‘আমি শিওর না এই পানি ভালো কি না।’ সে বলল। ‘কিছুটা খারাপ মনে হচ্ছে।’

লেনি তার বড় হাতটি পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে নখগুলো নাড়াল আর পানি লাফিয়ে উঠল। পানির প্রবাহ গোল হয়ে নদীর ধার ছুঁয়ে আবার ফিরে আসল। লেনি তা দেখতে লাগল। বলল, ‘দেখো, জর্জ। আমি কী করেছি দেখো।’ জর্জ নদীর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল এবং হাত দিয়ে পানি খেল ‘মন্দ না খেতে,’ জর্জ বলল। ‘কিন্তু নদীটা আসলে প্রবাহমান নয় বলে মনে হচ্ছে , যদিও বদ্ধ নদীর পানি পান করা উচিত নয়।’ সে হতাশ হয়ে বলল। ‘আসলে তৃষ্ণার কাছে থাকলে এসব যুক্তি খাটে না।’ বলে সে তার মুখে জলের ঝাপটা দিল। থুতনির নিচে এবং ঘাড়ে পানি দিয়ে হাত বুলিয়ে নিল। এরপর সে তার টুপি পড়ে নিল, নদী থেকে উঠে দাঁড়াল। লেনিও তাই করল। সে জর্জকে ফলো করছে মনে হলো। জর্জের টুপির মতো নিজের টুপিটাও চোখের কাছে নামিয়ে দিল।

জর্জ পানির দিকে চোখ বড় করে তাকাল। তার চোখের মণি সূর্যের আলোর মতো লাল ছিল।

লেনি ভয়ে জর্জের দিকে তাকাল, ‘জর্জ?’

‘হ্যাঁ, বলো?’

‘আমরা কোথায় যাচ্ছি, জর্জ?’

জর্জ তার টুপিটা টেনে নিল এবং লেনিকে চিত্কার করে বলল, ‘ও তুমি যে ভুলে গেছে? আবার তোমাকে বলতে হবে, অ্যাম আই রাইট? গড! ইউ আর এ ক্রেজি বাস্টার্ড!’

‘আমি ভুলে গেছি, ‘লেনি আস্তে আস্তে বলল। ‘আমি মনে রাখতে চেষ্টা করেছি। খোদার কসম।’ ‘ওকে ওকে আমি আবার বলব। আমার কিছুই করার নেই। এখন আমি সব তোমাকে বলে আমার সময় নষ্ট করব, তুমি ভুলে যাবে, আমি আবার তোমাকে বলব, তাই না?’

‘লেনি বলে, ‘বারবার মনে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। আমার খরগোশের কথা মনে আছে জর্জ। ’

‘জাহান্নামের খরগোশ। তুমি শুধু খরগোশদের মনে রাখতে পেরেছ। ঠিক আছে! এখন শোন মন দিয়ে, আর এখন তোমাকে মনে রাখতে হবে যেন কোনো সমস্যা না হয় এইবার। মনে আছে হাওয়ার্ড স্ট্রিটের গাটার সেটিং আর সেই ব্ল্যাক বোর্ডের কথা?’

লেনির মুখে হাসি ফুট উঠল।’ ও হ্যাঁ মনে পড়েছে , জর্জ! আমার মনে আছে ... কিন্তু ...এরপর আমরা কী করেছিলাম? মনে পড়ছে কয়েকজন মেয়ে এসেছিল আর তুমি বলেছিলে—তুমি বলেছিলে।’

‘মেয়ে আবার কী! হেল! আরে তুমি কি মনে করতে পারো? মনে আছে আমরা মারী আর রেডীর কাছে গিয়েছিলাম। তারা আমাদেরকে ওয়ার্ক কার্ড ও বাস টিকেট দিয়েছিল?’

‘ওহ, জর্জ। এখন মনে পড়ছে।’ তার হাত দ্রুত তার কোটের পকেটে চলে গেল।

সে বলল, ‘জর্জ , আমিতো আমারটা পাইনি। মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি।’ সে হতাশ হয়ে মাটির দিকে তাকাল। তোমার কখনো ছিল না! ক্রেজি বাস্টার্ড! আমার কাছে দুটোই আছে। তোমাকে যদি তোমার ওয়ার্ক কার্ড সঙ্গে রাখতে বলতাম তাহলে কী হতো!’

লেনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।’ আমি ভেবেছিলাম আমার সাইড পকেটে রেখেছি!’ সে তাড়াতাড়ি পকেটে হাত দিলা।

জর্জ তার দিকে কটমট করে তাকাল, ‘তুমি কী বের করতে যাচ্ছ তোমার পকেট থেকে?’

‘কেন আমার পকেটে কিছু থাকতে পারে না?’ লেনি চালাকি করে বলল।

‘আমি জানি পকেটে নেই। এটা তোমার হাতে কী এটা? কীভাবে হাতে এল? লুকিয়ে রেখেছিলে?’

‘না কিছু নাই, জর্জ। সত্যি।’

‘দাও, এখুনি দাও।’ লেনি জর্জের দিক থেকে তার হাত বন্ধ করে দূরে সরিয়ে নিল।

‘এটা একটা ইঁদুর, জর্জ।’

‘ইঁদুর? জ্যান্ত ইঁদুর?’

‘উহু। জাস্ট একটি মরা ইঁদুর, জর্জ।’ ‘আমি—আমি মারিনি। সত্যি, আমি এটা খুঁজে পেয়েছি। আমি এটা মৃত খুঁজে পেয়েছি।’

‘দেখাও!’ জর্জ বলল।

‘আরে, আমাকে ছেড়ে দাও, জর্জ।’

‘দেখাও! লেনি ধীরে ধীরে হাত খুলল। জর্জ ইঁদুরটা নিয়ে নদীর ওপারে জঙ্গলের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিল।

‘অ্যানিওয়ে, তুমি এই মরা ইঁদুর দিয়ে কী করবে?’

লেনি বলল, ‘আমি যখন হাঁটব তখন ও আমার হাতের মধ্যে থাকবে।’

‘কখনোই না। আমার সাথে হেঁটে গেলে এইসব ইঁদুর নিয়ে হাঁটা চলবে না। বলোতো এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

লেনি চমকে গেল, এরপর তার মুখ হাঁটুর নিচে ঢেকে বলল, ‘আমি আবার ভুলে গেছি।’

‘ওহ গড!’ জর্জ রেগে গিয়ে বলল, ‘ওয়েল লুক, আমরা একটা ফার্মে কাজ করতে যাচ্ছি উত্তরে।’

‘উত্তরে?’

‘উইডে?’

‘ও। মনে আসছে, উইডের কথা।’

‘আমরা যে ফার্মে কাজ করব, তা মাত্র কোয়ার্টার মাইল। আমরা মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তাকে কাজের টিকিট দেখাব, কিন্তু তুমি একটা কথা বলবে না। তুমি সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। সে যদি বুঝতে পারে তুমি একটা আস্ত বলদ, আমাদের কাজ দেবে না। কিন্তু যদি তিনি আগে কাজ দেখে, তোমার সঙ্গে কথা বলার আগে, তাহলে চাকরিটা পাব। বুঝতে পেরেছ?

‘শিওর, জর্জ। বুঝতে পেরেছি।’

‘ওকে। এখন আমরা যখন মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাব, তুমি কী করবে বলোতো?’

‘আমি—আমি,’ লেনি ভাবল। তার মুখটা চিন্তায় শক্ত হয়ে উঠল। ‘আমি কিছু বলব না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকব।’

‘গুড বয়। এবার দুই-তিনবার বলো। যাতে ভুলে না যাও।’

লেনি শান্ত হলো। বলল, ‘আমি বলব না, আমি কিছুই বলব না, আমি বলব না’

‘ওকে,’ জর্জ বলল। ‘আর তুমি উইডে যে খারাপ কাজ করেছ, সেই ধরনের কাজ আর করতে পারবা না।’

লেনিকে হতভম্ব দেখাল, ‘কী করেছি আমি উইডে?’

‘ওহ, তুমি সেটাও ভুলে গেছ? ওয়েল, আমি তোমাকে সেটা মনে করিয়ে দেব না। পাছে তুমি আবার সেই ধরনের কাজ করে বসো।’

লেনির মনে পড়ল, ‘তারা উইড থেকে আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল।’

‘আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল?’ জর্জ জঘন্যভাবে বলে, ‘আমরা পালিয়ে এসেছি। তারা আমাদের ধরার চেষ্টা করেছিল। পারেনি।’

লেনি হেসে বলল, ‘আমি তা ভুলিনি।’

জর্জ বালুর ওপর শুয়ে পড়ল। মাথার নিচে হাত দিয়ে। লেনিও তাই করল।

‘গড! তুমি একটা ঝামেলা।’ জর্জ বলল, ‘আমি একা একা সহজ, সুন্দরভাবে চলতে পারি, তুমি আমার সঙ্গে না থাকলে। আমি হয়তো সহজ সুন্দরভাবে বাঁচতে পারতাম, হয়তো প্রেমিকাও খুঁজে পেতাম।’

লেনি চুপ করে রইল। এরপর সে আশা নিয়ে বলল, ‘আমরা একটা ফার্মে কাজ করব জর্জ।’

‘ঠিক আছে। তুমি সেটা বুঝেছ। কিন্তু আমরা এখানে ঘুমাতে যাচ্ছি।’

দিনটি দ্রুত চলে যাচ্ছে। শুধু গ্যাবিল্যান পাহাড়ের শীর্ষে মনে হয় আগুন লেগেছে, সুর্যের আলো এমনভাবে পড়েছে।

‘জর্জ, কেন আমরা ওই ফার্মে গিয়ে রাতের খাবার খেতে পারি না? ফার্মে নিশ্চয় খাবার আছে।’

জর্জ লেনির দিকে ঘুরে তাকাল। ‘কোনো কারণ নেই। আমার এখানেই ভালো লাগছে। আগামীকাল আমরা কাজে যাব।’

লেনি হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠল এবং জর্জের দিকে তাকাল, ‘আমরা কোনো রাতে খাবার খাবো না?’

‘হ্যাঁ, যদি আমরা কিছু উইলো গাছে কাঠ জোগাড় করতে পারি, আমার থলিতে তিন ক্যান মটরশুঁটি আছে। তুমি আগুন জ্বালাও আমি তোমাকে ম্যাচ দিচ্ছি। আমরা আগুনে পুড়িয়ে খাব এগুলো।’

লেনি বলল, ‘আমি কেচাপ দিয়ে মটরশুঁটি খেতে পছন্দ করি’

‘কিন্তু, আমাদের কোনো কেচাপ নেই, তুমি কাঠ আনতে যাও। এবং উলটা পালটা কিছু করবে না। খুব তাড়াতাড়ি রাত নেমে আসবে।

লেনি উঠে দাঁড়াল এবং জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। জর্জ যেখানে ছিল সেভাবেই রইল এবং আস্তে আস্তে শিস বাজাল। নদী বয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল যেদিকে দিয়ে লেনি কাঠ আনতে গিয়েছিল। জর্জ শিস দেওয়া বন্ধ করে নদীর শব্দ শুনতে লাগল।

‘পুউর বাস্টার্ড’ বলে জর্জ আবার শিস বাজাতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরে লেনি বনজঙ্গলের মধ্য থেকে বের হয়ে এল। তার হাতে মাত্র একটা উইলি গাছে ডাল। জর্জ উঠে বসল।

বলল, ‘ওকে, আমাকে ইঁদুরটা দাও।’

লেনি এমন ভাব করল যেন কিছুই বুঝছে না।

‘কোন ইঁদুর জর্জ? আমার কাছে কোনো ইঁদুরে নেই।’

জর্জ তার হাত ধরে বলল, ‘দাও দাও।’ লেনি ইতস্তত করে পেছনে চলে গেল।

জঙ্গলের দিকে এমন করে তাকাল—মনে হচ্ছে সে জঙ্গলের দিকে দৌড় দিতে যাবে। জর্জ শান্ত হয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে ইঁদুরটা দেবে নাকি জোর করে নিতে হবে।’

‘কী দেব তোমাকে, জর্জ?’

‘তুমি ভালো করে জানো। আমি যে ইঁদুরটা চাই।’

লেনি অনিচ্ছুক হয়ে তার পকেটে হাত দিল। তার কণ্ঠস্বর একটু ভেঙে গেল।

‘আমি জানি না কেন আমি এটা রাখতে পারছি না। এটা কারো ইঁদুর না। আমি এটা চুরি করিনি। আমি রাস্তার পাশে থেকে এটাকে কুড়িয়ে পেয়েছি। আমি ওর সাথে কিছু খারাপ করছি না। হাতে ধরে রেখেছি শুধু।’

জর্জ উঠে দাঁড়াল এবং অন্ধকার জঙ্গলের যতদূরে পারা যায় ইঁদুরটাকে ছুড়ে মারল। এরপর নদীর দিকে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল।’

‘তুমি একটা আস্ত বোকা। তুমি কি মনে করো না যে—আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার পা ভেজা এবং তুমি নদীর ওপারে গিয়েছিলে ইঁদুর ধরতে?

জর্জ শুনতে পেল লেনি কাঁদছে এবং বলছে, ‘ব্লুবেরিং একটা শিশু, তুমি তার প্রতি এত কঠোর হলে!?’

লেনি তার ঠোঁট নাড়াচ্ছিল ও চোখজুড়ে কান্না চলে এসেছিল ওর। জর্জ তার হাত লেনির কাঁধে রেখে বলল, ‘ও, লেনি। আমি ইঁদুরটাকে বিনা কারণে দূরে ঠেলে দিচ্ছি না। ইঁদুর তাজা না লেনি এবং তুমি এভাবে নিজের কাছে রেখে পালতে গিয়েও ওর কষ্ট হচ্ছে। তুমি একটা তাজা ইঁদুর নিয়ে আসো, আমি কিছুক্ষণের জন্য রাখতে দেব।’

লেনি মাটিতে বসে পড়ল এবং না-সূচক মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি জানি না ইঁদুর কোথায় আছে। আমার মনে আছে এক মহিলা আমাকে ইঁদুর দিত। কিন্তু সেই মহিলা এখানে নেই।’

জর্জ বলল, ‘ভদ্রমহিলা? ভুলেও মাথায় এনো না সেই মহিলার কথা। ওই মহিলা তোমার মাসি, ক্লারা, সে তোমাকে ইঁদুর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তুমি সবসময় ইঁদুরগুলোকে মেরে ফেলো।’

লেনি তার দিকে দুঃখিত হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘তারা খুব ছোট ছিল, আমি ওদেরকে পোষ মানাতাম, খুব শীঘ্রই তারা আমার আঙুলগুলো কামড়ে দিত। এই কারণে আমি তাদের মাথায় একটু মারতাম ও তখুনি ওরা মরে যেত। কারণ ওরা খুব ছোট ছিল।’

‘আমি আশা করছি আমরা সেই খরগোশগুলোকে পাব, ওরা ছোট না।’

‘খরগোশ দিয়ে কী হবে! ছোট তাজা ইঁদুর তোমাকে দিলে তো তুমি মেরে ফেলবে। তোমার খালা তোমাকে রাবারের ইঁদুর দিত এবং তোমার তা ভালো লাগত না।’

লেনি বলে ওঠে, ‘এটা পোষা যায় না, রাবারের ইঁদুর।’

সূর্যের আলো পাহাড়ের উপর উঠে গেল এবং উপত্যকায় অন্ধকার নেমে এল।

জর্জ বলল, ‘তুমি কী কাঠ আনবে ? সিকামো গাছের বনের পেছনে অনেক কাঠ আছে’

লেনি গাছের পেছন থেকে শুকনো পাতা আর ছোট ছোট ডাল এনে জড়ো করতে লাগল। তখন প্রায় রাত নেমে এসেছে। জর্জ থলে খুলল এবং তিন ক্যান মটরশুঁটি নিয়ে বের করল। জর্জ বলল, ‘এই মটরশুঁটি চারজন লোক খেতে পারবে।’

লেনি আগুনের শিখার ওপর দিয়ে তাকে দেখল এবং বলল, ‘আমি কেচাপ দিয়ে খেতে চাই।’

জর্জ বিস্ফোরিত হলো রেগে, ‘আমাদের কেচাপ নেই। সবসময় আমাদের যা নেই, তুমি তা চেয়ে বসো। গড! যদি আমি একা থাকতাম, খুব সহজ হতো জীবন। আমি নিজে গিয়ে জব করতাম এবং কোনো সমস্যা হতো না। কোনো সমস্যাই ছিল না। মাসের শেষে আমি আমার পঞ্চাশ টাকা নিয়ে শহরে যেতাম এবং যা ইচ্ছা হতো কিনতাম। আমি এক গ্যালন হুইস্কি খেতে পারতাম, নদীর পাশে একটা হোটেল নিতাম, কার্ড খেলতাম।’ লেনি দেখল জর্জ রেগে গেছে। সে খুব ভয় পাচ্ছে। জর্জ বলছে,‘ কিন্ত কী পেলাম! তোমাকে পেলাম। তুমি নিজের চাকরি তো রাখতে পারো না, তোমার জন্য আমার চাকরি চলে যায়। তুমি ঝামেলা করো। ঝামেলায় পড়ো এবং আমার কাজ হলো তোমাকে উদ্ধার করা!’ জর্জ প্রায় চিত্কার করে বলছিল। ‘ইউ ক্রেজি সান অব আ বিচস! আমাকে সবসময় ঝামেলার রাখো!’ সেই একটা ছোট মেয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলল, ‘মেয়েটার কাপড় ধরতে চেয়েছিলে—চেয়েছিলে তাকে ইঁদুরের মতো পোষ মানাতে? তুমিই বলো মেয়েটি কী করে জানবে যে তুমি শুধু তার জামাটা ধরতে চেয়েছিলে? সে ঝাঁকি মারল তোমাকে আর তুমি এমনভাবে ধরে ছিলে যেন সে একটা ইঁদুর! মেয়েটি চিত্কার দিল আর লোকগুলো আমাদেরকে ধরতে এল আর আমরা ধানের খেতের মধ্যে পালালাম। সেই অন্ধকারে আমরা পালালাম এবং উইড ছাড়তে বাধ্য হলাম। আমি যদি তোমাকে ইঁদুরের খাঁচায় বন্দি করে রাখতে পারতাম!’ কথাগুলো বলে বলে জর্জ ক্যানগুলো আগুনে উলটে পালটে দিচ্ছিল। সে এমন ভাব করছিল যেন লেনির কথা তার মনে নেই।

‘জর্জ!’ লেনি বলল, ‘জর্জ, বলো তুমি কী চাও? আমি আসলে দুষ্টুমি করছিলাম। আমার কেচাপ লাগবে না। এমনকি আমার পাশে যদি কেচাপ থাকত এখন, আমি খেতাম না।’

‘এখানে থাকলে তো তুমি খেতে পারতে।’

‘না আমি কিছুই নিতাম না। তোমার জন্য রেখে দিতাম। তুমি তোমার মটরশুঁটি দিয়ে খেতে।’

‘কখন আমি একটা সুন্দর সময় পাব! তুমি সবসময় আমাকে বিরক্ত করো। আমার শান্তি নষ্ট করো।’

লেনি নিচু হয়ে নদীর দিকে তাকাল এবং বলল, ‘জর্জ তুমি কি আমি তোমার থেকে দূরে চলে যাই?’

‘কোন জাহান্নামে যাবে শুনি!’

‘আমি ঐ পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলে যাব। যদি কোনো গুহা পাই।’

‘ও আচ্ছা। খাবে কী তুমি?। খাওয়া খুঁজে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট জ্ঞান আছে তোমার!

‘আমি কিছু খুঁজে পাব, জর্জ। আমার কেচাপেরও দরকার নেই, ভালো খাবারেরও দরকার নেই। সেখানে কেউ আমাকে হার্ট করবে না। কেউ আমার কাছ থেকে ইঁদুর কেড়ে নেবে না। তুমি যদি চাও আমি চলে যাব।’

‘না। দেখো লেনি, আমি মজা করছিলাম। আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে থাকো। কিন্তু সমস্যা হলো, তুমি ইঁদুরগুলোকে মেরে ফেলো। তার বদলে আমি তোমাকে একটা কুকুর ছানা দেব। ওকে তো তুমি মারতে পারবে না। পোষ মানাতে পারবে।’

লেনির কথাটা মনের মতো হলো না।

জর্জ বলল, ‘আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে থাকো। তোমাকে কেউ হয়তো মেরে ফেলবে। এমনকি তোমার খালাও চাননি তুমি একা থাকো।’

‘লেনি বলল, ‘না আমি চলে যেতে চাই।’ লেনি আবার বলল, ‘জর্জ তুমি ঐ খরগোশটার কথা বলো না! ঐ যে তুমি ঐ খরগোশটার কী করেছিলে, ঐ কথা।’

জর্জ আবার বলল, ‘ঠিক আছে, বলব। এরপর আমরা রাতের খাবার খাব।’

জর্জের গলা ভারী হয়ে এল। সে বলে যেতে থাকল, ‘যারা আমাদের মতো ফার্মে কাজ করে তারা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ। তাদের কোনো ফ্যামিলি নেই, নিজেদের কোনো জায়গা নেই। তারা একটা ফার্মে আসে, সেখানে তাদের বসত বানায়। পরে তারা অন্য কোথাও চলে যায়, অন্য ফার্মে চলে যায়। তাদের নিজের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। লেনি বলল, ‘ঠিক ঠিক। কিন্তু আমরাও কি এরকম?’

‘না। আমরা এমন না। আমাদের আশা আছে। আমাদের ভবিষ্যত্ আছে। আমাদের কথা বলার মানুষ আছে।’

লেনি ফেটে পড়ল, ‘কিন্তু কেন, কেন! কারণ তুমি আমাকে পেয়েছ, আমার সবকিছু দেখাশোনা করছ। আমি তোমাকে পেয়েছি, তোমার ভালোমন্দ দেখছি?’ লেনি আনন্দে হাসতে হাসতে বলল, ‘বলো জর্জ, বলো।

‘তার মানে তুমি ভালোই মনে রেখেছ। তুমি জানো সব।’

‘না। আমি কিছু জিনিস ভুলে গেছি। বলোই না, কেমন হবে আমাদের জীবন।’

‘ওকে, হয়তো একদিন আমরা একসঙ্গে সব করব। আমাদের একটা ছোট বাড়ি হবে, কয়েক একর জমি হবে, একটা গরু, আর কিছু শুয়োর থাকবে।

লেনি চিত্কার করে বলল, ‘দিনে আনব দিনে খাব! আমাদের খরগোশ থাকবে। বলো বলো জর্জ, আমাদের বাগানে কী কী থাকবে, খাঁচার ভিতরে খরগোশ কিভাবে থাকবে, শীতকালের বৃষ্টি, চুলা, দুধের সর কত পুরু হবে, বলো জর্জ বলো।’

‘কেন তুমি নিজে বলছ না? তুমিতো সব জানো।’

‘না । তুমি বলো জর্জ। আমি বললে তোমার মতো শোনাবে না। বলো, কিভাবে আমার খরগোশের দেখাশোনা করা উচিত।’

জর্জ তার মটরশুঁটির ক্যানে চাকু চালাল। ক্যান খুলে লেনির দিকে দিল। এরপর আরো একটা ক্যান খুলল। সাইড পকেট থেকে দুটো চাকু বের করে একটা লেনিকে দিল।

জর্জ চামচ ধরে লেনিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাল যখন তোমার মালিক তোমাকে প্রশ্ন করবে, তুমি কী উত্তর দেবে?’

লেনি চিবানো বন্ধ করে, গিলে ফেলে বলল, ‘আমি তাকে কোনো কথাই বলব না।’

‘গুড বয়। তোমার উন্নতি হচ্ছে। আমি তোমাকে খরগোশের কাছে যেতে দেব। যদি তুমি এমন করে মনে করতে পারো’

লেনির কথাটা শুনে খুব ভালো লাগল। বলল, ‘অবশ্যই পারব। আমি কিন্তু কিছু বলব না বলেছিলাম, সেটা মনে রেখেছি।’

‘অবশ্যই তুমি মনে রাখতে পেরেছ। শোনো তুমি যদি আগের মতো ঝামেলা করো, তাহলে আমি তোমাকে পরামর্শ দেব জঙ্গলে লুকিয়ে যাবে।’

‘জঙ্গলের লুকানো?’ লেনি বলল।

‘তুমি লুকিয়ে থাকবে। কিন্তু আমি তোমাকে খুঁজে বের করব। মনে থাকবে?’

‘হ্যাঁ জর্জ। জঙ্গলের নিচে লুকিয়ে থাকব তুমি না আসা পর্যন্ত।’

জর্জ খালি ক্যান জঙ্গলের দিকে ছুড়ে দিতে দিতে বলল, ‘কিন্তু তুমি কোনো ঝামেলা করবে না। নাহলে আমি তোমাকে খরগোশের কাছে ঘেঁষতে দেব না।’

‘আমি কোনো সমস্যা করবো না জর্জ। আমি কোনো কথা বলব না।’

‘ওকে, তোমার থলে আনো আগুনে পাশে। রাতে এখানে ঘুমাতে খুব আরাম হবে।’

তারা বালুর ওপরে তাদের বিছানা পাতল। অন্ধকার নেমে এসেছে। লেনি ডাকল, ‘জর্জ! তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ?’

‘না, কেন?’

‘আমাদের যেন ভিন্ন ভিন্ন রঙের খরগোশ থাকবে।’

‘ঠিক আছে।’ জর্জ ঘুমের ঘোরে বলল, ‘লাল, নীল ও সবুজ খরগোশ লেনি, লক্ষ লক্ষ খরগোশ।’

‘হ্যাঁ। ওদের গা অনেক পশমে ঢাকা।’

‘আমিতো দূরে চলে যাব এবং গুহায় বসবাস করব।’

‘তুমি জাহান্নামে যাও। এখন চুপ করো।’ জর্জ বলল।

আগুনের লাল আলো কয়লায় নিভে গেল। দূরের পাহাড়ে নেকড়ের ডাক শোনা গেল, একটা কুকুর তার সাথে সুর করে ডাকতে লাগল। সিকামোরের পাতা বাতাসের সঙ্গে ফিসফিস করতে লাগল যেন।

শ্রমিকদের শোবার ঘরটা ছিল লম্বা আর আয়তাকার। ওয়ালে সাদা রং, কিন্তু ফ্লোরে রং নাই। তিনটা ওয়ালে ছোট ছোট বর্গাকার জানালা এবং চার নম্বর ওয়ালে একটা কাঠের দরজা। ওয়ালের পাশে আটটা বিছানা। ওয়ালের কাছে লোহার কালো চুলা, চুলা থেকে একটা পাইপ ওপরে সিলিঙ্গের দিকে উঠে গেছে। রুমের মাঝখানে একটা গোলাকার টেবিল, যেখানে তাস খেলা যায়—এবং টেবিলের চারপাশে বক্স আছে যাতে প্লেয়াররা বসতে পারে। সকাল দশটার দিকে সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ধুলামাখা রোদ আসে। এবং তারার মতো ঝকঝক করে।

সেদিন ঘরের কাঠের দরজা খুলল। ঘাড় খাটো একটা বয়সী লোক ঢুকল। তার পরনে ছিল নীল জিন্স এবং তার বাম হাতে একটা ঝাড়ু ছিল। তার পেছনে পেছনে ঢুকল জর্জ ও তার পেছনে লেনি।

‘মালিক চেয়েছিল তোমরা কাল রাতে আসো।’ বৃদ্ধ লোকটি বলল।

‘সে রাগ করেছিল, কারণ আজকে সকালে তোমাদেরকে ফার্মে পাঠাতে পারল না।’

লোকটি ডান হাত দিয়ে দেখাল, তার হাত লোহার, ডান হাত নাই তার। সে বিছানা দেখিয়ে বলল, ‘তোমরা এই দুটো বিছানায় থাকবে।’ বিছান দুটি স্টোভের কাছে ছিল।

জর্জ ভিতরে ঢুকল এবং সে তার কম্বল একটা খড়ের তোশকের ওপর রাখল। সে তার থলে শেলফে দেখল। শেলফ থেকে একটা হলুদ রঙের ক্যান বের করে আনল ও বলল, ‘এটা কী?’

‘কী জানি।’ বৃদ্ধ লোকটি জবাব দিল। লেখা আছে উকুন, তেলাপোকা ও অন্যান্য ঝামেলাযুক্ত প্রাণী ধ্বংস করে।

জর্জ বলল, ‘আমরা খরগোশ মারতে চাই না।’

বৃদ্ধ লোকটি তার ঝাড়ু রাখল এবং ক্যানটা ধরে দেখল, যত্ন নিয়ে পড়ল এবং বলল, ‘শোনো যে লোকটি আগে এখানে ছিল, সে একজন নাপিত ছিল। লোকটি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। সে খাওয়ার পরে এইটা দিয়ে হাত ধুয়ে নিত।’

‘তাহলে কেমন করে সে...।

‘শোনো, এই নাপিত যার নাম হুইটি পারলে, যেখানে ছারপোকা নাই, ওখানেও এই ওষুধ ঢালত।’

‘বুঝছি না।’ জর্জ সন্দেহের চোখে বলল, ‘আচ্ছা সে চাকরি ছেড়ে দিছে কেন?’

লোকটি হলুদ ক্যানটা তার পকেটে রাখল , বলল, ‘সে এমনি চলে গেছে।’

বৃদ্ধ লোকটি বলল, ‘মালিক কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। সে নিশচয়ই রেগে আগুন হচ্ছিল—যখন তোমাদেরকে সকালে দেখতে পায়নি। সকালের নাস্তা খেয়ে এখানে এসে তোমাদের না দেখে বলেছিল, কোথায় নতুন কর্মী! মালিক একজন আফ্রিকান লোককে জাহান্নামে পাঠিয়েছে।’

জর্জ বসে পড়ল এবং বলল, ‘খুব রাগ করেছে?’

‘হ্যাঁ। সে নিগ্রো।’

‘ওহ, নিগ্রো।’

‘হ্যাঁ, সে ভালো লোক। মালিক তার সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু লোকটি কেয়ার করে না কিছুই। সে অনেক বই পড়ে। তার রুমে অনেক বই আছে।’

‘মালিক কেমন লোক’ জর্জ জিজ্ঞেস করল।

‘ওয়েল, সে ভালো লোক। কখনো কখনো খুব রেগে যায়। কিন্তু সে ভালো আছে। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি কি জানো সে ক্রিস্টমাসে কী করেছে? গ্যালন গ্যালন হুইস্কি এনে বলেছে, ‘পান করো। ক্রিস্টমাস তো একবারই আসে জীবনে।’

‘গড! এক গ্যালন?’

‘ইয়েস স্যার। আমরা খুবই মজা করেছিলাম। ঐদিন ওই নিগ্রো লোকটিকে এখানে আসার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। সেও অনেক খেয়েছিল সেদিন।’

লেনি বিছানা ঠিক করছিল। কাঠের দরজা খুলে গেল। একজন লোক ঢুকল। তার পরনে নীল জিন্সের ট্রাউজার , ফ্লানেলের শার্ট, একটা কালো হাতাকাটা সোয়েটার এবং একটা কালো কোট। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বেল্ট ধরা ছিল। বৃদ্ধ লোকটি তার দিকে এক পলক তাকাল ও তড়িঘড়ি করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ‘ওরা এসেছে’ বলেই পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল দরজা দিয়ে।

মালিক রুমের ভেতরে ঢুকল, মোটা মোটা পায়ে হেঁটে, ‘আমি মারী এবং রেডীকে লিখেছিলাম যে—আমার দুজন লোক লাগবে আজ সকালে। তোমরা তোমাদের কাজের টিকেট এনেছ?’

জর্জ পকেট থেকে স্লিপ বের করে মালিককে দিল। ‘এটা মারী বা রেডীর দোষ না। স্লিপে পরিষ্কার লেখা আছে তোমরা আজ সকাল থেকে কাজ করতে পারতে।’

জর্জ তার পায়ের দিকে তাকাল। ‘বাসে ড্রাইভার আমাদেরকে নামিয়ে দিয়েছে।’ জর্জ বলল, ‘আমাদের দশ মাইল হাঁটতে হয়েছে। তাই সময়মতো আসতে পারিনি।’

মালিক পেন্সিলে কামড় দিয়ে বলল, ‘তোমার নাম কী?’

‘জর্জ মিল্টন।’

‘আর তোমার নাম কী?’

জর্জ বলল, ‘ওর নাম লেনি জুনিয়র।’

বইতে ওদের নাম লেখা হলো। সে বই বন্ধ করল, ‘তোমরা আগে কোথায় কাজ করেছ?’

জর্জ বলল, ‘উইডে।’

‘তুমিও?’ লেনিকে জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, সেও।’ জর্জ বলে দিল।

মালিক লেনির দিকে তাকিয়ে হাসল; বলল, ‘সে মনে হয় কথা কম বলে।’

‘না, কিন্তু কাজে খুব ভালো। ষাঁড়ের মতো খাটতে পারে।’

লেনি তার দিকে তাকিলে হাসল। ‘ষাঁড়ের মতো শক্তিশালী।’ লেনি বলে ফেলল।

জর্জ লেনির দিকে ভ্রু কুঁচকাল। লেনি লজ্জা পেল, মাথা নিচু করল।

মালিক হঠাত্ বলল, ‘দেখো লেনি জুনিয়র,’ লেনি হাত তুলল। মালিক বলল, ‘তুমি কী কী করতে পারো?’

ভয় পেয়ে লেনি জর্জের দিকে তাকাল সাহায্যের জন্য, জর্জ বলল, ‘ তুমি যা বলো, ও সব করতে পারবে। তাকে খালি একটা সুযোগ দাও।’

মালিক জর্জের দিকে ফিরল। ‘কেন তুমি লেনিকে বলতে দিচ্ছ না?’

জর্জ জোরে করে বলে উঠল, ‘সে আসলে ভালো করে কথা বলতে পারে না। কিন্তু খুব ভালো কাজ করতে পারে।’

মালিক তার ছোট খাতাটা পকেটে রাখল এবং তার আঙুল দিয়ে বেল্ট ধরে বলল, ‘আমাকে বলো তুমি লেনির কাছ থেকে কী সুবিধা নিচ্ছ। ওর বেতনের টাকা মেরে খাচ্ছ না তো?’

‘না । অবশ্যই না। তুমি এমন ভাবছ কেন?’

‘আমি কখনো দেখিনি, একজন লোক অন্যের ওপরে এমন আধিপত্য করতে পারে। আমি জাস্ট জানতে চাচ্ছিলাম তোমার ইন্টারেস্ট কী এখানে?’

জর্জ বলল, ‘সে আমার কাজিন। আমি তার মাকে বলেছিলাম আমি তাকে দেখে রাখব। সে যখন ছোট ছিল—একটা ঘোড়া তার মাথায় আঘাত করে। সে ঠিক আছে। খালি একটু কম বোঝে। কিন্তু সে সব করতে পারে, যা তুমি বলবে করতে।’

মালিক একটু ঘুরল, লেনিকে দেখল, বলল, ‘ওকে ঈশ্বর জানেন বার্লি ব্যাগ টানতে তার কি ব্রেনের কাজ লাগবে। কিন্তু তুমি ওর ওপরে কিছু চাপিয়ে দিও না। আমি তোমার ওপর চোখ রাখছি। তুমি উইড থেকে কেন চলে এলে?’

জর্জ তাড়াতাড়ি বলল, ‘ওদের কাজ ছিল না।’

‘কী জব করত ওখানে?’

‘আমরা গর্ত খুঁড়ছিলাম, ময়লা ফেলার।’

মালিক বলল, ‘ফসল তোলা টিমের সঙ্গে ডিনারের পরে যাবে। স্লিমের টিমের সঙ্গে।’

‘স্লিম?’

‘হ্যাঁ। রাতের খাবারের পর ওর সঙ্গে দেখা করবে।’

মালিক চলে গেলে জর্জ লেনির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি না কিছু বলবে না বলেছিলে?’

লেনি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি ভুলে গেছি জর্জ।’

‘হ্যাঁ। তুমি ভুলে গেছ। তুমি সবসময় ভুলে যাও।’ সে বিছানার ওপর বসে পড়ল।

লেনি বলল, ‘জর্জ।’

‘এখন আবার কী?’

‘আমার মাথায় ঘোড়ায় আঘাত করেছিল? এটা ঠিক?’

জর্জ রেগে গিয়ে বলল, ‘তোমাকে এটা বলে বাঁচালাম!’

‘তুমি বলেছ, আমি তোমার কাজিন।’

‘হ্যাঁ। সেটা মিথ্যা বলেছি। মিথ্যা বলে আমি আনন্দিত।’

সঙ্গে সঙ্গে ঐ বৃদ্ধ লোকটা হাতে ঝাড়ু নিয়ে ঢুকল। তার পায়ের কাছে একটা কুকুর এল। বৃদ্ধ লোকটি বলল, ‘আমি তোমাদের কথা শুনিনি। আমি শুধু কিছুক্ষণ কুকুরের গায়ে হাত বুলাচ্ছিলাম।’

‘তুমি আমাদের কথা শুনছিলে।’ জর্জ বলল, ‘মানুষের এই ধরনের ছে ছোঁক ছোঁক স্বাভাব অসহ্য।’

বৃদ্ধ লোকটি অপ্রস্তুত হয়ে একবার জর্জের দিকে, একবার লেনির দিকে তাকাল। ও আবার বলল, ‘আমি এখানে জাস্ট এসেছিলাম। আমি সত্যি তোমাদের কোনো কথা শুনিনি। তুমি যা বলেছ ঠিক না, আমি এসব ব্যাপারে একদম ইন্টারেস্টেড নই।’

‘আসলে ঠিক। ও শোনেনি।’ জর্জ বৃদ্ধ লোকটিকে বলল, ‘এসো, বসো কিছুক্ষণের জন্য। আরে তোমার কুকুর তো খুব বৃদ্ধ!’

‘হ্যাঁ, বাচ্চা অবস্থা থেকে আমার কাছে আছে। যখন কম বয়স ছিল, খুব সুন্দর ছিল সে।’ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল, ‘মালিককে কেমন দেখলে’

‘ভালো। মনে হলো ভালো।’

‘সে একজন ভালো লোক’, ঝাড়ুদার বলল।

সেইসময়ে ঐ ঘরে একজন যুবক ঢুকল। পাতলা, বাদামী মুখ, বাদামী চোখের মণি, মাথায় কোঁকড়ানো চুল। তার বাম হাতে গ্লাভসপরা এবং উঁচু জুতোপরা। মালিকের মতো। সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি মালিক বুড়োকে দেখেছ?’

ঝাড়ুদার বলল, ‘সে এখানে কিছুক্ষণ আগে ছিল, চার্লি। রান্নাঘরে গেছে মনে হয়।’

‘আমি তাকে খুঁজছি’, চার্লি বলল। তার চোখ জর্জ আর লেনির দিকে গেলা এবং সে দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘তোমরা কি তারাই যাদের জন্য মালিক অপেক্ষা করছিল?’

‘আমরা এইমাত্র এসেছি’, জর্জ বলল।

‘ওকে কথা বলতে দাও’, লেনির দিকে তাকিয়ে বলল চার্লি।

‘আসলে ও কথা বলতে তেমন চায় না’, জর্জ বলল।

চার্লি একটু গা মোচড়ালো। বলল, ‘ঈশ্বরের কসম, দেখবে সে কথা বলবে অনেক। সে কথা বলতে চায় না , এটা দিয়ে কী বোঝাতে চাইছ তুমি?’

জর্জ শান্ত গলায় বলল, ‘আমরা একসঙ্গে এখানে এসেছি। আমি তাকে চিনি।’

‘ওহ আচ্ছা। তাহলে এই ব্যাপার?’

জর্জ চিন্তায় পড়ে গেল এবং নড়ল না। বলল,‘হ্যাঁ।’

লেনিকে দেখে মনে হচ্ছিল সে জর্জের অনুমতি নেওয়ার জন্য অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‘আর তুমি এই ছেলেটিকে কথা বলতে দেবে না, রাইট?’

জর্জ লেনির দিকে মাথা কাত করে বলল, ‘সে কথা বলতে পারে, যদি সে তোমাকে কিছু বলতে চায়।’

লেনি নরম স্বরে বলল, ‘আমরা কেবল এসেছি।’

চার্লি লেনির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরপর থেকে তুমি কথা বলবে যখন তোমার ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করা হবে।’ বলে সে দরজার দিকে গেল এবং বের হয়ে গেল।

জর্জ তার যাওয়া দেখল এবং ঝাড়ুদারকে বলল, ‘বলো, লেনি ওর ঘাড়ে কী এমন বোঝা চাপিয়েছি। লেনি ওর কী করেছে?’

ঝাড়ুদার দরজার দিকে খেয়াল করে দেখল কেউ কিছু শুনছে কি না। এরপর সে বলল, ‘সে মালিকের ছেলে। সে খুব ভালো লোক না।’

‘ওকে। সে তার মতো যাই হোক। কিন্তু তার লেনির দেখাশোনা করতে হবে না।’

ঝাড়ুদার বলল, ‘শোনো তোমাকে একটা কথা বলি। সে ছোটখাটো মানুষদের পছন্দ করে। সে লম্বা চওড়া মানুষকে ঘৃণা করে। সে লম্বা চওড়া লোক দেখলে খুব রাগ করে। কারণ সে নিজে ছোটখাটো। তুমি নিশ্চয়ই এরকম অনেক ছোটখাটো লোক দেখেছ, যারা খুব অসহ্য।’

জর্জ বলল, ‘হ্যাঁ দেখেছি। অনেককে দেখেছি। কিন্তু চার্লি যেন ভুলেও লেনির ব্যাপারে ভুল না করে এবং তার জ্ঞান না ফলায়। তার খবর করে ছাড়ব যদি সে লেনিকে নিয়ে উলটা পালটা কিছু করে বসে।’

‘ওয়েল, লেনিও বদ আছে’, ঝাড়ুদার বুড়ো চালাকি করে বলল।

জর্জ দরজার দিকে লক্ষ করছিল। জর্জ পানসে ভাব করে বলল, ‘তার লেনির ব্যাপারে ঠিকমতো চলতে হবে।। লেনি ফাইট করে না, কিন্তু লেনি স্পস্টভাষী এবং শক্তিশালী। লেনি অত নিয়ম কানুন জানে না।’ বলতে বলতে জর্জ টেবিলের কাছে গেল, একটা চেয়ারবক্সে বসল এবং তাস শাফেল করতে লাগল।

বুড়ো ঝাড়ুদার অন্য একটা বাক্সে বসল। ‘চার্লিকে এইসব বলো না, আমি যা বলেছি। সে আমাকে খুন করে ফেলবে। মালিকের ছেলে তো।’

জর্জ তাস শাফেল করতে করতে বলল, ‘এই চার্লিকে আমার একটা কুত্তার বাচ্চা মনে হচ্ছে। আমি এই ধরনের লোককে পছন্দ করি না।’

ঝাড়ুদার বলল, ‘ইদানীং আরো খারাপ হয়েছে সে। কয়েক সপ্তাহ আগে সে বিয়ে করেছে। তার বউ মালিকের বাড়ি থাকে। বিয়ে করার জন্য চার্লি অহংকারী হয়েছে বেশি।’

জর্জ বুঝল, ‘মনে হয় সে তার বউকে দেখানোর জন্য এমন করছে।’

ঝাড়ুদার জর্জের কথা শুনে উত্ফুল্ল হয়ে বলল, ‘তুমি কি তার বাম হাতে গ্লাভস দেখেছ?’

‘হ্যাঁ দেখেছি’

‘এই ভ্যাসেলিন দিয়ে ভরা?’

‘ভ্যাসেলিন? কী ফালতু কারণে?’

‘আমার মনে হয়, চার্লি তার বউকে বোঝায় সে তার হাত নরম রাখে ভ্যাসেলিন দিয়ে।’

জর্জ তাসের দিকে নিমগ্ন হয়ে আছে। বলল, ‘এই ধরনের বাজে কথা লোককে বলা যায় না।’

বুড়ো মাথা নাড়ালো। সে এখন নিশ্চিত হয়েছে যে সে জজের্র কাছে গোপন কথা বলতে পারে।

‘আমি তোমাকে চার্লির বউকে দেখাব, অপেক্ষা করো।’

জর্জ তাস কাটতে লাগল এবং জিজ্ঞেস করল, ‘সুন্দরী?’

‘হ্যাঁ, সুন্দরী, কিন্তু...।’

জর্জ তাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, ‘কিন্তু কী?’

‘সুন্দরী কিন্তু নজর দেয়।’

‘ও তাই? দুই সপ্তাহ ধরে বিয়ে করেছে এবং চার্লিকে চোখে চোখে রাখে? হয়তো সেই কারণে চার্লির প্যান্ট পিপীলিকায় ভরা।’

‘আমি দেখেছি সে কেমন করে স্লিমের দিকে তাকিয়ে আছে। স্লিম আস্তাবল দেখাশোনা করে। সে খুব হ্যান্ডসাম। তার কোনো উঁচু হিলের জুতো পরতে হয় না। আমি দেখেছি চার্লির বউ স্লিমের দিকে নজর দিচ্ছে। চার্লি দেখে নাই। কিন্তু চার্লসন আবার চার্লির বউয়ের দিকে নজর দেয়।’

জর্জ অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে মজাই হবে ভবিষ্যতে।’

এরপর ঝাড়ুদার উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘তুমি কি জানো আমি কী চিন্তা করছি’, জর্জ কিছু বলল না।

বুড়ো বলল, ‘আমার মনে হয় চার্লি একজন বিবাহিত ও বিকৃত মানসিকতার।’

জর্জ বলল, ‘চার্লি একমাত্র না। এরকম অনেক আছে।’

বুড়ো ঝাড়ুদার দরজার দিকে চলে গেল। তার কুকুরও কষ্ট করে পায়ে ভর দিয়ে উঠে মনিবের সঙ্গে সঙ্গে গেল।

‘আমি ধোয়ার জন্য বেসিন ঠিক করে রেখেছি। দলবল খুব শীঘ্র চলে আসবে। তোমরা কি ট্রাকে বার্লি তুলতে যাবে?’

‘হ্যাঁ’

‘আমি যা বলেছি চার্লিকে বলো না।’

‘আরে না।’

‘ওয়েল, তুমি তার বউকে লক্ষ করে দেখো যে—সে বাজে দৃষ্টি দেয় কি না’, বুড়ো চলে গেল।

দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল, ‘কোথায়, কোথায় আফ্রিকান আমেরিকান?’কোন জাহান্নামে গেছে গাধা নিগ্রো?’

জর্জ তাস নিয়ে কী যেন ভাবছিল। লেনি বিছানায় শুয়ে তাকে দেখছিল।

‘দেখো লেনি। এখানে কোনো নিয়ম নাই। আমি ভীত। চার্লির সাথে তোমার সমস্যা হতে পারে। আমি এই ধরনের লোক আগেও দেখেছি। সে তোমাকে অনেক প্রশ্ন করবে সরাসরি। সে বুঝতে পেরেছে যে, সে তোমাকে ভয় পাইয়ে দিতে সক্ষম এবং সে যখনই চান্স পাবে তখনই তোমার সাথে এমন করবে।’

লেনির চোখে ভয়। সে দুঃখ পেয়ে বলল, ‘আমি কোনো সমস্যা চাই না। তুমি তাকে আমার ওপর ঝামেলা করতে দিও না।’

জর্জ লেনির বিছানার কাছে এল, বলল, ‘শোনো লেনি, আমি এই ধরনের বাস্টার্ড আগে দেখেছি। বুড়ো ঝাড়ুদার যেমন বলছিল যে, চার্লি কাউকে চান্স দেয় না, সে সব সময় জয়ী হয়।’ জর্জ ভেবে আবার বলল, ‘সে যদি তোমার সাথে লাগতে আসে, ভুল করো না । সে মালিকের ছেলে। সবসময় তার থেকে দূরে দূরে থাকবে। থাকবে তো? কখনো তার সাথে কথা বলবে না। সে যদি এখানে আসে, তুমি অন্য সাইডে চলে যাবে। যাবে তো লেনি?’

‘আমি কোনো ঝামেলায় পড়তে চাই না’ লেনি দুঃখ পেয়ে বলল, ‘আমি তো চার্লির কোনো সমস্যা করিনি।’

‘এ কথা বলে লাভ নাই। চার্লি যদি ফাইট করতে চায়, তাহলে কিছু করার নাই।’

‘ঠিক আছে জর্জ। আমি চার্লির সাথে কোনো কথাই বলব না।’

শস্য তোলার গ্রুপ আসছে, তাদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘোড়ার পায়ের শব্দ আসছে, লাগাম টানার শব্দ আর শিকলের শব্দ ভেসে আসছে। জর্জ লেনির বিছানার পাশে বসে ছিল। সে ভ্রু কুঁচকাল। লেনি ভয়ে ভয়ে জর্জকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?’

‘আমি তোমার ওপর রাগ করিনি। আমি চার্লি বাস্টার্ডের ওপর রাগ করেছি। আমি আশা করছি আমরা দুজনে মিলে ভালো কামাই করতে পারব, ধরো একশ ডলার,’ তার গলায় শক্ত ভাব ‘প্লিজ চার্লির কাছ থেকে দূরে থেকো, লেনি।’

‘ঠিক আছে জর্জ, আমি কোনো কথা বলব না ওর সাথে।’

‘তোমাকে ঝামেলা করতে দেবে না ওকে। কিন্তু কুত্তার বাচ্চাটা যদি তোমার সাথে ফাজলামো করতে আসে, আমি সামাল দিচ্ছি।’

‘কী সামাল দেবে তুমি?’

‘এখন না, থাক। সময় হলে বলব। আমি এই ধরনের লোককে ঘৃণা করি। ও যদি কোনোরকম ঝামেলা করে, আমি তো তোমাকে বলেছি কী করবে, তাই না?’

লেনি হাতে ভর করে উঠল। মুখে চিন্তা তার। সে জর্জের দিকে মুখ বেজার করে তাকাল। ‘যদি আমি কোনো সমস্যা করি, তুমি আমাকে পাল্টে দেবে না।’

‘না তা না। তোমার মনে আছে গত রাতে আমরা কোথায় ঘুমিয়েছিলাম, নদীর কাছে?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়ছে, আমি জঙ্গলের ভিতরে গিয়েছিলাম।’

‘আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না আসব, ততক্ষণ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকবে। কেউ যেন তোমাকে না দেখতে পায়। নদীর কাছে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকবে।’

লেনি বলতে থাকল, ‘নদীর কাছে জঙ্গলের ভিতরে লুকিয়ে থাকো। নদীর মধ্যে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকো। যদি সমস্যায় পড়ো, যদি সমস্যায় পড়ো।’

বাইরে থেকে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। কেউ ডাকছে, ‘ঐ নিগ্রো, ঐ নিগ্রো!’

জর্জ বলল, ‘বারবার বলতে থাকো লেনি। তাহলে তুমি ভুলে যাবে না।’

ওরা দুজনে বাইরের দিকে তাকাল। দেখল দরজায় পড়া সূর্যের আলো ডিঙ্গিয়ে একটা মেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মোটা, লাল ঠোঁট, বড় বড় চোখ এবং মুখে ভারী মেকাপের সাজ। তার নখগুলো লাল। সসেজের মতো চুলগুলো কার্লি।

‘আমি চার্লিকে খুঁজছি,’ মেয়েটি বলল। মনে হচ্ছে নাক দিয়ে কথা বলছে আর গলার স্বর ভাঙা।

জর্জ তার দিক থেকে চোখ অন্যদিকে নিল এবং বলল, ‘কিছুক্ষণ আগে সে এখানে ছিল, কিন্তু চলে গেছে।’

মেয়েটি তার মাথার নিচে হাত রাখল এবং শরীর দরজায় লাগিয়ে বলল, ‘ও তাহলে তোমরাই সেই নতুন লোক, যারা নাকি কালকে এসেছ?’

‘হ্যাঁ’

লেনি মেয়েটির আপাদমস্তক দেখছে। ‘না, কখনো কখনো চার্লি এখানে আসে,’ মেয়েটি বলল।

জর্জ বলল, ‘কিন্তু এখন সে এখানে নাই।’

মেয়েটি হেসে বলল, ‘ও যেহেতু এখানে নেই, আমার অন্য জায়গায় খোঁজা উচিত।’

লেনির খুব ভালো লাগল। জর্জ বলল, ‘চার্লির সাথে দেখা হলে, আমি ওকে বলব যে তুমি তাকে খুঁজতে এসেছিলে।’

মেয়েটি বাঁকা ঠোঁটে হাসল, শরীর বাঁকিয়ে বলল, ‘খোঁজা কোনো দোষ নয়।’ তার পেছনের রাস্তা দিয়ে কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছিল। পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘হাই স্লিম।’

এরপর স্লিমের সঙ্গে মেয়েটি চলে গেল। জর্জ লেনির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী বাজে মেয়ে! তাহলে এই মেয়েকে চার্লি বিয়ে করেছে?’

‘সে সুন্দরী,’ লেনি বলল।

লেনি তখনো দরজার দিকে তাকিয়েছিল। হেসে বলছিল, ‘মেয়েটা সুন্দর আছে।’

জর্জ লেনির কাছে এসে ওর কান ধরে টান মারল।

রাগ করে বলল, ‘আমার কথা শোন। এই কুত্তির দিকে কখনো তাকাবি না। সে যা বলুক আর যা করুক। আমি এইসব পয়জন আগে দেখেছি। ওকে?’

লেনি তার কান ছাড়ানোর চেষ্টা করল, ‘আমি কিছু করেছি নাকি!’

‘না। কিছু করোনি। কিন্তু চার্লির বউ যখন পা বের করে দাঁড়িয়েছিল, তুমি ঐদিকে কেমন হা করে তাকিয়েছিলে।’

‘কিন্তু তার মধ্যে কোনো খারাপ কিছু ছিল না জর্জ। অনেস্টলি বলছি।’

‘ওয়েল, তুমি এই মহিলার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবে। কারণ তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে একটা ইঁদুর ধরার ফাঁদ। চার্লিই এর জন্য উপযুক্ত। সে এই মহিলার জন্য কিসব করছে। গ্লাভসভর্তি ভ্যাসেলিন!’ জর্জ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আমি শিওর যে, চার্লি কাঁচা ডিম খাচ্ছে।’

লেনি চিত্কার করে বলল, ‘আমি এই জায়গা পছন্দ করছি না জর্জ। মনে হচ্ছে ভালো জায়গায় আসিনি। আমি এখান থেকে বের হতে চাই।’

‘আমরা এখানে থাকব যতদিন আমরা কিছু ডলার কামাতে পারি। আমরা এখান থেকে চলে যাব যখন আমাদের হাতে কিছু ডলার আসবে। আমারও এই জায়গা পছন্দ হচ্ছে না।’

জর্জ আবার বলল, ‘আমার ভালো লাগছে না। পকেটে মাত্র কয়েকটা ডলার হলে, আমরা আমেরিকান নদীর দিকে চলে যাব এবং সোনা খোঁজার কাজ করব। আমরা হয়তো একদিনে কিছু ডলার কামাব।’

লেনি তার দিকে মাথায় বাঁকিয়ে বলল, ‘চলো জর্জ চলে যাই। চলো। এই জায়গাটা ভালো না।’

‘আমরা এখানে থাকব। চুপ করো লোক আসছে।’ জর্জ সংক্ষেপে বলল।

বাথরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ শোনা গেল, বেসিনে পানি পড়ছে। জর্জ তাস নিয়ে খেলছিল। বলল, ‘আমাদের মনে হয় গোসল করতে হবে। যদিও আমরা ময়লা কিছু ধরিনি।’

এরমধ্যে একজন লম্বা চওড়া লোক দরজায় এসে দাঁড়াল। তার চুলগুলো লম্বা। হাতের নিচে টুপিটা ধরে লম্বা চুলে ব্রাশ করছিল। অন্যদের মতো সেও নীল জিন্সের শার্ট আর একটা শর্ট প্যান্টপরা। চুল যখন ব্রাশ করা হলো, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কোনো রাজ পরিবারের কেউ । তার গলায় গাম্ভীর্য। হাত লম্বা এবং শক্ত, এমন সুন্দর, মনে হচ্ছিল কোনো মন্দিরের নর্তকীর হাত।

সে তার টুপিটা ঝেড়ে নিল এবং পরলো। বলল, ‘এই ঘরে এত বেশি আলো যে, চোখে ধাঁধা লাগে। কিছু দেখা যায় না। তোমরা কি নতুন লোক?’

‘হ্যাঁ, কালকে এসেছি,’ জর্জ বলল।

‘বালির বস্তা তোলার কাজ তোমাদের?’

‘হ্যাঁ, মালিক তো তাই বলল।’

স্লিম টেবিলের কাছে এসে জর্জের সামনের একটা বক্সে বসল। সে তার সামনে তাস দেখতে পেল এবং বলল, ‘মনে হয় তোমরা আমার সাথে কাজ করবে,’ তার গলা খুব শান্ত। ‘আমার টিমে কতগুলো গাধা আছে তারা জানে না বার্লি ব্যাগ আর অন্য ব্যাগের মধ্যে পার্থক্য কী। তোমরা কখনো এই কাজ করেছ?’

‘হ্যাঁ অবশ্যই। কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি একাই ওই গাধাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পারো’ জর্জ বলল।

লেনি চুপ করে কথা শুনছিল ওদের এবং তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছিল প্রশংসার ভঙ্গিতে। স্লিম জর্জের দিকে তাকাল এবং প্রশংসা পেয়ে খুশি হলো। স্লিম টেবিলে ঝুঁকে তাসগুলো নড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ তোমরা দুজন কি একসাথে এখানে এসেছ?’ তার কথা বন্ধুসুলভ শোনাল।

‘হ্যাঁ,’ জর্জ বলল। ‘আমরা খুব কাছের বন্ধু।’ সে লেনির দিকে হাত দিয়ে দেখাল। ‘সে খুব বেশি কিছু বলতে পারে না। কিন্তু খুব ভালো কাজ পারে। সে ভালো ছেলে। যদিও কথা বলে না। সে আমার অনেকদিনের পরিচিত।’

এরমধ্যে একজন ভুড়িওয়ালা লোক খামার বাড়িতে এল। তার চুল থেকে তখনো টপটপ করে পানি পড়ছে। ‘হাই স্লিম।’ বলেই সে জর্জ আর লেনির দিকে তাকাল।

‘ওরা দুজন কাল এসেছে।’ স্লিম পরিচয় করিয়ে দিল।

‘গ্লাড টু মিট ইউ। আমার নাম চার্লসন।’

‘আমার নাম জর্জ মিল্টন। ও লেনি জুনিয়র।’

‘গ্লাড টু মিট ইউ,’ চার্লসন আবার বলল, ‘সে একদমই ছোট না।’ সে জোক করল এবং আবার বলল, ‘সে একেবারেই ছোট আকৃতির না। বাই দ্য ওয়ে স্লিম, তোমার কুকুর কোথায়। আমি তাকে তোমার ওয়াগনের নিচে দেখিনি সকালে।’

‘গতরাতে তার কতগুলো বাচ্চা মারা হয়েছে। আমি চারটা মেরে বের করে এনেছি। সে এতগুলোকে খাওয়াতে পারছিল না।’

‘তার মানে এখনো পাঁচটা আছে?’ চার্লসন বলে চলল, ‘তুমি কি পাঁচটা বাচ্চাকেই রাখবে?’

‘আমি এখনো জানি না। আমাকে ওদের রাখতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওরা মায়ের দুধ পায়।’

হঠাত্ স্লিম উঠে দাঁড়াল সম্মানের সঙ্গে। বলল, ‘তোমরা আসো খেয়ে যাও। খুব দ্রুত খাবার শেষ হয়ে যাবে।’

চার্লসন স্লিমকে আগে যেতে দিল এবং দুজনই দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।

জর্জকে উত্তেজিত দেখাল। সে তাসগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করল। বলল, ‘আমি স্লিমকে জিজ্ঞেস করব লেনি, কুকুরের বাচ্চাগুলোর কথা।’

লেনি উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ একটা বাদামী আর একটা সাদা।’

জর্জ বলল, ‘ডিনারে চলো আগে। আমি জানি না যে তার কাছে সাদা আর বাদামী বাচ্চা আছে কি না।’

লেনি বিছানা থেকে না উঠে বলল, ‘তুমি তাকে এখনই জিজ্ঞেস করো, যাতে সে আর ওদের মারতে না পারে।’

‘ঠিক আছে। চলো এখন খেতে চলো।’

লেনি বিছানা ভাঁজ করে উঠল এবং তারা দুজনে দরজা ঠেলে বের হতে গেল। আর চার্লি এসে সামনে দাঁড়াল।

চার্লি রেগে বলল, ‘তোমরা একটা মেয়েকে দেকেছ এখানে?’

জর্জ বলল, ‘আধা ঘণ্টা আগে।’

‘সে এখানে এসেছিল কোন কাজে!’

জর্জ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, ‘সে বলল, সে তোমাকে খুঁজতে এসেছিল।’

চার্লি জর্জের পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকাল। তার চোখে আগুন। কিছুক্ষণ পর সে বলল, ‘কোন দিকে গেছে সে?’

‘জানি না। কোন দিকে গিয়েছে সে,’ জর্জ বলল।

চার্লি ওর দিকে ভ্রু কঁচকে তাকাল, এরপর ঘুরে দৌড়ে বের হয়ে গেল।

জর্জ বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে লেনি, এই জানোয়ারের সাথে আমার সমস্যা হবে। ঈশ্বরের কসম, একে আমি ঘৃণা করি। আসো আসো তাড়াতাড়ি, নাহলে খাবার সব শেষ হয়ে যাবে।’

যদিও সন্ধ্যার আলো জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল, বাড়ির ভিতরে ছিল অন্ধকার। স্লিম এবং জর্জ অন্ধকার ঘরে ঢুকল। স্লিম তাসের টেবিলের কাছে গেল এবং আলো জ্বালিয়ে দিল। টেবিলটি আলোকিত হয়ে গেল। স্লিম একটা বক্স চেয়ারে বসল এবং জর্জ তার বিপরীত চেয়ারে।

স্লিম বলল, ‘এ তেমন কিছু না। আমাকে কুকুরছানাগুলোকে মেরে ফেলতে হতো । আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

জর্জ বলল, ‘তোমার কাছে হয়তো কিছু না। কিন্তু লেনির কাছে অনেক কিছু। আমি জানি না কিভাবে আমি এই ছানাগুলোকে ঘুমাতে দেব। লেনি ছানাগুলোর সাথে শস্যাগারে ঘুমাতে চায়।’

‘এ তেমন কিছু না,’ স্লিম আবার বলল, ‘তুমি যা বলেছ তার ব্যাপারে একদম ঠিক। সে কথা বলে না কিন্তু খুব কাজ করতে পারে। সে তার সহযোগীকে প্রায় মেরেই ফেলছিল। তার সাথে কাজ করতে পারে খুব কম লোক। আমি এমন শক্তিশালী ছেলে আগে দেখিনি।’

জর্জ খুব খুশি হয়ে বলল, ‘জাস্ট লেনিকে বলো একটা কাজ করতে, ও করে দেবে। সে নিজের ব্যাপারে না ভেবে, কাজগুলো ঠিকই করে দেবে।’

স্লিম মুখটাকে সরিয়ে নিল যেন আলো না লাগে এবং বলল, ‘আমি আশ্চর্?য যে তোমরা দুজন কেমন করে একসাথে আছ?’

‘এটার মধ্যে আশ্চর্য কী দেখলে?’

‘জানি না। তবে দুজন লোক সাধারণত একসাথে কাজ বেশি দিন করতে পারে না। আসলেও এরা এক মাসের বেশি টেকে না, চলে যায়। কেউ কারো তোয়াক্কা করে না। এটা মজার যে তার মতো একজন সরল ছেলে আর তোমার মতো একজন স্মার্ট ছেলে একসাথে আছ।’

‘সে গাধা না। সে কথা বোঝে না। কিন্তু সে বদমেজাজি না। আমিও স্মার্ট না তেমন। আমি যদি এত কিছু বুঝতাম তাহলে আমার একটা জায়গা থাকত থাকার, নিজের জমি থেকে শস্য তুলতাম।’

‘আমি আর সে একসাথে আছি—এটা ঠিক আছে, আমার মনে হয়। আমি আর সে অবার্নে জন্মেছি। আমি তারা মাসি ক্লারাকে চিনতাম। সে তাকে নিজের কাছে নিয়ে লালন-পালন করে ছোটবেলা থেকে। যখন তার মাসি ক্লারা মরে যায়, লেনি আমার সাথে চলে আসে কাজ করার জন্য। এটা আমাদের জন্য সহজ ব্যাপার হয়ে গেছে।’

‘আচ্ছা।’ স্লিম বলল

জর্জ স্লিমকে দেখল। ঈশ্বরের দৃষ্টি যেন তার চোখে।

জর্জ বলল, ‘খুব মজার। আমি তার সাথে অনেক মজা করতাম, জোক করতাম, কারণ সে সেগুলো কিছুই বুঝত না। আমার ভালোই লাগত। এজন্য তার পাশে আমাকে খুব স্মার্ট দেখায়। আমি তাকে যা বলি, তা সে করে ফেলবে। যদি আমি তাকে পাহড়ের ধার ধরে হাঁটতে বলি, সে চলে যাবে। কিছুদিন পরে এটা আসলেই সহ্য করা কষ্টকর। কিন্তু একদিন আমার সহ্য হয়ে গেল। তোমাকে বলি, একদিন অনেক লোক স্যাক্রামেন্টো নদীর পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমি লেনিকে বললাম, জাম্প দাও। সে সাথে সাথে লাফ দিয়ে পড়ল সে। একদম সাঁতার জানত না। প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। পরে আমি তাকে তুলে ফেলেছি। এরপর থেকে আমি আর এরকম কিছু তাকে বলি না।’ স্লিম বলল, ‘সে খুব ভালো ছেলে।’

জর্জ তাস শাফেল করল। বলল, ‘আমি কোনো ভালো কাউকে পাইনি। আমি অনেক লোককে দেখেছি ফার্মে, যারা একা থাকে। একা থাকা ভালো না। জীবনের মজা থাকে না। কিছুদিন পরে, মন সংকীর্ণ হয়ে যায়। তারা সবসময় ঝামেলা করতে চায়।’

স্লিম বলল, ‘হ্যাঁ, তারা কেমন সংকীর্ণ হয়ে যায়। তারা এমন হয়ে যায় যে তারা কারো সাথে কথা বলতে চায় না।’

‘লেনি প্রায় সবসময়ের জন্য একটা বোঝার মতো। কিন্তু তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তুমি তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।’

স্লিম বলল, ‘লেনি সংকীর্ণ না। একদম না।’

জর্জ বলল, ‘অবশ্যই সে সংকীর্ণ না। কিন্তু সে সবসময় একটা বিপদে ফেলে, কারণ সে কিছু বোঝে না। যেমন উইডে যা ঘটেছিল।’

জর্জ একটু থামল যখন সে স্লিমের দিকে তাস রাখছিল। তাকে সতর্ক দেখাল এবং সে স্লিমকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কাউকে বলবে না তো?’

‘কী হয়েছিল উইডে?’ স্লিম সরলভাবে জিজ্ঞেস করল।

‘তুমি কাউকে বলবে না? অবশ্যই কাউকে বলবে না।’

স্লিম আবার বলল, ‘কী করেছে সে উইডে?’

‘ওয়েল। সে একটা মেয়েকে দেখেছিল, যার গায়ে লাল জামা ছিল। লেনি যা দেখে তাই ধরে দেখতে চায়। সে মেয়েটির জামা ধরে ফেলল। মেয়েটি চিত্কার করে উঠল। কিন্তু লেনি কিছু না বুঝে ধরেই রইল। এদিকে মেয়েটি চিত্কার করে অস্থির। আমি গিয়ে দেখি সে মেয়েটির জামা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছুতেই তাকে ছাড়াতে পারি না। তুমি তো দেখছ তার কত শক্তি!’

স্লিমকে আশ্চর্য হতে দেখা গেল না। সে বলল, ‘কিছু তো হয়নি।’

‘ওয়েল, মেয়েটি এটাকে অতিরঞ্জিত করল এবং পুলিশকে বলল যে, সে রেপড হয়েছে। এরপর আমাদের ধরার জন্য লোকজন লাগল পিছনে। আমি আর লেনি ওইদিন সেচের ড্রেনের মধ্য সারাদিন ডুবে বসেছিলাম কোনোরকম মাথা বের করে। আর ওই রাতে আমরা পালিয়ে এলাম।’

স্লিম এবার বলে উঠল, ‘সে কী মেয়েটিকে কোনোরকম আঘাত করেছিল?’

‘আরে না। সে জাস্ট ভয় পেয়েছিল। আমিও ভয় পেতাম যদি কেউ আমাকে এভাবে ধরত। সে তাকে কিছু করেনি। সে শুধু লাল জামাটা ধরে রাখতে চেয়েছিল, যেমন সে কুকুর ছানাগুলোকে পুষতে চায়।’

‘অবশ্যই সে এটা করবে না। আমি জানি।’

লেনি ঘরে ঢুকল। ‘হায় লেনি, তোমার কুকুরছানাগুলো কেমন আছে?’

লেনি বলল, ‘ওরা খুব ভালো আছে, আমি যেমন চেয়েছিলাম।’ সে সরাসরি বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ওয়ালের দিকে মুখ করে।

জর্জ লেনিকে ডাকল, ‘লেনি।’

‘কিছু বলবে?’

‘আমি তোমাকে বলেছিলাম যে তুমি কুকুরছানাগুলোকে ঘরে আনতে পারবে না।’

‘কিসের ছানার কথা বলছ? আমার কাছে কোনো কুকুরছানা নেই।’

জর্জ তাড়াতাড়ি লেনির কাছে গেল। ঘাড়ের কাছে ধরে উলটে ফেলল। সে তার পেটের নিচ থেকে বাচ্চাগুলোকে বের করে আনল।

লেনি তাড়াতড়ি উঠে গেল, ‘ওদের আমার কাছে দাও জর্জ।’

জর্জ বলল, ‘তুমি ওঠো এবং ওদের ওই ঘরে রেখে এসো। ওরা ওদের মায়ের সাথে ঘুমাবে। তুমি কি ওদের মারতে চাও? কেবল কালকে জন্ম নিয়েছে, এখনি ওদের মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসা উচিত হয়নি।’

লেনি অনুরোধের স্বরে জর্জকে বলল, ‘আমাকে দাও ওদের। আমি ওদের দিয়ে আসব। আমি ওদের কোনো ক্ষতি করব না।’

জর্জ বাচ্চাগুলোকে লেনিকে দিয়ে দিল। ‘ওকে, দিয়ে এসো।’

লেনি ঘরের বাইরে চলে গেল। স্লিম কোনো কথা বলল না। সে লেনির চলে যাওয়া দেখল। বলল, ‘লেনি একটা বাচ্চা ছেলে!’

‘একদম! সে শুধু শক্তিশালী, কিন্তু আসলে সে একটা বাচ্চা।’

বাইরে অন্ধকার হয়ে এসেছে। একজন শ্রমিক এল ঘরের ভিতরে। তার ঘাড় বেঁকে যাচ্ছিল। উঁচু জুতার ওপর ভর করে এঁকেবেঁকে হাঁটছিল সে। মনে হচ্ছিল তার কাঁধে একটা শস্যের বস্তা আছে। সে তার বিছানার কাছে গেল, টুপিটা শেলফের ওপর রাখল। তারপর সে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিল শেলফ থেকে। এরপর টেবিলের লাইটের কাছে এল আর বলল, ‘আমি কি তোমাকে এটা দেখিয়েছি স্লিম?

‘কী দেখিয়েছ?’

লোকটি টেবিলে ম্যাগাজিন সামনে রাখল এবং আঙুল দিয়ে দেখাল, ‘এই যে... এই যে... পড়ো।’ স্লিম বাঁকা হয়ে দেখতে গেল। লোকটি বলল, ‘পড়ে দেখো। জোরে জোরে পড়ো।’

‘ডিয়ার সম্পাদক,’ স্লিম আস্তে আস্তে পড়ল। ‘আমি আপনার ম্যাগাজিন ছয় বছর ধরে পড়ছি এবং আমার মতে, আপনার ম্যাগাজিন শ্রেষ্ঠ ম্যাগাজিন। আমি পিটার র্যান্ডের গল্প পছন্দ করি। তার লেখা জীবন্ত। তার ‘ডার্ক রাইডারের’ মতো আরো লেখা ছাপবেন আশা করি। আমি সাধারণত চিঠি লিখি না। কিন্তু লিখেছে, যেহেতু আমি মনে করেছি আপনার ম্যাগাজিন শ্রেষ্ঠ ম্যাগাজিন এবং পড়ে আমি সার্থক।’

স্লিম পড়ল প্রশ্নের চোখে, ‘কেন তুমি আমাকে এটা পড়তে বলছ?’

‘হুইট,’ ছোট ছেলেটা বলল, ‘নিচের নামটা পড়ো।’

স্লিম পড়ল, ‘আপনার সাফল্য আশা করছি, উইলিয়াম টেনার।’

স্লিম আবার হুইটের দিকে তাকাল, ‘তুমি কেন আমাকে পড়তে বলছ এটা?’

হুইট মুচকি হেসে ম্যাগাজিন বন্ধ করল, ‘তুমি কি বিল টেনারকে চিনতে না? এখানে তিন মাস আগে কাজ করত।’

স্লিম চিন্তা করল, ‘ওই ছোট ছেলেটা, যে ট্রাক্টর চালাত।’

হুইট চিত্কার করে বলল, ‘হ্যাঁ, সেই ও।’

‘তোমার কি মনে হয় এই চিঠিটা সে লিখেছে?’

‘আমি জানি, বিল আর আমি এখানে ছিলাম একদিন। বিলের কাছে এই ম্যাগাজিন ছিল। সে তার চিঠিটা খুঁজছিল সেদিন, কিন্তু ম্যাগাজিনে তার চিঠিটা পায়নি। বিল বলেছিল হয়তো ওরা ওর চিঠিটা পরের কপিতে ছাপবে। এই চিঠিটা এখন ছেপেছে।’

স্লিম বলল, ‘আচ্ছা। তাহলে তার চিঠিটা এই ম্যাগাজিনে ছেপেছে।’

জর্জ ম্যাগাজিন চেয়ে হাত বাড়াল, ‘দেখি তো কী লিখেছে?’

হুইট ম্যাগাজিনটা না দিয়ে আঙুল দিয়ে ওই চিঠিটা আবার পড়ল। এরপর আবার শেলফে নিয়ে রেখে দিল।

‘আমি ভাবছি বিল এটা পড়েছে কি না? আমি আর বিল মটরশুঁটির ক্ষেতে একসাথে কাজ করতাম। আমরা একসাথে ট্রাক্টর চালাতাম। সে খুব অদ্ভুত রকমের ছেলে ছিল।’

জর্জ তাস শাফেল করল। হুইট একটা স্কোরবোর্ড আঁকল এবং একটা পিন দিয়ে শুরুর পজিশন ঠিক করল। এরপর জর্জকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার মনে হয় তোমাদের কাজ খুব দরকার, তাই এখানে এসেছ।’

জর্জ বলল, ‘কেন জিজ্ঞেস করছ?’

হুইট হেসে দিল, ‘কারণ তোমরা শুক্রবারে এসেছ। রবিবার হতে এখনো দুদিন বাকি।’

জর্জ বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, তুমি কী করে জানো আমাদের আসলে কাজ খুব দরকার?’

হুইট আবার হাসল, ‘তুমি বুঝতে যদি এই ফার্মে আগে থাকতে। যে লোকটি ফার্মের লোকের উপস্থিতি দেখতে আসে, সাধারণত সে আসে শনিবার দুপুরে। সে শনিবারে রাতের খাবার পায়, রবিবারে তিনবার খায়। সোমবার সকালে খেয়ে চলে যায়। কিন্তু তুমি তো শুক্রবারে এসেছ, তার মানে তোমরা দেড় দিন আগে থেকে কাজ শুরু করেছ।’

জর্জ হুইটের দিকে নীরস চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা বেশ কিছুদিন এখানে থাকব।’

দরজা আস্তে আস্তে খুলে গেল এবং আফ্রিকান লোকটি ঢুকল। বলল, ‘মিস্টার স্লিম।’

স্লিম চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যালো ক্রুক, কী অবস্থা তোমার?’

‘তুমি আমাকে বলেছিলে গাধার পায়ের জন্য আলকাতরা গরম করতে, আমি গরম করেছি।’

‘ওহ ঠিক আছে। আমি এখনি বের হয়ে যাচ্ছি।’

‘আমি করে দিতে পারি, যদি তুমি চাও’

স্লিম উঠে দাঁড়াল, ‘না, আমি নিজে করব।’

ক্রুক বলল, ‘মিস্টার স্লিম।’

‘আবার কী?’ স্লিম বলল।

‘যে লম্বা মোটা নতুন ছেলেটা এসেছে, ও তোমার শস্যাগার উল্টাপাল্টা করছে।’

‘সমস্যা নেই। ও কোনো ক্ষতি করবে না। আমিই ওকে কুকুরছানাটা দিয়েছি।’

ক্রুক বলল, ‘আমি ভাবলাম তোমাকে জাস্ট জানাই ব্যাপারটা। সে তাদের মায়ের কোল থেকে বের করে নিয়েছে এবং নিজে দেখাশোনা করছে। ব্যাপার ভালো হচ্ছে না।’

জর্জ স্লিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্লিম, লেনি যদি বেশি সমস্যা করে, ওকে বের করে দাও ওখান থেকে।’

স্লিম ক্রুকের সাথে চলে গেল। জর্জ কার্ড দিল হুইটকে, ‘নতুন বাচ্চা দেখেছ এখনো?’

‘কোন বাচ্চা?’ জর্জ জিজ্ঞেস করল।

‘কেন, চার্লির নতুন বউয়ের?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি।’

‘সে কি দেখতে আকর্ষণীয় না?’

জর্জ বলল, ‘খুব ভালো করে দেখা হয়নি।’

হুইট তাস টেবিলের ওপর নামিয়ে হাসি দিল, ‘চারদিকে দেখো, নাক-চোখ খোলা রাখো। তুমি অনেক কিছু দেখতে পাবে। সে কিছু লুকিয়ে রাখছে না। আমি তার মতো কাউকে দেখিনি। সে সবাইকে নজর দেয়। এমনকি ওই নিগ্রোটাকেও। আমি জানি না সে আসলে কী চায়!’

জর্জ সাধারণ গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘সে আসার পরে কি কোনো ঝামেলায় ফেলেছে?’

বুঝা যাচ্ছে হুইট তাস খেলা পছন্দ করছে না। হুইট বলল, ‘ও আচ্ছা, না তেমন কিছু ঘটেনি এখন পর্যন্ত। চার্লি তার ড্রয়ারে হলুদ রঙের জ্যাকেট রাখে, এই যা নতুন। যখনই যুবকেরা এখানে আসে, সে চলে আসে। বলে সে চার্লিকে খুঁজছে অথবা কিছু ফেলে গেছে, যা সে খুঁজতে এসেছে। মনে হচ্ছে, যুবকদের না দেখে সে থাকতে পারে না। আর চার্লির প্যান্টে অনেক পিঁপড়া দেখা যায় সবসময়।’

জর্জ বলল, ‘চার্লির স্ত্রী ঝামেলা করবে। খারাপ ভাববে।’

হুইট বলল, ‘তোমার ধারণা ঠিক। তোমরা কি আমাদের সাথে আগামীকাল রাতে বের হবে?’

‘কেন? কোনো প্ল্যান আছে তোমাদের?’

‘না, আমরা এমন প্রায়ই বের হই। আমরা সুজির ওখানে যাই। আমরা ওখানে যেতে পছন্দ করি। শি ইজ আ চার্মিং লেডি! তার ওখানে পাঁচজন মেয়ে আছে।’

‘কত খরচ?’

‘আড়াই ডলার। কিন্তু তুমি শট নিতে পার দুই বিট দিয়ে। সুজির ওখানে ভালো চেয়ারও আছে। তুমি যদি মাতাল হতে না চাও, তাহলে তুমি চেয়ারে বসে দুই-তিনটা শট নিতে পার এবং সময় উপভোগ করতে পার। সুজি কিছুই বলবে না, সে তোমাকে বের করে দেবে না।’

জর্জ বলল, ‘হ্যাঁ, আমি তোমাদের সাথে আসতে পারি।’

‘শিওর। আসো। ইট ইজ আ হেল লট অব ফান! সুজি সবসময় আনন্দে ফেটে পড়ে। সে বলে, আমি জানি যুবকেরা কী চায়। আমার মেয়েদের শরীরে কোনো অসুখ নেই এবং হুইস্কিতে পানি মিশানো না।’

জর্জ জিজ্ঞেস করল, ‘ক্লারা কি অন্য একটা ব্রোথেল চালায়?’

হুইট বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু আমরা ওখানে যাই না। ক্লারার ওখানে রেট বেশি।’

জর্জ বলল, ‘আমার আর লেনির টাকার দরকার। আমি হয়তো যাব ওখানে, একটা শট নেব। কিন্তু আড়াই ডলার দিতে পারব না।’

হুইট বলল, ‘কিছু কিছু সময় পুরুষের আরো বেশি কিছুর দরকার হয়।’

দরজা খুলে গেল। লেনি আর চার্লসন একসঙ্গে ঢুকল। লেনি ওর বিছানায় বসল চুপ করে, কারো দিকে ওর কোনো মন নেই। চার্লসন ওর বিছানার নিচ থেকে একটা রড আর এক ক্যান তেল বের করল। সেগুলো বিছানার ওপর রেখে সে তার পিস্তল বের করল। ম্যাগাজিন বের করে, গুলি বের করে নিল এবং পিস্তল পরিষ্কার করতে থাকল।

চার্লসন বলল, ‘চার্লি এখানে এখনো আসেনি?’

‘না। কেন? কী ব্যাপার চার্লিকে নিয়ে?’

চার্লসন তার বন্দুকটার দিকে খেয়াল করে বলল, ‘সে তার স্ত্রীকে খুঁজছে এখানে ওখানে।’

হুইট মজা নিয়ে বলল, ‘দিনের অর্ধেক সময় সে তার স্ত্রীকে খোঁজে, আর অর্ধেক সময় তার স্ত্রী তাকে খোঁজে।’

সঙ্গে সঙ্গে চার্লি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বলল, ‘তোমরা কি আমার স্ত্রীকে দেখেছ?’

হুইট বলল, ‘না। সে এখানে আসেনি।’

চার্লি রুমের ভিতরে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘স্লিম কোথায়?’

জর্জ বলল, ‘শস্যাগারে গিয়েছে। গাধার ক্ষুরে আলকাতরা লাগানোর জন্য।’

চার্লি ঘাড় নিচু করে বলল, ‘কতক্ষণ হলো?’

‘পাঁচ থেকে দশ মিনিট।’

চার্লি ঠাস করে দরজা লাগিয়ে লাফ দিয়ে বের হয়ে গেল। হুইট উঠে দাঁড়াল, ‘আমি দেখি গিয়ে, চার্লি যে স্লিমের কী করে বসবে! চার্লি ভয়ানক চালাক লোক। কিন্তু তার মনে হয় স্লিমকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। কেউ জানে না স্লিম কী করে বসবে।’

জর্জ বলল, ‘আমার মনে হয় চার্লির স্ত্রী স্লিমকে পছন্দ করে।’

হুইট বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু স্লিম করে না। কিন্তু তা যদি সত্যিই হয়, আমি সেই খেলা দেখতে চাই। চলো যাই জর্জ।’

জর্জ বলল, ‘না তুমি যাও। লেনির সাথে আমার কিছু কথা আছে।’

এদিকে চার্লসন তার বন্দুক পরিষ্কার করে ব্যাগের মধ্যে ভরে বিছানার নিচে রাখল এবং বলল, ‘আমি দেখতে চাই হুইট। লেটস গো।’ ওরা দুজনে চলে গেল। জর্জ লেনির কাছে এসে বলল, ‘কী চিন্তা করছ লেনি?’

‘কিছু করিনি জর্জ। স্লিম বলেছে কুকুরছানার কাছে না যেতে।’

‘আমি তোমাকে বলছিলাম আগেই।’

‘আমি ওদের মারিনি। খালি কোলের ওপর ছিল।’

জর্জ বলল, ‘তুমি কি স্লিমকে শস্যাগারে দেখেছ?’

‘তুমি কি ওই মহিলাকে দেখেছ?’

‘তুমি কি চার্লির স্ত্রীর কথা বলছ?’

‘হ্যাঁ, সে কি শস্যাগারে এসেছিল?’

‘না। আমি তাকে দেখিনি।’

‘তুমি কি দেখেছ স্লিম তার সাথে কথা বলছে কি না?’

‘উঁহু, সে কখনো আসেনি তো।’

জর্জ বলল, ‘ওকে। তাহলে ওদের কোনো মারামারি দেখা হবে না। যদি কোনো মারামারি হয়, তুমি ওখানে যাবে না।’

‘না আমি মারামারি পছন্দ করি না।’

জর্জ জিজ্ঞেস করল, ‘ওখানে স্লিম কী করে?’

‘স্লিম?’

‘হ্যাঁ, সে তোমার সাথে শস্যাগারে দেখা করেছে এবং বলেছে কুকুরছানার কাছে না আসতে।’

‘ওহ, তার হাতে একটা রঙের ক্যান ছিল আর ব্রাশ ছিল। জানি না সে কী করবে তা দিয়ে।’

লেনি হঠাত্ টেবিলের ওপরে শব্দ করে বলল, ‘জর্জ!’

‘বলো।’

‘আচ্ছা, আমাদের একটা ছোট বাড়ি হতে কত দিন লাগবে? আমাদের নিজেদের মতো জীবনযাপন করব এবং আমাদের খরগোশ থাকবে?’

‘জানি না। আমরা দুজনে মিলে টাকা জমাব। আমি জানি একটা জায়গা আছে, যা আমরা কমে পেতে পারি, কিন্তু তারা এখন সেটা দেবে না।’

বৃদ্ধ ঝাড়ুদার স্যান্ডি একটু নড়াচড়া করল ঘুমের মধ্যে। সে চোখ খুলে জর্জের দিকে তাকাল।

লেনি বলল, ‘ওই জায়গাটা কেমন জর্জ?’

‘আমি তোমাকে তো কাল রাতেই বললাম।’

‘বলো, আবার বলো জর্জ।’

‘দশ একরের মতো জমি। উইন্ডমিল আছে। তার ওপরে একটা খোপের মতো, সেখানে মুরগি পালা হয়। রান্নাঘর আছে, বাগান আছে, চেরি, আপেল, পিচ, অ্যাপ্রিকট, বাদাম কিছু বেরির গাছ আছে। আলফাআলফা ঘাসের জায়গা আছে এবং পানি আছে এগুলোয় সেচ দেওয়ার জন্য। শুকর রাখার জন্য একটা ঘর আছে।’

‘আর খরগোশ জর্জ?’

‘আপাতত খরগোশের জন্য কোনো জায়গা নেই। কিন্তু আমি সহজেই একটা খাঁচা বানিয়ে দিতে পারি। এবং তুমি আলফাআলফা ঘাস খরগোশকে খাওয়াতে পার।’

‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি খরগোশকে ঘাস খাওয়াব।’

জর্জ তাস বাটা বন্ধ করল। তার গলায় আনন্দের স্বর, ‘হ্যাঁ আমরা কিছু শুয়োর কিনব। একটা স্মোক হাউস বানাব আমার দাদার মতো। শুয়োর মেরে বেকন আর হ্যাম স্মোক করে সসেজ বানাব। নদীতে যখন স্যামন মাছ আসবে, আমরা অনেক মাছ ধরব। নোনতা বানাব অথবা স্মোকড করব। যখন ফল ধরবে আমরা সেগুলো সহজেই ক্যানে ভরে ফেলব। প্রতি রবিবারে আমরা একটা মোরগ বা খরগোশ জবাই করব। মে বি গরু অথবা খাশিও হতে পারে। ঘন মাখন খাব, যা তোমাকে ছুরি দিয়ে কেটে খেতে হবে।’

লেনি চোখ বড় বড় করে জর্জের কথা শুনল, স্যান্ডিও জর্জের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লেনি বলল, ‘আহা আমরা কত স্বাধীন জীবনযাপন করব!’

‘হ্যাঁ।’ জর্জ বলল, ‘সব সবজি থাকবে বাগানে, আমরা চাইলে ডিম অথবা অন্য কিছু ধরো দুধ বেঁচে হুইস্কি কিনব। আমরা আমাদের জীবন খুব উপভোগ করব। আমাদের আর জীবন নিয়ে দৌড়াতে হবে না এবং বাবুর্চির রান্না করা বাজে খাবার খেতে হবে না। নো স্যার! আমাদের আর এসব ফার্ম হাউসে থাকতে হবে না! আমাদের নিজেদের বাড়ি হবে।’

লেনি বলল, ‘জর্জ ঘরটা কেমন হবে?’

‘আমাদের ছোট বাড়িতে একটা ঘর থাকবে তোমার জন্য। একটা ছোট লোহার চুলা থাকবে। উইন্টারে আমরা এটাতে আগুন জ্বালাবো। যদি অনেক জমি না থাকে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ধরো, ছয়-সাত ঘণ্টা দিনে? আমরা শস্য বুনব এবং শস্য তুলে আনব।’

লেনি আকুতি করে জিজ্ঞেস করল, ‘এবং খরগোশগুলোকে আমি দেখাশুনা করব। তুমি আমাকে বলে দিবে কিভাবে ওদের আদর যত্ন করতে হবে।’

‘তুমি আলফাআলফা ঘাস তুলে আনবে একটা ব্যাগে করে এরপর ওগুলো খরগোশের খাঁচায় দিয়ে দিবে।’

‘ওরা খাবে আর খাবে। আমি দেখেছি খরগোশ কেমন করে খায়।’

জর্জ বলতে থাকল, ‘ছয় সপ্তাহ বা এইরকম সময়ে খরগোশগুলো বাচ্চা দিবে। আমাদের অনেক খরগোশ হবে, খাব, বেচব। এবং আমাদের একঝাঁক কবুতর থাকবে। ওরা উইন্ডমিলের উপরে উড়বে যেমন আমি দেখতাম ছোটবেলায়।’ জর্জ দেখল লেনি ওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে শুনছে। সে বলল, ‘বাড়িটি একান্ত আমাদের হবে এবং কেউ আমাদের কিছু বলবে না। যদি আমরা কাউকে পছন্দ না করি, আমরা বলব, দূর হয়ে যাও আমাদের সামনে থেকে এবং সে চলে যাবে। যদি আমাদের বন্ধু বাসায় আসে, এজন্য আমাদের একটা আলাদা রুম থাকবে এবং আমরা তাকে বলব, আজকের রাতটা আমাদের এখানে থাকো না! সে থাকবে আমাদের সাথে। আমাদের একটা কুকুর এবং অনেকগুলো ডোরাকাটা বিড়াল থাকবে। তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে যে বিড়াল যেন খরগোশের বাচ্চা না খেয়ে ফেলে।’

লেনি ভারী নিঃশ্বাস ফেলল, ‘তুমি শুধু ওদেরকে খরগোশ থেকে দূরে রাখবে। নাহলে আমি ওদের ঘাড় ভেঙে দেব। লাঠি দিয়ে বাড়ি দেব।’

জর্জ তার নিজের কল্পনা বর্ণনা করতে লাগল। স্যান্ডি যখন কথা বলা শুরু করল, ওরা দুইজনে এমনভাবে লাফ দিয়ে উঠল মনে হলো খারাপ কিছু করে ধরা পড়েছে স্যান্ডি বলল, ‘আচ্ছা এই জায়গাটা কোথায়?’

জর্জ সাথে সাথে বলল, ‘ধরে নাও এমন একটা জায়গা আমাদের আছে, কেন তুমি তা দিয়ে কী করবে?’

‘তোমাকে বলতে হবে না এটা কোথায় । জায়গাটা যে কোনো জায়গায় হতে পারে।’

‘ঠিক। তুমি হয়তো একশ বছরেও এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাবে না।’

স্যান্ডি উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আচ্ছা, এমন জায়গার কিনতে কত লাগতে পারে?’ জর্জের চোখে সন্দেহ, ‘ওয়েল, আমি এরকম জায়গা ছয়শ ডলারে পেতে পারি। যে বৃদ্ধা এই জায়গাটার মালিক, তার বুকে অপারেশন হবে। কিন্তু তুমি এটা নিয়ে প্রশ্ন করছ কেন? তোমার কী?’

স্যান্ডি বলল, ‘আমার একটা হাত নিয়ে আমি সুখী না। আমি এই ফার্মে আমার হাত হারিয়েছি। এই কারণে ওরা আমাকে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে দুইশ পঞ্চার ডলার দিয়েছে, কারণ আমি হাত হারিয়েছি। আমার ব্যাঙ্কে আরো পঞ্চাশ ডলারে মতো আছে। এই তিনশ আর আমার আরো পঞ্চাশ ডলার আসবে এই মাসে শেষে। ধরো আমি যদি তোমাদের সাথে থাকি এই তিনশ পঞ্চাশ ডলার আমি দিতে পারি। আমি সব কাজ খুব ভালো পারি না, তবে আমি রান্না করতে পারি, মুরগি দেখাশোনা করতে পারি আর বাগান দেখাশোনাও করতে পারি। কেমন হবে বলো?’

জর্জের চোখ অর্ধবন্ধ। ‘আমাকে চিন্তা করতে হবে। আমরা এটা আসলে নিজেরা করতে চাই।’

স্যান্ডি বাধা দিয়ে বলল, ‘আমি তোমাদের এটা উইল করে দেব যদি আমি মারা যাই। আমার কেউ নেই এই পৃথিবীতে। তোমাদের কাছে কোনো টাকা আছে? মে বি আমরা এখনই কিনতে পারি তাহলে।’

জর্জ ফ্লোরে বিরক্ত হয়ে শব্দ করল, ‘আমাদের দুইজনের কাছে দশ ডলার আছে।’ সে চিন্তা করে বলল, ‘দেখো, আমি আর লেনি যদি একমাস কাজ করি এবং কিছু খরচ না করি, আমাদের একশ ডলার হবে। তাহলে টোটাল চারশ পঞ্চাশ ডলার। আমার মনে হয়, এই টাকা প্রথমে দিলে হবে। তারপর তুমি আর লেনি বাড়ির কাজ শুরু করলে, আমি একটা চাকরি নেব বাকি টাকা পরিশোধ করার জন্য। তুমি এসময় ডিম বেচতে বা কিছু একটা করতে পার।’

ওরা একটু চুপ রইল। নিজেদের দিকে তাকাল এবং আনন্দিত হলো। তারা কখনো চিন্তাই করতে পারেনি কখনো তাদের একটা বাড়ি হবে। জর্জ বলল, ‘ঈশ্বরের কসম! আমার মনে হচ্ছে, আমরা জমিটা কিনতে পারব।’ জর্জের চোখে রাজ্যের স্বপ্ন।

স্যান্ডি তার বিছানার একপাশে বসেছিল। সে তার হাতের কুনুই চুলকাতে থাকল। ‘চার বছর আগে আমার হাতে এমন অবস্থা হয়েছে। আমি জানি আমি যখনই ঝাড়ূ দিতে পারব না। ওরা আমাকে এখানে রাখবে না। আমি তোমাদের আমার সব টাকা দেব। যদি আমি বাগানের দেখাশোনা না করতে পারি, আমাকে একটু ঢুকতে দিও। আমি থালাবাসন পরিষ্কার করব, মুরগি দেখব। কিন্তু এটা হবে আমাদের নিজেদের বাড়ি।’ সে দুঃখ পেয়ে বলল, ‘তোমরা কী দেখেছ, স্লিম, চার্লসন আমার কুকুরটাকে কেমন জঘন্য ভাবে মেরে ফেলল? বলল, কুকুরটি খুব খারাপ, গন্ধ। যখন আমি কুকুর ওদের মারতে দিয়ে এখানে এলাম, আমার মনে হয়েছিল আমাকে যদি এখন কেউ গুলি করত, আমি শান্তিতে মরে যেতাম। কিন্তু তারা আমাকে মারবে না। আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, এরপরে আমি আর কোনো চাকরি পাব না। আমার আরো ত্রিশ ডলার জমা হবে, যখন তোমরা এখান থেকে চলে যাবে।’

জর্জ উঠে দাঁড়াল, ‘আমরা জমিটি কিনব, আমরা ওই পুরনো জায়গাটা ঠিক করব এবং বসবাস করা শুরু করব।’ সে আবার বসে পড়ল। ‘ধরো, কোনো মেলা হলো বা সার্কাস, আমরা সেগুলো দেখতে যাব। আমাদের কারো অনুমতি নিতে হবে না। আমরা গরু থেকে দুধ পাব। মুরগিকে ধান খাওয়াব।’

লেনি বলে উঠল, ‘এবং খরগোশকে ঘাস দেব। আমার এই কাজে কখনো ভুল হবে না। আমরা কখন এসব করব জর্জ?’

‘এক মাসের মধ্যে। জাস্ট এক মাসের মধ্য। শোনো, আমি ওই বৃদ্ধাকে চিঠি লিখব, যে আমরা তোমাদের জায়গাটা কিনব। আর স্যান্ডি ওদেরকে একশ ডলার দেবে, কনফার্ম করতে।’

স্যন্ডি বলল, ‘হ্যাঁ, দেব। ওদের কি ভালো চুলা আছে?

লেনি বলল, ‘আমি কুকুরছানাকে নিয়ে যাব। আমি জানি, ওর জায়গাটা খুব ভালো লাগবে।’

বাইরে থেকে কথার শব্দ শোনা গেল। জর্জ বলল, ‘কাউকে এগুলো বলো না। আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ যেন না জানে।’

লেনি ও স্যান্ডি সম্মতি দিল এবং তারা আনন্দে উত্ফুল্ল হলো, ‘কাউকে বলো না লেনি।’ লেনি নিজেকে বলল।

স্যান্ডি বলল, ‘জর্জ।’

‘বলো।’

‘আমার কুকুরকে আমার নিজের গুলি করা উচিত ছিল। অন্যকে আমার কুকুরকে অপরিচিত লোকদেরকে গুলি করে মেরে ফেলতে দেয়া ঠিক হয়নি।’

দরজা খুলে গেল। স্লিম প্রবেশ করল। এরপর এল চার্লি, চার্লসন ও হুইট এক এক করে ঢুকল।

স্লিমের হাত আলকাতরায় কালো হয়ে আছে। চার্লি তার কুনুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

চার্লি বলল, ‘আমি কিছু বাজে বকিনি তোমাকে। আমি জাস্ট তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি।’

স্লিম বলল, ‘তুমি আমাকে এটা নিয়ে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছ এবং এগুলো আর নিতে পারছি না। তুমি যদি তোমার নিজের স্ত্রীর খেয়াল রাখতে না পার, আমি কী করতে পারি! তুমি আমাকে কাজ থেকে ছাটাই করো।’

চার্লি বলল, ‘আমি তোমাকে কিছু বলিনি স্লিম। আমি জাস্ট তোমাকে বলেছি, তুমি তাকে দেখেছ কি না।’

‘কেন তুমি তোমার স্ত্রীকে ঘরে থাকতে বলো না!’ চার্লসন বলল।

চার্লি চার্লসনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, ‘তুমি তোমার নিজের চরকায় তেল দাও।’

চার্লসন বলল, ‘তুমি একটা ওর্থলেস! তুমি স্লিমকে উল্টাপাল্টা দোষ দিচ্ছ। আবার স্লিম তোমকে উলটা থ্রেট দিচ্ছে। তোমার আসলে ব্যাঙের পেট বুঝছ! আমি কেয়ার করি না যদি তুমি দেশের রাজাও হও। তুমি আমার সাথে এমন করলে, আমি তোমার মাথা উড়িয়ে দিতাম।’

স্যান্ডি চার্লসনের সাথে যোগ দিল, ‘তোমার তো গ্লাভস ভ্যাসেলিনে ভরা।’ সে মুখ বেঁকিয়ে বলল। চার্লি রক্ত চোখে স্যান্ডির দিকে তাকাল। এদিকে লেনির মুখে হাসি হাসি ভাব।

চার্লি লেনির দিকে গিয়ে রাগ করে বলল, ‘তুমি কি কারণে হাসছ, স্টুপিড!’

লেনি তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ?’

চার্লি রেগে আগুন হলো। ‘বাস্টার্ড! ওঠ! কোনো কুত্তার বাচ্চা আমাকে নিয়ে মজা করতে পারবে না! আমি তোকে দেখাব আমি কে!’

লেনি জর্জের দিকে অসহায়ের মতো তাকাল এবং উঠে দাঁড়াল। চার্লি লেনিকে বাম হাত দিয়ে ধাক্কা দিল এবং ডান হাত দিয়ে ওর নাকে জোরে ঘুষি বসিয়ে দিল। লেনি চিত্কার করে উঠল, ওর নাক দিয়ে রক্ত বের হলো। বলল, ‘জর্জ, ওদের বলো আমাকে আমার মতো থাকতে দিতে। সে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। চার্লিও পিছন পিছন গেল মুখের ওপর মারতে মারতে। লেনির হাত পিছনে ছিল, সে ভয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না।

জর্জ জোরে জোরে বলল, ‘মারো লেনি, মারো। ওকে তোমাকে মারতে দিও না।’

লেনি হাত দিয়ে ওর মুখ ঢাকল এবং ভয়ে কাঁপতে থাকল। সে চিত্কার করে বলল, ‘ওদেরকে থামতে বলো জর্জ।’ এরপরই চার্লি ওর পেটে মারল এবং তার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো হলো।

স্লিম লাফ দিয়ে, ‘এই নোংরা ইঁদুরটাকে আমিই দেখতেছি।’

জর্জ স্লিমকে সরিয়ে নিয়ে গেল। ‘না, তুমি দূরে যাও। লেনিকে মোকাবিলা করতে দাও।’ জর্জ স্লিমের হাত ধরে মুখের কাছে সজোরে চেপে ধরল।

লেনি মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে ফেলল এবং জর্জের দিকে তাকাল। এবং চার্লি তার চোখে মারল। লেনির মুখ রক্তে ভরে গেল। জর্জ আবার বলল, ‘আমি বলছি লেনি, ওকে মারো, মারো।’

কিন্তু লেনি পারল না। লেনির মুখ থেকে রক্ত বের হলো, তার একটা চোখ কেটে বন্ধ হয়ে গেছে। জর্জ লেনিকে মুখের ওপর আঘাত করল। কিন্তু লেনি মুখে হাত দিয়ে ঢেকে ছিল। চার্লি এরমধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে এবং ক্লান্ত হয়ে গেছে।

জর্জ বারবার চিত্কার করে বলল, ‘লেনি ওর হাতে মারো। চলো স্লিম আমরা ওর হাত ভেঙে দিই।’

লেনি বলল, ‘তুমি আমাকে বলছ জর্জ!’ বলে সে চার্লিকে জোরে ওয়ালে ধাক্কা মারল।

এরপর হঠাত্ লেনির জ্ঞান ফিরল। চার্লি ফ্লোরে বসে পড়ল। স্লিম ও চার্লসন তার দিকে ঝুঁকে দেখল। স্লিম বলল, ‘চার্লিকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।’

লেনি কেঁদে বলল, ‘আমি চাইনি। আমি তাকে মারতে চাইনি।’

স্লিম বলল, ‘চার্লসন, যাও ওয়াগন নিয়ে আসো। আমরা তাকে সোলেদাদ নিয়ে যাব এবং ঠিক করে আনব।’ চার্লসন তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেল। স্লিম লেনিকে বলল, ‘এতে তোমার কোনো দোষ নেই। এই জানোয়ারের এটা প্রাপ্য ছিল। মনে হচ্ছে, একটা হাতও ঠিক নেই এর। স্লিম তাড়াতাড়ি এক কাপ পানি এনে চার্লির মুখের কাছে ধরল।’

জর্জ বলল, ‘স্লিম আমাদের কি এখন তাড়িয়ে দেওয়া হবে? আমাদের তো টাকার দরকার। মালিক কি আমাদের বের করে দেবে?’

স্লিম একটু শুষ্ক হাসি দিল। সে চার্লির দিকে ঝুঁকে বলল, ‘তুমি তোমার হাতে সেন্স ফিরে পেয়েছ? শুনছ?’ সে জিজ্ঞেস করলে চার্লি মাথা নাড়াল। স্লিম বলে গেল, ‘আমার মনে হচ্ছে তোমার হাত মেশিনে কেটেছে। তুমি কাউকে না বললে, আমরাও কাউকে বলব না। কিন্তু তুমি যদি বলো এবং এদের বিপদে ফেলো আমরা সবাইকে বলে দেব। এবং সবাই তোমাকে দেখে হাসবে।’

চার্লি বলল, ‘আমি কাউকে বলব না।’ চার্লি লেনির দিকে তাকাতে পারল না। বাইরে ওয়াগনের শব্দ শোনা গেল। স্লিম চার্লিকে উঠাল, ‘আসো, চার্লসন তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।’ স্লিম চার্লিকে বাইরে নিয়ে গেল।

জর্জ লেনির দিকে এসে বলল, ‘এটা তোমার দোষ না। তোমার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি তোমাকে যা বলেছি তুমি তাই করেছ। যাও ওয়াশরুমে গিয়ে রক্ত পরিষ্কার করে আসো। তোমাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।’

লেনি তার রক্তমাখা মুখে হাসল, ‘আমি কোনো ঝামেলা চাই না।’ সে দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলল, ‘জর্জ আমি কি এরপরও খরগোশ দেখাশুনা করতে পারব?’

‘অবশ্যই। তুমি তো কিছু ভুল করনি।’

‘আমি আসলেই কোনো ক্ষতি করতে চাইনি।’

‘এসব এখন বলতে হবে না। যাও বাথরুমে যাও এবং পরিষ্কার করো নিজেকে।’

হার্নেস রুমে নিগ্রো ক্রুকের বিছানা। রুমের একপাশে একটা বর্গাকার চার দরজার জানালা এবং অন্যপাশে একটা সরু তক্তার দরজা সেখান দিয়ে শস্যাগারে যাওয়া যায়। ক্রুকের বিছানা একটা লম্বা খড়ের, তার ওপর কম্বল বিছানো। জানালার পাশে ওয়ালে পেরেকে ছেঁড়া হার্নেস যা কিনা সেলাই করা হবে। নতুন চামড়া ঝুলানো, এর নিচে চামড়ার কাজ করার যন্ত্র, বাঁকা ছুরি, সুঁচ এবং সুতার বল এবং একটা হাতে সেলাইয়ের মেশিন। ক্রুকের বিছানার পাশে তার আপেলের বাক্স, তার ভিতরে তার ও ঘোড়াগুলোর জন্য ওষুধ রাখা। সাবানের ক্যান, আলকাতরার ক্যান এবং তার সঙ্গে রং করার ব্রাশ। ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে তার পছন্দের জিনিসপত্র। একা থাকে বলে ক্রুক সে এভাবে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রাখে। সে একজন নিগ্রো এবং কিছুটা বিকলাঙ্গ হওয়ার কারণে সে এখানে বেশি স্টাবল। সে তার নিজের ভালো লাগাকে অনেক দাম দেয়, ক্রুকের কয়েক জোড়া জুতা, এক জোড়া রাবার বুট, একটা বড় অ্যালার্ম ঘড়ি এবং একটা শটগান। তার অনেক বই, একটা ছেড়া ডিকশনারি এবং ক্যালিফোর্নিয়া সিভিল কোড ১৯০৫। বিছানার ওপর ছেঁড়া ম্যাগাজিন এবং কিছু ময়লা বই আছে শেলফে। একটা সোনালি রঙের চশমা ঝুলে আছে একটা পেরেকের সাথে।

রুমটা ঝাড়ু দেওয়া হয় এবং ভালো পরিষ্কার, এই কারণে ক্রুক একজন একা সুখী মানুষ। সে তার দূরত্ব বজায় রাখে অন্যদের কাছ থেকে। তার শরীর বাম দিকে বেঁকে থাকে, তার মেরুদণ্ড বামদিকে বেঁকে থাকে, তার চোখগুলো চক্ষুকোটরে ঢুকে আছে মনে হয়। তার মুখে বয়সের ভাঁজ, তার পাতলা ঠোঁট মুখের চেয়ে সরু মনে হয়।

সেদিন ছিল শনিবার রাত। ক্রুক তার বিছানায় শুয়ে ছিল। পেছন থেকে জিন্সের ভিতর দিয়ে শার্ট দেখা যাচ্ছিল। তার এক হাতে তেলের বোতল, অন্য হাতে সে তার মেরুদণ্ডে হাত দিয়ে তেল মালিশ করছিল। শব্দ করে লেনি তার দরজায় এসে দাঁড়াল। প্রথমে ক্রুক তাকে দেখতে পারল না। কিন্তু যখন দেখল সে শক্ত হয়ে গেল এবং বিরক্ত হলো। তার হাত শার্টের নিচ থেকে বেড়িয়ে এল। লেনি অসহায়ের মতো হাসল। ক্রুক শক্ত গলায় বলল, ‘তোমার আমার রুমে আসার অধিকার নাই। আমার রুমে কারো আসার পারমিশন নাই, আমি ছাড়া।’

লেনি ঢোঁক গিলল এবং তার মুখ হলুদ হয়ে গেল। সে বুঝাল, ‘আমি এখানে কিছু করতে আসিনি। আমি আমার কুকুরছানাগুলোকে দেখতে এসেছিলাম এবং দেখলাম তোমার এখানে আলো জ্বলছে।’

‘ওয়েল, আমার আলো দরকার তাই লাইট জ্বালায়েছি। আমি তোমাদের রুমে যাই না, তাই তুমি আমার রুমে আসবে না।’

‘কেন তুমি আসতে চাও না।’ লেনি জানতে চাইল।

‘কারণ আমি নিগ্রো। আমি খেলতে পারি না। কারণ আমি কালো। ওরা বলে যে আমার গায়ে গন্ধ। কিন্তু আমি বলছি যে তোমাদের গায়ে গন্ধ।’

লেনি অসহায়ের মতো বলল, ‘সবাই শহরে চলে গেছে। স্লিম, জর্জ সবাই। জর্জ বলেছিল আমাকে আমাদের রুমে থাকতে। কিন্তু আমি দেখলাম তোমার রুমে আলো জ্বলছে।’

‘ওয়েল, তুমি কী চাও?’

‘কিছু না। আমি এখানে আলো দেখলাম, ভাবলাম আসি আর বসি তোমার সাথে।’ v

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৩ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন